ডাকাতমারির মাঠে….

পীযূষ কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়

 

“এ এলাকায় মৃতদেহ দাহ করবার এক এবং একমাত্র জায়গা হল, ধরো তোমার জঙ্গিপুর শ্মশান। গঙ্গার (আসলে ভাগীরথীর) তীরে ভারত সেবাশ্রম সংঘের একটি ছোট্ট শাখা, আর কালো মার্বেল পাথরে বাঁধানো কালী মন্দিরের চাতাল পেরোলেই দেখতে পাবে, নির্বিকার, নিশ্চিন্ত চিত্তে পরপর শুয়ে থাকা বেশ কয়েকটি সাদামাটা কাঠের চুল্লি। তাদের মধ্যেই কিছুদিন আগে মিউনিসিপ্যালিটি থেকে বসানো একটি ইলেকট্রিক চুল্লি তেল জাবজেবে ছাপোষা গ্রাম্য গেরস্থ বৌ, ঝি’দের ভীড়ে মহার্ঘ প্রসাধনসজ্জিত অভিজাত চেহারার শহুরে নারীর মতো নিজ আভিজাত্য-মদে বুঁদ। অবশ্য সমস্ত মৃতদেহের গন্তব্যই যে জঙ্গিপুর শ্মশান এমনও নয়। প্রেমে পড়ার জন্যে এখন বারোমেসে বসন্তকাল। অধুনা কুন্তি’রা কবিরাজি কিংবা গ্রাম্য হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে গর্ভপাত করে লজ্জা হতে পরিত্রাণ পায় বটে কিন্তু গর্ভাস্থিত অবোধ ভ্রূণটি কর্ণের ন্যায় সৌভাগ্যবান না হওয়ার দরুণ তার বা তাদের জঙ্গিপুর দর্শনের সৌভাগ্য হয় না। কন্যার মাতা স-পারিষদ নদীর পাড়ে বাঁশবনের অন্তরালে উর্বর মৃত্তিকার বেশ কয়েক হাত ভিতরে আপন কন্যার প্রেমের ইতিহাস গোড় দিয়া রাখে। গ্রাম্য শরিকি বিবাদে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ভাই অন্য ভাইয়ের কিংবা জামাই শ্বশুরের মুণ্ডু ধড় হতে আলাদা করে দিলেও পুলিশ কেসের ভয়ে ভীত গ্রামবাসীরা শলা করে পাশের বাঁশলৈ কিংবা জগধরীর নদীর পাড়েই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তাদের দাহকার্য সম্পন্ন করে। তবে এইসব ব্যতিক্রমকে ছেড়ে দিলে বাকি মৃতদের নিয়ে জঙ্গিপুর শ্মশান ও শ্মশানের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বিভিন্ন পেশার লোকজন বহাল তবিয়তে আছে সন্দেহ নাই।”

এতদূর বলে হাঁপানির রুগী চক্কোত্তি মশাই কাশতে শুরু করলেন। এরপর আরও দেড় মিনিট ধরে কাশির প্রাবল্যে তার অস্থিচর্মসার দেহখানি বেতসের মতো কাঁপতে থাকবে। পরে প্রবল হতে মৃদু হয়ে সেই কাশির দমক যখন একেবারে থেমে যাবে, যতীন চক্কোত্তি তখন কল্পিত বিড়ি ও দেশলাইয়ের সন্ধানে নিজের ময়লা ধুতির কোঁচা হাতড়াবেন। “দেখেছ, সনৎ আজও বিড়ির বান্ডিলটি কোথায় ফেলে এসছি…” বলতে বলতে তিনি সনৎ মণ্ডলের দিকে নিজের ডান হাতখানি বাড়িয়ে দেবেন। কোনও এক অলিখিত নিয়ম মেনে সনৎ কাকু বিড়ি ও দেশলাই আগিয়ে দিলে, বিড়ির আগে ও পেছনে ফুঁ ফুঁ করে কয়েকবার ফুৎকার করে, তাতে অগ্নি সংযোগ করে, একটা অতি লম্বা সুখটান মারার পর আবার চক্কোত্তি মশাই নিজের গল্পে মনোনিবেশ করবেন।

