উদ্বাস্তু

হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়

 

'উদ্বাস্তু' বইটির প্রথম প্রকাশ ১৯৭০ সালে। লেখক শ্রী হিরন্ময় বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন একজন আই সি এস যিনি সরকারি দফতরে উদ্বাস্তু পুনর্বাসন বিভাগের মহাধ্যক্ষ ছিলেন বহুদিন। দেশজোড়া উদ্বাস্তু সঙ্কটের সময় তাদের সঙ্গে লেখকের প্রত্যক্ষ পরিচয়। সংবেদনশীলতা ও আন্তরিকতা নিয়ে হিরন্ময় এই বইয়ে উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান সূত্র খুঁজতে চেয়েছেন। দীর্ঘদিন বাজারে না থাকার পর ২০১৩ সালে দীপ প্রকাশন পুনরায় ছেপে বার করেছে এই মহামূল্যবান আকর গ্রন্থটি। বইটির নির্বাচিত অংশ প্রকাশকের সহৃদয় অনুমতিক্রমে পুনঃপ্রকাশিত হল।

পূর্ববঙ্গ হতে উদ্বাস্তু আগমনের প্রথম পর্ব এইভাবে শেষ হল। এ কয়বৎসরে যে পরিবারগুলি চলে এসেছিল তারা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে প্রাণভয়ে বাস্তুত্যাগ করেনি। তারা প্রধানত দেশত্যাগী হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ায় তারা পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক অধিকার পাবে না, এই ছিল তাদের আশঙ্কা। তাদের মধ্যে যারা সরকারের ওপর পুনর্বাসনের জন্য নির্ভরশীল ছিল, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা এইভাবে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে শেষ হয়ে গেল।

কিন্তু পূর্ববঙ্গবাসী হিন্দুর এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভাগ্যে স্বস্তি লেখা ছিল না। এক পর্ব শেষ হতে না হতেই আর এক পর্বের সূত্রপাত হল। জানুয়ারি মাসের গোড়াতেই খবর এল, বাগেরহাট অঞ্চলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানের হাতে অনেক হিন্দু পরিবার রীতিমতো নিপীড়িত হয়েছে। এ নিয়ে দাঙ্গা, মারপিট, খুনজখমও ঘটে গিয়েছে। ফলে এই অঞ্চল হতে কিছু কিছু হিন্দু পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে আসতে শুরু করে। তখন আশা করা গিয়েছিল যে এই গোলমাল সীমাবদ্ধ থাকবে এবং শীঘ্রই পাকিস্তানের এই অঞ্চলে শান্তি পুনরায় স্থাপিত হবে৷ এই আশার ওপর নির্ভর করে যে নূতন পরিবারগুলি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আশ্রয়প্রার্থী হল, তাদের বনগাঁ অঞ্চলে সোজাসুজি পুনর্বাসনের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হল। কারণ বনগাঁ অঞ্চলেই বাগেরহাটের নূতন উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল।

কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই সে আশা মিথ্যা প্রমাণ হয়ে গেল৷ পূর্ববঙ্গ হতে যে নূতন বিতাড়িত উদ্বাস্তু পরিবার আসছিল, তাদের মুখে মুখে যে নিপীড়ন ও অত্যাচারের কাহিনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল তা পশ্চিমবাংলার হিন্দুদের মনে দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল। মুখের কাহিনি ছড়ায় সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে, খবরের কাগজে প্রকাশিত কাহিনি ছড়ায় ব্যপক ক্ষেত্রে। ফলে এদেশের হিন্দুদের মনে আক্রোশ ও বিদ্বেষভাব রীতিমতো ছড়িয়ে পড়তে লাগল। সুতরাং উত্তেজনা যেমন বৃদ্ধি পেতে লাগল, তাতে কোনও সন্দেহ রইল না যে প্রতিহিংসা যে-কোনও মুহূর্তে পশ্চিমবাংলায় ব্যাপক আকারে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে একদিন ঘটলও তাই। সন্ধ্যার পর আপিসের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে সবে বসে বিশ্রাম করছি। রাত আটটা বেজে গেছে। হঠাৎ লালবাজারে কন্ট্রোল রুম হতে ডা. রায় ফোন করে তখনই তাঁর কাছে সেখানে গিয়ে দেখা করতে নির্দেশ দিলেন।

