ঠিক জায়গায় ঠিক লোক

সব্যসাচী দাস

 

“এই বিদেশিরা অবাধে এখানে আসে, আর সরকার কিছুই করে না। কী হত, এখানকার বদলে যদি এরা পাঞ্জাব যেত? ওখানকার লোকেরা তো এদেরকে টুকরো টুকরো করে কেটে ছুড়ে ফেলে দিত।’’

নেলি হত্যাকাণ্ড। অসম। ১৯৮৩-র ১৮ই ফেব্রুয়ারি। সরকারি হিসেবে মৃত ২১৯১, বেসরকারি হিসেবে ১০০০০-এর বেশি। বেশিরভাগই ওপার বাংলা থেকে আসা বাঙালি মুসলিম। আজ যখন এনআরসি নিয়ে অসম তথা দেশ তোলপাড়, নতুন করে চল্লিশ লক্ষ মানুষ হয়ে গেছেন বাস্তুহীন, ঠিকানাহীন, দেশহীন, সেইরকম একটা সময়ে দাঁড়িয়ে নেলিকে আর একবার মনে করা মোটেই অপ্রাসঙ্গিক হবে না!

কিন্তু ওটুকুই। নেলি নিয়ে আপাতত আর কিছু করব না আমরা। বরং জেনে নেব উপরের উদ্ধৃতিটির বক্তা কে? কেননা, তিনিই এ লেখার প্রোটাগনিস্ট।

জানার আগে বরং আর একটা উদ্ধৃতি দেওয়া যাক।

“মুসলিমরা কোথাওই মিলেমিশে থাকতে পারে না। শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের ভাবধারা প্রচার করা তাদের ধাতে নেই। তারা সবসময়েই সন্ত্রাস এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে নিজেদের মতবাদ প্রচার করে বেড়ায়। সারা পৃথিবীর সামনেই এরা একটা বিপদ।”

ওপরের এই জোড়া-উদ্ধৃতির বক্তা হলেন সদ্যপ্রয়াত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ি।

দ্বিতীয় উক্তিটিকে ঐতিহাসিক বলা যায়। সময়টা ২০০২। গোয়া। আগের উক্তিটি যেমন নেলি হত্যাকাণ্ডের পর এবং প্রেক্ষিতে বলা, তেমনই এই উক্তিটিরও প্রেক্ষিৎ একটি বর্বর হত্যাকাণ্ড। গুজরাট। ঐতিহাসিক, কারণ বাজপেয়ি তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তার আগে বা পরে আর কোনও প্রধানমন্ত্রীই, এমনকি নরেন্দ্র মোদিও, এইভাবে একটা গোটা সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় তুলে দেননি প্রকাশ্যে।

১৯৮৩ থেকে ২০০২। দুই দশক। এটাই সেই সময়কাল, যখন অটলবিহারীর যাবতীয় অর্জন। তিন তিনবার প্রধানমন্ত্রিত্ব। তেরো দিন, তেরো মাস, পাঁচ বছর। নিজের দলে অবিসংবাদী নেতা হয়ে ওঠা। বিরোধীদের কাছ থেকে রাইট ম্যান ইন রং পার্টি তকমা আদায় করে নেওয়া। বিজেপিকে একটা অচ্ছুৎ দল থেকে দেশের প্রথম সফল কোয়ালিশন গভর্নমেন্টের প্রধান দল বানানো। বিলগ্নীকরণ মন্ত্রক গড়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব শুরু করা, এবং শেষ করা ইন্ডিয়া শাইনিং-এর দেদার টাকা-ওড়ানো চোখ ঝলসানো বিজ্ঞাপনে। পাকিস্তানের সঙ্গে একবার লাহোর, একবার আগ্রা, এবং একবার কার্গিল। পোখরানে পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ। কান্দাহারে বিমান কেলেঙ্কারি। সংসদে হামলা। হাঁটু বদলিয়ে সেই চিকিৎসককে পদ্ম-পুরস্কার দান। সব মিলিয়ে ঘটনাবহুল সফর বটে। এ-হেন ব্যক্তির মৃত্যুতে আবাগের খানিক আতিশয্য দেখানো তো যেতেই পারে! জীবদ্দশাতেই যদি বিরোধীরা তাঁকে ভুল পার্টিতে ঠিক লোক বলে ডাকতে পারেন, তো এ আর কী!

বস্তুত, লেখাটা লিখতে হবে জানার পর থেকে সেই লোকটাকেই খুঁজছিলাম। এই কয়েনেজটা যার। রাইট ম্যান ইন রং পার্টি! তা হলে এই লেখায় অটলবিহারীর বদলে তাকেই প্রোটাগনিস্ট বানানো যেত। খুঁজে পেলাম না!

এই দুই দশকের দুই প্রান্তের যে দুটি উদ্ধৃতি দিলাম, তার মাঝের একটা দিই। এটা সেই সময়কার, যে সময়কাল ভারতীয় রাজনীতিতে বিজেপির মোড়ঘোরানো উত্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। আদবানির কুখ্যাত রথযাত্রা এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস। ১৯৯২। ৬ই ডিসেম্বর। ঠিক তার আগের দিন, অর্থাৎ ৫ তারিখ বাজপেয়ি লখনৌতে বললেন, লেভেল-প্লেয়িং গ্রাউন্ড দরকার। তার জন্য সমতল করতে হবে জায়গাটা। আগে থেকেই কিছু নির্মাণ হয়ে থাকলে সেখানে লোক বসে কথা বলবে কেমন করে? তাই, আগে সমতল হওয়া দরকার!!

