অন্য অবস্থান: স্কটিশ হাইল্যান্ডস, হার্মিটেজ ওয়াক

শ্রীজাতা গুপ্ত

 

বারুদের পরিবর্তে কামানে আরও যুগান্তকারী সামরিক সম্ভার এখন প্রয়োজন। কামানে ঠেসেঠুসে ভরে ফেলাই যায় অগণিত বৃক্ষের বীজ। সুসম্ভাবনা। এরপর কোনও এক সুডৌল পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে শেষবারের মত দেখে নিতে হয় অনুর্বর চরাচর। শেষবারের মতই। যতদূর স্পর্শ করেছে দিনের আলো, ততখানি রক্ষা করার দায়িত্ব সম্রাটের। রাজাধিরাজ সেই অনির্দেশের দিকে নিশানা টানবেন কামানের। দূর থেকে দূর অবধি ছুটে যাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী গাছেদের ভ্রূণ। আগামীর সন্ধানে আলো জল বাতাসে বেড়ে উঠবে অননুকরণীয় অরণ্য। পৃথিবীর এটুকুই প্রাপ্য।

এমনটাই করেছিলেন স্কটল্যান্ডের থার্ড ডিউক অফ অ্যাটহল, জন মারি। দেশের সবচেয়ে লম্বা নদী, টে। তার দু’ধারে ছবির মত দুই গ্রাম, ডানকেল্ড আর বার্নাম। সেখানেই জন-এর প্রাসাদ। ছোট্ট উপত্যকাটিকে দেশজ গাছপালায় ভরিয়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে জন এমন রাজকীয় বৃক্ষরোপন করেছিলেন ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে। রূপকথার মত শুনতে লাগলেও, পরিপূর্ণ বনাঞ্চলে পরিণত হয়েছিল তাঁর স্বপ্ন, আজ যার একমাত্র সাক্ষী এই সুজলা সুফলা উপত্যকা। বর্তমানে স্কটিশ ন্যাশনাল ট্রাস্ট-এর অধীন, স্কটল্যান্ডের হাইল্যান্ডস এলাকার পার্থশ্যাইর অঞ্চলে হার্মিটেজ ওয়াকস নামে পরিচিত এই বনভূমি। দেখলে মনেই হবে না, মানুষের হাতে তৈরি জঙ্গল। অগোছালো, এলোমেলো স্বভাবেও যে ছড়িয়ে থাকে প্রাকৃতিক শ্রী, সুশৃঙ্ক্ষল স্নিগ্ধতা, এই পথে দু’ কদম না হাঁটলে তা’ অধরাই থেকে যায়। পথে পড়বে মিলেমিশে কিছু পর্ণমোচী এবং কিছু কনিফেরাস। ‘সমস্ত গাছের মধ্যে অরণ্যের কিছু ধর্ম থাকে’, সেই আপ্তবাক্যের মুখোমুখি হই হঠাৎ। প্রতিটি বাকলের গঠনে, ডালপালার বিন্যাসে বেঁচে আছে প্রাচীনের স্বাদ। আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে নানা রঙের মস্। লিকলিকে ফার্ণ। পায়ে পায়ে হেঁটে চলি আরও।