সিনেমার ইন্টারভ্যালে চিউয়িং গামের মতো একে অপরের গায়ে সেঁটে থাকা নব্য প্রেমিক প্রেমিকা ছাড়া অন্যরা যেমন হিসি করতে যায়, স্টার জলসার ধারাবাহিকে বিজ্ঞাপন বিরতি হলে যেমন ঘোষ গিন্নি গোয়ালে আধ-ভেজা খড়ের সঙ্গে মসকিউটো কয়েল মিশিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে পোষ্য গো-পাল’কে হিংস্র মশার কামড় হতে রক্ষা করার জন্যে গোয়ালের দিকে যান, চক্কোত্তি মশাইয়ের বিড়ি ব্রেকেও আমরা একটু দূরত্বে সরে গিয়ে পিএনপিসি-সহযোগে ধূমপান করি।

“আষাঢ়ের অন্ধকার রাত। টিপটাপ করে শুরু হয়ে রাত দশটা নাগাদ মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে, “ধুর বাঁ!” বলে স্বগতোক্তি করে হিয়াতনগরের ভটভটি স্ট্যান্ডের সর্বশেষ ভটভটির ড্রাইভার শের মহম্মদ নিজের বাড়ির দিকে গাড়ি ঘোরাল। বৃষ্টির উৎপাতে সারাদিন সওয়ারির পাত্তা নেই। আশা ছিল, দুর্যোগের রাত্রে শব নিয়ে দু একটি অসহায় শ্মশানযাত্রীর দল নিশ্চয় বরাতে জুটবে। এবং তেমন বুঝলে বড়সড় ভাড়া হাঁকতেও শের কার্পণ্য করবে না। কিন্তু…

দত্তদের মিষ্টির দোকান পার হতে না হতেই পিছনে সমবেত কণ্ঠে হাঁকডাক শুনে শের মহম্মদ গাড়ির ব্রেকে পা দিল। বিদ্যুতের আলোয় শের দেখল, তিন-চারজন হনহন করে গাড়ির দিকে ছুটে আসছে। কাছে এলে বোঝা গেল, মাঝবয়সী জনা-চারেক পুরুষ। হাতে ঝোলা, লণ্ঠন, সাইকেলের টায়ার প্রভৃতি দেখেই স্পষ্ট হল যে শ্মশানযাত্রীর দল। “দ্যাখেন, ভাই বহুত রাত হুং গেলছে, তাছাড়া রাত খুব খারাপ, যেন মাটিতে কেয়ামত নেমি আলছে। ই সুময়ে অদ্দুর যাওয়ার রিস্ক লিব না আর।” অভিজ্ঞ শের জানে, কী করে এইসব পার্টিকে খেলিয়ে খেলিয়ে ছিপে তুলতে হয়। তার না না শুনতে শুনতে শেষমেশ যখন অসহায় শ্মশানযাত্রীর দল হতোদ্যম হয়ে পড়বে, ঠিক তখনই শের প্রায় তিন ডবল ভাড়া হাঁকবে। সারাদিন তো বউনিও হয়নি। এদের মাথা থেকেই আজ লোকসানটা পুষিয়ে নিতে হবে। “চলেন চলেন, ভাড়া নিং চিল্লাচিল্লি করার লোক আমরা লোই। পাঁসশো চাহান, পাঁসশো টাকাই দিব।” বুলেন যদি তো আরও দু পঞ্চাশ টাকা লিবেন। বর্ষাপুকুরে থেমি আমরা যা খাব, আপ্নিও খাবেন। চলেন, গাড়ি ঘুরান।” দেড়শো টাকা ভাড়া একলাফে, বিনা তর্কে পাঁচশো টাকা হয়ে যাওয়াতে শের মহম্মদ প্রথমে চমকাল বটে, তারপর ভাবল, এই দুর্যোগের রাতে সে ছাড়া আর গাড়িই বা কই! আর শের মহম্মদ ছাড়া এই ঝড়জলের রাতে চার পাঁচ কিমি লম্বা মিত্রপুরের মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়ার হিম্মতই বা কয় শালার আছে! সুতরাং পাঁচশো টাকা না দিয়ে যাবেই বা কোথায়!