ইনিই অটলবিহারী! বিজেপির মতো রং পার্টিতে যিনি কিনা রাইট ম্যান। যাকে সামনে দেখেই নাকি কেটে যায় বিজেপি সম্পর্কে সেকুলার ধ্বজাধারী সমস্ত রাজনৈতিক দলের ছুৎমার্গ। যাঁর নেতৃত্বে জোটে সামিল হতে আর কোনও বাধা থাকে না তাদের!

অটলবিহারী, হয়তোবা মুচকি হাসতেনও এসব দেখেশুনে। কারণ এই জোটকে সবচেয়ে বড় তামাশার পাত্র তো তিনিই বানিয়েছিলেন। পোখরানে ভারত পরমাণু বোমা ফাটানোর ঘটনার আগে অব্দি বিন্দুবিসর্গও জানতে পারেনি কোনও জোটশরিক। এমনকি তাদের যে সব ক্যাবিনেট মন্ত্রী ছিলেন, তাঁরাও। জানত কিন্তু সঙ্ঘ পরিবার। এমনকি সে বোমা বিস্ফোরণের পরেও, কেন তা ঘটানো হল সে ব্যাখ্যা প্রথমে দেশবাসীকে দেওয়া হয়নি সরকারের পক্ষ থেকে। চিঠি গেছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের কাছে। যে চিঠি প্রকাশিত হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসে। দেশবাসী অটলবিহারীর রেডিও ভাষণে শুনেছিল কিছু টেকনিকাল ব্যাপারস্যাপার মাত্র। কটা বোম, কত কিলো ওজন… এইসব!

তবে অটলবিহারী যে এই প্রচারটা উপভোগ করতেন, এবং সেটা টিকিয়ে রাখার জন্য নানা কৌশল করতেন সে অবশ্য সত্য। এই যেমন নেলি-র কথা বললাম। অসমে ওইসব বলে এসেই দিল্লিতে অটল বললেন, নেলি-র ঘটনা মর্মান্তিক। ’৯২-এর ৫ই ডিসেম্বর যে লোক বাবরি মসজিদ সমতল করার এরকম স্পষ্ট উস্কানি দিল, সে-ই পরে বারবার বলে গেল, বাবরি মসজিদ ধ্বংস নাকি তাঁর জীবনে সবচেয়ে দুঃখের ঘটনা!

উল্টোটাও আছে। ২০০২-এ গুজরাট গণহত্যার সময়ে বাজপেয়ি তার সেই বিখ্যাত ‘রাজধর্ম পালন’-এর ডায়লগ দেওয়ার একই সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, মোদি সেটা (রাজধর্ম পালন) করছেনও বটে!

মোদি যে আজ তাঁর মরদেহের পিছু পিছু হাঁটছেন, সে এমনি এমনি না। তিনি ভারতের সংসদীয় ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির মধ্যে বিজেপি সম্পর্কে শৈথিল্য না এনে দিলে, তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে চ্যালেঞ্জের মুখে না ফেলে দিলে আজ মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়া হত কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

আপাদমস্তক সঙ্ঘী অটলবিহারীর এটাই বোধহয় বৃহত্তম সাফল্য। তার দল এজন্যই তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে চিরকাল। ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা এইজন্যই আফশোষ করবে চিরকাল।

হ্যাঁ সঙ্ঘী। যে উদ্ধৃতিগুলি দিয়েছি, এবং তার অন্য কাজকর্ম থেকেও এটাই স্পষ্ট। একদম যেরকম সঙ্ঘীদের কথা এই কিছুদিন আগেই এই কাগজে শৈবাল দাশগুপ্তের লেখায় পড়লাম। অটলবিহারী বাজপেয়ি এমনই একজন সঙ্ঘী। তিনি তার ভুল পার্টির বোঝা ছিলেন না মোটেই, বরং সম্পদ ছিলেন। ইতিহাস তাঁকে সেভাবেই মনে রাখবে।

আর সেই স্পষ্ট অবস্থান থেকেই তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুতেই বিপ্লবীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার বিতর্কিত ঘটনাটিকেও আর অবিশ্বাস্য মনে হয় না। ব্রিটিশদের পদলেহনে সঙ্ঘীদের জন্মগত অধিকার এক ঐতিহাসিক সত্য।

যাকগে, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। মা-ঠাকুমাদের কোনও মৃত খারাপ লোক সম্বন্ধে কিছু বলার সময় বলতে শুনেছি ছোটবেলায়, ‘স্বর্গে গেছে… বলতে নেই…!’ সে আর মানা গেল না! এই লেখাটা আদৌ অবিচুয়ারিই হল না নিশ্চিত!

কিন্তু আমি নাচার…

 

About Char Number Platform 602 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*