পাহাড়তলির গেরিলারা

নিরুপম চক্রবর্তী

 

প্রাককথন

“The whole place is going to blow up, I cannot see how I can control the revolution now. When everybody wants to fight there’s nothing to fight for. Everybody wants to fight his own little war, everybody is a guerrilla”

উদ্ধৃত প্রগাঢ় উক্তিটি হাজি জেমস আহমেদের তাঁর সংগে আমার প্রথম পরিচয় প্রায় একদশকেরও আগে যখন সদ্য প্রয়াত স্যার ভিদিয়াধর সূরজপ্রসাদ নইপলের গেরিলাস নামক উপন্যাসটি আমি প্রথমবার পাঠ করি, এবং সে কেতাবে তিনি অন্যতম মুখ্য চরিত্র নইপলবাবুর ইন্তেকালের পরে, বঙ্গীয় তুঙ্গ বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁকে নিয়ে প্রবল প্রতর্ক উত্থাপিত হতে থাকে; তাঁর ব্যক্তিগত যাপনের মিসোজেনি ও তজ্জনিত কারণে তাঁর সাহিত্যের নারীবাদী অপাঠ্যতা, তাঁর লেখনীর নিম্নমেধা যা ল্যাটিন অ্যামেরিকার জাদুবাস্তবতা বিতরণে অসমর্থ, তাঁকে ঘিরে উগ্র হিন্দুত্বের লুঙ্গি ড্যান্স ইত্যাদি বিষয়ে নোবেল কমিটি যে তাঁদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি এইসব জেনে আমি নিতান্ত মর্মাহত হই, প্রায় মরমে মরে থাকি যে পলায়ন করে সে বাঁচে, গুরুবাণীর এই নিদারুণ প্রজ্ঞা নতমস্তকে ধারণ করে এইসব বকায়েত বিতণ্ডার পরিসর থেকে পরাণ হস্তে পলায়ন করে, হাঁফ ছেড়ে যেই ভেবেছি যে ‘মানটা রেখে প্রাণটা নিয়ে সটকেছি কেমন’ অমনি প্রবল হুংকারে চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের জনৈক শাখামৃগ সদস্য মাথার পেছনে বন্দুক ধরে হিমশীতল স্বরে বলেন যে এক্ষুনি নইপলবাবুকে নিয়ে একটা রচনা না লিখলে তাঁর একদিন কি আমার একদিন! আমি প্ল্যানেট অফ দ্য এপস সিরিজের চলচ্চিত্রগুলির একনিষ্ঠ দর্শক, অতএব এনার ক্ষমতা সম্পর্কে বিলক্ষণ অবহিত আছি! ভুল করে নইপলবাবুর বেশ কিছু বই এককালে পড়েছিলাম বটে, কিন্তু সে তো আজকে নয় আর তার অধিকাংশই ভুলে মেরে দিয়েছি এই মহাসত্যটি কাতরভাবে জানিয়ে পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করি কিন্তু ভবি ভোলবার নয়! অতএব প্রাণভয়ে গেরিলাস নামের বইটি আবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়বার চেষ্টা করি হে পাঠক, বলে একটা প্রবল বঙ্কিমী হুঙ্কার ছাড়ি বরং এবার! এই রচনাটির পাঠক আদৌ কেউ আছেন কিনা জানি না, যদি পরম দুর্ভাগা কেউ থেকে থাকেন, আসুন আপনার সৎসঙ্গে আমি এই বইটি একটু বোঝার চেষ্টা করে দেখি

 

