তিতাসের পাড়ে বর্ষাকাল

দুর্জয় আশরাফুল ইসলাম

 

দখিন খোলা জানলার পাশে বসে আমরা কয়েকজন। সামনে থৈ থৈ জল। দৃষ্টির মধ্যভাগে তিতাস। তিতাস ফুলে ফেঁপে উঠে এখানে আমাদের স্কুলঘরের ভিটে ছুঁয়ে আছে। আর নৌকা ছুটে যাচ্ছে সারি সারি, এ সব নৌকোর গন্তব্য আমাদের জানা। তিতাসেরই এক পাড়ে কল্লাশাহের মাজার, সেখানে ওরস, সব নৌকো সেখানে যাচ্ছে। আমাদের কাজ ঘণ্টায় কতটা চোখে পড়ে তা গণনা করা। বাধ সাধে নৌকোর আড়াল থেকে কোনও নৌকো বেরিয়ে এলে, আমাদের হিসেবে ভুল হয়ে যায়। আমরা তবুও বসে থাকি। আর পাশেই কোনও পাড়া থেকে নৌকো প্রস্তুত হচ্ছে, ওই নৌকো মিছিলে যোগ দিতে, বিকট মাইকের শব্দ, হুল্লোড় আর রঙিন পাল নিয়ে কোনও নৌকো ইতোমধ্যে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে, যতক্ষণ আরেকটিকে দেখছি। এসব মাত্র দেড়যুগ আগের কথা। তখন সদ্য কৈশোরে। স্মৃতি যত তরতাজা, বাস্তবিকতা তত পুরনো করে দেয় এই মনোচিত্র। তখনও ছটি ঋতুর অনেকগুলো মেজাজে চেহারায় চেনা যেত। এর ভেতর বর্ষাকাল ছিল এমনই ব্যাপ্ত আর রঙিন, পালতোলা নৌকোসারির মতো।

এ তো ভরা বর্ষার গল্প, এর আগে বর্ষার প্রাথমিক আভাস কীরকম ছিল? ধানকাটা মৌসুম মানে গ্রীষ্ম ফুরিয়ে যেত, গ্রাম জুড়ে ব্যস্ততা আর হালখাতা আয়োজনে ভাটা পড়তে শুরু করলেই আমরা দেখতাম ফসলি জমিতে জমে উঠেছে অন্য আয়োজন, নানা উপলক্ষের ফুটবল। বিবাহিত অবিবাহিত প্রতিপক্ষ, এপাড়া ওপাড়া, ছোটদল বড়দল কত কী! যেসব জমিকে খেলার মাঠ বানানো হত সেসবে একটু একটু করে জল ভিড় করত, আকাশে প্রায়শ মেঘের ঘনঘটা, গগনবিদারী চিৎকার, বৃষ্টি নামত প্রায় বিকেল, অঝোর বৃষ্টি, থেমে গেলেই আবার সকলে খেলা দেখায়, কিংবা হালকা বৃষ্টি, সে কি দমিয়ে রাখতে পারে মানুষের সম্মিলিত উচ্ছ্বাস আর আয়োজন! ওই যে ঘিরে ধরত জল, সে শুধু বৃষ্টির জমে থাকা জল নয়, বর্ষা আবাহনের। নতুন আরেক ঋতু দাঁড়িয়ে পড়ত আমাদের দরজায়। আর আমরা যারা এইসব ফুটবল উৎসবের দিনেও ক্রিকেট মাঠে পড়ে থাকা, তাদের একটা মাঠ, গ্রামের শেষ দিকে, যেখানে যেতে শীত ঋতুতে পা ভিজে যায় শিশিরে, সে জুড়ের মাঠের চারদিকে জল জমতে থাকে, আমাদের মাঠে ঢুকবার পথ ক্রমশ সরু হতে থাকে, এরপর মাঠটিও কয়েক মাসের জন্য তলিয়ে যায়।

