সবকিছুই হচ্ছে একটা সুনির্দিষ্ট ছক মেনে

আশীষ লাহিড়ী

 

আজ যখন ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ, গৌতম নওলাখা প্রমুখ মানুষকে গ্রেফতার করা ও হয়রানি নিয়ে আমাকে কিছু বলতে বলা হয়েছে, আমার মনে পড়ে যাচ্ছে ইউ আর অনন্তমূর্তির কথা। ওঁর জীবনের সর্বশেষ বই, ‘হিন্দুত্ব অর হিন্দ স্বরাজ’ ক’দিন আগেই পড়ছিলাম। যদিও ইউ আর বড় বেশি গান্ধীবাদী ছিলেন এবং সর্বোদয় ইত্যাদি বেশ কিছু প্রসঙ্গে ওঁর মতামত আমি মানতে পারি না, কিন্তু তিনি একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে বইটি শুরু করেছেন। ইউ আর যখন এই বইটি লিখছেন তখনও বিজেপি ক্ষমতায় আসেনি, কিন্তু লোকসভা ভোটের দামামা বেজে গেছে এবং স্পষ্ট হতে শুরু করেছে যে দিল্লির মসনদে ক্ষমতাবদল হতে আর বেশি দেরি নেই। ইউ আর অনন্তমূর্তি লিখছেন, ‘আমি সেই ভারতবর্ষে বেঁচে থাকতে চাই না, যে ভারত নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় নিয়ে আসে।’ তিনি এই কথাটা বলার পরে রাজনৈতিক মহলে প্রচুর প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। বিজেপি তাঁকে বলেছিল পাকিস্তানে গিয়ে থাকতে। ইউ আর এর পরে আর বেশিদিন বাঁচেননি, উনি বুঝতে পেরেছিলেন আর বেশিদিন বাঁচবেন না। কিন্তু আমার যেটা বারেবারে মনে হয়, উনি বেঁচে থাকলেও, এই বইটা লেখার সুবাদে ওঁর ওপরে প্রাণঘাতী হামলা হওয়াটা সুনিশ্চিত ছিল, ঠিক যেমনটি কালবুর্গি বা পানসারের ক্ষেত্রে হয়েছিল। ইউ আর এই বইতে সাভারকারের হিন্দুত্ববাদের রেফারেন্স টেনেছেন, যা কিছুদিন পর নাথুরাম গডসের মধ্যে দিয়ে একটা অবয়ব পাবে। গান্ধীহত্যার পরে নাথুরামের বিবৃতি সাভারকরের হিন্দুত্ববাদের এক ধরনের ‘কালমিনেশন’ যেখানে নাথুরাম সরাসরি বলছেন, গান্ধীকে তাঁরা দেশের শত্রু বলে মনে করেন, যেহেতু তিনি যথেষ্ট মুসলিমবিরোধী নন। এরপর ইউ আর রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের নিদর্শন হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ ছুঁয়ে চলে আসছেন সমসাময়িক ভারতে, যেখানে তিনি সাভারকর = নাথুরামের হিন্দুত্ববাদী উচ্চারণের নৈকট্য খুঁজে পাচ্ছেন খোদ নরেন্দ্র মোদির ভোটপ্রচারের বক্তৃতায়। আর এখন এই মোদির আমলে সাভারকরের সেই পুরনো হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে একটা নতুন দৃষ্টিকোণ যুক্ত হয়েছে, যা অর্থনৈতিক। এখন রাষ্ট্রনেতারা দেশটাকে বেচে দিচ্ছেন। এবং এই পুরো প্রক্রিয়ায় মোদি একজন সেলসম্যান হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন, যেখানে দেশের সম্পদ বহুজাতিকের হাতে জলের দামে তুলে দিয়ে সেলসম্যান ইন্সেন্টিভ পাচ্ছে। এবং যারা এই কাজে বাধা দিচ্ছে, তাদেরই দেশের শত্রু বলে ঘোষণা করে দেওয়া হচ্ছে। ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ প্রমুখকে গ্রেফতারের ঘটনাটিকে এই ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’-এরই একটা অংশ হিসেবে দেখতে হবে৷