এলেম নতুন দেশে তথা উদাসিনী বেশে বিদেশিনী কে সে

একটি কাল্পনিক দ্বীপ নইপল আমাদেরকে তার অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ জানাননি, তবে দ্বীপটির যাত্রাপথে বাহামাসের নাস্যু বিমানবন্দরের উল্লেখ আছে, দ্বীপটির অর্থনীতি তীব্রভাবে বক্সাইট খনন নির্ভর, যার সত্ত্বাধিকারী মার্কিন সংস্থাগুলি এখানে বিপুল ক্ষমতাশালী, এই দ্বীপের পিজ্‌ন বুলি ইংরিজি আশ্রিত, শ্বেতদ্বীপের প্রাক্তন ঔপনিবেশিকতার বহু অভিজ্ঞান এখানে ছড়িয়ে আছে ইতস্তত অবশ্যই ধরে নেওয়া যেতে পারে যে দ্বীপটি পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত, হয়তোবা কল্পিত হয়েছে লেখকের জন্মস্থানের আদলে অধুনা তার রাস্তায় দেওয়াল লিখন: হে কালোমানুষ, ভোট বয়কট কর, জন্মনিয়ন্ত্রণ আসলে নিগ্রো জাতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত! অনতিদূরে আর দেওয়ালে লেখার প্রয়োজন পড়ে না, শ্লোগান লেখার জন্য ঝকঝকে বোর্ড বসানো থাকে রাস্তার ধারে, যাতে লেখা থাকে: জমির জন্য, বিপ্লবের জন্য! আর বোর্ডগুলির নিচে ছোট করে লেখা থাকে কোকাকোলা কিংবা আমেরিকান বক্সাইট কোম্পানির নাম, কেননা এগুলি স্থাপন করে বিপ্লবের প্রতি তাঁরা তাঁদের শ্রদ্ধার্ঘ জ্ঞাপন করেছেন গভীর রাতে পাহাড়তলিতে গুলির শব্দ শোনা যায় কখনো সখনো: শোনা যায় গেরিলারা নাকি পাহাড়ের জঙ্গলে লুকিয়ে আছে প্রত্যক্ষদর্শীর দ্যাখা মেলে না নইপলের বর্ণনায় এই দ্বীপ শ্রীহীন, পাণ্ডুর; বাসিন্দারা এই ডুবন্ত জাহাজ পরিত্যাগ করতে উন্মুখ এইসব তথ্য আমাদের হাতে আসে অনতিবিলম্বে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে নইপলের সর্বগ্রাসী নেতি বিপ্লবের কোন পরিণতি আঁকতে চলেছে হে পাঠক! আমরা এই নেতিবাচকতার উৎসমুখ সন্ধান করিব যথাস্থানে, আপাতত গল্প পঠন জারি রহুক

আমাদের স্তিমিত চোখের সামনে আজ তোমার আবির্ভাব হ’লো স্বপ্নের মত চোখ, সুন্দর, শুভ্র বুক, রক্তিম ঠোঁট যেন শরীরের প্রথম প্রেম আর সমস্ত দেহে কামনার নির্ভীক আভাস, আমাদের কলুষিত দেহে আমাদের দুর্বল, ভীরু অন্তরে সে উজ্জ্বল বাসনা যেন তীক্ষ্ণ প্রহার (সমর সেন)

পাঠক! জেন নামক মেয়েটি পৌঁছে গেছে দ্বীপটিতে এস পাঠক, আমরা তার পূর্ব বৃত্তান্ত সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকিত হই

জেনের বয়ঃক্রম চৌত্রিশ সে হয় ব্রিটিশ জেন অবিসংবাদিতভাবে শ্বেতকায়া; দ্বীপটিতে যদিও বহু শ্বেতাঙ্গ মানুষের বসবাস, তবু তার গাত্রবর্ণের বিশেষতা তাঁদের সমভিব্যাহারেও প্রকট হয়ে উঠবে এই গাত্রবর্ণের আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক নয়, এই আখ্যানে তার কিছু বিশেষ তাৎপর্য আছে যা ক্রমশ প্রকাশ্য জেন এক অসফল ইংরেজ রাজনৈতিক নেতার প্রাক্তন পত্নী তার বিবাহিত জীবন এবং বিচ্ছেদ পরবর্তী প্রেমাখ্যানগুলির যে বর্ণনা আমরা পাই তাতে তার পুরুষ সঙ্গীদের মিসোজেনির ধারাবাহিকতা মোটামুটি অক্ষুণ্ণ থাকে ব্যতিক্রম যতদূর মনে হয় পিটার, তার বর্তমান সহচর পিটার শ্বেতাঙ্গ, প্রাক্তন গেরিলা, দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার রক্ষার আন্দোলনে কারারুদ্ধ এবং কারাগারে আমানুষিকভাবে নির্যাতিত তার নিজস্ব জবানিতে জানা যায় যে অন্তরীণ থাকাকালীন একটি সম্পূর্ণ সিম্ফনি নাকি তার মস্তিষ্কের কোষে নিঃশব্দে বাজতে থাকত! মুক্তির পরে পিটার আশ্রয় নেয় ইংল্যান্ডে এবং তার দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা পুস্তকাকারে লিপিবদ্ধ করে শোনা যায় সেই কেতাবে সে প্রবল নির্লিপ্তভাবে তার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে পিটারের ক্ষোভ নেই, তার বক্তব্য ক্রোধ বিরহিত, তৎসত্ত্বেও নব্য নাৎসিরা তাকে হত্যার হুমকি দ্যায় বইটির প্রকাশনা সূত্রেই জেনের সঙ্গে তার পরিচয় ও প্রণয় পিটার বর্তমানে দ্বীপবাসী বক্সাইট কোম্পানির মতো সর্বশক্তিমান নয়, অথচ ওই দ্বীপে অনন্তকাল অবস্থিত একটি প্রতিষ্ঠান সম্ভবত তাদের একদা দাস ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার ইতিহাসে কিঞ্চিত চুনকাম করতে চায় পিটারকে কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ করে পিটার নিজে ভাবে যে ওই দ্বীপের কৃষ্ণাঙ্গ স্বার্থরক্ষায় তার কিছু না কিছু করার আছেজেন তা বিশ্বাস করে, এবং নিজে তার অংশভাক হতে চায় হে পাঠক! জেনের ব্যক্তিগত বিবেচনার প্রতি দুর্ভাগ্যবশত নইপল বিরাট কিছু আস্থা স্থাপন করেননি তবে সংবাদ এইপ্রকার যে সুদীর্ঘ বিমানযাত্রার শেষে জেন অবশেষে দ্বীপটিতে পৌঁছেছে তার সুদীর্ঘ সফরের শেষভাগটিতে তার দুই অপরিচিত সহযাত্রী স্রেফ পর্ণোগ্রাফি পড়ে কাটিয়েছে, এবং অবলীলায় জেন তাদের সঙ্গে ইমিগ্রেশেনের গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে এসেছে জানা যায় যে এই দুই পুণ্যাত্মা বক্সাইট কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট: ওই দ্বীপের তাজবিহীন রাজন্য আর তাদের সংস্রবে থাকায় জেনের পাসপোর্টে প্রবেশ করার কোন ছাপ পড়ে না পাঠক! ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণে রাখিও

