করুণানিধি : বহু বর্ণের বিচ্ছুরণ

প্রতীপ নাগ

                 

ভারতীয় রাজনীতির এক বর্ণময় চরিত্র করুণানিধি। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় রাজনীতিতে যখন ধর্মের ভিত্তিতে মেরুকরণ ঘটছে, করুণানিধি ছিলেন নাস্তিক। একদিকে তিনি ছিলেন সংস্কারক, অন্যদিকে তার পরিবারকে তাড়া করেছে দুর্নীতি।

সিনেমা থেকে রাজনীতি সব কিছুতেই তার বর্ণময়তা প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৬৯ সালে ডিএমকে-র সভাপতি হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তামিলনাডুর মুখ্যমন্ত্রী হন। সেই সময়ে স্বতন্ত্র পার্টির এক বিধায়ক তার সরকারকে ‘তৃতীয় শ্রেণি’র সরকার বলেছিলেন। তার প্রত্যুত্তরে করুণানিধি জানান তার সরকার ‘চতুর্থ শ্রেণি’র সরকার, অর্থাৎ এই উক্তির মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝিয়েছিলেন আসলে তার সরকার শূদ্রদের, ব্রাক্ষণ্যবাদের সামাজিক স্তরের সবচেয়ে নিম্ন স্তর।

সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। পেরিয়ারের শিষ্য হিসেবে তিনি সামাজিক ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধ ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হয়েই তিনি পিছিয়ে পড়া জাতি (BC) ও তপশিলী জাতিদের উঠিয়ে আনার জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। তপশিলী জাতিদের জন্য তিনি বিনামূল্যে পাকা বাড়ির ব্যবস্থা করেন। পিছিয়ে পড়া জাতিদের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ২৫% থেকে ৩১% এবং তপশিলী জাতিদের ক্ষেত্রে ১৬% থেকে ১৮% বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সামাজিক ন্যায়ের প্রতি তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণে তিনি তাঁর এক পুত্রের বিবাহ দিয়েছিলেন দলিত নারীর সঙ্গে।

ক্ষমতায় থাকাকালীন করুণানিধির নেতৃত্বাধীন ডিএমকে সরকার কতগুলো সমাজকল্যাণমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে। যেমন — গরীবদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করা। এর ফলে, দরিদ্রতমদের মধ্যে পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতি ঘটে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বেশি বেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিদের জন্য শিক্ষাখাতে ভর্তুকির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ছাত্রদের ভর্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায় ও সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তামিলনাড়ু তৃতীয় স্থান অধিকার করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যে বিপুল বিনিয়োগ হয়, ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য বিরাট পরিমাণ মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়। সাফল্যের সঙ্গে গ্রামীণ কর্মনিযুক্তি প্রকল্প চলে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ দরিদ্রতম মানুষ উপকৃত হয়।

যদিও, দ্রাবিড়ীয় মতাদর্শের রাজনৈতিক দল ডিএমকে-র সামাজিক ভিত্তি হল উপরের দিকে চলনযুক্ত জাতি। দরিদ্রতম বা দলিত বা আদিবাসীরা নয়। যার প্রমাণ আমরা দেখতে পাই জমির মালিকানার ক্ষেত্রে। কৃষির ক্ষেত্রে (সার, কীটনাশক, পাম্পের জল প্রভৃতি) ভর্তুকি এবং ঋণে মুকুব প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুবিধা আরও উপরের দিকে চলনের সুবিধা দিয়েছে। সামান্য অংশের তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিরা এর সুবিধা পেয়েছে। তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতির যারা গ্রামীণ ও কৃষিক্ষেত্রে যুক্ত আছে, তাদের সামান্য অংশই বড় বা মাঝারি জমির মালিক।

ডিএমকে সমাজের মধ্য ও নিম্ন-মধ্য স্তরের উপরের দিকে চলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সমাজকল্যাণের ক্ষেত্রে তাদের মোটামুটি সাম্যের নীতি দরিদ্রতমদের সাহায্য করেছে। ভাষিক সত্তার সঙ্গে এই জনকল্যাণমূলক নীতি তাদের সামাজিক ভিত্তিকে আরও গভীরে প্রোথিত করেছে, উত্তর ও পশ্চিম ভারতের জাতভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায়। এইভাবে সম্পদের সঠিক বণ্টন না হওয়া সত্ত্বেও ডিএমকে শ্রেণি ও জাতিগত বৈষম্যের বিরোধকে ঠেকাতে পেরেছে।

১৯৮৯-১৯৯১ সময়ে করুণানিধি সামাজিক ন্যায়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভি পি সিং সরকারের শরিক হিসেবে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশ রূপায়ণের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা আছে।

