এনআরসি ও বন্যা: জোড়া সঙ্কটে অসম

তানিয়া লস্কর

 

বিলাসিপাড়ার আই এন একাডেমির একটি বন্যাত্রাণ শিবির। দিনের ব্যস্ততম সময়। ত্রাণ-কর্মীরা তখন খাবার, ঔষধ, জামা-কাপড় বণ্টনে ব্যস্ত। কিন্তু হঠাৎ উঠোনে এক বৃদ্ধকে দেখা গেল সব ছেড়েছুড়ে কিছু কাগজপত্র নিয়ে পড়েছেন। বৃষ্টিতে অল্প ভিজে যাওয়া কাগজগুলো যেন প্রাণের চেয়েও দামি। সেগুলো রৌদ্রে শুকোতে দিয়েছেন। মাথায় হাত দিয়ে পাশে বসে এমনভাবে চেয়ে আছেন যেমন করে মায়েরা অসুস্থ সন্তানের দিকে চেয়ে থাকে। কারণ বর্তমান সময়ে অসমে এই কাগজগুলো পূর্বপুরুষের চেয়েও বেশি সত্য। বন্যাত্রাণের কাজের সাথে যুক্ত সামাজিক সংগঠন নেরসন-এর কর্ণধার রাজু নার্জারি সেই বৃদ্ধের ছবিটি ফেসবুকে আপলোড করে লিখেছেন – হৃদয়বিদারক। জলবন্দি, ক্ষুধার্ত, জীবন-জীবিকা ছিন্নভিন্ন। অথচ আপনি করছেন কী – কাগজপত্র সামলাচ্ছেন। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে তো আপনি ভারতীয়। বরপেটার হেল্পলাইন ফাউন্ডেশনের প্রেসিডেন্ট সমাজকর্মী সফিউল হাসান-এর মতে ক্রমাগত জল বাড়তে থাকলেও লোকেরা বাড়ী ছেড়ে ত্রাণ শিবিরে যেতে চাইছে না। হঠাৎ করে যদি এনআরসির নোটিশ আসে। বাড়িতে কাওকে থাকতে হবে তো। সুপ্রিম কোর্ট বা প্রতীক হাজেলা কেউই তো বলছেন না যে বন্যার সময় এনআরসির কাজ বন্ধ থাকবে কি না? শেষমেশ গাঁওবুড়ার সাথে কথা বলে তাদেরকে নিশ্চিত করা হয় যে নোটিশ এলে শিবিরে পৌঁছে দেওয়া হবে। তখন তারা শিবিরে যেতে রাজি হন।  এ যেন এক বন্ধকী জীবন। বন্যা তো অসমে প্রতিবছরই হয়। প্রতি বছর প্রায় ৪০০০ বর্গ কিলোমিটার ভূমি ব্রহ্মপুত্রের বুকে তলিয়ে যায়। কিন্তু এবছরের বন্যা অসমের ভাষিক তথা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের লোকদের অস্তিত্বের সঙ্কটকে আরও তীব্রতর করতে এসেছে । সুতরাং এই বন্যাকে শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে উড়িয়ে দিলে হবে না। এর সমাজতাত্ত্বিক এবং মনস্তাত্ত্বিক দিকগুলোও বিচার করে দেখতে হবে।