 

আমরা করব জয় অথবা জেমস আহমেদের কমিয়্যুন

জেন এবং পিটার দ্বীপটির ট্রাস্ক্রস-গ্রাঞ্জ অঞ্চলে জিমি আহমেদের কমিয়্যুন দেখতে যায় সন্নিকটে চোখে পড়ে বৈপ্লবিক বুলেটিন বোর্ড, তাতে আঁকা একটি উদ্যত মুষ্টিবদ্ধ হাত, নিচে লেখা:

ট্রাস্ক্রস-গ্রাঞ্জ
জনগণের কমিয়্যুন
জমির জন্য, বিপ্লবের জন্য
বিনানুমতিতে সর্বক্ষণ প্রবেশ নিষেধ
হাইকমান্ডের আদেশানুসারে
জেমস আহমেদ (হাজি)

এই বোর্ডটির পৃষ্ঠপোষক পিটারের বর্তমান অন্নদাতা প্রতিষ্ঠানটি, এই কমিয়্যুনের জমিটিও এই প্রাক্তন দাস ব্যবসার গ্লানি মোচনে, বিপ্লবের স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদী লিসে দত্তক দেওয়া এই কমিয়্যুনের ইস্তেহারটি আমরা বরং একটু পড়ে নিই

“সমস্ত বিপ্লবের শুরু জমিতে জমিতে মানুষের জন্ম, প্রতিটি মানুষের তাতে আছে নিজস্ব অংশ, যা তার জন্মগত অধিকার, আর মানুষ অবশ্যই তার সেই প্রাপ্যটুকু চাইবে ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে এবং সবকিছুর সঙ্গে সমন্বয় রেখে সেই বিশ্বাসেই আমরা কিছু দুঃসাহসী মানুষের দল, জড়ো হয়েছি এই অনাঘ্রাত অরণ্যে আমাদের এই যাপন প্রণালী ট্রাস্ক্রস-গ্রাঞ্জ-এর জীবন দর্শন

 

একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়

একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়, একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি বাদুড়বাগানে, একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো—তবে আমি হেঁটে চ’লে যাবো মানে-মানে—ব’লে সে বাড়ায়ে দিলো অন্ধকারে হাত (জীবনানন্দ দাশ)

‘ট্রাস্ক্রস-গ্রাঞ্জের দুঃসাহসী মানুষের দল’ মূলতঃ স্থানীয় বস্তিগুলির কৃষ্ণাঙ্গ কিশোরেরা তাদের একত্র করে সমবেত ফসল উৎপাদনের প্রচেষ্টা ঠিক কতখানি সফল, সে ব্যাপারে দ্বিধা থেকে যায় আপাততঃ জেন একটি প্রায়ান্ধকার ঘরে, জানা যায় জিমি আহমেদ স্নান করতে গেছে, ঘরটিতে কমিয়্যুনের কিশোরেরা বিশ্রামরত আধো অন্ধকারে প্রথমে ভেসে আসে একটি তীক্ষ্ণ শিস, একজন ডাকে ‘দিদি শুনে যাও’ জেন উপেক্ষা করার ভান করে আবার ডাক আসে ‘এই যে সফেদ দিদিমণি!’ জেন বাধ্য হয়ে ফিরে তাকায় কে যেন হাসে, বলে, ‘যাক, তুমি তোমার নিজের নাম জানো তাহলে!’ শিস দেওয়া ছেলেটি বলে ‘একটা ডলার দাও আমায়!’ ছেলেটির চক্ষু রক্তাভ, কিছু জন্মগত ত্রুটিতে তার মুখের চেহারা ভীতিপ্রদ, ছোট ছোট ঝুঁটিতে বাঁধা তার চুল গ্রিক পুরাণের মেডুসার মতো ঝোলে জেন একটা ডলার দ্যায়, তার চোখেমুখে ভীতির চিহ্ন প্রচ্ছন্ন থাকে না এক পৃথিবীর ভুল; ভিখিরীর ভুলে: এক পৃথিবীর ভুলচুক ছেলেটির নাম ব্রায়ান্ট এই আখ্যানে সে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে

