অরবিন্দ গুহ : আমার পিতৃপ্রতিম পরিজন

যশোধরা রায়চৌধুরী

 

১৯৮৪ সালের আশপাশ। তখন প্রেসিডেন্সি ক্যান্টিনে রোজ নতুন বই আসে বন্ধুদের হাত ধরে। নব নব কবিতার সঙ্গে পরিচিতি ঘটে, সেও এই বন্ধুদের হাত ধরেই। ক্লাসরুমে বসে যত না শিখি তার চেয়ে অনেক বেশি শিখি কলেজ ক্যান্টিনেই। অন্তত ততদিন পর্যন্ত ব্যাপারটা সেরকমই ছিল, এখন কী হয় জানা নেই। জীবন গিয়াছে চলে ত্রিশ ত্রিশ বছরের পার। সেই সময়ে, যখন ইস্কুলের বা ইলেভেন টুয়েলভের পড়া বইগুলো, কবিতাগুলো, যেন সামান্যই কাদাজলে ভরা পাড়ার পানাপুকুরের জলে চেনা ব্যাঙাচি বা পুঁটিমাছের মতো লাগে, যখন ওইসব বইয়ের বাইরেও আরও এত এত বই, এত এত মত, এত এত ভাবনা ঝাঁপিয়ে পড়ছে মাথার ওপরে আমার, সেইসময়ে এক রাঘব বোয়ালের মতো আমাদের ক্যান্টিন পাবলিকদের অনেককেই অধিগ্রহণ করল এই কবিতাটি। কবির নাম অরবিন্দ গুহ, কবিতাটি বয়ে আনল আমাদের বন্ধু অনিন্দ্য বসু।

আমার প্রজন্মের অসংখ্য বন্ধুর স্মৃতিবিধৃত সেই অরবিন্দ গুহ। তার আগে পরে পড়ে ফেলেছি অনেক নীরেনচক্কোত্তি, অনেক তারাপদ  রায়, অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন শঙ্খ ঘোষ, তাঁর জার্নাল বা কবিতার মুহূর্ত নিয়ে পাগলামি করছি আমরা, মুখস্থ হয়ে যাচ্ছেন আপসে শক্তি চাটুজ্জে ও নিশ্বাসে প্রশ্বাসে উঠতে বসতে “প্রাতিষ্ঠানিক” সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতাও আপামর আবৃত্তি হচ্ছে, পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথন নিয়ে মাতামাতি চলছে বিস্তর…

এই সময়েই ধীরে ধীরে পড়ে উঠছি অরবিন্দ গুহ বা তন্ময় দত্ত। এদের লেখা আর তত পাওয়া যায় না, সংগ্রহ করে পড়ে নিতে হয়, পঞ্চাশের কবি হলেও এঁরা যেন খানিক উপেক্ষিত নায়কই। আর কে না জানে যে কলেজজীবনের ওই সময়টা যাবতীয় অতর্কিত স্থল থেকেই গেরিলা হানার দিন।

ভালোবেসেছিলাম একটি স্বৈরিণীকে
খরচ ক’রে চোদ্দসিকে।
স্বৈরিণীও ভালোবাসা দিতে পারে
হিসেবমতো উষ্ণ নিপুণ অন্ধকারে।
তাকে এখন মনে করি।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরি হরি।
কী নাম ছিল? সঠিক এখন মনে তো নেই:
আয়ুর শেষে স্মৃতি খানিক খর্ব হবেই।
গোলাপী? না তরঙ্গিনী? কুসুমবালা?
যাক গে, খোঁপায় বাঁধা ছিল বকুলমালা,
ছিল বুঝি দু’চোখে তার কাজলটানা;
চোদ্দসিকেয় ছুঁয়েছিলাম পরীর ডানা,
এখন আমি ডানার গন্ধে কৌটো ভরি।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরি হরি।
অন্ধ কিছু দেখে না, তার কণ্ঠ পারে
ফুল ফোটাতে অন্ধকারে।
অন্ধকারে যে-গান বানাই একলা হাতে
সুদূর সরল একতারাতে
সে-গান কোথায় ভাষা পেল, স্বচ্ছ ভাষা?
মূলে আমার চোদ্দসিকের ভালোবাসা।
জলের তলায় মস্ত একটা আকাশ ধরি।
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরি হরি।