ধরো তোমার, আনসারুলের ফলের চটির সামনেই হাঁজড়াটা নামানো ছিল। শীতলপাটি জড়ানো ছোট্টখাট্টো একটি লাশ। গাড়িতে তুলতে গিয়ে এল ই ডি টর্চের আলোয় লাশের মুখখানি দেখে শের মহম্মদ শিউড়ে উঠল। “আ-হাহা! শালোর মরণের ধরণ নাই হে!” বড়জোর সতেরো কি আঠেরোর এক তরুণী বধূ। কী আশ্চর্য মায়াবী মুখখানি! মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা পরেও কেমন সতেজ, ঢলঢলে। যেন এখনই ঘুম থেকে জেগে কথা বলে উঠবে! বৃষ্টির জলে সিঁদুর ধুয়ে গেছে। আলতার রঙে সমস্ত কাপড়চোপড় মাখামাখি। কার কোল যে উজাড় হল কে জানে! ছিঃ ছিঃ বলে আফসোস করতে করতে শের মহম্মদ বাকিদের সাথে লাশকে গাড়িতে তোলার কাজে হাত লাগাল। এমনিতে হিন্দু মহিলা প্যাসেঞ্জার হলে ছোঁয়াছুঁয়ি থেকে সাবধান থাকতে হয়। কেউ ছোঁয় না মুসলিম বলে, কেউ ড্রাইভার বলে। কিন্তু লাশের আবার জাত কী।

লাশ গাড়িতে তোলা, বাঁধাছাঁদা করতে তোমার ধরো, সাড়ে এগারো পৌনে বারোটা বাজল।” ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষের মতো চোখমুখ করে চক্কোত্তি মশাই আকাশের দিকে তাকালেন। হাই তুলতে তুলতে মুখের সামনে তুড়ি বাজালেন। এ সিগনাল আমাদের সকলের চেনা। সনৎ কাকু নিজের পাঞ্জাবির পকেট থেকে বেশ হৃষ্টপুষ্ট নিটোল একটা বিড়ি বের করে, ধরিয়ে সেটা চক্কোত্তির দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বিনা বাক্যব্যয়ে বিড়িটা হাতে নিয়ে চক্কোত্তিমশাই বলতে শুরু করলেন। “শ্মশানযাত্রীদের মধ্যে বেশ মুরব্বি ধরণের যে জন, সেই এগিয়ে এসে বল্লো, “কই, মিয়াঁ এবার গাড়ি ছাড়েন।” “হ, তো আপনারা চাপেন কেনে, আমি তো রেডি। আপনাদিকে ফেলি আসতে পাল্লেই তো আমার ছুটি।” আমরা তো চাপব না, চাচা।” পাশের অল্প বয়স্ক চাপদাড়ির কথা শুনে শের ঘুরে দাঁড়াল। “বুলছেন কী হে! নিজেদের মরা ফেলি পালাবেন সব! খুন ফুনের কেস লয় তো? দ্যাখা গ্যালো আপনাদের এই পাঁসশোটা টাকার লেগি হামাকেই শেষে জেলের ঘানি টানতে হলো।” “তা লয়, তা লয়।” শের মহম্মদের চমকে যাওয়া দেখে চাপদাড়ি হো হো করে হেসে উঠল। “আসলে হঠাৎ মরা তো, কাহুকেই খবর দিয়া হয় নি। ফুনেরও যা হাল আজকাল, একবার লাগে তো বিশবার লাগে না। পাশেই সাহেব-লগর, উখানে যেং কুটুমদের নিং মটর সাইকেলে করি জঙ্গিপুর যাব। আপনি চাচা ততক্ষুণ আস্তে আস্তে একলাই এগ্যান। মটর সাইকেল ত, আপনি উমরপুর ঢুকতে না ঢুকতেই সাথ ধরি লিব।” শের কতবার এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। কখনও একজনকে মৃতদেহের সাথে গাড়িতে রেখে বাকি শ্মশানযাত্রীরা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের খবর দিতে যায়। কখনও আবার কেউই থাকে না। শের মৃতদেহ শ্মশানে নামিয়ে কালী মন্দিরের সামনে বুড়ো নিমগাছটার নীচে গামছা বিছিয়ে গড়াগড়ি দেয়। কখনও পাটনিদের ঝুপড়ি থেকে একটা দেশি মদের বোতল এনে তাতে চুমুক দিতে থাকে। পনেরো বিশ মিনিটের মধ্যেই একে একে আত্মীয়দের সঙ্গে নিয়ে শ্মশানযাত্রীরা এসে জোটে। আগত মহিলা আত্মীয়রা অদ্ভুত, বিকৃত কান্নায় রাতের শ্মশানের নীরবতা ভেঙে খানখান করে দেয়। পুরুষরা কেউ পাটনিদের ডেকে নিয়ে ঝিল সাজানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ আড়ালে গিয়ে সেদ্ধ ছোলা আর লবণ সহযোগে মদের পাত্রে চুমুক দেয়। সুতরাং এসব দেখতে শের অভ্যস্ত, কিন্তু……