জেমস আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় এর পরে সে জেন ও পিটারকে তার আবাসনে নিয়ে যায় জেনের চোখে পড়ে আহমদের ঘরে রাখা একটি ফটোগ্রাফ, দুটি শিশু দাঁড়িয়ে আছে তার এক পাশে, আর তার অন্য পাশটি নির্মমভাবে ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে জেমস আহমেদের লন্ডনের স্মৃতি একদা সে বিবাহিত ছিল

 

জিমি আহমেদ কি কিস‌্‌সা

আগেই বলেছি জেমস আহমেদ এই আখ্যানের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র ইস্কি হুলিয়া ইস প্রকার (মূল তথ্যগুলি আমি বুলেটবিদ্ধ করিলাম):

  • জেমস আহমেদ জন্ম লন ওই দ্বীপে এবং তিনি জন্মসূত্রে চিগ্রো চৈনিক ও কৃষ্ণাঙ্গের সঙ্কর প্রজাতি অর্থে এই অতীব রেসিস্ট এবং প্রবলভাবে অনভিপ্রেত শব্দটি ব্যবহৃত হইল পাঠকের সুবিধার্থে নইপলজী ওই দ্বীপে প্রচলিত পিজ্‌নে ইহার প্রতিশব্দটি ব্যবহার করিয়াছেন, তাহা দুর্বোধ্য হইতে পারে, কিন্তু ইহার সহিত ভারসাম্য রক্ষা করিয়া শব্দটি একই মাত্রার অসম্মানজনক
  • এই দ্বীপে জিমি লিউং নামে পরিচিত বালকটি পরবর্তী কালে লন্ডন শহরে আবির্ভূত হয় হাজি জেমস আহমেদ নামে, কৃষ্ণাঙ্গ অধিকার রক্ষার স্বার্থে নিয়োজিত প্রবল বিপ্লবী হিসাবে তাহার নাম পরিবর্তনের আখ্যানে কিঞ্চিত ধোঁয়াশা রহিয়াছে এবং তাহার হাজি অভিধাটি ব্যবহারের সহিত সত্যকারের কোন তীর্থযাত্রার সম্পর্ক আদৌ রহিয়াছে কিনা সে প্রসঙ্গেও প্রবল সংশয় রহিয়াছে লন্ডন শহরে তাহার বাসস্থান ছিল অভিজাত উইম্বলেডন অঞ্চলে জনশ্রুতি এইপ্রকার যে তাহার এই উইন্ডফল তথা ফাঁপাইয়া তোলা বিপ্লবী ভাবমূর্তিটির নির্মাণে জনৈক মহিলার প্রত্যক্ষ অবদান রহিয়াছে তিনিই কি তাহার প্রাক্তন ধর্মপত্নী?
  • জিমি আহমদের নিজস্ব মতানুসার কর্পোরেট জগত তাহাকে সম্ভ্রম করিতে বাধ্য কেননা বিপ্লব ও তাহাদের মাঝখানে একমাত্র সেই দাঁড়াইয়া আছে।
  • জনশ্রুতি আরও বলে লন্ডন শহরে জেমস আহমেদের নামে বলাৎকার ও অত্যাচারের অভিযোগ রহিয়াছে এবং তাহা তাহার লন্ডন হইতে নিষ্ক্রমণের কারণ হইতে পারে।
  • জেমস আহমেদ ব্রায়ান্ট নামক কিশোরটির প্রতি দৈহিকভাবে আসক্ত।
  • জেমস আহমেদ আত্মজীবনীমূলক একটি উপন্যাস লিখিতেছেন। তাহার কিছু কিছু পৃষ্ঠা আমরা পাঠ করিয়াছি।

 

কাহিনী ঘনীভূত হইতেছে

একটু চুম্বক থাকুক। স্টিফেন্স নামে একটি ছেলে নিরুদ্দেশ হয় কমিয়্যুন থেকে। তার সঙ্গে আরও কয়েকটি ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। স্টিফেন্সের একটা স্বাভাবিক নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা আছে, পারিপার্শ্বিকের পরিস্থিতি নিয়ে সে ওয়াকিবহাল, কমিয়্যুনের অন্যান্য ছেলেরা তাকে সম্ভ্রম করে, জেমস আহমেদের উপন্যাসে আশঙ্কা আছে যে স্টিফেন্স আদতে তার বিকল্প হয়ে উঠতে চায়। পিটার তার মার বাড়িতে গিয়ে তার সম্পর্কে খবরাখবর নিতে চায়। মহিলা জানান যে ছেলের বর্তমান স্থিতি সম্পর্কে তাঁর কাছে আদৌ কোন তথ্য নেই। পিটার এও বোঝে যে বাড়িটি এখন পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।

