সাহিত্য সূত্রধর-বিদ্যারই রকমফের

http://skylinemediainc.com/?pokakal=opcje-binarne-ksi%C4%85%C5%BCka&196=79 গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

অনুবাদ : প্রবাস দত্ত

[নিজের উপন্যাসের লিখনপ্রক্রিয়া নিয়ে মার্কেজের এই প্রবন্ধটির অনুবাদ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল 'কবিতীর্থ' পত্রিকার জানুয়ারি ১৯৯৪ সংখ্যায়।]

প্রতিটি উপন্যাসেই চরিত্র হল একটি কোলাজ — কোলাজ সেই সব বিভিন্ন চরিত্রের যা কেউ দেখেছে, শুনেছে বা পড়েছে। বিগত এবং বর্তমান শতাব্দীর প্রারম্ভের ল্যাটিন আমেরিকার সকল স্বৈরাচারী সম্পর্কিত সবকিছুই আমি পড়ি। স্বৈরতন্ত্রের অধিবাসী ছিলেন এমন বিস্তর মানুষের সঙ্গেও আমি আলাপ করেছি। অন্তত দশ বছর ধরে আমি এই কাজ করেছি। আর যখন চরিত্রটা ঠিক কী রকম হতে চলেছে সে সম্পর্কে আমার সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়েছে, তখনই যা আমি পড়েছি এবং শুনেছি তা সবটাই বিস্মরণের প্রয়াসী হয়েছি। এটা করেছি এই জন্যেই যাতে বাস্তব জীবনে সংঘটিত কোনও পরিস্থিতিকেই ব্যবহার না করে আমি অপূর্ববস্তু-নির্মাণক্ষম হতে পারি। একটা সময় আমি উপলব্ধি করলাম যে, কোনও স্বৈরতন্ত্রে কোনও এক সময়ের জন্যেও আমি নিজে বসবাস করিনি। সেই কারণেই ভেবেছিলাম যে আমি যদি দি অটাম অব দি প্যাট্রিয়ার্ক ইন স্পেন গ্রন্থখানি লিখি তাহলেই একটি স্বৈরতন্ত্রে বসবাসের পরিমণ্ডলটি আমি বুঝতে পারব। কিন্তু আমি দেখলাম যে ক্যারিবিয়ান স্বৈরতন্ত্রের থেকে স্পেনে ফ্রাংকোর সময়ের পরিমণ্ডলটি একেবারেই আলাদা রকমের ছিল। সেই জন্যেই কার্যত গ্রন্থখানি প্রায় এক বছরের মতো আটক রইল। গ্রন্থখানিতে একটা কিছুর অভাব ছিল এবং সেটা যে কী সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। তখন রাতারাতি আমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম যে, আমাদের ক্যারিবিয়ানে প্রত্যাগমনই সবচেয়ে ভালো কাজ হবে। আমরা কলম্বিয়ার ব্যারালকুইলায় এভাবেই ফিরে এলাম। আমি সাংবাদিকদের কাছে একটি বিবৃতি দিলাম যেটা তারা পরিহাস বলেই গণ্য করল। আমি বলেছিলাম আমি ফিরে এসেছি এই কারণেই যে পেয়ারার ঘ্রাণ আমি ভুলে বসেছি। আসলে যেটা আমার সত্যিই প্রয়োজন ছিল তা হল গ্রন্থখানি সমাপ্ত করা। ক্যারিবিয়ানের অভ্যন্তরে অভিযাত্রায় বেরোলাম আমি। দ্বীপ থেকে দ্বীপান্তরে পরিক্রমা করে আমার উপন্যাসে অনুপস্থিত উপকরণগুলি খুঁজে পেলাম আমি।