“আমি এগ্যাল্যাম। আপনারা কিন্তু দেরি করিয়েন না, দিনের গতিক ভাল লয়।” সারা শরীরে একটা পলিথিনকে রেনকোটের মতো বেঁধে, আরেক টুকরো পলিথিনকে মাথায় বেঁধে নিয়ে শের মহম্মদ ভটভটিতে স্টার্ট দিল। পেছনে পড়ে থাকল আনসারুলের ফলের দোকান, বিদ্যুতের আলোয় ফলের দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিন শ্মশানযাত্রীর ঝিকমিকিয়ে ওঠা দেহাবয়ব, দত্ত সাইকেল স্টোর্স, মিলন মণ্ডলের কাপড়ের দোকান। কাশেমনগরের কাঠগোলা পেরোতেই পাকা রাস্তার দুদিকে ধানী জমি জলে জলাময়। “এমনি আর দুদিন চললেই নিগঘাত বান। তখুন আবার আর‍্যাক ঝামেলা! বালবাচ্চা, লাতুড়িপুতুড়ি নিং একবার ইখানে ছুট তো আর‍্যাকবার উখানে ছুট। খচ্চাকে খচ্চা, হয়রানিকে হয়রানি! বিচ্যার নাই, আল্লার কুনু বিচ্যার নাই! নাহলে ঐটুকুন পারা মেয়্যা, চেহারা তো লয় যেন নব করের হাতে গঢ়ানো লক্ষ্মী গোঁসাং। সেই কিনা…”

কড়কড়াত করে হঠাৎ ভয়ংকর মেঘ ডাকার শব্দে শের মহম্মদের চটক ভাঙল। “উঃ! চির্ক্যাছে দ্যাখো, যেন আজই সব শ্যাষ করি দিব্যে! রাস্তাও শালো শেষ হতে চাহে না আজ। এতুক্ষুনে মিত্রপুরের মাঠ!”

তোমার ধরো, মিত্রপুরের মাঠের বদনাম তো সারা এলাকায় আছে। ছাছিমড়ি, ক্ষুদাপিঁপড়ি এমন কেউ নাই যার বুক রাতের বেলায় ঐ মাঠ পার হতে কাঁপে না। কেউ নিজের চোখে কিছু দেখেছে কিনা তা এখন পর্যন্ত যদিও জানা যায়নি, কিন্তু শ্মশানযাত্রী বা ট্রাক ড্রাইভারদের মুখে অদ্ভুত সব গল্প শুনতে পাওয়া যায়।”

