নির্বাচন ২০১৯: সাংবাদিকের পরীক্ষা

স্বাতী ভট্টাচার্য

 

সপ্তদশ সাধারণ নির্বাচন হয়ে গেছে কয়েক মাস আগেই। যা জানা গেছে, কেবল পশ্চিমবঙ্গেই মার খেয়েছেন সাংবাদিকরা। সে আর আশ্চর্য কী, ভোট নিয়ে খুনোখুনি হয়েছে কেবল পশ্চিমবঙ্গে। না, বিহারেও হয়নি, উত্তরপ্রদেশেও নয়। গত বছর দশেক বোধহয় পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনও নির্বাচন হয়নি, যাতে কোনও সাংবাদিক মার খায়নি, ক্যামেরা ভাঙেনি। এ বারও ভোটের দফায় দফায় আক্রান্ত হয়েছেন সাংবাদিকরা, সবক’টি ঘটনাতেই অভিযুক্ত শাসক দল। সে-ও নতুন কথা নয়। অবাক করল তার পরের ঘটনা।

দ্বিতীয় দফার ভোটে (১৮ এপ্রিল) গোয়ালপোখরের কাটা ফুলবাড়িতে ভোটারদের ভোটদানে বাধা দেওয়ার হচ্ছে শুনে ঘটনাস্থলে খবর গিয়ে আক্রান্ত এবিপি আনন্দর সাংবাদিক পার্থপ্রতিম ঘোষ ও চিত্র সাংবাদিক স্বপন মজুমদার।

সে খবর করে এবিপি আনন্দ, আনন্দবাজার পত্রিকা। সামান্য উল্লেখ ছিল গণশক্তিতে।

পঞ্চম দফায় (৬ মে) তিন জায়গায় তিনটি আলাদা ঘটনায় আক্রান্ত হন সাংবাদিকরা। উত্তর চব্বিশ পরগনার তেঁতুলিয়াতে জ়ি ২৪ ঘণ্টা চ্যানেলের রিপোর্টার কমলিকা সেনগুপ্তের গাড়ি ভাঙচুর হয়, তাঁর হাত কেটে রক্ত পড়ে, একটি আঙুল ভেঙে যায়।

সেই খবর করে জ়ি ২৪ ঘণ্টা।

উত্তর ২৪ পরগনারই আমডাঙাতে নিউজ় এক্স চ্যানেলের রিপোর্টার তাপস সেন, তাঁর ক্যামেরাম্যান রনি সাঁতরা এবং তাঁদের গাড়ির চালক আক্রান্ত হন। তৃণমূল কর্মীদের মারধরে তাপস সেনের মাথায় আঘাত লাগে।

সেই খবর করে নিউজ় এক্স।

হুগলিতে বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ধনেখালির একটি স্কুলে যান সংবাদ প্রতিদিনের সাংবাদিক নব্যেন্দু হাজরা এবং চিত্র সাংবাদিক রাজীব দে। বিজেপি প্রার্থী হামলা এড়াতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলে তৃণমূলের কর্মীদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ে সাংবাদিকদের উপর। তাঁদের বেধড়ক মারা হয়, মাটিতে ফেলে মারধর করার ফলে চশমা ভেঙে যায় রাজীবের।

সেই খবর করে সংবাদ প্রতিদিন।

কিন্তু কোনও কাগজ বা চ্যানেলই, অপর কোনও পত্রিকা বা চ্যানেলের সাংবাদিক প্রহৃত হওয়ার খবর করেনি।

এই ‘ট্রেন্ড’ অব্যহত থাকে ষষ্ঠ দফায়। কেশপুরে বিজেপি প্রার্থী ভারতী ঘোষের উপর আক্রমণের পরেই আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় এবং চিত্র সাংবাদিক বিশ্বনাথ বণিকের উপর আক্রমণ হয়। এ দিনই মেদিনীপুরের মোহনপুরে আনন্দবাজারের সাংবাদিক শান্তনু ঘোষ আর সঙ্গী চিত্র সাংবাদিক সুমন বল্লভের উপর হামলা হয়।