ইতিমধ্যে জেন একদিন জিমির প্রেমিকা হয়ে ওঠে। জিমির আবাসন থেকে একদিন জেন নিষ্ক্রান্ত হওয়ার পরে ব্রায়ান্ট জানায় যে সে একটা সাদা ইঁদুর দেখেছে। জিমি ব্রায়ান্টকে প্রতিশ্রুতি দ্যায় যে ইঁদুরটিকে সে একদিন তার হাতে সমর্পণ করবে।

 

বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে

সকালের সংবাদপত্র ঘোষণা করে দ্বীপে জরুরি অবস্থা জারি। জানা যায় কাকভোরের সংঘর্ষে পুলিশের গুলিতে স্টিফেন্স নামে জনৈক গেরিলার মৃত্যু হওয়ার কথা। তার মার বাড়ি থেকে প্রভূত পরিমাণ অর্থ উদ্ধার হওয়ার কথাও লেখে ভোরের কাগজ। সমস্ত শহর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে: স্টিফেন্সের দেহ নিয়ে বিশাল মিছিল বার করে সারা শহর পরিক্রম করে জেমস আহমেদ, তার আন্দোলনের নাম শান্তির তীর, মিছিলে প্রত্যেকের হাতে নারকোল অথবা তাল গাছের প্রতীকী পাতা, ক্রমশ মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। ঘটনার মোড় ঘোরে আচম্বিতে: স্টিফেন্সের মা জিমি আহমেদকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। জিমি আহমেদ পরিপূর্ণভাবে জনসংযোগ হারাতে থাকে। তারপরে চূড়ান্ত অরাজকতা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট। প্রত্যেকেই নেতা, আন্দোলনের রাশ কার হাতে পরিষ্কার বোঝা যায় না। আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যও স্পষ্ট থাকে না। কেউ দ্বীপ থেকে বিদেশি শক্তিকে হাত ওঠাতে বলে, কেউ আফ্রিকান জাগরণের নামে জয়ধ্বনি দ্যায়, কেউ ইজরাইলের। হিংসা ছড়াতে থাকে, সরকারের পতন প্রায় অবশ্যম্ভাবী বলে মনে হয়।

উল্টে যায় পাশার দান। দ্বীপের আকাশে উড়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে মার্কিন হেলিকপ্টার। বোঝা যায় বক্সাইট কোম্পানির লোকেরা স্রেফ পর্ণোগ্রাফি পড়ে দিন কাটায় না, জলের মতো পরিষ্কার যে এই দ্বীপের অধিকার বজায় রাখতে তারা বদ্ধপরিকর। বিপ্লবের পরিসমাপ্তি হয়। জনতা জনার্দন সরকারের নামে জয়ধ্বনি দ্যায়।

এই পরিস্থিতিতে পিটার বোঝে সে সম্পূর্ণভাবে অপ্রয়োজনীয়। জেন মনস্থির করে লন্ডনে ফিরে যাওয়ার। বিদায় জানাতে সে ট্রাস্ক্রস-গ্রাঞ্জ কমিয়্যুনে গেলে জিমি তার ওপর যৌন নিগ্রহ করে ব্রায়ান্টের হাতে তুলে দ্যায়। ব্রায়ান্ট পুরনো দিনের জলদস্যুদের কাটলাস দিয়ে তার শাদা ইঁদুরটিকে কুপিয়ে কুপিয়ে কাটে।

কাটতে কাটতে রক্তে লাল, বিপ্‌ বিপ্‌ বিপ্লব আসছে কাল! (অমিতাভ চৌধুরী)

 

এই কিস‌্‌সার পরিশিষ্ট

জেনের হত্যার অব্যবহিত পরে কমিয়্যুনে আসে পিটার। জিমি তাকে জানায় যে এখানে কেউ আসেনি। তার মুখে চোখে হিংস্রতা, প্রয়োজনে আরেকটি খুন করতে সে পিছপা হবে না। পিটারের চোখে পড়ে জেনের সিগারেট লাইটারটি। যা বোঝার সে তা বোঝে। সে নির্বিবাদে প্রস্থান করে।

পিটারের বাড়িতে পড়ে আছে জেনের পাসপোর্ট। ঝকঝকে নতুন। কোন চিহ্ন নেই ১৯৪৩ সালে ১৭ই অগাস্ট জন্মানো এই ব্রিটিশ মহিলা নাগরিকটির এই দ্বীপে আগমন কিংবা প্রস্থানের।