“অদ্ভুত মানে ঠিক কেমন অদ্ভুত?” আমার প্রশ্নে চক্কোত্তিমশাই ঘাড়টাকে সামান্য ঘোরালেন। ডান-চোখের কোণা দিয়ে দেখে নিলেন আমার প্রশ্নে সত্যিই জিজ্ঞাসা আছে নাকি ব্যঙ্গ, তারপর সন্তুষ্ট হয়ে আবার সামনের দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন, “যেমন ধরো, গতবার এক ট্রাক ড্রাইভারের গল্প শুনেছিলাম। ন্যাশনাল পারমিটের গাড়ি নিয়ে সে মুরারই থেকে মালদা যাচ্ছিল। হঠাৎ ট্রাকের হেডলাইটের আলোয় সে দেখে মাত্র কয়েক হাত দূরে দুই ভাইবোন নিশ্চিন্তে হেঁটে রাস্তা পার হচ্ছে। কোনওরকমে ব্রেক ধরে সে যাত্রা পরিস্থিতি সামলে নিয়ে সে ট্রাক ড্রাইভারদের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অত্যন্ত রাগত স্বরে ছেলে ও মেয়েটির মাতৃ ঠাকুরানের সাথে রাত্রিযাপনের অভিপ্রায় জাহির করে। এমনকি তাদের কানের পাশে সশব্দে সুবিশাল চপেটাঘাত করার মহান উদ্দেশ্যে গাড়ি থেকে নেমে রাস্তাতেও দাঁড়ায়। কিন্তু কোথায় কী! একঘেয়ে ঝিঁঝিঁর জ্বলে গিয়ে নিভে যাওয়া আর হেডলাইটের আলোয় জ্বলজ্বল করে ওঠা এক আধটি শেয়াল ছাড়া আর কিছুই তার নজরে পড়েনি। অদ্ভুত মানে, ধরো তোমার, মেয়েলি কান্না কিংবা খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা, বাচ্চাদের হঠাৎ করে গাড়ির সামনে চলে এসে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে দেওয়া, বাতাসের মতো ফিসফিসে স্বরে কথা বলা, দুমদাম এখানে ওখানে জ্বলে ওঠা আগুন কিংবা আলো… এইসবই আর কী!”

তারপর মিনিট দুয়েকের নিরবচ্ছিন্ন, অসহনীয় নীরবতা ভেঙে চক্কোত্তিমশাই’ই আবার শুরু করলেন, “তো আর পাঁচজনের মতো শের মহম্মদও এসব জানত। বরং বলা ভাল নিয়মিত গাড়ি নিয়ে যাতায়াত করার সুবাদে একটু বেশি করেই জানত। কবে ডাকাতমারির মাঠে কবে স্থানীয় তিনটি গ্রামের লোক চারজন ডাকাতকে মেরে মাটিতে পুঁতে দিয়েছিল, কবে জমির মোড়লের নাতনি তাদের মাহিনদারের সঙ্গে অবৈধ প্রণয়ে লিপ্ত হয়ে গর্ভবতী হলে বংশের সম্মান বাঁচাতে গর্ভের সন্তানসহ মা’কেও বাড়ির ভেতরে গলা টিপে খুন করে এই মাঠেই গোড় দেওয়া হয়েছিল, দুর্ঘটনাগ্রস্ত ট্রাকে মজুত বহুমূল্য ইলেকট্রনিক জিনিসের লোভে কে বা কারা ড্রাইভার ও খালাসিকে এই মাঠেই পাথরে থেঁতলে খুন করেছিল, এসব গল্প শের মহম্মদের মুখস্থ ছিল। ফলে, মিত্রপুরের মাঠ ঢুকতেই অতি সাহসী শের মহম্মদেরও বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

