পেরোনো শিল্প

মণীন্দ্র গুপ্ত

 

বহু বছর আগে আমাদের ছেলেবেলায় দিলীপ রায়, নলিনীকান্ত গুপ্তেরা পণ্ডিচেরী থেকে “আর্ট ফর আর্টস্‌ সেক” নিয়ে একটি গোটা বই প্রকাশ করেছিলেন। বইটি, যতদূর মনে পড়ছে, চারজন ভাবুকের চারটি নিবন্ধের সংকলন। বইটি ছিল বিতর্কমূলক। শিল্পের জন্যই শিল্প­— এই কথাটাই আমার যথার্থ মনে হয়েছিল, এখনও তাই মনে হয়।

শিল্প জীবন অনপেক্ষ নয়। শিল্প জীবনের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়, জীবন থেকে রস নেয়, জীবনের রৌদ্র ছায়ায় পল্লবিত কুসুমিত হয়। জীবনের কাছে সে আগাগোড়াই ঋণী। তবু সে ঋণ সে অন্যভাবে শোধে— শিল্প জীবনকে সমৃদ্ধ করে, সুন্দর করে, জীবনকে অস্তিত্বমাত্র না রেখে তাকে আত্মিক লোকে নিয়ে যায়। নন্দলাল বসু যেমন বলেছেন, “কুণালজাতকে আছে কামলোকের কথা— তার উপরে রূপলোক, তারও উপরে অরূপলোক। আমি বলি, তারও উপরে আনন্দলোক।”

শিল্প এক ছটাক ধান বেশি ফলায় না, এক ফোঁটা বৃষ্টি কম বা বেশি ঝরায় না, একটি সন্তানের জন্ম সম্ভব বা অসম্ভব করতে পারে না, বন্যা রুখতে পারে না, খরা আটকাতে পারে না। তবে সে পারেটা কী?

সে মেঘ করে এলে মনকে উধাও করার ক্লু দিতে পারে, ভূতের গল্প শুনিয়ে শিহরণ তৈরি করতে পারে, হেমন্ত-বসন্ত-শরৎ-শীতের আকাশ ইথারকে আন্ডারলাইন করে অনুভূতির মধ্যে ঢোকাতে পারে। কবিতা, ছবি, গান, গল্প— এই চারটি হল এই ব্যাপারে মহা পারঙ্গম শিল্প।

রিপিটিটিভ জব-এ একপ্রকার শিল্পনৈপুণ্য আসে। মনে করুন, একজন ছুতোর রোজ অনেকক্ষণ করাত চালায়। চালাতে চালাতে তার হাত, দৃষ্টি এবং চেতনা এমন সম্মিলিত সিদ্ধি পাবে যে তার করাত তার নির্দিষ্ট কাটবার রেখা থেকে এতটুকু চ্যুত হবে না। এই অভ্যাসযোগে বা রেয়াজে সিদ্ধ হয় একজন ক্যালিগ্রাফিস্ট বা একজন তবলচি। যদি কেউ মনে করেন, কবিতাও ঐরকমই দেহসর্বস্ব শিল্প তাহলে তিনি ভুল করবেন। ছন্দ, শব্দ, মাত্রা, ধ্বনি, ছত্রের বিন্যাস বহিরঙ্গে এই সবই আছে সত্যি কিন্তু ওদের পেরিয়েও যিনি আছেন তিনিই আসল। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার প্রাণহীন কামুক বিচারকদের কাছে নিঁখুত মাপজোকই সব, যার সঙ্গে মেয়েটির নারী অস্তিত্বের তুচ্ছতা বা মহিমার তেমন কোনও সম্পর্ক নেই। কবিতায় চিরদিনই আলংকারিকদের আরাধ্য সেই বহিরঙ্গের শিল্পের চেয়ে ভিতরের প্রাণমর্মরের মূল্য বেশি। এটিই কবিতার শিল্প পেরোনো শিল্প বা শিল্পের অন্তরে শিল্প।

বহিরঙ্গ, অন্তরঙ্গ কোনও শিল্পই কাজের কাজ কিছু করে না, শুধু চেতনাকে আনন্দিত করে। তাছাড়া ছবি যেমন শুরুতেই চোখের সুখ আনে, গান যেমন শুরুতেই কানের সুখ আনে, কবিতা শুরুতে তেমন কিছুই আনে না। কবিতা তাকে এখন আমরা যেভাবে জানি, শুধু বই খুলে মনে মনে পড়ার। প্রত্যক্ষভাবে নয়, পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয় পড়তে পড়তে জেগে ওঠে— অপ্রত্যক্ষভাবে কাজ শুরু করে— চেতনার সমস্ত জ্ঞানেন্দ্রিয় সংহত হয়ে এসে দেশকালকেও জড়িয়ে নিয়ে কাজ করে। শুধু একটুকরো তুচ্ছ কাগজ আর ঝাঁটার কাঠির মতো কলম দিয়ে আঁকা এমন দূরবিসারী শিল্প আর কে আছে।