হ্যাঁ, বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কুফলের প্রভাবে অসমেও প্রতিবছর কিছু অঞ্চল নূতন করে বন্যার কবলে পড়ছে বটে কিন্তু চর-চাপরিবাসিদের ক্ষেত্রে এ মোটেই নূতন কিছু নয়। সেই ১৯২০ সনে যখন থেকে লাইন প্রথা চালু হয় এবং এর মাধ্যমে এই নিয়ম চালু হয় যে ‘গ্রো মোর ফুড’ পলিসির মাধ্যমে তদানীন্তন ভারত এবং অধুনা বাংলাদেশের রংপুর, মৈমনসিংহ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে যেসব লোক ভারতবর্ষে এসেছেন তারা নদীর কাছাকাছি একটি নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া সমতলীয় উর্বর জায়গায় প্রব্রজন করতে পারবেন না, তখন থেকেই এদের কপালে এ দুঃখ লেখা হয়ে গেছিল। কাছাড়-করিমগঞ্জ সহ এই চর-অঞ্চলগুলোতে সময়ের হিসেবটাও বন্যা এবং ভূমিকম্পের সাথে সম্বন্ধ করে বলার একটি চল আছে। এই যেমন ৩৬-এর বাংলার বন্যার আগে কিংবা পরে, পঞ্চাশের ভূমিকম্পের আগে কিংবা পরে। তাই বন্যার সাথে লড়াই করাটা এদের মজ্জাগত। এবং বর্তমানে চর-চাপরিবাসীদের মধ্যে পড়াশুনা করা মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাবের ফলে গত কয়েকবছর ধরে বন্যা নিয়ে নানা ধরনের গবেষণাও হচ্ছিল। বরপেটার চর-অঞ্চলে যাই ফাউন্ডেশন অনেক আঁটগাঁট বেঁধে এরকম কাজ করতে এগিয়ে আসতে শুরু করেছিল। মজিদভিটা চরে প্রায় শ’খানেক ঘরকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে প্লেন্থ লেভেল উঁচু করার কাজ করা হয়েছে। এর ফলে সেখানে এই ক’বছরে  ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমেছে। কিন্তু ২০১৫ থেকে এনআরসির ধোঁয়া উঠার ফলে লোকদের মধ্যে এসব নিয়ে কাজ করার সময় এবং সুযোগ হারিয়ে যেতে  শুরু করে। বর্তমানে যখন এনআরসি বিষয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ষাটের ঘর ছুঁয়েছে। ষাটোর্ধ বৃদ্ধ থেকে শুরু করে সতেরোর কিশোরী পর্যন্ত এই ট্রমা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। যাই ফাউন্ডেশনের কর্ণধার আব্দুল কালাম আজাদ, আশরাফুলরা বন্যা, ভাঙন ইত্যাদি ছেড়ে এখন এনআরসি, ফরেনার্স ট্রাইবুনাল ইত্যাদিতে দিশেহারা লোকদের সাহায্য করতে বেশি ব্যস্ত। বর্তমানে মিয়াঁ কবিতা লেখা এবং পড়ার জন্য কালামদার উপর এজাহার দায়ের হওয়ায় তাঁকেই আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য দৌড়োতে হচ্ছে। সে এক অন্য আখ্যান। কিন্তু আমরা যতটুকু কালামদাকে চিনি তিনি কাছে না থাকলেও কোথাও না কোথাও থেকে নিজের মানুষদের পাশে আছেন। সুতরাং অসমের বন্যার সাথে বঞ্চনার ইতিহাসও জড়িত হয়ে আছে। এক বৃহৎ সংখ্যক লোককে কীভাবে যুগ যুগ ধরে অন্ধকারের নিমজ্জিত করে রাখা হয় সেটা জানতে হলে আপনাকে অসমের সমাজব্যবস্থার অধ্যয়ন করতে হবে।

এছাড়াও এসব অঞ্চলে মৌখিক সাক্ষ্যপ্রমাণকে গুরুত্ব না দিয়ে নথিপত্রের উপর অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে নাগরিকত্ব সাব্যস্ত করা যে কত বড় ভুল সেটা বন্যা আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেল। নথিপত্রগুলো তো বিনাশশীল। বন্যাসহ আরও নানা কারণে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে কারওর কাছে এনআরসির তালিকায় উল্লেখিত ১৪টি নথির মধ্যে একটি নথিও না থাকতে পারে। সে ভিত্তিতে তার নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ করা কিংবা নাগরিকত্ব বাতিল করা হলে তার প্রতি অন্যায় করা হবে। অথচ আসামে আজ সেটাকেই ন্যায়ের নাম দিয়ে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে বঞ্চিত হচ্ছেন আবার সেই একই শ্রেণির লোক। যারা এসব চর-চাপরি অঞ্চলে বসবাস করেছেন, এবং বন্যা কিংবা ভাঙনের ফলে বারবার গৃহহারা হয়েছেন। যদিও রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ কাঠামো এদেরই শ্রমের উপর টিকে আছে কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র কখনও এদেরকে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুবিধাগুলো দেয়নি। আরও বিস্ময়ের কথা হল যে একটু-আধটু সুবিধা এরা আদায় করে নিয়েছিলেন সেগুলোও এবার ছিনিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ছাড়াও কাছাড়-করিমগঞ্জসহ বরাকের চরগুলিতেও একই অবস্থা। এমনিতেই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়, এর উপর এনআরসি আর বন্যার দু-তরফা মারে তারা জেরবার। বন্যার মাঝখানেই চলছে খসড়া-তালিকা ছুটদের বায়োমেট্রিক্স পরিচয় সংগ্রহ। কিন্তু বন্যায় গৃহহারা কালীবাড়ি চরবাসী কিংবা অন্নপূর্ণাঘাটের বাসিন্দারা কীকরে নোটিশ পাবেন, কী করেই বা বায়োমেট্রিক্স দিতে যাবেন? তবুও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের সময় বাড়ানো যাবে না। তবুও উইপোকা বাছাইপর্ব চলতে থাকবে। আর নির্বাসিত, বঞ্চিত লোকেরা এভাবেই  মার খেতে খেতে জীবিত থাকবে। অসম চুক্তির ৬ নং ধারার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আসু এবং গৃহমন্ত্রকের যুগ্ম সচিবকে নিয়ে আরেকটি নূতন কমিটি গঠন করা হচ্ছে। ২০ শতাংশ লোকের রিভেরিফিকেশনের দাবি উঠছে। প্রশাসনের সাথে গোপন বৈঠকে বসা হচ্ছে। এসবের শেষ কোথায়? না কি অসমের ভাষিক এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের এই অগ্নিপরীক্ষার কোনও শেষ নেই? এসব প্রশ্নের উত্তর অজানা থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট যে অসমের লোকদের ‘বেঁচে থাকা শেষ, কোনও রকম টিকে থাকা’-র লড়াই চলছে। আর এই বন্যা সেই লড়াইকে আরেকটু কঠিন করে দিচ্ছে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1912 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...