ততক্ষণে বৃষ্টির প্রাবল্য অবশ্য বেশ খানিক থেমে গেছে। যদিও ঠাণ্ডা হাওয়া আর কড়াৎ কড়াৎ শব্দে চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়া বিদ্যুৎ চমকানোর বিরাম নাই। শের মহম্মদের রীতিমতো শীত করতে লাগল। বিড়িতে দু টান মারতে পারলে খানিক শীত কম লাগত কিন্তু সে উপায়ও কি আর আছে! পলিথিন প্যাকেটে মোড়া সত্ত্বেও বিড়ি দেশলাই সবই ভিজে একাকার। কী কুক্ষণে আজ ভাড়া বইতে রাজি হয়েছিল সে! শের নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্যে নিজেকেই খিস্তি দিতে লাগল। ভাড়ার কথায় হঠাৎ তার সম্বিৎ ফিরলে শের ভাবল, একবার লাশের অবস্থা দেখে নেওয়া যাক। এত হুজ্জত করে লাশ বয়ে নিয়ে যেতে গিয়ে শ্মশানে নেমে যদি দ্যাখে গাড়িতে লাশই নেই। ঝাঁকুনির আর বৃষ্টির চোটে বাঁধন আলগা হয়ে কোথায় পড়ে গিয়েছে, তাহলে খিটকেলের একশেষ হবে। ভাড়া তো পাবেই না, তার উপর আরও নানান বাড়তি ঝামেলা।

একটা ঝাঁকড়া আমগাছের নীচে ভটভটি থামিয়ে লাশের হালহকিকত দেখার জন্যে শের মহম্মদ পেছনে তাকাল। “এ হে! লাশের অবস্থা তো চোখে দ্যাখার লয়! ম্যাঘের পানি আর খালঢিঁপের রাস্তায় খ্যাড়ের দড়ির আলগা বাঁধুন প্রায় খুলি যাওয়ার জুগাড়। যা ইস্পিডে আলছি, মরা বুলি এই ঝাঁকুনি সহ্য কর‍্যাছে। জিন্দ্যা প্যাসেঞ্জার হলে…”

পাশ ফিরে শোওয়া লাশটিকে আবার চিৎ করে শুইয়ে দিয়ে, তার পেটের উপর খড়ের দড়ি বাঁধন দিয়ে শের সামনের দিকে তাকাতে গিয়েই চমকে খানিক পিছনে সরে এল। বিদ্যুতের ক্ষণস্থায়ী আলোয় তার হঠাৎ মনে হল, মৃত তরুণী বধূটির লাশ যেন একবার মাথা ঘুরিয়ে বড়বড় চোখ মেলে ড্যাবড্যাব করে যেন তার দিকে চাইল। সাহস করে তৎক্ষণাৎ পিছনে তাকাতেই দেখা গেল, লাশ যেমন কার তেমন সিঁদুর আর আলতা মাখামাখি হয়ে নির্বিকার পড়ে আছে। “ধুর বাঁ!” শের মহম্মদ নিজের উল্টোপাল্টা ভাবনার কথা ভেবে নিজের মনেই একচোট হেসে নিল। “হা খোদা, চোখটো এবার গেলছে মুনে হয়! চোখেরই বা দোষ কী! বয়সও তো কম হল না। তাছাড়া এমন হাবিয়ায় হালে প’লে শুধু শের ক্যানে, সব শালোই কাপড়ে হেগি দিত।”