Tastylia USA পৌত্তলিক/অরবিন্দ গুহ

এই কবিতাটির সঙ্গে এবং আশেপাশে অন্য কয়েকটি মাত্র কবিতাপড়া দিয়ে, আমার কবিতাভুবনের ইঁট কাঠ মাটি তৈরি হয়… পূর্বে উল্লিখিত পঞ্চাশের এক দল কবি, আশির দশকের শুরুতেই, এঁরা আমার কবিতাপিতা… স্বীকারে খেদ নাই। এর পর আসবেন ভাস্কর চক্রবর্তী মৃদুল দাশগুপ্ত বা জয় গোস্বামী।

leo dating aquarius man

৩ জুন ২০১৮, ফেসবুক থেকেই জানা যায়, বিশিষ্ট কবি, লেখক অরবিন্দ গুহ প্রয়াত। ১৯২৮-এর জাতক। ইন্দ্রমিত্র নামেই তিনি বেশি পরিচিত। বিশেষত বিদ্যাসাগরের জীবনীগ্রন্থের জন্য। ২০১৫ থেকে স্মৃতিভ্রংশ রোগে ভুগছিলেন। রবিবার সকালে দক্ষিণ কলকাতার এক নার্সিংহোমে তাঁর জীবনাবসান হয়। বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। রয়েছেন স্ত্রী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী পূরবী গুহ, কন্যা গৌরী।

অরবিন্দ গুহর জন্ম ১৯২৮–এ বাংলাদেশের বরিশালে। সেখানকার ব্রজমোহন স্কুল, কলেজে পড়াশোনা। কলেজে তাঁর শিক্ষক ছিলেন জীবনানন্দ দাশ। পরে কলকাতার আশুতোষ কলেজ থেকে স্নাতক। অরবিন্দ গুহ স্বনামে কবিতা লিখলেও প্রবন্ধ, উপন্যাস, জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন ইন্দ্রমিত্র নামে। ১৯৭২–এ ইন্দ্রমিত্রর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘‌করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’ রবীন্দ্র পুরস্কার পায়। ‘‌দেখা সাক্ষাৎ’‌ কাব্যগ্রন্থের জন্য আরবিন্দ গুহ আবার রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত হন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘‌দক্ষিণ নায়ক’ বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। সজনীকান্ত দাশকে নিয়ে লিখেছিলেন ‘নিপাতনে সিদ্ধ’‌। তাঁর উপন্যাস ‘সাজঘর‌’‌–এ উঠে এসেছে বাংলা রঙ্গমঞ্চের আলো–আঁধারি। ২০১৪–তে তাঁর শেষ কবিতার বই ‘‌প্রস্থান সময় উপস্থিত’।

‘‘এর পরে আর লিখতে পারব না,’’ মেয়ে গৌরীকে বলেছিলেন অরবিন্দ গুহ। ‘এর পরে’ মানে ২০১৫। তার পরেই স্মৃতিভ্রংশে কার্যত শয্যাবন্দি হয়ে পড়েন তিনি। এভাবেই কেটেছে প্রায় আড়াই বছর।

শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় রবিবার সকালে অরবিন্দবাবুকে আলিপুরের একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়। অন্ত্রে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছিল হঠাৎ। কিছুক্ষণের মধ্যেই পঞ্চাশের দশকের উজ্জ্বল কবি অরবিন্দবাবুর জীবনাবসান ঘটে।

জন্ম বরিশালে। সেখানে ব্রজমোহন কলেজে জীবননানন্দ দাশের সান্নিধ্যে আসেন অরবিন্দবাবু। প্রথম কাব্য ‘দক্ষিণ নায়ক’ থেকেই তাঁর মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন জীবনানন্দ। অরবিন্দবাবু পরে সরকারি চাকরি নেন কলকাতায়। প্রখর রসবোধ আর গবেষণাধর্মিতা মিশেছিল তাঁর সৃষ্টিতে। কবিতা ছাড়াও গদ্যে তিনি সাবলীল। লিখতেন ছোটদের জন্যও। শোনা যায়, ইন্দ্রমিত্র ছদ্মনামে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আকরগ্রন্থ ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’ লেখার পর্বে এক বার শম্ভু মিত্রের সঙ্গে আলোচনা করতে গিয়েছিলেন অরবিন্দবাবু। শম্ভুবাবু প্রথমে নাকি বুঝতে পারেননি ইনিই ইন্দ্রমিত্র। তিনি ইন্দ্রমিত্রের পরামর্শ নিতে বলেন অরবিন্দবাবুকেই! ‘করুণাসাগর বিদ্যাসাগর’ ছাড়াও অরবিন্দবাবুর গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থের মধ্যে আছে ‘নিপাতনে সিদ্ধ’, ‘সাজঘর’।