কথামতো, আমার বাঁদিকে থাকবে ব্র্যান নদী, ডানদিকে ক্রমশ ঘন হতে থাকবে জঙ্গল। একটু এগিয়ে দেখব, একফালি জায়গা হঠাৎ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। চেনা উঠোনের মত তার উপর এসে পড়েছে প্রতিবেশী রোদ। জাপানি ভাষায় এই আলোর নাম কোমোরেবি— গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে চুঁইয়ে পড়া আলো, যা অবশেষে এসে পৌঁছোয় বনপথে। একটাই বড়সর ওক্ গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে মধ্যমণি হয়ে। এই গাছের ছায়ায় বসে নীল গো সুর তুলতেন ভায়োলিনে। আশেপাশের গ্রামেই ছিল তাঁর ঘর, তবু সুরের খোঁজে তিনি আশ্রয় নিতেন সমাহিত ওকের দরবারে। এখন লোকে গাছটিকে নীল-এর নামেই ডাকে। নীল গো’স ওক-ট্রি তার নাম। নীল তাঁর প্রিয় গাছকে সুরের বদলে দিয়ে গেছেন। ইজের নামখানি। আর, গেইলিক লোকগীতি পেয়েছে সর্বকালীন শ্রেষ্ঠ কিছু নীল-গো-কম্পোজিশান। যাঁর নামে এ তল্লাটে এখনও চলে বার্ষিক সঙ্গীত উৎসব। নীল-এর প্রিয় গাছের কাছে এসে কেবল কান পেতে বাজনা শুনলে হবে না। মৃত ডাগ্লাস ফার-এর গুঁড়ি কেটে বানানো নৌকোয় শুয়ে পড়তে হবে। পায়ের তলায় জল না থাকলে বুঝি নৌকো অসম্ভব? ভেসে যাওয়ার ইচ্ছায় সৃষ্টি হয় নৌকোর খোল। ছই নেই, মাথার উপরে শুধু ডালপালা, কাটাকুটি। মাঝেমধ্যে উঁকি দেওয়া আকাশ আর মেঘ। করতলে পুষে রাখা রেখার মত জীবনের কথা বলে মেঘ। আয়ুরেখা আগলে রাখে সুগঠিত ক্যানোপি।

সেখান থেকে একটু দূরে ব্র্যান নদীর উপরে ছোট্ট কাঠের ব্রিজ। তার এক প্রান্তে ব্রিটেনের সব থেকে উঁচু গাছটি, ১৫০ বছরের ডাগ্লাস ফার। শোনা যায়, ৬৫ মিটার লম্বা গাছটি এখনও বাড়ছে অগোচরে। যত দেখছে যত শুনছে, চুপচাপ শুষে নিয়ে বেড়ে চলেছে মহীরুহ। আমার আর তার কাছে যাওয়া হয়নি কোনওবার। প্রথমবার হেমন্তে, দ্বিতীয় দফায় গ্রীষ্ম। পথে পড়েছে বাধা। জ্ঞানী মানুষের মতই, প্রজ্ঞাপ্রাপ্ত গাছের কাছে সবসময়ে পৌঁছোনো সহজ হয় না। সে ভারি সাধনার ফল। আমি ব্রিজের উপর থেকে দেখি ব্ল্যাক লিন জলপ্রপাতের হুড়মুড় অবতরণ। হেমন্তে এই জলে খেলে বেড়ায় স্কটিশ স্যামন মাছ। অকস্মাৎ রূপোলি ঝিলিক দিয়ে তারা লাফিয়ে আসে আমাদের জগতে। তারপরেই ডুব দিয়ে ফের ফিরে যায় অতলের সন্ধানে।

একটি পৃথিবীর মধ্যে বসে থাকে আরও অনেকগুলো পৃথিবী। একটি জগতের বাইরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে আরও অনেক জগত। প্রতি মুহূর্তেই আমরা তল্লাশি চালাচ্ছি কোনও না কোনও অন্য অবস্থানের। সেখানে যত অনায়াসে দেখা পাওয়া যেতে পারে বিলুপ্তপ্রায় লাল-কাঠবেড়ালি অথবা শিকারপ্রিয় অসপ্রে, কিংবা লাজুক পাইন মার্টেনের, ততখানি নিশ্চয়তার সঙ্গেই হঠাৎ সামনাসামনি হতে পারে জল থেকে উঠে আসা কেলপি। গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা উড়ন্ত ফেয়ারি। এইসব বনজঙ্গলে দেখা হয় এক পৃথিবীর সঙ্গে নতুন আরেক পৃথিবীর। সখ্যতা গড়ে ওঠে তাদের বাসিন্দাদের মধ্যে। আমরা কেবল পথচলতি মানুষ, মাঝে মাঝে এক ঝলক দেখে ফেলি সেই বন্ধুতাপূর্ণ সহাবস্থান। এই আমাদের রূপকথা।