“আর্টাৎ পরতরং নহি”,— আর উপরে কেউ নেই। আর সেজন্যেই আর্ট বিষয়ীদের হাতের বাইরে। তার পথ অনেক দূরে চলে গেছে, কিন্তু তার মধ্যেই তার পথের শেষ।

দরিদ্রের দিনগুলি একান্ত কাব্যময়

ভোর হতে তুমি যদি লক্ষ করো

দেখবে, তার চালের খড় রুখু চুলের মতো ওড়ে…

–মুকুল চট্টোপাধ্যায়

কবিতার কাছে যাবার জন্যে, কবিতাকে মহার্ঘ জানার জন্যে জীবনকে বস্তুবিরহিত করা দরকার। দামী বাড়িঘর, সাজসরঞ্জাম, টিভি, রেডিও, এমনকি মাত্রাতিরিক্ত বইও কবিতার পথে নানাভাবে উচ্চকিত এবং নীরব বাধা তৈরি করে। অনেক দিন পরে, মন এবং অনুভূতি সূক্ষ্ম হলে বোঝা যায় তার পথ ঢেকেছে মন্দিরে-মসজিদে। দলবদ্ধ পূজা কোনও পূজা নয়, সঙ্ঘবদ্ধ প্রার্থনা কোনও প্রার্থনা নয়, সন্ধ্যার সময় খুঁজে পাওয়া দর্শকদের সামনে রঙ্গমঞ্চে পেশাদারি আবৃত্তিকেও কবিতা পড়া বলে না। পেশাদার আবৃত্তিকারদের যান্ত্রিক দক্ষতা পেশাদার কবিরাও অনুসরণ করেন, ফলে তাঁদের কবিতা পাঠের আসর সেই একই ঝলমলে নগদ-বিদায়ের অনুষ্ঠান হয়ে দাঁড়ায়। এসব হল প্রচারের পথ। এবং প্রচারের সঙ্গে কবিতার গভীর অন্তর্বিরোধ আছে।

বিষয়ী লোক সামনে এসে বসলে শ্রীরামকৃষ্ণ সহ্য করতে পারতেন না। তারা উঠে গেলে বলতেন­­­­— ওরে, এখানকার দশহাত মাটি খুঁড়ে ফেল, বিষয়ীর ছোঁয়ায় এ জায়গার মাটি নষ্ট হয়ে গেছে। কবিতার বিষয়ীরা বিষয়ীরও বিষয়ী। সেদিন একটি কবি মেয়েকে জিজ্ঞাসা করা হল— কার কবিতা তোমার ভালো লাগে? মেয়েটির দ্বিধাহীন উত্তরঃ রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ এবং… (আর তিন অবধারিত)। সদ্য লিখতে আসা একটি অপাপবিদ্ধ তারুণ্য কত তাড়াতাড়ি বিষয়বুদ্ধি সম্পন্ন হয়ে উঠেছে দেখে ধন্য মানি। এইভাবে একটি নেটওয়র্ক তৈরি হয়। এবং তারাই বাংলা কবিতা প্রচারের এবং বিপণনের ভার পরোক্ষে নিয়ে নেয়। অবশ্য এটাও আমি ভেবে পাই না, বাংলা কবিতার নামগুলিই বা কেন আমরা পাঠকদের কাছে জানতে না চেয়ে কবিদের কাছে জানতে চাই।

মাত্র কদিন আগে শ্মশানে কেদার ভাদুড়ীর চিতার সামনে দাঁড়িয়ে, স্বভাবত শান্ত, কবি উত্তম দাশ ক্ষোভে এবং রাগে চিৎকার করেছিলেন— ‘কেদার ভাদুড়ীর মতো কবির যেখানে স্বীকৃতি মেলে না সেই বাংলা কবিতা উচ্ছন্নে যাক’। উত্তম দাশের মতো আমারও চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করে— বাংলা কবিতা উচ্ছন্নে যাক। ভালো কবি গণ্ডায় গণ্ডায় জন্মায় না। কেদার ভাদুড়ী সত্যিকারের ভালো কবি ছিলেন। তিনি জীবিতাবস্থায় প্রাপ্য মর্যাদা পাননি, মৃত্যুর পরেও পাবেন না। কেদার একা নন, এরকম আরও কেউ কেউ আছেন। বাংলা কবিতা যতক্ষণ মুরুব্বিদের হাত থেকে পাঠকদের হাতে না যাচ্ছে ততক্ষণ এইরকমই ঘটবে। হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারি যিশু কেন সিনাগগ থেকে ফ্যারিসিদের পিটিয়ে ভাগিয়েছিলেন।

এক সময় শিক্ষিত ও দীক্ষিত পাঠকদের জন্য কবিদের আকাঙ্ক্ষা ছিল। আজকাল কেউ আর অপেক্ষায় বিশ্বাসী নন, মুরুব্বিরা দ্রুত বলে দেন, অমুক অমুক ভাল লিখছে। পাঠকেরা সেই অন্যের পছন্দ শিরোধার্য করে কবিতা পড়েন। প্রকাশকেরা সেই পছন্দ অনুসারেই বই বার করেন, পুরস্কারদাতারা সেই পছন্দ অনুযায়ীই পুরস্কার দেন। চাকা ঘুরতে ঘুরতে মোমেন্টাম সংগ্রহ করে — কবিকে ঘিরে একটা ইন্ডাস্ট্রি গড়ে ওঠে।

