অচ্ছে দিনের পাঁচ বছর : কী বলছে পরিসংখ্যান?

সৌভিক ঘোষাল

 

স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতকে জানা-বোঝার বিশ্বস্ত তথ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিগণিত হত ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে। অভিযোগ, সেই এনএসএসও-র তথ্যকে চেপে দিয়েছে মোদী সরকার। কারণ, এর নানা তথ্য তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। জিডিপি নির্ণয়-সহ নানা হিসাবের ধরনকেও তারা বদলে দিয়েছে, চেষ্টা করেছে তথ্য পরিসংখ্যানকে যতটা সম্ভব নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসার। কিন্তু এই বদল আর বিকৃতির নানা ছলচাতুরি পেরিয়েও নিজেদের পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতা ঢেকে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। যেসব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা থেকেই ফুটে বেরোচ্ছে বাস্তবের হাড়-হিম-করা চিত্র।

আসুন, তেমনই কিছু তথ্যজ্ঞাপক চিত্র / সারণির দিকে চোখ রাখা যাক।

ছবি – ১

শিক্ষাখাতে বিজেপি সরকারের আমলে ব্যয়বরাদ্দ কীভাবে কমেছে এখানে তার পরিষ্কার তথ্য আছে।

বাজপেয়ীর এনডিএ সরকার যখন বিদায় নেয়, শিক্ষাখাতে জিডিপির মাত্র ২.৬৩ শতাংশ বরাদ্দ হয়েছিল। বাম-সমর্থিত ইউপিএ-১ সরকারের আমলে তা ২০০৬-০৭ সালে ৪.০৮ শতাংশে ওঠে। ইউপিএ আমলে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ জিডিপি-র ৪ শতাংশের বেশিই থাকত। ২০১৩-১৪ সালে তা ৪.৭৭ শতাংশে পৌঁছয়। মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিক্ষাখাতে ব্যয়বরাদ্দ আবার কমতে থাকে। চার শতাংশের কম ব্যয়বরাদ্দ দেখা যায় প্রতি বছরেই। এখন তা ৩.৬ শতাংশ। বোঝা যায়, সরকারের অচ্ছে দিন-এর অ্যাজেন্ডায় রামমন্দির বা লাভ জেহাদ থাকতে পারে, কিন্তু শিক্ষায় উন্নয়নের জন্য ব্যয়বরাদ্দ অগ্রাধিকারের তালিকায় নেই।

ছবি – ২

এই ছবিটির কয়েকটি মাত্র তথ্যের দিকে একবার তাকালেই উচ্চশিক্ষার প্রতি মোদী সরকারের দৃষ্টিভঙ্গী এবং প্রকৃত আগ্রহ-অনাগ্রহ স্পষ্ট বোঝা যাবে।

ইউপিএ আমলের শেষে উচ্চশিক্ষায় ব্যয়বরাদ্দ ২০১৪-তে ছিল ৯১০০ কোটি টাকা। মোদী সরকার থিতু হয়ে বসেই ২০১৬-১৭-য় তাকে একধাক্কায় একেবারে অর্ধেকে, ৪৪৭০ কোটি টাকাতে নামিয়ে আনে। ২০১৭-১৮ আর ২০১৮-১৯ সালে অনেক সমালোচনার পরও তা বাড়ানো হয়নি। ২০১৮-১৯ সালেও উচ্চশিক্ষায় ব্যয়বরাদ্দ ৪৭২২ কোটি টাকায় আটকে রাখা হয়। গোটা বিশ্ব যখন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রাধিকার দিয়ে এগোতে চাইছে, তখন এখানে উচ্চশিক্ষায় ব্যয়বরাদ্দ অর্ধেক করে মহাভারত আর রামায়ণের যুগে আমরা কেমন মোটরগাড়ি চড়তাম, বিমানে চাপতাম আর প্লাস্টিক সার্জারি করতাম – সেই সেই গল্প শোনানোটাই সরকারের নেতামন্ত্রীদের অগ্রাধিকার।

