আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

তিনকাঠির ভেতর বল যাক, না যাক, আমরা বেঁচে ছিলাম। ফুটবল। আমাদের জন্ম দিয়েছিল দিয়েগো। দিয়েছিল। ওই লোকটাকে আপনি বলা যায় না। ও তুমি, তুই, সে…। ও আমার পাশের বাড়ি, ও আমার পড়া না মুখস্থ করেও পার পেয়ে যাওয়ার নাইন্টিজ, ও আমার ফার্স্ট লাভ। ছিয়াশি দেখিনি। ফুটবল বললে ক্যামেরুন মনে হয়। রজার মিল্লা। আফ্রিকার কালো মানুষ। ওই একটা ম্যাচ আমার কাছে আফ্রিকা, স্মৃতি আর স্বপ্নভঙ্গের দ্যোতক হয়ে বেঁচে আছে। পুরনো বাড়ি, তখনও মরে না যাওয়া অথচ অন্যদের মরে যাওয়া নিয়ে সান্ধ্য আড্ডা মারা আমার রোয়াকি ঠাম্মারা, উঠোন, ঘোরানো লোহার সিঁড়ি, কালো দরজা, চাঁদ আর এসবের মাঝে ‘দেখা যায় তোমাদের বাড়ি’র মতো সাদা কালো টিভি। মাঠের ভেতর দুটো কালারের স্ট্র্যাপ। কী রং হয় ওদের? বাড়ির সামনেই একটা মাঠ। ওখানে একবার আটটা গোল করেছিলাম। ঘরে ফিরে বিশ্বাস করেনি কেউ। ওখানে, ওই মাঠে প্রচুর ঘাস ছিল, এবং বল পড়ে যাওয়ার অপরাধবোধে জড়সড় হয়ে থাকা দুটো জল-শুকনো পুকুর। ওই ঘাসে তো কোনও সাদা কালো ভাগ দেখিনি। সেই নব্বই। ক্যামেরুনের পর যুগোস্লাভিয়া, তারপর আরও কীসব করে স্কিলাচির ইতালি আর ক্যানিজিয়ার মাথা পেরিয়ে ভুল পেনাল্টি আর আমার ঘুম না হওয়া রাত্তির। অনেক পরে, অনেক পরে, যারা আমাকে, এই আকণ্ঠ লিওভক্ত আমাকে ট্রল আর দিয়েগো দেখিয়েছে, তাদের জন্য মনে হয়, ওই গ্যালন গ্যালন কান্নাগুলো, প্রথম নির্ঘুম রাত্তিরের প্রত্যেকটা ঘড়ির কাঁটা জমিয়ে রাখার খুব দরকার ছিল। বস, আমাকে, আমাদের মারাদোনা দেখাবেন না প্লিজ। চুরানব্বইয়ের ফিরে আসার মাঝে বাইশ গজ, পাকিস্তান, আকিব জাভেদ পেরিয়ে এসছি। তখনও যুগান্তর। কালারড খবরাখবর। নাইজেরিয়া আর গ্রিসের স্বপ্নের পর রোমানিয়া, বুলগেরিয়া। ডোপ কী? ধুর, ফাঁসিয়েছে। রাগ, অভিমান, সলিলোকি। বড়দের সঙ্গে তর্ক। নিজের সঙ্গেও। ক্রমশ নিভে গেছি একদিন। একটা ফেজ ছিল। পেরিয়ে এলাম। নাইন্টিজে বড় হয়েছি যারা, শৈশব, কৈশোরের মাঝে তৃতীয় আরেকটা ফেজ নিয়েই বড় হয়েছি, মারাদোনা। ওটা নিয়ে কোনও আপোষ করিনি আমরা।

