সহজ পথে পরিবেশ পাঠ ‘সহজ পাঠে’

সোহম দাস

 

রবিবারের সকাল গড়িয়ে বেলা হতে চলেছে তখন। আড় ভেঙে আস্তে আস্তে স্বমহিমায় ফিরছে কয়লাখনি অঞ্চলটির দৈনন্দিন জীবন। জায়গাটা উখরা, জেলা পশ্চিম বর্ধমান। এই উখরারই সবচেয়ে পুরনো স্কুল কুঞ্জবিহারী ইন্সটিটিউশনে তখন সবেমাত্র শেষ হয়েছে ক্লাস। প্রার্থনার সময় সমস্বরে আবৃত্তি করছে ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকা সকলে। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য/উচ্চ যেথা শির’। প্রার্থনার পরেই সকলের হাতে বিস্কুটের প্যাকেট বিতরণ। সকালের খাবার। বিতরণের সময় সামান্যতম বিশৃঙ্খলা নেই। লাইন করে একে-একে সকলে নিচ্ছে বিস্কুটের প্যাকেট। পুরোটা একপাশে দাঁড়িয়ে তদারকি করছেন সৌম্যদীপ, ওদের স্যার। চলে যাওয়ার সময় সকলে তাঁকে বলে যাচ্ছে— ‘স্যার আসছি’। উত্তরে স্যার মনে করিয়ে দিচ্ছেন— ‘রাস্তায় কেউ প্যাকেট ফেলবি না।’ তাঁর উচ্চৈঃস্বর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে ছেলেমেয়ের দল। ওদের যাওয়া দেখতে দেখতে ওদের প্রিয় ‘স্যার’ সৌম্যদীপ বলেন— ‘কেউ রাস্তায় প্যাকেট ফেলবেই না। সঙ্গের বন্ধুকেও রাস্তায় প্লাস্টিক ফেলতে বারণ করবে।’ কথার মধ্যে পরিতৃপ্তির সঙ্গে লুকিয়ে থাকে আত্মবিশ্বাসও।

উখরারই ছেলে সৌম্যদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। পেশায় গবেষক। তাঁর এই স্বপ্নের স্কুলটির নাম ‘সহজ পাঠ’। নামে রবীন্দ্রনাথ। ভাবনাতেও সেই আঁকড়ে ধরা রবীন্দ্রনাথকেই। পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকা, নাচ, ফুটবল তো বটেই, সঙ্গে নীতিশিক্ষা ও পরিবেশ-শিক্ষাও প্রদান করা হয় অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে। এখানে যারা পড়াশোনা করতে আসে, বেশিরভাগেরই বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ বা চল কোনওটাই নেই। উপরন্তু, এই অঞ্চলের একটি প্রধান সমস্যা হল শিশু-শ্রম। দারিদ্র্যের কারণে অল্প বয়স থেকেই দুটো পয়সা রোজগারের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয় এই নিরুপায় শিশুদের। এই অভিশাপের করাল থাবা থেকে বাঁচাতেই ‘সহজ পাঠ’-এর ভাবনা মাথায় আসে সৌম্যদীপের।

ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে সৌম্যদীপও মেতেছেন গাছ লাগানোর আনন্দে

সকালের ক্লাসে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা বজার রাখা হয়। পাঁচ মিনিট দেরি হলেই তাকে দেরির কারণ জিজ্ঞাসা করেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষের দেওয়ালে বা অন্য কোথাও লিখে বা ছবি এঁকে নোংরা করে না কেউ। পেন্সিলের উচ্ছিষ্ট অংশ বা ছেঁড়া কাগজ মেঝেতে ফেলতে ভুলে গেছে এরা। অনেক সময় বিশেষ ক্ষেত্রে খোলা আকাশের নীচেও ক্লাস নেওয়া হয়। সেখানেও একই নিয়ম মেনে চলে ছাত্রছাত্রীরা। বিকালে হয় নাচের ক্লাস। ক্লাস শুরুর আগে ঘরটাকে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে ছাত্রীরাই। হাত লাগান শিক্ষিকাও। এখানে কেউ এসব কাজ করতে লজ্জাবোধ করেন না। সকলেই এটাকে কর্তব্য মনে করেন। আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এটা ভাবা বেশ কঠিনই। হাত লাগান সৌম্যদীপ নিজেও। তাঁর কথায়— ‘আমি নিজে না করলে ছাত্রছাত্রীরাই বা শিখবে কীভাবে?’