এই ছকটা আসলে ‘অগ্রগতি’র ছক, যেখানে জাতীয় সম্পত্তিকে বিদেশিদের কাছে জলের দরে বেচে দেওয়া হচ্ছে, এবং সেটাকেই আমরা পুঁজির শেখানো পরিভাষায় উন্নয়ন বলছি। সেই উন্নয়নের একটা ভাগ, যারা আমাদের দেশের সংখ্যালঘু ও উচ্চবিত্ত মানুষ, অর্থাৎ দেশের তথাকথিত ‘ক্রিমি লেয়ার’, তাদের পকেটস্থ হচ্ছে ও ভবিষ্যতেও হবে। বলা বাহুল্য, যাঁরাই এই সর্বনেশে ছকটার বিরোধিতা করবেন, তাঁরাই দেশের শত্রু বলে গণ্য হবেন। হিন্দুত্ববাদ এই ছকটারই একটা সাহায্যকারী অংশ, যা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিপন্থী, এবং আমাদের দেশের মূল সমস্যাগুলির থেকে চোখ সরিয়ে দেবার জন্যই হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাগুলিকে ক্রমাগত ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই মুহূর্তে সারা দেশ জুড়ে যেসব ঘটনা ঘটছে, যাকে অঘোষিত জরুরি অবস্থা বললে অত্যুক্তি হয় না, তা পুরোপুরি এই ছক, এই প্যাটার্নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাঁরা আমাদের দেশে মানবাধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করছেন, যাঁরা দলিতদের অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, আদিবাসীদের সম্পদ বহুজাতিকের হাতে তুলে দেওয়ার বিরোধিতা করছেন, তাঁদেরই মাওবাদী, আরবান নকশাল, দেশদ্রোহী ইত্যাদি তকমা দিয়ে জেলে পুরে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। ভারভারা রাও ও অন্যান্যদের গ্রেফতার আসলে রাষ্ট্রের প্যানিক রিফ্লেক্স। গত ক’দিনের ঘটনাক্রম স্পষ্ট বলে দিচ্ছে, যে-অভিযোগগুলির ভিত্তিতে এইসব মানবাধিকার কর্মীদের ধরপাকড় করা হচ্ছে তা অত্যন্ত অস্বচ্ছ। সুধা ভরদ্বাজের লেখা যে-চিঠিটার কথা বলা হচ্ছে, সেই চিঠির যাবতীয় তথ্য জনপরিসরে বিদ্যমান, অর্থাৎ যে কেউ ও-চিঠি জাল করে ফেলতে পারে৷ সুধা সেই অভিযোগই এনেছেন। ভীমা-কোরেগাঁওয়ে ঝামেলার দিন গ্রেফতার হওয়া এই পাঁচজনের কেউই ঘটনাস্থলে ছিলেন না ও সেই সময়কার চার্জশিটেও এঁদের কারও নাম ছিল না। তাহলে প্রায় আট মাস পরে নতুন করে অভিযোগ তুলে এনে তাঁদের গ্রেফতার করার সারবত্তাটি কী? প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার যে-অভিযোগ পুলিশ প্রথমে তোলার চেষ্টা করেছিল, তা পরবর্তীকালে নিজেরাই আদালতে গুছিয়ে পেশ করতে পারেনি। আদালতও এঁদের জেল হেফাজতে রাখার পুলিশি আবেদন পত্রপাঠ নাকচ করে দিয়েছেন। মাত্র একভাবেই রাষ্ট্রের এই সন্ত্রাসের অর্থ করা যায়, তা হল, অভিযুক্তরা দীর্ঘ সময় ধরে নানান ইস্যুতে রাষ্ট্রের জনবিরোধী উন্নয়নের বিরোধিতা করে আসছিলেন, অতএব এই সুযোগে তাঁদের কিছুটা শিক্ষা দেওয়া, ভয় দেখানোর চেষ্টা করা গেল।