 

কিঞ্চিৎ আলোচনা

রচনা শৈলীর নিরিখে নইপল, যথেষ্ট ধ্রুপদী। আর্ট ফর্মের প্রসারণ তাঁর কাছে ঠিক একমাত্রিক ব্যাপার নয় যে প্রথা ভাঙলেই তা হাতে পায়ে বেড়ে উঠবে। তাঁর গদ্যে ভাস্করের কারুকাজ; একেকটি অনুচ্ছেদের শেষ শব্দটি বসানোর পরে মনে হয় যেন তিনি ছেনি হাতুড়ি হাতে ঘাম মুছতে মুছতে পরিতৃপ্তির হাসি হাসছেন। গেরিলাস বইটির প্রায় সর্বত্র ছড়িয়ে আছে তার নিদর্শন: নিসর্গ বর্ণনা থেকে প্রতিটি চরিত্রের সূক্ষ্ম চিত্রায়নে তার ব্যাপ্তি। সেসব আলোচনা হতেই পারে কিন্তু আপাতত আমি একটি অন্য প্রসঙ্গে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করতে চাই।

বিষয়বস্তু তথা গঠন প্রণালীতে সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ থেকে নভেম্বর ১৯৭৪ পর্যন্ত লেখা গেরিলাস বইটি এক অর্থে নইপল রচনা সমগ্রে একটি সিঙ্গুলারিটি। এই বই প্রসঙ্গে তাঁর নিজের বক্তব্য ‘হিংস্রতা ছড়িয়ে আছে এর স্বরে। বইটি জোরে জোরে পড়বার চেষ্টা করলে দ্যাখা যাবে যে হিংস্রতা এর ছন্দে। এটা ক্রোধ নয়, এটা বিশুদ্ধ হিংস্রতা।’

নিখাদ ভায়োলেন্স যে প্রায় চেম্বার সঙ্গীতের মতো বেজে উঠতে পারে, তা প্রত্যক্ষ করেছি কুয়েন্টিন টারান্টিনোর কিল বিল চলচ্চিত্রদুটির দর্শক হিসেবে। ফিল্মের ভিস্যুয়াল পরিসরের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেও, এক্ষেত্রে নইপল, আমার ব্যক্তিগত মতে, ঢের বেশি গ্রাফিক এবং এক অর্থে অধিকতর নির্মম এবং সফল। আর কিল বিল যেহেতু এক নির্দয়ভাবে নির্যাতিতা নারীর হাড় হিম করা প্রতিশোধের আলেখ্য, তা তার বিষয়বস্তুর স্বভাবে নারীবাদী আশীর্বাদের গণ্ডিতে পৌঁছে যায়। পক্ষান্তরে জেন নামক নারীটি প্রতিরোধবিহীন, আত্মরক্ষায় অসমর্থ, পিটার নামক প্রাক্তন গেরিলাটিও তাকে ন্যূনতম সুরক্ষা দিতে অপারগ। জেনের উপাখ্যানে তাই স্বধর্ম পালনকারী হিংসার কাছে একটি রমণীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের ভয়াবহতা: নৃশংস, কর্কশ, অপরিমেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং ব্লিক।

মতামতের স্পুন ফিডিং-এ আমার আস্থা নেই। বইটিতে জেনের হত্যাদৃশ্যের বঙ্গানুবাদ করে দিলাম। চাইব, পাঠক যেন তাঁর নিজের সিদ্ধান্তে নিজেই পৌঁছতে পারেন।

“জিমি বলে ‘ব্রায়ান্টকে মনে আছে?’

জেন উত্তর দ্যায় ‘না, মনে নেই।’

জিমি বলে ‘ব্র্যায়ান্টের তোমাকে মনে আছে।’

ব্রায়ান্ট মাথা তোলে। তার মুখ বিকৃত আর তার ঝুঁটি বাঁধা চুলে আক্রমণাত্মক ভঙ্গি। চোখ দুটি রক্তবর্ণ, ঝাপসা, একটি চোখের পাতা আধবোজা। সে ছুটে আসে, ঘুরে মুখোমুখি দাঁড়ায় জিম ও জেনের: তার হাতে ধরা একটি কাটলাস, সে কাঁদছে।

ব্রায়ান্ট ডেকে ওঠে ‘জিমি! জিমি!’

জিমির ডানহাত জেনের ঘাড় ধরে তাকে একটা হ্যাঁচকা টানে ব্রায়ান্টের সামনে দাঁড় করায়। তার কামানো গাল সামান্য ফুলে ওঠে, মনে হয় সে হাসছে।

সে বলে ওঠে এই যে ইঁদুরটা! মারো ইঁদুরটাকে!’

ব্রায়ান্ট ছুটে আসে, থতমত খায়।

তোমার ইঁদুর ব্রায়ান্ট! তোমার ইঁদুর!’

