‘যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তুমিই বাংলাদেশ’

ইলিয়াস কাঞ্চন  

 

ঘটনার সূত্রপাত ২৯ শে জুলাই, ২০১৮। সেদিনের পর থেকে আর মাত্র কয়েকদিন আগে পর্যন্ত বাংলাদেশ বিশেষত রাজধানী ঢাকা কার্যত অচল ছিল। ইস্কুল কলেজের পাঠক্রম ব্যাহত, রাস্তায় খুব একটা গণপরিবহনের দেখা পাওয়া ভার হয়েছিল। কর্মস্থলে পৌঁছতে মানুষের হাপিত্যেশ অবস্থা। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ একটু পথ করে করে রিকশা, সদ্য চালু হওয়া মোটর বাইক শেয়ারিং-এ চলাচল করছিলেন। কিন্তু মানুষের ভেতর বিরক্তির চিহ্ন ছিল না, সকলেই এই অচল অবস্থাকে স্বাগত জানিয়েছেন। আর যারা ছিলেন এই পরিস্থিতিটার কাণ্ডারী তারা কিন্তু কেউ বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিক নন, এমনকি তাদের তরুণও বলা যাবে না। সদ্য কিশোর বা কৈশোর পেরোনো ইশকুলের ছাত্র-ছাত্রীরা দখল নিচ্ছিল প্রতিদিন ঢাকার রাজপথের। নবারুণের কবিতার সেই কিশোরেরা, প্রতিবাদে সারা শহর উথালপাথাল করে দিচ্ছিল যেন। যারা ঢাকার খোঁজখবর রাখেন তারা জানবেন গত ২৯ জুলাই ঢাকায় পথচারী তিনজন ইশকুল বালকবালিকা খুন হন। হ্যাঁ, খুনই বলতে হচ্ছে এই কারণে যে, যাত্রীরা নির্দিষ্ট স্টপেজে অপেক্ষায় ছিলেন বাসে উঠবার জন্য, এবং কার্যত তাদের চাপা দিয়ে চলে যায় ‘জাবালে নূর’ নামের একটি বাস।

বাংলাদেশে পথ দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে, বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী গত বছর বাংলাদেশে পথ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৭৩৯৭ জন। অর্থাৎ হিসেব করলে, গত বছরে প্রতিদিন গড়ে কুড়িজন করে মানুষ বাংলাদেশের রাস্তায় প্রাণ হারিয়েছেন। এক্ষেত্রে সাধারণের পথ চলাচলের অসাবধানতা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সবচেয়ে বড় উদ্বেগের হয়ে উঠেছে এইসব বেসরকারি পরিবহন সেবাগুলোর যাত্রী তুলবার জন্য শৃঙ্খলাভঙ্গের এই ধরনটা। কাছাকাছি সময়ে ঢাকাতেই একজন পথচারী দু’টো বাসের চাপে হাত খুইয়ে ক’দিন ভুগে মারা গেলেন, একজন মহিলা পা হারালেন। এগুলো হল খুবই আলোচিত ঘটনাক্রমের উদাহরণ। এর বাইরে পথ দুর্ঘটনা যেন বড্ড বেশি স্বাভাবিক, মানুষের সয়ে গেছে। কারও যেন কোনও উদ্বেগ নেই, এমনকি রাষ্ট্রেরও। ঠিক এই শূন্য জায়গাটায় কিশোর-কিশোরীদের কণ্ঠস্বর প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছিল। এর পেছনে আরেকটি কারণও আছে, ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী মন্ত্রী যিনি কিনা একইসাথে বাস শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনেরও নেতৃত্ব দিচ্ছেন, দুর্ঘটনাটির ঘটনা শুনে যে সহাস্য অভিব্যক্তি দিয়েছেন তা যেন গণমানুষের জীবন নিয়ে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করছিল, যদিও তিনি পরবর্তীতে ক্ষমা চেয়েছেন, কিন্তু এর আগেই জনমনে একটা বিপুল ক্ষোভের সঞ্চার হয়ে গিয়েছিল।

কিশোর-কিশোরীদের এই আন্দোলনটা নানা কারণে অভিনব। তাদের এই জাগরণ যেমন সড়ক পরিবহন নিয়ে অরাজকতা আর অনিরাপত্তায় সয়ে যাওয়া মানুষদের দিয়েছে ধিক্কার, ক্ষমতাসীন সরকারকে দিয়েছে বার্তা, তেমনি আন্দোলনকে পরিচালিত করবার এক ভিন্নতর ধরন সামনে এনেছে। এর আগে আন্দোলন মানেই যেখানে দুর্ভোগ, সেখানে দেখা যাচ্ছিল যে এইসব ইশকুলের বালক-বালিকারা পথরোধ কার্যক্রমের ভেতর অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস যেন নিশ্চিন্তে চলাচল করতে পারে তার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, তারা গাড়ি সম্মুখে পেলে আটকাচ্ছে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্যে, গাড়ির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং গাড়িচালকের লাইসেন্স দেখাতে পারলে তাদের ছেড়ে দিচ্ছে। এ কাজটা মূলত ট্রাফিক পুলিশেরই কাজ, কিন্তু আগ বাড়িয়ে ছাত্রছাত্রীদের এ কার্যক্রম একটা স্পষ্ট চিত্র তুলে এনেছে যে, কীভাবে অল্পবয়সি আর লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের আনাগোনায় বাংলাদেশের পরিবহন-খাত চলছে। অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা কর্মচারীদেরও দেখা যাচ্ছে কাগজপত্রবিহীন, অনেকটা থলের বেড়াল বেরিয়ে যাওয়ার মতো। যাদের দেখভাল করবার কথা, তারাই যেন অনিয়মে হাবুডুবু খাচ্ছে। তারা সংবাদমাধ্যমের গাড়িকেও আটকে দিচ্ছিল কাগজপত্রের অভাবে, তেমনি উল্টো পথে যাওয়া ক্ষমতাসীন কোনও মন্ত্রীকেও বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠিক পথে ফেরত পাঠিয়েছে, এই যে পুরো আবহটা একেবারেই নতুনতর। যেন এই নতুন প্রজন্ম, অনিয়মে অভ্যস্ত হওয়া সাধারণদের জন্য শিক্ষক হয়ে এসেছে।