ভাবে বর্ষা আসে। ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের চারদিকে। ফোটে শাপলা শালুক। নতুন মাছেরা এসে ভিড় জমায় গ্রামের মেঠোপথ ঘেঁষা নিচু ঝুপড়ির তলে। নবীন মাছ শিকারির দল ভিড় জমায়। কেউ কেউ টর্চের আলো নিয়ে খোঁজে নিশীথ ভিড়ের মাছ। আর সারাদিন এখানে সেখানে সদ্য ধরা পড়া মাছের বিকিকিনি। জমে ওঠে কর্মহীন অলস মানুষদের আড্ডা, তাসখেলা। তৈরি হয় নতুন সব ঘাট, এপাড়া থেকে ওপাড়া যোগাযোগের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকো। কতবার এমন হয়েছে ঘাটে বাঁধা নৌকো শখ করে কেউ বৈঠা চালাতে গিয়ে ফেলে আসছে খানিক দূরে, মাঝি নেই। জলে নেমে টেনে নিয়ে আসা ছাড়া কোনও গতি নেই। আর জমে উঠত লাঠিখেলা, এপাড়া ওপাড়ায়। ভিনগ্রাম থেকে লাঠিখেলার দক্ষ খেলোয়াড়রা এসে জড়ো হতে থাকে দুপুরে, বিকেলের আগেই মাঠভর্তি লোক গোল হয়ে বসে, আর খেলা শুরু হয়। কত কৌশল আর দক্ষতা, মানুষ বিস্ময় চোখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, হাততালিতে পাড়া সরগরম হয়ে ওঠে। আর গল্প চলে আরও অনেকদিন।

তখনও গ্রাম মানে মাটিপথ, পর্যাপ্ত ব্রিজ কালভার্ট নেই। সামষ্টিক প্রচেষ্টায় দাঁড়িয়ে পড়া বাঁশের সাঁকো। সে সব সাঁকো পেরোতে গিয়ে নতুন অতিথির পড়ে যাওয়া অবস্থা নিয়ে হাসি তামাশা আর শেষে মানুষের উদ্বেগ সহমর্মিতার কত গল্প মনে পড়ে আজ। শৈশবের প্রাথমিক স্কুলে যেতে পেরোতে হত একটি সাঁকো, উচ্চবিদ্যালয়ে যেতে সেটা আরও দু তিনটির যোগ। কতবার এমন হয়েছে বই খাতা নিয়ে কেউ পড়ে গেছে পানিতে, হয়তো বা ইচ্ছা করেই। ছিল দুর্ভোগ, যন্ত্রণাও অনেক। তখন বর্ষা মানেই নিয়ম করে সেটা বন্যায় গড়ানো। সেটার আঁচ পাওয়া যেত রেডিওতে, আসামে বন্যা হয়েছে মানে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বভাগ সেটাকে পাবে, এই জল প্রথমে নেমে আসবে সিলেটের হাওড়, জলাঞ্চলে, তারপর মেঘনা, তিতাস হয়ে কুরুলিয়া খাল এবং গ্রামে গ্রামে। গ্রামের মেঠোপথ ভেঙে পড়ে প্রতিবার, কত পুকুরের পাড় ভেঙে সব মাছ সরে যায়। বাঁশের মাচা দিয়ে বাঁধ দিয়ে কত রকম প্রচেষ্টা নিয়ে নামে মানুষেরা, তারপর জল বাড়লে আর কোনও উপায় থাকে না। এইসব দুর্ভোগ অভিভাবকদের, বয়োজ্যেষ্ঠদের যেন কেবল। দস্যি কিশোরদের তখনও দুরন্তপনা, কলাগাছের ভেলা নিয়ে সারাদিন পুকুরে, সারাদিন জলে হুল্লোড়। বন্যা যে কত দুর্বিষহ আর যন্ত্রণার তার সাক্ষী হয়ে আমাদের আয়ুষ্কালে চিহ্ন রেখে আছে ১৯৯৮ আর ২০০৪-এ। প্রথমটি ছিল বাঁধ ভেঙে আসা জলের মতো এক দুদিনে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে দেখা, এত দ্রুত, কেউ হয়তো ঘুমুতে গেল বাড়ির পাশে খানিক জলের চিহ্ন দেখে, ঘুম থেকে উঠে দেখল ঘরের ভেতর জল নাচছে। ২০০৪-এর বন্যা ছিল দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগের। মানুষ ও গৃহপালিত পশুপাখি একে অপরের দিকে অসহায় চোখে তাকায়। এত জল ঈশ্বরের রোষানল সঞ্চয়ে! এত জল যাবে কোথায়! কোনওদিন কি আদৌ যাবে! তারপর সত্যিই একদিন জল নামতে শুরু করে, ক্রমে উঠোন, মেঠোপথ জেগে উঠতে শুরু করে, আর মানুষেরা তৈরি হতে থাকে ফসলের স্বপ্নে…

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*