জেনের ডান হাত আর গলা চেপে ধরে আছে জিমি। তার ডান হাতে কাটলাসের প্রথম কোপটি পড়ে।

প্রথম কোপটাই আসল: বাদবাকিটা আপনা থেকেই চলতে থাকবে।

ধারালো ইস্পাত মাংসে পৌঁছে যায়। চামড়া ছিঁড়ে তার নিচে মাংস দৃশ্যমান। এক মুহূর্তের জন্য দগদগে সাদা, তারপরে ক্রমাগত সবকিছু ঢেকে দিয়ে, বিকৃত মাংসপিণ্ডের রক্তপাত। শেষ পর্যন্ত কাটা জায়গাগুলোই আবার কাটতে থাকে ব্রায়ান্ট।

ব্রায়ান্ট চিৎকার করে, চোখে জল; যেন প্রবল যন্ত্রণা আর হতাশায় বলতে থাকে ‘আমাকে মদত কর জিমি!’

প্রত্যুত্তরে জিমি আরও শক্ত করে ধরে থাকে জেনের গলা। জেনের গলার কথা তার মনে থাকে না, সে শুধু অনুভব করে তার নিজের শক্তি, তার নিজের চামড়ার মসৃণতা, তার নিজের শিরাগুলির টানটান হয়ে ওঠা। সে সেদিকেই মনঃসংযোগ করে থাকে, যতক্ষণ না জেন লুটিয়ে পড়তে থাকে, তাকে ভারী মনে হয়। জিমির শক্তির প্রয়োজন ফুরিয়েছে, জেন নিস্তেজ হয়ে এলে জিমিকে ঘিরে ধরতে থাকে একধরনের শূন্যতা। অবশেষে শূন্যতা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।”

মনে কর শেষের সে দিন ভয়ঙ্কর (রাজা রামমোহন রায়)।

পাঠক, এস কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকি।

 

১০ তবুও নগরে যুদ্ধে বাজারে বন্দরে জেনে গেছি কারা ধন্য, কারা স্বর্ণ প্রাধান্যের সূত্রপাত করে

গেরিলাস উপন্যাসটিতে ক্যারিবিয়ান বিপ্লবের পরিসমাপ্তি ঘটে প্রবল হিংস্রতায়, শঠতায়। নইপলের হাতে এ গ্রন্থ বিপ্লবের নামে প্রতারণার দলিল হিসেবে গড়ে ওঠে। তাঁর চিরাচরিত রচনাধারার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ধার ধারেননি তিনি এক্ষেত্রেও। অতএব তিনি একইভাবে বীতশ্রদ্ধ ও সহানুভূতিহীন বহুজাতিক সংস্থার বক্সাইট উত্তোলনের প্রতিও। এই প্রবল নেতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক সুতীব্র অভিমান যা তাঁকে স্বতন্ত্র করে তোলে। তিনি জন্মসূত্রে ত্রিনিদাদের মানুষ, শিক্ষা এবং কর্মসূত্রে ব্রিটিশ। ত্রিনিদাদ সম্পর্কে তাঁর বিন্দুমাত্র মোহ ছিল বলে মনে হয় না, আর ‘When Britain first, at heaven’s command/Arose from out the azure main,/This was the charter of the land,/And guardian angels sung this strain — (Rule Britania, James Thomson)’ এই ধরনের বিশ্বাসে আপ্লুত হওয়ার নিদর্শন তাঁর রচনায় খুঁজে পাওয়া শক্ত। আইস পাঠক, পরিবর্তে আমরা বরং সঙ্গীত শ্রবণ করি “যেদিন সুনীল জলধি হইতে উঠিলে জননী ভারতবর্ষ/ উঠিল বিশ্বে সে কী কলরব, সে কী মা ভক্তি, সে কী মা হর্ষ। (দ্বিজেন্দ্রলাল রায়)” ভাবিয়া দেখিয়াছ কোন মহান বারিধি হইতে আমাদিগের জাতীয়তাবোধ, আমাদিগের জাত্যভিমান উত্থিত হইয়াছিল?