সেখানে হাজির হয়ে যা শুনলাম তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। জানা গেল, কলিকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমান সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের ওপর অত্যাচার করতে হিন্দুরা দাঙ্গা শুরু করেছে। ডা. রায় সেখানে কন্ট্রোল রুমে বসে বিভিন্ন জায়গা হতে খবর নিচ্ছেন এবং দাঙ্গা থামাবার জন্য নির্দেশ পাঠাচ্ছেন। কিন্তু তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করলে কী হবে, প্রতিহিংসাপরায়ণ মারমুখী জনতাকে ঠেকানো যাচ্ছে না, অনেক বস্তিতে আগুন জ্বলছে, অনেক নিরীহ মানুষ খুনজখম হচ্ছে।

এইভাবে কলকাতার বিভিন্ন অঞ্চলে গোলমাল শুরু হল, এবং সরকারের পক্ষ থেকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা দমনেরও আপ্রাণ চেষ্টা চলল। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে অবস্থা আয়ত্তে এল। কিন্তু অবস্থা আয়ত্তে এলে কী হবে? তার প্রতিক্রিয়া যখন পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হবে, তখন কী হবে সেই চিন্তাই আমাদের বিশেষভাবে বিব্রত করে তুলল।

এটা স্পষ্ট বোঝা যায় যে এদিকের দাঙ্গা-হাঙ্গামার খবর ওদিকে পৌঁছতে দেরি হবে না এবং যখন ওদিকে যাবে, তখন অতিরঞ্জিত হয়ে ছড়াবে। আর যখন ছড়াবে তখন পূর্ববঙ্গে তার প্রতিক্রিয়া যা দেখা দেবে, তা ভয়ঙ্কর আকার নেবে। প্রতিশোধটা তোলা হবে সেখানকার হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর। তার ফলে স্তিমিতপ্রায় উদ্বাস্তু আগমনের স্রোত আবার স্ফীতিলাভ করবে, তাতে সন্দেহ ছিল না। এবার হয়তো জনস্রোত বন্যার আকারই ধারণ করবে৷ তার জন্য আমাদের তো উপযুক্ত ব্যবস্থা শুরু করতে হয়।

কিন্তু ভাববার তো বেশি সময় পাওয়া গেল না। শীঘ্রই খবর আসতে শুরু করল যে পূর্ববঙ্গের নানা স্থানে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। হিন্দুর প্রাণ ও সম্পত্তি সেখানে বিপন্ন। বাংলার দুই অংশে ব্যাপক আকারে এইরকম গোলমাল শুরু হওয়ায় দুই রাষ্ট্রের মুখ্য সচিবের আলোচনা বৈঠক ডাকা হল। আলোচনার স্থান পালাক্রমে কলিকাতা ও ঢাকায় নির্বাচিত হত। এবার ঢাকার পালা। সেখানেই বৈঠক হল। শ্রী সুকুমার সেন তখন আমাদের মুখ্য সচিব। তিনি ঢাকা হতে ফিরে এসে যে খবর দিলেন, তা আমাদের রীতিমতো ভাবিয়ে তুলল। তিনি বললেন, আমাদের খুব বিরাট সংখ্যার উদ্বাস্তুদের ভার নেবার জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এমনকী তাদের সংখ্যা দশ লক্ষও হতে পারে। তখন মনে মনে ভাবলাম, ভাগ্যিস আগের পর্বের উদ্বাস্তু সমস্যার ওপর একরকম যবনিকাপাত হয়েছে। তার ফলে নূতন উদ্বাস্তুদের প্রতি পূর্ণভাবে নজর দেওয়া সম্ভব হবে।

ভারত সরকারের উদ্বাস্তু মন্ত্রকের মন্ত্রী তখন ছিলেন শ্রী মোহনলাল সাকসেনা। ভারত সরকারের মনোযোগ তখন পনের আনা পশ্চিম পঞ্জাবের উদ্বাস্তুদের ওপরে সীমাবদ্ধ। এদিকে তখনও এমন কিছু নজর দেবার প্রয়োজন হয়নি। এ অঞ্চলের কাজ নিষ্পন্ন হত ভারত সরকারের ঐ মন্ত্রকের এক যুগ্ম সচিবের তত্ত্বাবধানে। তাঁর নাম ছিল বি জি রাও। তিনি পশ্চিমবাংলার সিভিলিয়ান ছিলেন। যখন অবস্থা খারাপ হয়ে উঠল, তিনি দিল্লি হতে পশ্চিমবাংলার সমস্যা সম্বন্ধে একটা ধারণা করবার জন্য কলিকাতায় এলেন।