রাস্তার একদিকে ডাকাতমারির মাঠ। অন্যদিকে টিহারা। আশেপাশে পূর্বপশ্চিমউত্তরদক্ষিণ কোনও দিকেই আট দশ কিমির মধ্যে কোনও গ্রাম নেই। এখন যদিও রাস্তার দু ধারে দিগন্তবিস্তৃত ধানীজমি বৃষ্টির জলে থইথই করছে। মাঝেমাঝে বিদ্যুৎ চমক জলে প্রতিফলিত হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু ডাকাতমারির মাঠ যেমন তার হিংস্রতা আর খুনোখুনির ইতিহাসের জন্যে বিখ্যাত, টিহারা বিখ্যাত তার নির্মম বিশালতার জন্যে। এখনকার জল-থইথই অবস্থা দেখে অনুমান করাই যাবে না, যে কখনও গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে এই সুদীর্ঘ মাঠ পেরোতে গিয়ে বহু লোক একটুখানি জলের অভাবে মারা গেছে। তিন দিন, চার দিন তাদের শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাওয়া লাশ পার্থেনিয়ামের ঝোপে পড়ে থেকেছে। শেয়ালে, শকুনে ছিঁড়ে খাওয়ার পর কখনও উচ্ছিষ্ট লাশের শ্মশান বা কবর প্রাপ্তি ঘটেছে, কখনও ভবিষ্যৎ যাত্রীদের স্পর্ধাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্যে বিপদ সংকেত হিসেবে পড়ে থেকেছে তাদের সাদা স্কেলিটন। বাপ চাচার মুখে সেসবের কত গল্প শুনেছে শের মহম্মদ। হঠাৎ মিহি কান্নার মতো ধাতব আওয়াজ! শেয়াল ডাকল কি? নাকি বেড়াল? এই দুর্যোগের রাতে বেড়ালই বা আসবে কোত্থেকে? বিদ্যুৎ চমকানোর পর অন্ধকারও যেন বেশ ঘন হয়ে উঠছে। ঠাণ্ডা বাতাসেরও চরিত্র যেন হঠাৎ করে বদলে গেছে। তার শোঁশোঁ আওয়াজের মধ্যে দিয়ে অসংখ্য অতৃপ্ত অশরীরি যেন কোরাসে তাদের বঞ্চনা, অসহায়তা, জমে থাকা ক্রোধ আর পরিকল্পিত প্রতিশোধের কথা বলে চলেছে।