ওপরের এই পরিচিতিটুকু ফেসবুকের প্রতিবেদন টুকেই লিখে দেওয়া গেল। তাছাড়া, নাহ, নাহ, আমার কোনও ব্যক্তিগত আলাপ ছিল না। ২০০৬ সালে একবারই এক কবিসম্মেলনে দেখেছিলাম মনে পড়ে। অথচ আজ আমি বোধে পিতৃহারা। আবারও।

পঞ্চাশের কবিতার একটা সংকলন ছিল বাড়িতে। কলেজে পড়ার আগেই সেটায় হাত পড়েছিল কিন্তু কাঁচা বয়সে বুঝিনি কিছু, মনে হয়। পরবর্তীতে সে বই বার বার নামিয়ে নামিয়ে পড়তাম। শান্তি লাহিড়ির সম্পাদনায় ছিল সেটা। আমাকে অন্ধের যষ্টির মতো কবিতা শেখাত সেই বই। তাইতে পড়া অনেক কবিতা এখনও স্মৃতিধার্য। “যে দশক পুনরধিকারের পুনরর্জনের পুনরুজ্জীবনের, প্রাচুর্যে প্রবলতায় সামর্থ্যে ও প্রত্যয়ে স্পন্দমান” এমনই স্পর্ধিত সংকলন শান্তি লাহিড়ি সম্পাদিত বাংলা কবিতা-র প্রথম কবিই ছিলেন অরবিন্দ! নামের আদ্যক্ষর ‘অ’ বলেই।

কিছু কবিতা হন্ট করত আমায়। যেমন এই কয়েক পংক্তি:

আরও একবার তুমি দুঃসাহসী হও, ভালোবাসো।
জানাও তোমার প্রেম লজ্জাহীন লম্পটের মতো।
সে তোমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল? উচ্চকণ্ঠে হাসো।
হে প্রেমিক, জয়ী হবে। মনে রেখো, তুমি প্রধানত
প্রেমিক, দাম্ভিক, কবি। মনে রেখো, তুমি ভালোবেসে
যা চাও তা প্রাপ্য নয় কোনওকালে সহজে, নিমেষে।

http://www.energylease.fr/viliv/1431 আত্মরতি কবিতা থেকে অংশ

অথবা এই মিষ্টি কবিতা:

তোমার কাছে অনেক কিছু গোপন করে রাখি,
তুমি আমার মধ্যদিনের পাখি।
অসংশয়ে শুনি তোমার নানারকম স্বর,
তুমি আমার একা থাকার ঘর।
দিনের বেলা কাটাতে হয় কটু কাজের তানে,
দু-চোখ আমি সজল করি কপট অভিমানে।
তোমারও চোখ সহসা জলময়
সফল হল আমার অভিনয়–
মাঘের শেষে বৃষ্টি নামে বাংলাদেশের প্রাণে।
বৃষ্টি যদি নামে মাঘের শেষে,
বলতে পার কী হয় তবে দেশে?
জান না? হায়, আমিই কি তা জানি?
তুমি আমার নীরবতা, তুমি আমার বাণী।
তুমি যখন ডোবাতে চাও, আমি তখন ভাসি;
দূরে সরাও, আমি তোমার বুকের কাছে আসি।
বন্ধ হয়, আবার খোলে দ্বার।
জীবন ভরে আমার পারাপার
করতে হবে: কেন যে আমি তোমাকে ভালোবাসি!

homme d'affaire suisse cherche femme পারাপার

বহু, বহু পরে, আমি নিজের কয়েক লাইন লেখালেখিতে তথাকথিত প্রতিষ্ঠা পেয়ে, অনেককে মিলিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম, কবিতায় আমার পিতা ও পরিজনেরা। তাইতে তাঁর কথাও লিখেছিলাম। সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা এই, যে এক দাপুটে, শব্দদক্ষ, অভিমানী, সাবলীল, এবং অ্যাটিচিউড সম্পন্ন কবি ছিলেন অরবিন্দ গুহ। পঞ্চাশের মেধা, অনায়াস শব্দছন্দদক্ষতা এবং পঞ্চাশেরই অ্যাটিচিউড। যে ঝরঝরে গদ্য তিনি করুণাসাগর বিদ্যাসাগরে ব্যবহার করেছেন, তারই মূল এই কাব্যভাষায় দক্ষতা।

Trombettato involtarti ostlia zavorrassero Super alert pro option binary Circostanziavi livellino steccavate http://mysarlogs.com/go34fs/

oota sa torju lamaa lama dari biasanya. Tunggu saja sampai masuk tampilan SAMSUNG Galaxy Selamat…