আফসার ও তার একটি গল্প

স্বপ্নময় চক্রবর্তী

 

আফসার বয়সে আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট, কিন্তু আমরা ছিলাম সহযাত্রী। ওর লেখার আলাদা একটি চলন বরাবরই ছিল, এবং এ জন্য আমার ভেতরে একটা শ্রদ্ধাও ছিল ওর ওপর। আফসার হঠাৎই চলে গেল। কিছুদিন ধরেই ভুগছিল, এটা সেটা লেগেই ছিল শরীরে। কিন্তু যখন হাসপাতালে ভর্তি হল, জানতে পারলাম ওর ব্যাধি গুরুতর।

আফসার একেবারে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরসূরি। লেখায় নয় হয়তো। কিন্তু ওর যাপনে। ওর পরিণতিতে। মানিক অভাবকে সঙ্গে নিয়েই সাহিত্যচর্চা করে গেছেন, আফসারও। ওর এরকম হওয়া উচিত ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাডেমিতে দীর্ঘদিন সেবা দিয়ে গেছে, গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে গেছে, কিন্তু ওর চাকরিটা পাকা হয়নি। অন্য কর্মচারীদের মতো স্কেলও পায়নি। এজন্য যারা দায়ী, তাদের অনুতাপ হয় কিনা জানি না। তবে আমাদের ক্ষোভ হয়। যে অসুখটা ওকে খেল, তার নাম দারিদ্র্য। ওর লেখার মধ্যে দরিদ্র মানুষ থেকেছে, কিন্তু ওর লেখার মধ্যে দারিদ্র্য নেই। লেখাগুলির মধ্যে ঝলকে ওঠা রত্ন আছে। মন্দ্রস্বরও আছে। আজ আফসারকে নিয়ে কিছু লিখতে হচ্ছে। কিন্তু কী লিখব? আফসারের এতগুলি উপন্যাস, দুশোর বেশি গল্প থেকে আমি একটি মাত্র গল্প বেছে নিয়ে তা নিয়ে দুটো কথা বলব।

আফসারের লেখা আমি পেলেই পড়ি না। পড়া সম্ভব নয়, বা পড়ার কোনও মানেই হয় না। ট্রেনে যেতে যেতে পড়া যায় না, সময় কাটানোর জন্য আদৌ উপযুক্ত নয়। হাতে অল্প সময় আছে, একটা গল্প টুক করে পড়ে নেওয়া যাক — এরকম অভীপ্সায় পড়া সম্ভব নয়। গোগ্রাসে পড়া যায় না, দু-একটা লাইন বাদ দিয়ে বাদ দিয়ে হপিং হয় না। সুতরাং আফসারের লেখা পেলেই পড়া হয় না। যখন মনে হয়, লেখাটির প্রতি সুবিচার করতে পারব, তখনই পড়া হয়। আমি আফসারের চার-পাঁচটি উপন্যাস ও ডজন দুয়েক গল্প পড়েছি, যদিও আফসার আড়াইশোর উপর গল্প লিখেছে বলে আমার ধারণা। আফসারের শেষ গল্প যেটি পড়েছি তার নাম ‘আগাগোড়া আকাশের চাঁদ সঙ্গে নিয়ে’। এটি গ্রাম জীবনের বিজড়িত গল্প নয়। এই গল্পটি আমার হাতের কাছেই ছিল, কিন্তু এই গল্পটি নিয়ে আমার আলোচনা করতে ইচ্ছে করল না। আমি চেষ্টা করলাম যে গল্পটি পড়ে আমি তিরিশ বছর আগে চমকে গিয়েছিলাম সেই গল্পটি খুঁজে নিতে। গল্পটির নাম ‘ডিপ টিউবওয়েলের দাম কত?’ গল্পটি ওর শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলনে আছে।