জঙ্গল ভেঙে, জল পেরিয়ে, হঠাৎ ঘন কুয়াশা নেমে আসে। এরপর ধু-ধু প্রান্তর, নাকি পাহাড়, মালভূমি, বা শুরু হয়েছে লখ-টে-এর টলটলে জল, তা ঠাহর করা মুশকিল। ফিনফিনে দৃষ্টিতে ধরা পড়বে, মাঝেমাঝে অবয়ব বদলে ফেলছে কুয়াশার স্তর। রুপোলি কেশর ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ধবধবে সাদা অশ্ববাহিনী। তাদের অর্ধেক শরীরে ঘোড়ার তেজ, অর্ধেক জল। এদের নাম কেলপি। জল ছুঁয়ে জেগে ওঠে, জলেই ঘুমিয়ে পড়ে ফের। আরেকটু কাছে গেলে দেখা যাবে এক একটি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়েছে দেবশিশুর মত ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। বাবা মা তাদের কেলপি-র ভয় দেখিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বলেছিল ঠিকই, তবু কেলপি-র পিঠে চেপে রয়েছে জলে-ভ্রমণের আমোঘ হাতছানি। অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে সবাই একে একে জড়ো হয়েছে হ্রদের কিনারে। এইসব শিশুদের দল, যারা কোনও এক সময়ে চলে গিয়েছিল কেলপিদের সঙ্গে, তারা আজ ঘুরে ফিরে বেড়ায় বনেবাদারে। ফিরতি পথে স্বাভাবিকভাবেই কানে আসে জলীয় ফিসফাস। মুহুর্মুহু ছায়া সরে যায় গাছেদের আনাচেকানাচে। লুকোচুরি খেলছে কি ওরা? নাকি ধরা দিতে চায়? ব্র্যান নদীর উপরের ব্রিজটা এই প্রথমবার খেয়াল করে দেখি, হাতে হাত ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ধ্যানমগ্ন শিশুদের সেতু। সময়ের শুরু থেকে তারা এপার থেকে ওপার জুড়ে রেখেছে। তাদের শরীরে এখন কাঠ-পরিচয়। পাঁজরে পাঁজরে পা ফেলে পেড়িয়ে আসি ব্র্যান নদী। গেইলিক ভাষায় ‘ব্র্যান’ শব্দের অর্থ ‘শিশু’।

এইবার ফেরার সময়। অন্ধকার ঘনিয়ে এল, নাকি এসব অঞ্চলের এরকমই রীতি? পথের পাশেই, আচমকা কোনও টোটেম স্তম্ভের গায়ে ফুটে ওঠে ঈগলের চোখ, স্যালমনের ঝাঁপ। তাকে ঘিরে শুরু হয় জোনাকির নাচ। জোনাকি? না ছোটখাটো মানব শরীর? ডানা পেয়ে উড়ে গিয়েছিল যারা? এখানেই তো সেইসব কিংবদন্তী ফেয়ারির বাস। “Do not think the fairies are always little. Everything is capricious about them, even their size… Their chief occupations are feasting, fighting, and making love, and playing the most beautiful music.” এদের পছন্দ যা কিছু চকচকে, ঝিকিমিকি আলো ঠিকরে বেরোবে যার থেকে। পথচলতি মানুষ তাই এখানে গাছের মরা গুঁড়িতে চকচকে পয়সা পুঁতে রেখে যায়। সেইসব পেয়ে খুশি থাকবে ফেয়ারির দল। তাহলে আর মানুষের নিস্তরঙ্গ পৃথিবীতে এসে তোলপাড় করবে না তারা। ছিনিয়ে নিয়ে যাবে না লোভনীয় স্বপ্নের ঝিলিমিলি। আমি অনেক চেষ্টাতেও একটা পয়সা পুঁতে আসতে পারি না গাছের গায়ে। চেষ্টাও যে খুব বেশি করেছি, তেমন নয়। ওদের ওই ধিকিধিকি জ্বলা-নেভা দেহ আমাকে টানছে। শৌখিন ফুরফুরে ডানা পেতে চাই। রোদ্দুর ঠিকরে পড়ে উড়ানে, আমরা হঠাৎ ভাবি, এই বুঝি আলো পড়ল আয়নার জলে। এইসব ফিরে পেতে চাই। স্কটিশ হাইল্যান্ডস-এর জলে-জঙ্গলে আরও একবার হেঁটে আসাই যায়….

 

(উদ্ধৃতি ঋণ : শ্রীজাত, W. B. Yeats)

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1688 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...