এসব সত্ত্বেও করুণানিধির ডিএমকে বাস্তবে মধ্যবর্তী জাতিগোষ্ঠীদের প্রাধান্যকারী সংগঠন, নির্বাচনী ফলাফলকে মাথায় রেখে। ডিএমকে-র সময়ে থেবার, কঙ্গু ভেল্লার, ভান্নিয়াররা অনেক বেশি রাজনৈতিক ক্ষমতা ভোগ করত সামাজিক স্তরের নিম্ন জাতিগুলোর তুলনায়। এমনকি ডিএমকে-র জেলা সম্পাদক পদে কোনও দলিতের প্রার্থী হওয়া অসম্ভব ছিল।

মন্ত্রিত্ব গঠনের ক্ষেত্রেও উপরে বর্ণিত তিনটি জাতির প্রাধান্য ছিল। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব তারাই পেত। দলিত ও আদিবাসীরা কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক পেত। অসংরক্ষিত আসনে দলিত প্রার্থী কখনওই দেওয়া হয় না।

১৯৬০-এর দশকের পর দ্রাবিড়ীয় রাজনৈতিক দলগুলো সংখ্যাধিক্য এই শক্তিশালী মধ্যবর্তী জাতিগোষ্ঠীকে উৎসাহিত করেছে। এই জাতিগোষ্ঠীগুলি দলিতদের শোষণ করত। কিন্তু এরা ছিল ডিএমকে-র মতো দলগুলোর সমর্থক। এমনকি সেই সময়ে ডিএমকে বিরোধী থাকাকালীন প্রতিবাদ করেনি ২২ বছরের এক দলিত যুবককে খুনের। কারণ ঐ যুবক উচ্চবর্ণের এক যুবতীকে বিয়ে করেছিল।

সুতরাং এ কথা বলাই যায় যে করুণানিধি বা ডিএমকে-র সামাজিক ন্যায় ছিল প্রতীকী। জাতিবাদী প্রথার ধ্বংস তারা চাননি।

জরুরি অবস্থা ঘোষণার আগে করুণানিধি অনেক সামাজিক সংস্কার করেছিলেন। তামিলনাড়ুতে অব্রাহ্মণদের মন্দিরের পূজারী হতে মান্যতা দিয়েছিলেন। তিনি ভারতে প্রথম transgender-দের কল্যাণমূলক বোর্ড গঠন করেন।

জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করলেও ১৯৮০ সালে করুণানিধি আবার কংগ্রেসের সাথে হাত মেলান। ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিবাদ বিরোধিতা ছিল দ্রাবিড়ীয় আন্দোলনের মূল বিষয়। যদিও করুণানিধি জাতিবাদী ব্যবস্থা কাজে লাগিয়েছেন খুব সূক্ষ্মভাবে। জাতিবাদী সমীকরণকে মাথায় রেখেই জেলা সম্পাদক নিযুক্ত করা হত। এর ফলে ওবিসি-রা দলিতদের থেকে সুবিধাজনক জায়গায় গিয়েছে।

দ্রাবিড়ীয় আন্দোলন মতাদর্শগতভাবে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থানের বিরোধী। এই আন্দোলন বিজেপির ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিবাদী প্রথারও বিরোধী। করুণানিধি তাঁর মতাদর্শের সঙ্গে সবচেয়ে বড় আপস করলেন ১৯৯৯ সালে। স্বল্প সময়ের বাজপেয়ি সরকারের পতনের পরে, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার লোভে এনডিএ-র সাথে জোটে আবদ্ধ হলেন। এমনকি বাজপেয়ি সরকারের মন্ত্রী করলেন তাঁর ভাইপো মারানকে। ২০০২ সালে গুজরাট গণহত্যার পরেও তিনি বিজেপি-র নেতৃত্বে এনডিএ জোটে ছিলেন।

তবুও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য তাঁর লড়াই অনস্বীকার্য।

করুণানিধি ও জয়ললিতার মৃত্যুর পর দ্রাবিড়ীয় রাজনীতি কোন খাতে বয় সেইটি দেখার বিষয়। করুণানিধি তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন ব্রাক্ষণ্যবাদী জাতিবাদী প্রকল্পের বিরুদ্ধে। বহুক্ষেত্রে তাঁর জনকল্যাণকর সংস্কার দৃষ্টান্তস্বরূপ। কিন্তু বুর্জোয়া ব্যবস্থার সংসদীয় রাজনীতি তাঁকে মতাদর্শগত আপসে বাধ্য করেছে।  

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 905 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*