ছবি – ৩

শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় মোদি সরকারের ব্যয়বরাদ্দ সবচেয়ে কম। ৩ নং ছবিটি সেটা স্পষ্ট করছে।

বাম-সমর্থিত ইউপিএ-১ সরকারের আমলে আইসিডিএস-এর ব্যয়বরাদ্দে বৃদ্ধির হার ছিল ২৫.৪ শতাংশ। বামেদের সমর্থন প্রত্যাহারের পর ইউপিএ-২ সরকারের আমলে এই বরাদ্দের বৃদ্ধিহার ছিল ১৮.১ শতাংশ। চলতি বিজেপি সরকারের আমলে বৃদ্ধি দূরে থাক, তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬.৫ শতাংশ। উপেক্ষিত হয়েছে শিশুদের অধিকার, তাদের স্বাস্থ্য, অ প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা।

ছবি – ৪

জিডিপির বৃদ্ধির সঙ্গে প্রকৃত উন্নয়ন ও জনগণের সুযোগসুবিধে বৃদ্ধির কোনও সম্পর্ক নেই, যতক্ষণ না বন্টন সুষম হয়। কিন্তু ৪ নং ছবির পরিসংখ্যান, “মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়” দক্ষিণপন্থীদের এই ভুয়ো প্রচারকেও নস্যাৎ করে দিচ্ছে। বাজপেয়ীর এনডিএ জমানায় জিডিপির বৃদ্ধির হার ছিল ৫.৯ শতাংশ। আর মোদীর আমলে তা ৭.৪ শতাংশ। আর যে বামেদের তারা বিকাশের অন্তরায় বলে উঠতে বসে শাপশাপান্ত করেন, সেই বাম-সমর্থিত ইউপিএ-১ সরকারের সময় এই জিডিপি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.৪ শতাংশ।

(বলা বাহুল্য, জিডিপি বৃদ্ধির হিসাব কখনওই উন্নয়নের প্রকৃত সূচক নয়। এই তথ্যের উল্লেখ মোদী সরকারের মিথ্যাভাষণকে উন্মোচিত করার জন্যই)

ছবি – ৫

এই জমানায় বেকারত্ব কী মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, ৫ নং ছবিটি তার স্পষ্ট নিদর্শন।

প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বছরে এক কোটি চাকরির সুযোগ তৈরি করবে তাঁর সরকার। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বেকারি গত ৪৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। তুলনায় বাম-সমর্থিত ইউপিএ-১ সরকারের আমলে বেকারত্ব ছিল গত ৫০ বছরে সবচেয়ে কম, ২ শতাংশ। আর অচ্ছে দিনের ধ্বজাবাহী সরকারের আমলে তা সবচেয়ে বেশি, ৬.১ শতাংশ।

ছবি – ৬

৬ নং ছবিটি দেশজুড়ে কাজ-হারানো পুরুষের তথ্য তুলে ধরছে।

এই সরকারের আমলে নোট-বাতিলের হঠকারী সিদ্ধান্তে একধাক্কায় কাজ হারিয়েছিলেন লক্ষ-লক্ষ মানুষ। সেই ভয়াবহতার পাশাপাশি, গোটা মোদী-জমানা জুড়েই মানুষ জীবিকা হারিয়েছেন। শহরে ও গ্রামে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। ইউপিএ জমানার শেষদিকে যেখানে দেশে ৩০ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ কর্মরত ছিলেন, সেখানে মোদী-জমানায় তা নেমে এসেছে ২৮ কোটি ৬০ লক্ষে। প্রায় দু’কোটি পুরুষ কাজ হারিয়েছেন এই জমানায়।

ছবি – ৭

৭ নং ছবিটি দেখিয়ে দিচ্ছে গোটা দেশে গত পাঁচ বছরে মহিলারা কীভাবে কাজের জগৎ থেকে, বিশেষত গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র থেকে আস্তে-আস্তে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