ক্লাস শুরুর আগে ছাত্রছাত্রীরা সবাই মিলে ক্লাস পরিষ্কার করে

স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কেও বাচ্চারা বেশ ওয়াকিবহাল। রাস্তায় থুতু ফেলা বা প্রস্রাব করার মতো সমাজের চোখে ‘স্বাভাবিক’ ব্যাপার বর্জন করতে পেরেছে এরা। প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়েও বাচ্চাদের ক্লাস নিয়েছে সহজ পাঠ। টিফিন দেওয়ার সময় সৌম্যদীপের আদেশেই তা তো অনেকটাই পরিষ্কার। এছাড়াও, আরও নানাভাবে তাদেরকে শেখানো হয়েছে, প্লাস্টিক কতটা ক্ষতিকর। বাজারে গেলে তারা নিয়ে যায় কাপড়ের থলি, বাড়িতে থাকা প্লাস্টিকের ব্যাগকে তারা বারবার ব্যবহার করে। অনেকসময় প্যাকেট ফেলার জন্য রাস্তায় ডাস্টবিন না খুঁজে পেলে সেটা ব্যাগে রেখে দেয়, পরে ডাস্টবিন পাওয়া গেলে ফেলে দেয়।

বৃক্ষরোপণে ব্যস্ত ছাত্রছাত্রীরা

সহজ পাঠে এসে পরিচ্ছন্নতা-শিক্ষার পাশাপাশি পরিবেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও বদলেছে ছাত্রছাত্রীদের। রাস্তায় যেতে যেতে কুকুর, বিড়ালকে ঢিল ছোঁড়া বা গরু-ছাগলকে বিরক্ত করতে আর মন চায় না তাদের। এমনকি খুদে খুদে পিঁপড়ে বা পোকামাকড়কেও যে কষ্ট দিতে নেই, সে শিক্ষাও তারা পেয়েছে সহজ পাঠে এসে। গাছপালার প্রতি তাদের অসম্ভব ভালবাসা। শুধু বৃক্ষরোপণ উৎসবেই নয়, সারাবছরই তারা বিভিন্ন সময়ে গাছ লাগায় ও গাছের যত্ন নেয়। প্রত্যেককে শেখানো হয়েছে, নিজেদের বাড়ির পাশের অন্তত দুটো গাছের যত্ন নিতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কথায় গাছের ফুল পাতা ছেঁড়া বন্ধ করে দিয়েছে এইসব ফুলের মতো শিশুরা। গাছের গুঁড়িতে ক্ষতসৃষ্টি করাও এখন নিষিদ্ধ তাদের কাছে। কারণ ওদের যে শেখানো হয়েছে— ‘গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, তাই গাছের ক্ষতি করতে নেই।’

একটি গাছ একটি প্রাণ

রোপণের অপেক্ষায় চারাগুলি

এমন ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমেই তাদের পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করছেন সৌম্যদীপ। তার ফলও পাচ্ছেন খুব ভাল। অত্যন্ত সহজ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করলেই যে অনেকটা সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলা যায়, তা হাতে-কলমে করে দেখাচ্ছেন তিনি। আজকে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের যুগে এমন শিক্ষার যে প্রয়োজনীয়তা যথেষ্ট, তা বারবারই বলছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু বাস্তবে তা কতটা মানা হচ্ছে, তা সত্যিই অস্পষ্ট। প্রতিনিয়তই একটু একটু করে সবুজ নষ্ট হয়ে চলেছে, বিলুপ্ত হয়ে চলেছে শত শত প্রজাতি, আর তার পেছনে অন্তত পক্ষে আশি শতাংশ দায়ী আমাদের উন্নয়নী আগ্রাসন। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে সহজ পাঠের এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রকৃত অর্থেই দৃষ্টান্তস্বরূপ। পথচলার সবেমাত্র শুরু, এখনও অনেক পথ হাঁটতে হবে তাদের। তবু সৌম্যদীপ স্বপ্ন দেখেন। সহজ পাঠের আশা, পরিবেশ-রক্ষার বিপুল কর্মকাণ্ডে এইসব ছাত্রছাত্রীরাও নিজেরাই হয়ে উঠুক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সচেতনতা-শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিক সমাজের আর পাঁচজন মানুষের মধ্যে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...