শের মহম্মদের হাতে অবশ্য পালোয়ান-বাবার মাজারের মাটি ভরা তাবিজ আছে। গত বছর মেজ’কির শ্বশুর দিয়েছিল। কিন্তু তা কি আর এতদিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকবে? আর যদি থাকেও বা তার গুণ কি আর এতদিনে খানিক নষ্ট হয়নি! এই দিগন্তবিস্তৃত অন্ধকার জটাজালের প্ররোচনায় অসংখ্য অতৃপ্ত, প্রতিশোধ-কামী অশরীরীর এই যে উদ্দাম তাণ্ডব, সমস্ত শোষক মানব জাতির প্রতিনিধিত্ব করা অসহায় শের মহম্মদকে সামনে পেয়ে রক্তপিয়াসী এই যে সম্মীলিত তুমুল অট্টহাস্য তাকে আটকাবার ক্ষমতা কি আর ঐ সামান্য তাবিজের আছে! সামনে পেছনে অন্ধকার ঘন থেকে ঘনতর হয়ে পালাবার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। রাস্তার পাশের গাছের ডালগুলো যেন লম্বা হাত হয়ে শের মহম্মদের গলার দিকে এগিয়ে আসছে। খুব কাছে দপ করে একজোড়া চোখ জ্বলে উঠেই নিভিয়ে যেতে শের মহম্মদের মনে হলে সে অজ্ঞান হয়ে যাবে। চলন্ত গাড়ি থেকে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে গেলে মৃত্যু অনিবার্য। বহু অভিজ্ঞতার বলে বলীয়ান শের মহম্মদকে চরমতম ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও তার উপস্থিত বুদ্ধি ধোঁকা দিল না। সে গাড়ি থামাল। দেখল, এই ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও তার ভিতর ঘেমে চবচব করছে। খুব জোরে শ্বাস নেওয়ার পর, খানিক ধাতস্থ হয়ে গাড়ি ছাড়ল সে। এল ই ডি টর্চের আলো জ্বেলে যত দ্রুত সম্ভব উমরপুর পৌঁছাতেই হবে। জোর, আরও জোর, আরও আরও জোর! মনে হচ্ছে এখনই ফুসফুস ফেটে যেতে পারে। হৃদপিণ্ড যে কোন মুহূর্তে মুখ দিয়ে লাফিয়ে বের হয়ে আসতে পারে। কিন্তু থামলে চলবে না। যেমন করেই হোক এই দোজখ তাকে পার হতেই হবে। খানাখন্দর, রাস্তার উপরে পরে থাকা ব্যালেস্ট পাথর, কিছুই আর তাকে আটকাতে পারবে না। হঠাৎ ঘাড়ে এক অদ্ভুত, শীতল স্পর্শে শের গাড়ির গতি কমাতে বাধ্য হল। মনে হল, মৃত বধূটি উঠে যেন তাকে ঘাড় ছুঁয়ে তাকে কিছু বলতে চাইছে। গাড়ির ব্রেকে পা দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে শের দেখল, মৃত বধূটি ধীরে ধীরে তার মৃত্যুশয্যা থেকে উঠে বসেছে। মুখ, চোখ, কপাল রক্তে মাখামাখি। ঠোঁট থেকেও টপটপ করে তাজা রক্ত ঝরে পড়ছে। রক্তমাখা ঠোঁটে প্রগলভ হাসি, দুটি বাহু আমন্ত্রণের ভঙ্গিতে বাড়িয়ে সে ধীরে ধীরে শের মহম্মদের দিকে এগিয়ে আসছে। বিগত কয়েক ঘণ্টায় শের অস্বাভাবিক অনেক কিছুই দেখেছিল। কিন্তু এই অকল্পনীয়, ভয়ঙ্করতম দৃশ্য তার মানব মস্তিষ্ক আর সহ্য করতে পারল না। সে অজ্ঞান হয়ে ভটভটির সিট থেকে নীচে পড়ে গেল।” চক্কোত্তিমশাই এই বলে একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে চুপ করে গেলেন। দেখলাম, শ্রোতাদের চোখের পলক পড়ছে না। সন্ধ্যার মৃদুমন্দ শীতল বাতাস হঠাৎ কোনও মন্ত্রবলে আরামদায়ক শীতলতার পরিবর্তে ভয়শীতল এক আবহকে বয়ে এনে সেই ডাকাতমারির মাঠ হতে বহু দূরের এক গ্রামের দুর্গামণ্ডপে এনে ফেলেছে। ইলেকট্রিকের মিটমিটে হলুদ আলোর বাইরে গেলেই যেন হঠাৎ করে জীবন্ত হয়ে উঠবে অমানুষিক, ভয়ংকরতম সেইসব গল্পের চরিত্ররা।

“ভোরে কয়েকজন সবজি ব্যবসায়ী যখন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়, তখন আশেপাশে ভটভটি কিংবা ভটভটির সওয়ারির কোনও চিহ্নই ছিল না। সাহেবনগর কিংবা তার আশেপাশে মৃত্যুসংবাদ দিতে যাওয়া কোনও আত্মীয়দের খোঁজও পাওয়া যায়নি। তবে এই ঘটনার পর স্থানীয় মৌলবী মুসলমানের ছেলের পানদোষ থাকা ঠিক কতখানি হারাম আর নাপাক, আর মানুষকে সুপথে আনতে পরম করুণাময় ঈশ্বর যে কতখানি নৃশংস হতে পারেন, সে নিয়ে জুম্মার দিন এক সুদীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। দূর দূরান্তের গ্রামগুলিতে ভুতের কল্যাণে শের মহম্মদ, আর শের মহম্মদের কল্যাণে ডাকাতমারি আর টিহারার ভুত বিখ্যাত হয়ে গেল। কিন্তু মিত্রপুর ও তার আশেপাশের গ্রামের লোকেরা এই ঘটনাকে তেমন পাত্তা দেয়নি। সম্প্রতি অতীতে শ্মশানযাত্রী সেজে একই ভাবে ভটভটি ছিনতাইয়ের ঘটনার কথা তারা বেশ কয়েকবার শুনেছিল।

 

1 Comment

  1. অসাধারণ লিখছো পীযূষদা।
    কবিতার সাথে আরো আরো ছোটোগল্প চাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*