অনিন্দিতা গুপ্ত রায়ের কবিতা

সারস্বত

 

 

এই জলের শব্দের ভিতর কুয়াশা মিশে যাচ্ছে। শুক্লা পঞ্চমীর হলুদ গলে পড়ছে হাওয়ার শব্দে। হাওয়ার ভিতর ঢুকে বসে আছে ক্যালেন্ডার, পুরনো বছর। তার গায়ে মৌরীফুলের গন্ধ। তাকিয়ে আছ, অথচ দেখতে পাচ্ছোনা বলেই অবলীলায় পা মাড়িয়ে ফেলছ। ব্যথাবোধের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আসলে প্রমাণ করছ নিজেরি ক্রমাগত ভোঁতা হয়ে ওঠা স্নায়ু। ধুলো কিরকম অবলীলায় কাদা হয়ে জড়িয়ে ধরেছে পা। এখন আর ঝেড়ে ফেলতে পারছ না ইচ্ছেধীন। বৃষ্টি আসার আগে জলের গন্ধ যারা পায় তারা তো ধুলোর নীচেই মিশে থাকে! হাঁসের পালক থেকে উড়ে আসে সাদার নরম, মসৃণ। সে তোমাকে জল থেকে পরমান্ন তুলে নেওয়ার মন্ত্র শেখাবে, বলো?

 

কথোপকথন

 

কথা ও বার্তাদের পরস্পর দেখা হয়ে গেলে অনেকটা স্তব্ধতা লেখা হল। বার্তা  পৌঁছনোর পর কথাদের অপেক্ষা সেখানে ঘন হয়ে আছে। গুটিয়ে রাখা শীতলপাটীর মত তার খুলে যাওয়া স্পর্শের কাছাকাছি যায়। না-লেখা শব্দমালা বারুদ ও বসন্ত পাশাপাশি রেখে দ্যাখে, আড়চোখে। লিখিত অক্ষর থেকে আলো উঠে এসে কপালের মাঝবরাবর বসে চাঁদে, চন্দনে। একেকটা মায়ার জন্য অনেক সভ্যতা পার হয়ে ক্রমে ক্রমে নির্মোহই হতে চেয়েছি তারপরও। উড়ে আসা সাদা পায়রার ডানা মুচড়িয়ে কেউ কেউ খোঁজে সংকেত। অথচ ভাঙাচোরা শরীরের আধিদৈবিক পরী, পাথর হওয়ার আগে কী বলেছিল বুঝে ওঠা হয়না কখনো।

 

মুখোশ

 

ক্রমশই হাঙরের মুখের ভিতর ঢুকে যায় মাঝিমাল্লা সমেত নৌকো। লাইফ জ্যাকেট খোলার সুযোগমাত্র না দিয়ে আকাশ ছাপিয়ে ওঠা ঢেউ—লোফালুফির খেলায় দিগভ্রান্ত কম্পাস। এসবের মধ্যেও লবণ আর জলে ডুবে ভেসে একাকার পার অবধি হতশ্বাস মাটি ছুঁই। কী আশ্চর্য! জল থেকে টেনে তুলছিল যে তাকে অবিকল হায়নার মত দেখায়। অতঃপর কিছু লাল রঙ গোধুলি পর্যন্ত গড়াতে থাকে—বুদবুদে, ফেনায় ফেনায়।

 

ছায়া ও ছবি

 

ছায়াদের অসুখ করে না। ঘুম খিদে প্রেম রাগ যৌনতা কবিতা পায় না। পিছনে বা সামনে থেকে কিছুটা তোমারই মত তবু তুমি নও। বস্তুত নিজের ছায়াকে ঠিক চিনতে পারি না। পায়ের শব্দহীন স্পর্শহীন থাকাটুকু শুধু। ততক্ষন, যতক্ষন আলো এসে পড়েছে শরীরে। তারপর নেই। নাকি আছে? অন্ধকারে নিজেই ছায়াটি হয়ে খুঁজতে বেরোই প্রকৃত শরীর। একসময় আলো, ছায়া ও অন্ধকার সমার্থক হয়ে ওঠে।

 

ইতিহাস

 

চলে যাওয়ার কথা বলতে ভালবাসি না। অবশ্যম্ভাবী নিভে আসার দিকে তাকালেও ঝাপসা দেখি মূর্খের স্বভাবে। অথচ চলে যাওয়াগুলো দেখি। অনায়াস সরে সরে যাওয়া। ধূপ জ্বালানো ছিল, নেই—বুঝি। শুকনো কাঠকুটো জড়ো করে ধিকিধিকি আগুনের পাশে রাখি। হাওয়া দিই। ছাই উড়ে উড়ে চোখে জল ভরে আসে। সমবেত হাসির শব্দে ওড়ে পায়রার দল। সারাটা বছর জুড়ে শীত ঋতু থেমে থাকে চেয়ারে টেবিলে। এমনকি গাছটাও নিজেকে অনাদৃত জেনে মরে যায় ওপরে ওপরে। একদিন নতুন পড়শি এলে ফিসফাস কথা হয় — মরে যাওয়া গাছটির, নিভে যাওয়া আগুনের।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1180 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*