বন্ধু তুষার চক্রবর্তী তাঁর সাম্প্রতিক একটি প্রবন্ধে একটা চমৎকার প্রসঙ্গ তুলেছেন৷ উনি বলছেন, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ভারতের বুকে যে-নকশাল আন্দোলন শুরু হয়েছিল, এবং রাষ্ট্র ও পুলিশের অত্যাচারে আর নিজেদের অবিমৃষ্যকরিতায় যা কয়েক বছরের মধ্যে শেষও হয়ে গিয়েছিল, বসন্তের সেই বজ্রনির্ঘোষের প্রকৃত উত্তরাধিকার যদি আজ কোনও আন্দোলনের মধ্যে প্রতিধ্বনি খুঁজে পায়, সে হল এই রাষ্ট্রবিরোধী আদিবাসীদের সম্পদ ও পরিবেশরক্ষার আন্দোলন। একে কমিউনিস্ট আন্দোলন বলা যায় কিনা আমি জানি না, কারণ এই আন্দোলনের সঙ্গে দেশের বৃহত্তর শ্রমজীবী মানুষ সরাসরি যুক্ত নন, কিন্তু যাঁরা এইভাবে আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁদের জীবন, জীবিকা ও বাস্তুতন্ত্র বাঁচানোর লড়াইটা লড়ছেন, তাঁরা মাওবাদী হোন বা যাই হোন, ভারতবর্ষের প্রকৃত বামপন্থী আন্দোলনের চেতনা ও অস্তিত্বটুকু তাঁদের মধ্যেই অবশিষ্ট আছে।

এবং রাষ্ট্র সেটা বুঝতে পারছে। রাষ্ট্র জানে, বামপন্থীদের সংসদীয় লড়াই আক্ষরিক অর্থেই শেষ হয়ে গেছে। বামপন্থীদের অস্তিত্ব নির্বাচনী রাজনীতিতে মুছে যেতে যেতে এখন প্রায় না থাকার মতোই। তাই সংসদীয় প্রতিরোধকে শাসক আর পরোয়া করে না। কিন্তু রাষ্ট্র জানে, এই ধরনের আদিবাসী ও মানবাধিকার রক্ষার আন্দোলনগুলির মধ্যে একটা সত্যিকারের শক্তি আছে, একটা সততা আছে। এই আন্দোলন সংসদে নিছক আরও ক’টি আসন বাগিয়ে নেবার লড়াই নয়। এই আন্দোলনগুলির ক্ষমতা আছে রাষ্ট্রকে নাড়িয়ে দেওয়ার এবং তারা তা দিচ্ছেও। উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী আগ্রাসন, যা বর্তমান সরকার স্বাধীন ভারতে আগের যে-কোনও সরকারের চেয়ে অনেক ব্যাপকভাবে ও দ্রুততার সঙ্গে শুরু করেছে, এই আন্দোলনগুলি সেই উন্নয়নকে কক্ষচ্যুত করার শক্তি ধরে৷ তাই তার আগে যেনতেনপ্রকারেন প্রতিবাদের স্বরকে থামিয়ে দেবার এই চেষ্টা, নিন্দুকের মুখ বন্ধ করে দেবার এই চেষ্টা, ফ্যাসিবাদ ও পুঁজির গাঁটছড়ার এ এক ধ্রুপদী উদাহরণ।

পাশাপাশি যা অত্যন্ত পীড়াদায়ক, তা হল এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রসঙ্গে শিক্ষিত মধ্যবিত্তশ্রেণির একটা বড় অংশের উদাসীনতা। তারা জানে যে মোদির এই ‘উন্নয়ন’ তাদের আরও কিছুটা আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে, এলিট শ্রেণির কাজের বাজার কিছুটা প্রসারিত হতে পারে, অতএব সব জেনেশুনে তারা চুপ করে আছে। এই উন্নয়ন সাধারণ গরিব মানুষের পাঁজরের বিনিময়ে হচ্ছে কিনা, তা নিয়ে এদের কোনও মাথাব্যথা নেই। তাই মোদির হিন্দুত্ববাদ এদের কারও কারও অপছন্দ হলেও, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির কথা মাথায় রেখে তারা চুপ করে বসে আছে। যে-শিক্ষিত আলোকিত মধ্যবিত্তশ্রেণি এতদিন রাষ্ট্রের বিবেকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হত, তাদের এই নব্যনীরবতা নিঃসন্দেহে দুর্ভাগ্যজনক। তবে তা সত্ত্বেও রাষ্ট্র যে বিনাযুদ্ধে এই লড়াইয়ে জয় পাবে না, আদিবাসীদের লড়াই আর ভারভারা-সুধা-গৌতমদের প্রতিরোধ তা বুঝিয়ে দিচ্ছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 905 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. শিক্ষিত আলোকিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী মানসিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। আর্বান নকশালের নামে ডাইনী খোঁজায় তাদেরও এখন ভারী উৎসাহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*