আপোষের কথা উঠলে দলবদল ওঠে। আমাদের শরিকি ছোটবেলায় বড়রা নিজেদের মতো করে দলবদল করত। ছাদ, রান্নাঘর, দাদু ঠাকুমার ওষুধ। ফাউল প্লে। তখনও বুঝিনি। কট্টর ব্রাজিলীয় আমাদের বাড়ির বনেদিয়ানায় আমি আমার সেজকাকাকে নিয়ে দোকলা বুয়েন্স আয়ারস বানালেও লোকাল লেভেলে সবাই একান্নবর্তী। মোহনবাগান। সত্যজিতের কর্নার থেকে সুব্রতর হেডে গোলের স্মৃতির আগে আর কিছু চেষ্টা করলেও মনে করতে পারছি না। তবে কার্ফু, লোডশেডিং, একসাথে খাওয়া, গুলি আর রাজনীতির শহরতলিতে আমি চোরাগোপ্তা খেলতাম একটুআধটু। ইস্টবেঙ্গলের জার্সি কিনেছিলাম। কেন? ওই যে ওই লোকটা। বাঁ পা। কেমন একটা খেলত। পাশে কুলজিত, বিকাশ পাঁজি। শুধু দিয়েগো না, ব্র্যাকেটে কৃশানু দে-ও একটা ফেজ তৈরি করে দিয়েছিলেন। মৃত্যুসংবাদে পৌঁছতে অনেকটা বড়বেলা এসে গেল। বুঝলাম, আসলে চোখের জলই শুধু শুকোয়নি। বিস্ময়বোধও তেমন একটা অবশিষ্ট নেই। শিশির ঘোষ, ওদের তুষার রক্ষিত, নড়তেই পারছে না বাইচুং থেকে ওই ব্যাকভলিগুলো, ১-৪ এর অবিশ্বাসের রাতে অদ্ভুতভাবে কান্না না স্বপ্নে দেখা চিমার ভলি। দীপেন্দু, আনচেরি, বিজয়ন হয়ে একটা সময়ে যখন জোস ব্যারেটোয় পৌঁছলাম, গুনে দেখলাম আরও অনেক সিঁড়ি পেরোতে হয়েছে। সিঁড়ির পর সিঁড়ি। বইয়ের মলাটে কাগজে কেটে রাখা বিশ্বকাপের টুকিটাকি। দেখ, আমি কত আপডেটেড। মাসখানেকও যেত না। আর্জেন্টিনার কাপ জেতার সুযোগের মতো ছিঁড়ে যেত একটার পর একটা মলাট। কখনও কোচ, কখনও ডেস্টিনি, কখনও আমার অসাবধানতায়। তবে এর মধ্যেই বাসুদেব-রেনেডি-জেমস-আরপি দিয়ে একটা রেডিও জীবন তৈরি করে দিয়েছিল ওরা। পাশে বাবলুদা। স্টপারে দেবজিত, উইং-এ দুলাল। সামনে ইগর-স্টিফেন। দুতিনটে ম্যাচ খেলা ড্রিমার দুসিতের মুখটাও একফোঁটাও ভুলিনি। বছর খানেক পরে সেরিকি। না। ব্যারেটোকে সামনাসামনি দেখা হয়নি আমার। আক্ষেপ নেই। সে তো ঈশ্বরকেও দেখা হয়নি। তা বলে নাস্তিকতায় আটকাবে কার সাধ্যি? আমার যেমন এখনও বিশ্বাস, জোস রামিরেজ ব্যারেটো বলে কেউ কোনওদিন ভারতীয় ফুটবলে খেলেনি। আমরা যারা পাখির মতো ডানা মেলার পোজ দিয়েছি ছোটবেলার ভেনেসীয় জানলায় একটু আনন্দ হলেই, যারা নিজে মাছের চোখ ভালবেসেও বোনকে দিয়ে দিতাম ও অন্য কিছু তেমন একটা খেত না সেই বোধ আর ভালোবাসা থেকে, যারা এক মফঃস্বল থেকে এসেও আরেক মফঃস্বলে স্বপ্ন, প্রেম, বন্ধুমৃত্যু আর রক্তক্ষরণের অহঙ্কার নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে গেছি অনেক অনেক দিন, তাদের সেই ছেড়ে আসাটুকু, মেশাটুকু, ভালোবাসাটুকু, ওড়াটুকু সবকিছুকে ব্যারেটো বলে নাম দিয়েছে কেউ। মুখ বসিয়ে দিয়েছে তখনকার ফটোশপে। ছিল না, ব্যারেটো বলে কেউ ছিল না কোনওদিন।