এই আঙ্গিক বা প্রকরণে একটি সাংবাদিকসুলভ গুণপনার অস্তিত্বও অনুভবভেদ্য ছিল। আপাত অবিশ্বাস্য ঘটনাবলির অনুপুঙ্খ বিবরণ ঘটনাগুলিকে এক নিজস্ব বাস্তবতা অর্পণ করেছিল। এটা একটা সাংবাদিকসুলভ কৌশল যা সাহিত্যেও ব্যবহার্য। দৃষ্টান্তস্বরূপ, যদি বলা যায়, নভতলে হস্তিযূথ উড্ডীয়মান হয়েছে, কেউই তা বিশ্বাসযোগ্য বিবেচনা করবেন না। কিন্তু যদি বলা যায় চারশো পঁচিশটি ঐরাবত আকাশে বিচরণ করছে, জনগণ সম্ভবত তাকে বিশ্বাস্য বলেই গ্রহণ করবেন। ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড গ্রন্থখানি সেইরকম উপকরণেই পরিপূর্ণ। আমার পিতামহী ঠিক অনুরূপ কৌশলই ব্যবহার করতেন। হলুদ প্রজাপতি পরিবেষ্টিত সেই চরিত্রটির কথা আমার বিশেষভাবে মনে পড়ে। যখন আমি খুব ছোট ছিলাম, একজন ইলেক্ট্রিসিয়ান আমাদের বাড়িতে আসতেন। আমি খুব কৌতূহলী হতাম তার কোমরবন্ধটি দেখে যার সাহায্যে বিদ্যুৎ-স্তম্ভ থেকে নিজেকে তিনি ঝুলন্ত রাখতে সক্ষম হতেন। আমার পিতামহী বলতেন যখনই সেই মানুষটি আসতেন বাড়িটাকে প্রজাপতি-পূর্ণ রেখে চলে যেতেন। কিন্তু যখন আমি ব্যাপারটা লিখতে বসলাম, তখন আমি আবিষ্কার করলাম যে প্রজাপতিগুলি যে হলুদ-বর্ণের ছিল এ-কথা না লিখলে মানুষ তা বিশ্বাস করবে না। যখন আমি রেমেডিওস দি বিউটি উপাখ্যানটি লিখছিলাম, তখন এটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে আমার দীর্ঘ সময় লেগেছিল। একদিন আমি বাগানে বেরিয়ে একজন মহিলাকে দেখলাম যিনি কাচাকুচির জন্য বাড়িতে আসতেন। তিনি কাচা কাপড়গুলি শুকোবার জন্য মেলে দিচ্ছিলেন। খুব হাওয়া দিচ্ছিল। তিনি হাওয়ার সঙ্গেই কথা বলছিলেন যাতে কাপড়গুলো উড়িয়ে নিয়ে না যায়। আমি আবিষ্কার করলাম যে, যদি আমি রেমেডিওস দি বিউটির জন্য কাপড়গুলি ব্যবহার করি, তাহলেই তিনি উর্ধ্বারোহণ করতে সক্ষম হবেন। ব্যাপারটা বিশ্বাসযোগ্য করতে আমি তা-ই করেছিলাম। বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রতিটি লেখকের সমস্যা। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য বলে গৃহীত হবে ততক্ষণ পর্যন্ত যে কেউ যা কিছু লিখতে পারেন।

‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড’-এর অনিদ্রা রোগের শুরুর সূত্রপাতটাই হয়েছিল এই কারণে যে ইডিপাস থেকে শুরু করে সকল সময়েই আমি মহামারী নিয়ে কৌতূহলী ছিলাম। মধ্যযুগের মহামারী নিয়ে আমি বিস্তর পড়াশুনা করেছি৷ আমার প্রিয় গ্রন্থাবলির মধ্যে অন্যতম হল ড্যানিয়েল ডিফোর দি জার্নাল অব দি প্লেগ ইয়ার। এর অন্যতম কারণ হল ডিফো ছিলেন একজন সাংবাদিক এবং তাঁর ধরনটাই ছিল যা তিনি বলছেন তা পুরোটাই কাল্পনিক। বহু বছর ধরে আমার ধারণা ছিল লন্ডনের মহামারী সম্পর্কে ডিফো যা লিখেছিলেন তা তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা৷ কিন্তু তারপরে আমি আবিষ্কার করলাম যে সেটা একটা উপন্যাস, কেননা লন্ডনে যখন মহামারী হয়, তখন ডিফোর বয়েস সতেরোর কম। মহামারী সব সময়ে আমার কাছে একটি পৌনঃপুনিক বিষয় হয়েছে — নানাভাবে। দি ইভিল আওয়ার গ্রন্থে পুস্তিকাগুলিই মহামারী। বহু বছর ধরে আমার চিন্তায় ছিল যে কলম্বিয়ায় যে রাজনৈতিক হিংস্রতা তার আন্তর্গঠন মহামারীরই অনুরূপ। ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ার অব সলিচুড-এ অনিদ্রা মহামারীকে এক সাহিত্য-কৌশল বলেই ব্যবহার করেছিলাম কারণ এটা ছুতোরের কর্ম ছাড়া আর কিছুই নয়।