নইপল আসলে তাঁর আপাত সরলতার মধ্যে বড় বেশি জটিল, তিনি না ঘরকা না ঘাটকা, এক তীব্র আত্মাভিমান তাড়িত একজন একাকী লেখক, যার কনভুলেটেড মননে যে বিশ্বরূপ, তা তাঁর ওই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে বরাবর সঙ্গতি রেখে চলেছে। মনে পড়ে তাঁর একদা চর্চিত A turn in the south বইটির কথা: যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশের প্রদেশগুলিতে তিনি পরাজিতের দীর্ঘশ্বাস ও একরাশ হীনম্মন্যতা ছাড়া আর বিশেষ কিছু খুঁজে পেয়েছিলেন বলে মনে পড়ে না। অথবা ত্রিনিদাদ সরকারের আমন্ত্রণে এবং অর্থানুকূল্যে রচিত The middle passage গ্রন্থটিতে এক অর্থে তিনি ওই অঞ্চলের আদ্যশ্রাদ্ধ সম্পন্ন করেছেন, লেখক হিসেবে পৃষ্ঠপোষককে সন্তুষ্ট রাখার দায়ভাগ তাঁর নেই। তিনি সচেতনভাবে বিতর্ক সৃষ্টি করেন, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রবল কন্ট্রোভার্সির জনক হয়ে ওঠেন বারবার, এবং প্রায় প্রতিবার। তাঁর এই নির্মম আক্রমণাত্মক ভঙ্গি আধুনিকতার অঙ্গ, তাঁকে জোর করে আধুনিক হয়ে উঠতে হয় না। তাঁর সততা প্রশ্নাতীত, কোনরকম মায়োপিক লেন্সে তাঁকে প্রদর্শন না করাই ভালো। তাঁর বীক্ষণ অসম্পূর্ণ, বক্তব্য প্রশ্নাতীত নয়, তবু তাঁর মন্থিত গরলে অজস্র অপ্রিয় সত্য লিপ্ত হয়ে থকে, যাকে অস্বীকার করাটা অনৃতভাষণ হবে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে আমাদের আধুনিক নান্দনিক মূল্যায়নের শিরোভাগে নইপলের থেকে ঢের বেশি বিতর্কিত ব্যক্তিত্বেরা জড়িত হয়ে আছেন। পাঠক, স্মরণ কর মার্কিন নাগরিক ফাসিস্ত এজ়রা পাউন্ডকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধান্তে মার্কিন ফৌজ ইতালিতে গ্রেফতার করে আক্ষরিক অর্থে একটি খাঁচায় পুরে রাখছে; অথবা যখন নাৎসি অধ্যুষিত ওয়ার্‌স বিদ্রোহে ফেটে পড়ছে, ফ্যুয়েরারের ফৌজ নির্বিচারে হত্যা করছে সহস্র সহস্র পোল নাগরিককে, অথচ প্রায় এক ডেমনিক দায়বদ্ধতায় রক্ষা করে চলেছে ফ্রেদেরিক শঁপার কর্তিত হৃদপিণ্ডটি! এই দুই ব্যক্তিত্বের বিহনে আধুনিক ললিত কলার চিত্ররূপটি অসম্পূর্ণ থাকে। আর এইসব প্রবল টেম্পেস্টের পাশে নইপল এক মৃদু কালবৈশাখী, তবু তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটুকু অবশ্যই দিতে হবে।

মোটর সাইকেল দিনলিপিতে বর্ণিত ভূখণ্ডের অনতিদূরে অবস্থিত হয়েও এই পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ভিন্ন গোত্রের। এদেশ জাদু বাস্তবের নয়, বিপ্লবের নামে গেরিলাস উপন্যাস হেমিঙওয়ের বৃদ্ধ জেলেটির মত মৃত মাছটির কঙ্কালটিকে টেনে আনে শুধু। এই বই দ্বিতীয়বার পাঠান্তে আমার মনে পড়ে:

হয়তো বা অন্ধকারই সৃষ্টির অন্তিমতম কথা; হয়তো-বা রক্তেরই পিপাসা ঠিক, স্বাভাবিক — মানুষও রক্তাক্ত হতে চায়; — হয়তো-বা বিপ্লবের মানে শুধু পরিচিত অন্ধ সমাজের নিজেকে নবীন ব’লে — অগ্রগামী (অন্ধ) উত্তেজের ব্যাপ্তি ব’লে প্রচারিত করার ভিতর; হয়তো-বা শুভ পৃথিবীর কয়েকটি ভালো ভাবে লালিত জাতির কয়েকটি মানুষের ভালো থাকা — সুখে থাকা — রিরংসারক্তিম হয়ে থাকা (জীবনানন্দ দাশ)।

গেরিলাস উপন্যাসটিতে ক্যালিপ্সো সঙ্গীতের ফাঁকে সার ভিদিয়ার অট্টহাস্য শোনা যায়। লেখকদের নিজস্ব স্বর্গে সদ্য আগত মানুষটি টুপিখুলে, পুরনো বাসিন্দা জীবনানন্দ দাশকে সম্মান জানান।

About Char Number Platform 602 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. চমৎকার, মন ছুঁয়ে যাওয়া। লেখকের খেয়ার পালে হাওয়া যুগিয়েছেন নইপালের সাথে জীবনানন্দ দাশ, সমর সেন। দেশ কাল বর্ণের দূরত্ব অতিক্রম করে সবার ঠিকানা মিলেছে বিদ্যা, জীবনের আনন্দ ও সমরে। বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*