তাদের বিচ্ছিন্ন এবং আপাতত অভিভাবকহীন এই আন্দোলন একটা সুরে আন্দোলিত হচ্ছিল, অত্যন্ত কিছুদিন আগে পর্যন্ত। বাস মালিক সমিতি চোখ রাঙালেও তারা দমে নেই। তারা বলেছে নিরাপদ সড়ক চাই, তারা বলেছে অনিয়ম বন্ধ হোক। তাদের বিচ্ছিন্ন শ্লোগানের ভেতর থেকে মোটামুটিভাবে যে দাবিগুলো উঠে এসেছিল তা এরকম —

  1. বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো ড্রাইভারকে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই বিধান সংবিধানে সংযোজন করতে হবে।
  2. নৌপরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।
  3. ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ ও লাইসেন্স ছাড়া চালকরা গাড়ি চালাতে পারবেন না।
  4. বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।
  5. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভারব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  6. প্রত্যেক সড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিডব্রেকার দিতে হবে।
  7. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে।
  8. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে বাস থামিয়ে তাদের তুলে নিতে হবে।
  9. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এই আন্দোলন একটা রাস্তা থেকে শুরু হয়ে ক্রমশ সারা ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল। এবং সরকারও যে বেশ বিব্রত, ইতিমধ্যে যার স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। গত ২ আগস্ট সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বনধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন দমনে বাংলাদেশের ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার রক্ত-লৌহ নীতি নেন। বাংলাদেশের পুলিশ ও সরকারি সমর্থকদের (যার মধ্যে একাংশ আওয়ামী লিগের যুব সংগঠন ছাত্র লিগ) সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত দেড়শোর বেশি ছাত্রছাত্রী আহত হন। গত রবিবার আওয়ামী লিগের কার্যালয় ঘেরাও করা হলে পুলিশ ছাত্রছাত্রীদের লক্ষ করে রাবার বুলেট ছোঁড়ে, লাঠি চালায়। গ্রাউন্ড জিরো থেকে যারা সারাক্ষণ আন্দোলনের খবর সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন, আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় সমালোচিত হচ্ছিল আওয়ামী লিগ সরকারের অবস্থান, সেইসব সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ব্যাপক হারে ধরপাকড় মারধোর শুরু হয়। আল জাজিরায় বিরুদ্ধ মত প্রকাশের ‘অপরাধে’ গ্রেফতার হন সমাজকর্মী ও চিত্রসাংবাদিক শহিদুল আলম। মোটের ওপর বাংলাদেশের পথ নিরাপত্তা নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ফাটলরেখাগুলি উন্মুক্ত করে দিয়েছে, এবং আরও গভীরতর কোনও অসুখের দিকে আঙুল দেখাচ্ছে৷

স্বভাবতই, এই আন্দোলন কোনও দীর্ঘস্থায়ী ফলপ্রসূ ব্যাপার বয়ে আনেনি, আনার কথাও নয়। অভিভাবকহীন, কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাহীন স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের ক্ষেত্রে এমন হওয়াটা আশ্চর্যের কিছু নয়৷ পথ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার এই ইস্যুটা পরবর্তীতে রাজনৈতিক মোড় নিয়েছে। বিএনপি জামাতের কিছু বিরোধী দল যে ছাত্রদের ভেতর ঢুকে যাচ্ছিল, ডিসেম্বরের আসন্ন নির্বাচনকে রেখে নিজেদের দলীয় স্বার্থগুলি একইসাথে সামনে আনছিল, এর স্বপক্ষে এখন অডিও ফুটেজও পাওয়া যাচ্ছে। আর সেই কারণেই শেখ হাসিনা সরকার চাইছিলেন না যে আন্দোলন আর দীর্ঘ সময় ধরে থাকুক, ফলে প্রথম আন্দোলনকে তাচ্ছিল্য, তারপর বিক্ষোভ থামানোর জন্য প্রথমে অনুরোধ এবং পরবর্তীতে কঠোর অবস্থানে যাবার আগেই গুজব ছড়িয়ে যেতে থাকে বিভিন্নভাবে। ফলে মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে যায় এই আন্দোলন। এরপর এই আন্দোলনকে পুঁজি করে আরও কিছু গোষ্ঠী যেমন কোটা সংস্কারপন্থীরা মাঠে নেমে পড়ে।

শেষ বিচারে হয়তো ব্যর্থ, দিকভ্রষ্ট এই আন্দোলন। কিন্তু অনিয়ম মেনে না নেওয়ার যে মানসিকতা ছাত্রছাত্রীরা দেখাল, তা বাংলাদেশকে একটা স্বপ্নময় আগামীর পথ দেখাচ্ছে। তাদের কণ্ঠস্বরেই বলতে হচ্ছে, — অনিয়ম দেখে থমকে থাকলে চলবে না। তাদের মতোই শ্লোগান তুলতে হবে — ‘যদি তুমি ভয় পাও/তবে তুমি শেষ,/যদি তুমি রুখে দাঁড়াও/তুমিই বাংলাদেশ’।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 899 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*