ক্ষমতার নির্জনতার বিষয়টি প্রায়শই আমি ব্যবহার করে থাকি। একজন যতই শক্তিধর হয়ে ওঠেন, কে তাঁর সঙ্গে আছেন, আর কে নেই — এটা জানা তার পক্ষে ততই কঠিন হয়ে ওঠে৷ যখন কেউ ক্ষমতার শীর্ষে যান, তখন বাস্তবের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এটাকেই বলা চলে নিকৃষ্টতম নির্জনতা। একজন খুব ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব, একজন স্বৈরাচারী, বিবিধ স্বার্থ এবং মানুষের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে থাকেন। এদের অন্তিম লক্ষ্য হল বাস্তবতা থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করা। এই বিচ্ছিন্নকরণে সবকিছুই ঐকতানের মতো বাজে। ক্ষমতার নির্জনতার মতো লেখকের নির্জনতাও অনেক কিছুই করতে সক্ষম। একটি বাস্তবতাকে চিত্রিত করবার প্রয়াস অনেক ক্ষেত্রেই একটি বিকৃত সত্যের দিকেই লেখককে পরিচালিত করে। বাস্তবতাকে স্থাপন করতে গিয়ে বাস্তবতার সঙ্গেই তিনি ছিন্ন-সম্পর্ক হতে পারেন। একেই বলে গজদন্ত-মিনারবাসী হওয়া। এর খুব ভালো প্রতিরোধ হল সাংবাদিকতা। সেই কারণেই সব সময়েই আমি সাংবাদিকতায় তন্নিষ্ঠ থেকেছি, কারণ এটা বাস্তব জগতের সঙ্গে আমাকে অন্বিত রাখে৷ রাজনৈতিক সাংবাদিকতা এবং রাজনীতির কথাই আমি বিশেষভাবে বলছি। ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অব সলিচুড-এর পরবর্তী যে নির্জনতা আমাকে সন্ত্রস্ত করেছিল, তা লেখকের নির্জনতা নয়, খ্যাতির নির্জনতা। ক্ষমতার নির্জনতার সঙ্গেই এর সাযুজ্য বেশি৷ আমার বন্ধুবর্গ, যারা সকল সময়েই ধারে কাছে ছিলেন, তাঁরাই আমাকে সেই নির্জনতা থেকে রক্ষা করেছিলেন। সেই বন্ধুবর্গকে সারাজীবনই আমি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম। পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে আমি কখনও যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন হইনি৷ তাঁরাই আমাকে বারবার মাটির পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছেন। তাঁদের পদযুগল সব সময়ে ভূমিতেই বিন্যস্ত থাকত, তাঁরা কেউই খ্যাতিমান ছিলেন না।

অটাম অব দি প্যাট্রিয়ার্ক গ্রন্থে একটি পৌনঃপুনিক চিত্রকল্প ছিল — প্রাসাদে কিছু গভীর অবস্থান। আমার একটা ছবির বই আছে। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে আমি বলেছি যে, আমার সকল গ্রন্থের উৎসমূলেই রয়েছে কোনও না কোনও চিত্রকল্প। অটাম অব দি প্যাট্রিয়ার্ক-এ প্রথম যে চিত্রকল্প, তা হল, একটি বিলাসবহুল প্রাসাদে এক অতি বৃদ্ধ এবং বেশ কিছু গাভী যারা নিয়মিত আসত এবং পর্দাগুলো খেত। কিন্তু রোমে একটি ছবি না দেখা পর্যন্ত সেই চিত্রকল্প বাস্তব অবয়ব পায়নি। একটি বইয়ের দোকানে গিয়ে সংগ্রহ করবার মতো ফটোগ্রাফি বই দেখতে গিয়ে এই ছবিটি দেখলাম আমি। একেবারে নিখুঁত ছবি। মুহূর্তেই আমি উপলব্ধি করলাম যে বিষয়টা কীরকম হতে চলেছে। বিশাল বুদ্ধিজীবী নয় বলেই মহান শিল্পকর্ম নয়, জীবনের প্রাত্যহিকতার মধ্যেই আমি আমার গ্রন্থের উপকরণ খুঁজে পাই।