বাক্‌-স্বাধীনতা যে কোনও নাগরিকের জন্মগত অধিকার, সংবিধানের দ্বারা সুরক্ষিত। তাই যদি হয় তবে কবিতা পড়ে ভালো না লাগলে জানাবার উপায় নেই কেন? এটা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে কেউ কবিতার বই দিলে তাঁকে জানাতেই হবে এবং কত যে ভালো লেগেছে, কত যে মুগ্ধ হয়েছি, জানাতে হবে সেইটেই। চুপ করে থাকা চলবে না। খারাপ বলা তো চলবেই না।

একটা ঘটনা শুনুন। চল্লিশ বছর আগে পরমা পত্রিকায় এক আলোচক একটি কাব্যগ্রন্থের কিছুটা বিরূপ সমালোচনা করেছিলেন। সম্পাদক হিসেবে আলোচকের বক্তব্যে আমি অসংগত কিছু দেখিনি। কিন্তু আলোচিত কবিটি সেই যে আমার উপর চটে গেলেন, আজও তাঁর রাগ পড়েনি। এখনও বইমেলায় বা কারও বাড়িতে যদি তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, আমি তাঁর ভিতরের অনির্বাণ ক্রোধ টের পাই। আমার মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবি, গোল্লায় যাক ওঁর কবিতা, আর আলোচকের মেধাবী বিশ্লেষণ, আর আমার সম্পাদকীয় নিষ্ঠা।

কদিন আগে এক লিটল ম্যাগাজিনে এখনকার এক সুবিখ্যাত’র একটি নিবন্ধ পড়লাম। তিনি লিখেছেন— বেশ ক’বছর আগে তাঁর এক বন্ধুর উপন্যাস বেরিয়েছিল, একইসঙ্গে এক বিখ্যাত কাগজের শারদ সংখ্যায়। এই লিটল ম্যাগাজিনটি তখন বন্ধুটির উপন্যাস নিয়ে অনেক কথা লিখলেও তাঁর উপন্যাসটি সম্বন্ধে ছিল সম্পূর্ণ নীরব। ঐ ‘নীরবতা’ নিয়ে অতঃপর লেখক কোনওরকম রাখঢাক না করেই সম্পাদক/আলোচকের দুষ্টুবুদ্ধির কথা বলেছেন। পড়ে আমি হতবাক। খ্যাতির চূড়ায় থাকা একজন প্রৌঢ় সাহিত্যিক এখনও এত নাবালকের মতো স্পর্শকাতর! এত তুচ্ছ কারণে তাঁর ভাষায় প্রতিহিংসা উঁকি দেয় এবং তিনি নিজেকে সংবৃত করার চেষ্টা করেন না।

এই যদি অবস্থা তাহলে পাঠক বাড়লেই বা কি, কমলেই বা কি। অলস পাঠক, নির্বিবাদী পাঠক, সামাজিক বুদ্ধিসম্পন্ন পাঠক, লেখকের কৃপাধন্য পাঠক হতে চাওয়া পাঠক তো সবসময় মিথ্যে কথা বলবেন। এঁদের কথায় নির্ভর করলে সাধারণ পাঠককে ঠকতে হবে।

আসলে যা হওয়া উচিত তা হল, পাঠক কারও কথা শুনে চলবেন না। কারও কাছে তাঁর শিক্ষার কোনও দরকার নেই— পড়ে পড়ে পড়ে পড়ে তিনি নিজেই নিজেকে শিক্ষিত করতে পারবেন। দীক্ষা তাঁর পক্ষে আরও ক্ষতিকর— কোনও গুরুর প্রয়োজন নেই তাঁর। সমস্ত সাধকের মতোই তিনি আত্মদীপ। কবিতা মুক্ত, অনুভূতিশীল, সত্যসন্ধ মানুষদের; লেখা মুক্ত, অনুভুতিশীল, সত্যসন্ধ মানুষদের জন্যে।

আর দু-একটা ছোটোখাটো কথা বলতে পারি।

বহির্মুখী মনের চেয়ে আত্মমুখী মন কবিতার কল্পনাশীল বয়নে প্রাণের আরাম বোধ করে।

দ্রুতগতি জীবন, বিশ্বায়ন এবং বাজার-সংস্কৃতি কবিতার অনশ্বরতার বিপরীত শক্তি।

কখনও মনে হয়, ম্লান দীন জীবনের গর্ভে সংগুপ্ত মুক্তার মতো নিটোল হতে থাকে কবিতা।

 

(রচনাটি অভিমন্যু পত্রিকার সৌজন্যে প্রাপ্ত। প্রথম ও দ্বিতীয় যৌথ সংখ্যায় প্রকাশিত )

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*