উদ্বাস্তুদের স্রোত তখনও বনগাঁর দিকেই প্রবাহিত। কারণ বাগেরহাট অঞ্চলেই প্রথম দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। ১৯শে ফেব্রুয়ারি তারিখে আমরা দু’জনে অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য বনগাঁ গেলাম। বনঁগা স্টেশনে যেসব নূতন উদ্বাস্তু নামছে, তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলাম। তাদের কাহিনি শুনে মনে হল, এবার বাস্তুহারা হয়ে যারা আসবে, তারা সত্যই বন্যার স্রোতের মতো আসবে। পূর্বে যারা এসেছিল, তারা প্রধানত রাজনৈতিক কারণে এসেছিল। তারা পূর্ববঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক হয়ে থাকতে সম্মত ছিল না বলে এসেছিল। এখন যারা আসবে, তারা রাজনীতি সম্বন্ধে এতটা সচেতন নয় যে নিজের ভিটেমাটি ত্যাগ করে রাজনৈতিক অধিকারের অভাবে দেশত্যাগী হবে। তারা প্রধানত কৃষিজীবী শ্রেণির লোক। চাষ করে ফসল উৎপাদন করে অতি সাধারণ মানুষ হিসাবে জীবিকা ধারণের সুযোগ পেলেই তারা সন্তুষ্ট। কিন্তু তারাও বোধহয় এবার থাকতে পারবে না। কারণ এবার নিদারুণ অত্যাচার এবং নিপীড়নের ফলে পালিয়ে আসতে বাধ্য হবে। থেকে গেলে তাদের ঘর পুড়বে, তাদের মেয়েরা ধর্ষিত হবে এবং নিজেরা খুন হবে।

শ্রী রাও ও আমি আলোচনা করে মোটামুটি ঠিক করলাম যে রেলপথে যেখানে তারা প্রথম ভারতভূমিতে প্রবেশ করবে সেখানে প্রাথমিক ত্রাণের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপিত হবে। এই কাজের জন্য দুটি কেন্দ্র নির্বাচিত হল। একটি বনগাঁ স্টেশনের নিকটবর্তী স্থানে। আর একটি নির্বাচিত হল দর্শনার নিকট সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। উদ্দেশ্য, যারা রেলপথে সীমান্ত অতিক্রম করে এই দুই স্থানে আসবে তাদের প্রাথমিক ত্রাণের ব্যবস্থা এখানে হবে এবং তারা যে উদ্বাস্তু হিসাবে এখানে এসেছে তার প্রমাণস্বরূপ তাদের একটি স্বাক্ষরিত প্রমাণপত্র দেওয়া হবে। এই প্রমাণপত্রের ভিত্তিতেই যারা আশ্রয় শিবিরে স্থান চায় তারা তা পেতে অধিকারী হবে৷ যারা অন্য ধরনের সাহায্য চায়, তারা তা পাবে৷ এই প্রমাণপত্র পরে বর্ডার-স্লিপ নামে খ্যাত হয়েছিল।

সরকারের কাছে এই ধরনের প্রস্তাব স্থাপন করব ঠিক করে আমরা কলিকাতায় ফিরে এলাম। তারপর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে ডা. রায়ের কাছে আমাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করবার জন্য গেলাম। তিনি সব শুনলেন, শুনে আমাদের প্রস্তাবগুলি অনুমোদন করলেন।

শুধু তাই নয়, আরও ঠিক হল যে সরকারের ওপর যারা আশ্রয়ের জন্য নির্ভর করবে, তাদের থাকবার জন্য যত বেশি সম্ভব আশ্রয় শিবির খোলার ব্যবস্থা হোক। এটি ডা. রায়ের নিজের নির্দেশ।

আলোচনা শেষ হল। শ্রী রাও আমাদের এই বিরাট দায়িত্বের সম্মুখীন হতে হবে ভেবে বেশ বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন। আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি সেটা প্রকাশ করে ফেললেন। তিনি ডা. রায়কে উদ্দেশ্য করে বললেন:

এত যে লোক আসবে, তাদের জন্য সব ব্যবস্থা করে উঠতে পারব তো স্যার?

উত্তরে তিনি বললেন, কেন পারব না? নিশ্চয় পারব।

এই তো ডা. বিধানচন্দ্র রায়। যেমন ব্যক্তিত্ব ও ধীশক্তি, তেমন অপরিসীম মানসিক বল। দায়িত্ব যত বড়ই হোক, তিনি দৃঢ় আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত। এমন নেতার অধীনে কাজ করতে কত আনন্দ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 905 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*