ইউপিএ আমলে গ্রামীণ মহিলাদের মধ্যে যেখানে ৩০.৪১ শতাংশ কর্মরতা ছিলেন, তা কমে এসে এই জমানায় দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪.৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৬ শতাংশ গ্রামীণ মহিলা এই সময়ে কাজ হারিয়েছেন।

বন্টন কতটা সুষম হচ্ছে তার হিসাব নিকাশই এই মুহূর্তে জনগণের দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০১৭ সালে যতটা সম্পদ তৈরি হয়েছে ভারতে, তার ৭৩ শতাংশ দখল করেছেন দেশের মাত্র ১ শতাংশ মানুষ। চলছে ‘সুপার রিচ’দের জন্য এক সরকার, যার স্লোগান – ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’। কংগ্রেস আমলেই নিও-লিবারাল জমানার শুরু এবং ভয়ানক অসাম্যের বিকাশ। কিন্তু মোদী সরকারের আমলে অসাম্যের বৃদ্ধি ও ক্রোনি ক্যাপিটালিজ্‌মের চরিত্র আগের সব আমলকে ছাপিয়ে গিয়েছে।

ধনীদের অতি ধনী করে তোলার লক্ষ্যে সরকারি যে প্রকল্প চলেছে, তাতে দেশের মানুষ কতটা সায় দেন, এবারের ভোটে তারই পরীক্ষা হতে চলেছে। তথাকথিত বিগ কর্পোরেটদের হাতে কল্কে খাওয়া জারি থাকবে, নাকি লড়াই তীব্রতর হবে  বিকল্প অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে? বিকল্প অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অন্যতম রাস্তা অসংগঠিত শ্রমিক ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি। ভারতের কর্মজীবী মানুষের অর্ধেকই এখনও কৃষিনির্ভর। মোদি কৃষকদের আশ্বাস দিয়েছিলেন, তাঁরা চাষের খরচের ওপর ৫০ শতাংশ লাভ পাবেন, এবং ২০২২ সালের মধ্যে কৃষির আয় দ্বিগুণ হবে। সেসবের চিহ্নমাত্রও নেই, উল্টে ভারতীয় কৃষি ব্যাপক সঙ্কটে। ২০১৪ থেকে ২০১৭-র মধ্যে কৃষি আয়ের বৃদ্ধি-হারের বার্ষিক গড় ২.৫১ শতাংশ। আগের দশকে (২০০৪-১৪) এই হার ছিল ৩.৭ শতাংশ, তার আগের দশকে (১৯৯৪-২০০৪) ২.৮৮ শতাংশ। আট বছরে কৃষির আয় দ্বিগুণ করতে গেলে আয়বৃদ্ধির বার্ষিক হার অন্তত ৯ শতাংশ হওয়া দরকার। সে তো অলীক স্বপ্নমাত্র।

বাস্তব হল, আগের দুই দশকের চেয়েও মোদি-যুগে কৃষির বৃদ্ধি-হার কমে যাওয়া। এই নির্বাচনে তাই আরও বেশি করে সামনে আসা দরকার ছিল কৃষকের স্বার্থরক্ষার কথা। ফসলের ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি (মাসে অন্তত ১৮ হাজার টাকা), বেকারদের জন্য সম্মানজনক কাজ ও পারিশ্রমিকের দাবিগুলিকে জনপ্রিয় করার মতো ইস্যুকে কেন্দ্র করে যত বেশি সম্ভব মানুষের সমর্থনভিত্তি গড়ে তোলা। মুম্বাই ও দিল্লিতে কৃষকদের লং মার্চ সেই কাজটা শুরু অরেছে। বাকি ইতিহাস মানুষকেই লিখতে হবে।

তথ্যসূত্র

কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া
এনএসএসও

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*