গোড়াতে আমার উপন্যাসগুলি অপ্রত্যাশিত মোড় নিত। প্রথমদিকের গল্পগুলোয় অন্তর্নিহিত ভাবের একটা সাধারণ ধারণা বর্তমান থাকলেও আকস্মিকতার হাতেই নিজেকে সমর্পণ করতাম আমি। আমার ছেলেবেলাতেই যে মহৎ উপদেশ আমাকে দেওয়া হয়েছিল, তা হল, উপরোক্ত ব্যাপারটা ঠিকই আছে, কেননা তখন আমার প্রেরণা ছিল প্রবল। কিন্তু বলা হয়েছিল যে, আমি যদি আঙ্গিকের শিক্ষা গ্রহণ না করি তাহলে, পরবর্তীকালে যখন প্রেরণা নিঃশেষিত হবে তখন বিপর্যয় ঘটবে। প্রেরণার অভাব আঙ্গিকই পূরণ করতে পারে। আমি যদি সময়মতো সেই শিক্ষা গ্রহণ না করতাম, তাহলে এখন অগ্রিম একটি রূপরেখা নির্মাণ আমার পক্ষে সম্ভব হত না। রূপরেখা নির্মাণ পুরোপুরি একটি আঙ্গিকগত সমস্যা এবং এটা যদি ছেলেবেলাতেই শিক্ষা না করা যায়, তা হলে আর কখনোই তা হয়ে ওঠে না। আমি মনে করি, অসাধারণ শৃঙ্খলাবোধ ছাড়া মূল্যবান কোনও গ্রন্থরচনাই অসম্ভব।

হেমিংওয়ের একটি রচনা যা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, তা হল, লেখার কাজ মুষ্টিযুদ্ধের সমতুল্য। লেখক তাঁর শরীরের এবং সুস্থতার প্রযত্ন করবেন। মদ্যপ হিসেবে ফকনারের প্রসিদ্ধি ছিল, কিন্তু আমাকে দেওয়া প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই তিনি বলেছিলেন, মত্ত অবস্থায় একটি লাইনও লেখা অসম্ভব। হেমিংওয়েও একই কথা বলেছিলেন। অর্বাচীন কিছু পাঠক আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, আমার কিছু রচনার সময়ে আমি ড্রাগাসক্ত ছিলাম কিনা। কিন্তু সেটাই সপ্রমাণ করে তাঁরা সাহিত্য বা ড্রাগ সম্পর্কে নিতান্তই অনভিজ্ঞ। ভালো লেখক হতে গেলে লেখার প্রতি মুহূর্তে নির্ভেজাল প্রাঞ্জল এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হবে। এই রোমান্টিক ধারণার আমি ঘোরতর বিরোধী যে অর্থনৈতিক বা আবেগজনিত অবস্থা যত খারাপ হবে লেখার মান ততই ভালো হবে৷ আমি মনে করি অত্যন্ত প্রফুল্ল মানসিক এবং শারীরিক অবস্থায় থাকাটা একান্ত জরুরি। আমার সাহিত্যকর্ম সুস্বাস্থ্যের দাবিদার এবং হারানো প্রজন্মে এই উপলব্ধি ছিল। এই লেখকরা জীবন-প্রেমিক ছিলেন। আমি মনে করি লেখা অতি কঠিন কর্ম। সতর্কভাবে সম্পাদিত যে কোনও কর্মই। তবে সুবিধেটা তখনই। কাজটা নিজের পরিতৃপ্তির জন্যেই যখন সম্পাদিত হয়৷ নিজের এবং অন্য সকলের কাছে হয়তো একটু বেশিই দাবি করছি, কেননা ভ্রান্তি আমার অসহ্য। যে কোনও কাজই নিখুঁত-সম্পাদন এক বিশেষ অধিকার। এটাই সত্যি, যদিও লেখকরা প্রায়শই অত্যধিক আত্ম-সচেতন এবং পৃথিবী আর সমাজ-বিবেকের কেন্দ্রবিন্দু বলেই নিজেদের জ্ঞান করে থাকেন। কিন্তু যা কিছু আমি — আমি তারই প্রতি সপ্রশংস। পর্যটনে বেরিয়ে আমি সব সময়েই উদ্ভাসিত হই, যখন দেখি, লেখক হিসেবে আমি যতখানি, পাইলটরা পাইলট হিসেবে তার চেয়েও দক্ষতর।

 

About Char Number Platform 523 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*