এই গল্পটি আফসার লিখেছিল আশির দশকের প্রথম দিকে। তিরাশি-চুরাশি সালে। ওর বয়স তখন কত কম। চব্বিশ-টব্বিশ হবে। কিন্তু অবাক হয়েছিলাম কী মুন্সিয়ানায় ও ফ্রেমের পর ফ্রেমে লিখিত কথাছবি নির্মাণ করেছে। কিন্তু ছবিগুলি কেবলই ছবি নয়। ছবিগুলি ধারণ করে থাকছে সময়ের সংবেদন। গল্পটির কেন্দ্রীয় চরিত্রের নাম শাকু। পুরো নাম বলেনি। বলার দরকার নেই। একটি বাক্যে শাকুর পুরো পরিচয় দেওয়া হয়। ‘মুক্তার আর লাইলি আর খুকির বাপ, এক পা সরু নসিবার গোরামি কোনচৌকির আড়াই বিঘের চাষি শাকু’। এই আড়াই বিঘে ওর নিজের নয়, সে ভাগচাষি। বলা না হলেও আমরা বুঝি। জমিতে ডিপ টিউবওয়েল বসলে শাকুর জমি হারানোর ভয় আছে। রটনা হয়েছে একটি ডিপ টিউবওয়েল বসবে, ঠিক কোথায় বসবে শাকু এখনও জানে না। এই শাকুর একটি দিন-রাত নিয়ে গল্প। এটা শাকু বা শাকুদের জীবন-নির্বাহের আপাত নির্মোহ ধারাবিবরণীর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের একদিন প্রতিদিনের ভার, ভালোলাগা-ভালোবাসা, ভয়-ভীতির চিত্রভাষ্য তৈরি হয়েছে। বসন্ত রোগের চিহ্ন ধারণ করা মাংসহীন মুখের প্রসন্নতাকে ভাষা দেওয়াটা একটা ম্যাজিক। গরুর এঁটুলি বাছবার মধ্যে, হাঁসকে ঘরে ডাকবার মধ্যে যে বাৎসল্য রস সেটা নিজ সন্তানকে ফেনা ভাত খাওয়ানোর চেয়ে আলাদা — এগুলো দেখতে গেলে পাঠকের মনে একটা আতস কাচের প্রয়োজন হয়, এবং সেটা দেখতে পেলে একটা প্রশান্তি হয়। আফসারের লেখার একটা অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আণুবীক্ষণিক পর্যবেক্ষণ বা মাইক্রো অবজার্ভেশন। এই সূক্ষ্মতাই একটা রস সৃষ্টি করে। আফসারের লেখার একটা গুণ হল আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা। আরও ভালো করে বলতে গেলে নিজেকে গোপন রাখা বা আন্ডারস্টক থাকা। কিছুতেই লেখক প্রকাশ হন না — যেটা বিরল গুণ। আর, আফসার খুব ছোট ব্যাপার যা প্রতীকায়িত হতে পারে সেটা আন্ডারলাইন করতে জানেন, আর বড় ব্যাপার সেটা কম কথায় ছেড়ে দিতে পারেন।

এই গল্পটিতে ডিপ টিউবওয়েল এলে উচ্ছেদ হওয়ার সম্ভাবনাজনিত ভয়ের ব্যাপারটা নিয়ে বেশি সময় খরচ করা হয়নি। শাকু কীভাবে কলসি করে জল সেচন করে চলেছে পালং বেগুনের শরীরে, সেটাই বেশি করে বলা আছে। ডিপ টিউবওয়েল এলে জল সেচনের পদ্ধতিটাই পালটে যাবে। ডিপ টিউবওয়েল-পূর্ব সেচনে গাছপালার সঙ্গে বেশি একাত্ম থাকা সম্ভব। কলসি বা ঝারি নিয়ে একটা একটা করে গাছে জল দেওয়া হয়। ডিপ টিউবওয়েল এলে ছোট ছোট নালার মধ্যে দিয়ে মাঠের চারদিকে জল ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একজন চাষির সঙ্গে তরুলতা ফুল ফল তথা প্রকৃতির সম্পর্ক পরিবর্তন হয়ে যায়। একটা দূরত্ব তৈরি হয়। টেকনোলজির সঙ্গে সমাজ সম্পর্ক পরিবর্তনের ব্যাপারটা অনেক সূক্ষ্ম ব্যাপার। আফসারের এই গল্পে এখানেই আন্ডারলাইন করা হয়েছে মনে হয়। তাই টেকনোলজিকে প্রশ্ন করা হয় — তুমি কতটা দামী? মানবিক সম্পর্কের চেয়ে তোমার দাম বেশি? এই প্রশ্ন এক সহজ চাষির সরল প্রশ্ন। প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা সহজ নয়।

কিন্তু একটা প্রশ্ন আমার কাছে থেকে যায় এর পরেও। আফসার টিউবওয়েল বলল কেন? কেন ডিপটিকল্ বা টিউকল নয়? যেখানে ফেস কাটিংকে ফেমকাটিম বলা হয়েছে, মিটিন, অনছল, সিপিএ্যান, কংরেস, এই সব বলেছে। তবে? গল্পের ভিতরে কিন্তু ডিপটিকল শব্দটা আছে দু’বার। কিন্তু শীর্ষনামে ডিপটিকল রাখা হয়নি। টিউবওয়েল এই ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রটি রেখে দিয়েছে। এটা কি ইচ্ছে করেই? বোঝবার জন্য — এই নতুন প্রযুক্তি একটি গরীব কৃষিজীবীর কাছে এলিয়েন। এটি ডিপটিকল নয়। এটি ডিপ টিউবওয়েল।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 905 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*