আমাদের একটা স্কুল ছিল। মফঃস্বলের স্কুলে কোনও ঘাস ছিল না। আমাদের চটি দিয়ে গোলপোস্ট, পা মেপে মেপে বানানো, একটু অসাবধানতায় ইঞ্চিখানেক ছোট বড়, আর এসবের মাঝে একটার পর একটা একটু বড় সাইজের প্লাস্টিকের ‘পিং পং’ বল। বড় বলে খেলেছি খুব কম। ওই ছোট বলটাকেই আমরা অভ্যেসের নব্বই মিনিটে ইনজুরি টাইমের বুঁফোর চেয়েও বড় দেখতাম। আমায় জোর করে গোলকিপার বানাত যারা, তাদের সঙ্গে কথা না বলার পিরিয়ড-আড়ির সংখ্যা গুনে দেখিনি। হাজার ছাড়িয়েছিল, নিশ্চিত। কোনওদিন রিসিভ করতে পারতাম না, কাছে এলেই বিপদমুক্ত করার ধারাবিবরণী অভ্যেস ছিল। তবে এসবের মধ্যে একটা মুক্তি ছিল। আমরা যারা প্রেয়ার লাইনে দেরি করে ঢুকতাম, মাধ্যমিকটাকে গায়কোচিয়া ভেবে টাইব্রেকার খেলতাম, তাদের কেউ কেউ বারেসি বাজ্জিও হয়ে অন্তত নিজস্ব খেলাটা জিতল, কেউ দোনাদিনি হয়ে তাও হারাল। আসলে সবাই ইতালি নব্বইয়ের মতো শেষমেশ একটা সময়ে হেরে গেছিল। সবাই বড় হয়ে গেছিল। খেলাটাকে, মুক্তিটাকে জিইয়ে রাখতে পারেনি কেউ।

দশ নম্বর থেকে দশ নম্বরে পৌঁছতে পেরোতে হয়েছে দুতিন দশক। রোনাল্ডিনহো তখনও রাজা। তখনও এপিটোম। যে দূর থেকে বল বসালে হাওয়াকে বলবে রথের সারথি হতে, আর সে নিজে কৃষ্ণঘন শ্যাম। যে চুল দুলিয়ে বলবে কাকে দেখবে কাকে? বুলেট কার্লোস, ক্লাবে প্রায় নিয়মিত জাগলিং করা ম্যাজিক মানুষ রোনাল্ডো, নাকি আমাকে? তার হাত ধরেই বার্সা। তার হাত ধরেই ন্যু ক্যাম্প। চেলসি। ছেলেটা নেমেছিল। একটা সময়ে চোট পেয়ে বাইরে। মাঝে অনেকে স্বপ্ন দেখিয়ে গেল। বাতিগোল আর ওর্তেগাকে দেখেছি। আইমারকেও। রিকলমের ইস্পাত দৃঢ়তা আর ম্যানারিজম নকল করেছি কতদিন। কিন্তু এ ছেলে অন্যরকম। এ ছেলে বল দেয়। ধরে। নিয়ে যায়। যা খুশি করে। এ ছেলের বলের ব্যারিকেডেই জন্ম। পরে জেনেছি ওই ব্যারিকেডের নাম রোজারিও। মুখে হাসি নেই। বড্ড বেশি সিরিয়াস। তারপর পেকারম্যান, মারাদোনা, সাবেল্লা। চুল বেড়েছে, কমেছে, মুখে যীশুর হাসি, দাড়ি, ক্লিনসেভ দেবদূত থেকে একদম মানতে না পারা বীভৎসতা, অথচ খেলা সেই একই। সোসিদাদ, জারাগোজা, সেভিল্লা। অন্তত খান পনেরো ঐতিহাসিক গোল। চক্রব্যূহ পেরিয়ে পাস দেওয়া। কনুই, রক্ত, এক আঙুলে তুলো নিয়ে ওই এল ক্ল্যাসিকো গোল, এক হাতের সোজা করা অলৌকিক শার্ট। তার অনেক আগে ব্রিটিশ বনেটে ম্যাঞ্চেস্টার কিলিং। আর্সেনাল, চেলসি, জুভেন্টাস, বায়ার্ন …। দেওয়া নেওয়া দেওয়া। টিকিটাকা। আর তার সঙ্গে স্পেন। এই দেশটা আমার ফুটবল মানচিত্রে ঢুকে পড়ল অনেক পরে। তার আগে জিদান ছিলেন। পাখির মতো, পেলব, টাচি জিনেদিন। যখন ভালবেসেছি তার পর আর কাপ পাননি। লিড করেছেন। ফাইনালে মা-বাবা তোলা অভিবাসী অপমান মানতে পারেননি। ধাক্কাটা আমার বুকেও লেগেছিল। একটা সময়ে লুই ফিগো। ঘাম। দৌড়। চোখ। প্রেমে পড়ে গেছিলাম মানুষটার। সেসব পেরিয়ে স্পেন। ইউরো ২০০৮। কিভাবে একটা দল তৈরি হয়। একটা কোচ। লুই আরাগোনেস। ঈশ্বরের মতো হাঁটাচলা। আলোর বাইরে। নির্বাক। মার্কোস সেনা, কালো মানুষ, ক্যানভাসে তুলির মতো আঁচড়, ওঠা নামা, লিড করা। স্বপ্নের ফারিস্তার মতো সেস ফ্যাব্রেগাস। মায়াময় ক্যাসিয়াস। ডেভিড সিলভা, ডেভিড ভিলা। আমি আর গোলিয়াথকে ভয় পেতাম না। তখনও ক্রুয়েফ দেখিনি। টার্ন দেখতাম। জাভি। রিয়েলকে পাঁচ গোল দেওয়ার মুহূর্তে শ্যাম্পেন ছোড়া। পাস। ম্যাগনেটিক ডান পা। আন্দ্রেজ। ‘বংশী চন্দ্রগুপ্ত’। ‘মানিক’ মেসির সিনেমাটিক সবুজ গালিচায়। ব্যাকহিল। আবার পাস। চেলসি ম্যাচে ওই ‘দ্যাট গোল’। তখন আস্তে আস্তে বড় হচ্ছি। বন্ধু কমছে। আমার পিঠে একসঙ্গে হাত রাখতেন তিন মানুষ। জেভি-মেসি-ইনিয়েস্তা। ‘তিন রাস্তার মোড়ে তিন বন্ধু, ছোটখাটো তিনটে জীবন। রাজু রাণী র‍্যাম্বো …’। এবং আরাগোনেসের তরুণ অলটার ইগো পেপ। ক্রুয়েফের ড্রিম টিমের একজন। তখন ইউটিউব এসে গেছে। পুরনো সাদা কালো ক্লিপিং-এ ক্রুয়েফকে পেয়ে গেছি অনেকদিন পর। তার আগে কিছুটা ডিডি ওয়ানে দেখেছি। টার্ন। সঙ্গে রেন্সেনব্রিঙ্ক, নিস্কেন্স। কমলা রঙের দিন। আমার ফুটবল-মিথ চুয়াত্তরের ফাইনাল আর আটাত্তরের স্বৈরাচারী সময়ে চলে যায়। লিও মেসির অনেক আগেই ঠিক হয়ে গেছিল, ট্রফি রহে না রহে, জন্নত জরুর রহে…।

এসমস্ত ডিভাইনিটির ভেতর আমার সকারু মনন। তাকে লালন। স্মৃতি থেকে গড়ে পিঠে নেওয়া। দাদুর কাছে, বাবা কাকাদের কাছে কুয়োর ওপরের আকাশের গল্প শুনে মিল্কি ওয়ে বুঝে নেওয়া। কল্পকথা। বিরাশি। চুনী মান্না পিকে থঙ্গরাজ জার্নাল সিং। পেলের কসমস। কলকাতায় ওয়ান-টু-ওয়ানে সুব্রতকে দাঁড় করিয়ে রেখে কালো মানিকের ম্যাজিক, এবং তারপর দীর্ঘদেহীর স্মিত হাসি, মুগ্ধতা। নেহেরু কাপ। ফ্রান্সিসকোলি, চিকারিতো র‍্যামোস। ফ্রিকিক। উরুগুয়ে। জিকো সক্রেটিস। না পাওয়ার লেগ্যাসিতে ক্রুয়েফ এবং লিও-র মাঝামাঝি যাদের যাপন। ঠিক পরেই ছিয়াশি। চোখ ফুটতে নব্বই হয়ে যাওয়ায় আমি এসব গোল মিস করেই ফার্স্ট হাফে মাঠ ছেড়েছিলাম। সেকেন্ড হাফে মাঠে নেমে চিনতে পারছি না কাউকে। ইউটিউব এসে গেছে। অথচ কিছু দেখতে পাচ্ছি না। খুঁজে পাচ্ছি না। রুড গুলিটের চুল, রোমারিওর হাসি, কারেকার দৌড়। আমার সেই উঠোনটা। সেই জোড়া পুকুর। আমার সেই ফুটবল জীবন। ‘সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি লজেন্স …

আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না’।

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*