সে খবর আনন্দবাজার পত্রিকায় বড় করে বেরোয়, আর প্রায় কোথাও সে ভাবে জায়গা পায়নি।

ভোটের শেষ দফায় ইসলামপুর উপনির্বাচনে খবর করতে গিয়ে জেলার প্রেস ক্লাবের সম্পাদক অমিত সরকার সহ বেশ কিছু সাংবাদিক আক্রান্ত হন। ‘এই সময়’ কাগজ আর কয়েকটি ওয়েবসাইট ছাড়া খবরটা বেরোয়নি।

ভারতে সংবাদমাধ্যমের ‘বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্কট’ নিয়ে গত কয়েক বছরে কথা কম হয়নি। কিন্তু তার বহর বুঝতে হলে এসে দাঁড়াতে হয় পশ্চিমবঙ্গে। কাগজ-চ্যানেলের খবরকে কতজন বিশ্বাস করল, সে তো পরের কথা। সাংবাদিকরা কি পরস্পরকে বিশ্বাস করতে পারছে? যে যার নিজের সাংবাদিকের মার খাওয়া নিয়ে লিখছে। অন্যেরটা সন্তর্পণে এড়িয়ে যাচ্ছে। ভাবটা যেন, ‘আমি তো ভাই সেখানে ছিলাম না, কী হয়েছে তা জানি না, আমি কী করে লিখি? তোমার মার খাওয়ার ভিডিও ক্লিপিং তোমারই তো তোলা, আমি কী করে দেখাই?’

আসল কথাটা অবশ্যই অন্য। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে চটাতে ‌এমনই ভয়, যে সাংবাদিকের উপর তাঁর দলের নৃশংস, নির্বিচার, ধারাবাহিক আক্রমণের প্রকৃত চেহারাটা তুলে ধরতেও ভয় পাচ্ছে কাগজ-চ্যানেল। এ বার তবু যে যার সাংবাদিকের মার খাওয়ার চেহারাটা ছেপেছে, এর পরের নির্বাচনে হয়তো তা-ও ছাপবে না। জ্ঞানের বাণী শোনাবেন কর্তৃপক্ষ, ও তো সাংবাদিকের অকুপেশনাল হ্যাজ়ার্ড — পেশাগত ঝুঁকি। সাংবাদিকতা করতে গেলে পুলিশের লাঠি আর রাজনৈতিক গুন্ডাদের লাথি তো খেতেই হবে। সম্প্রতি এক নিবন্ধ-লেখককে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে এক পেশাদার গুন্ডা, যিনি নির্বাচনে খেপ খাটেন, নির্বাচনী সন্ত্রাস সম্পর্কে বলেছেন, ‘ওটা সন্ত্রাস নয়, ওটা বাংলায় নির্বাচনের ঐতিহ্য।’ সাংবাদিকের পিঠে-মাথায় সেই ঐতিহ্য রচনা হতে থাকবে, এটা রাজনৈতিক দল থেকে কাগজ-চ্যানেল মালিক, সকলেই স্বাভাবিক মনে করছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীও সাংবাদিকদের সুরক্ষার যোগ্য বলে মনে করে না। একটি ক্ষেত্রেও সাংবাদিকদের মারধর খেতে দেখে এগিয়ে কোনও বন্দুকধারী এগিয়ে আসেনি। তাদের কাজ নাকি ইভিএম-এর সুরক্ষা দেওয়া, সাংবাদিক মার খেয়ে মরে গেলেও তাদের বাঁচাতে আঙুলটি নাড়ার নির্দেশ নেই। এইভাবেই গণতন্ত্রের উৎসব হয় ভারতে।

ঠিকই তো, সাংবাদিকের সঙ্গে গণতন্ত্রের আর সম্পর্ক কী। সাংবাদিক বাঁচলে গণতন্ত্র বাঁচবে, এ আবার আজকাল কেউ বিশ্বাস করে নাকি? আজ সাংবাদিকরাও সেই প্রত্যয় হারাচ্ছেন। গত বছরও ছবিটা অন্য ছিল। পঞ্চায়েত নির্বাচনে যে নির্লজ্জ, উন্মুক্ত সন্ত্রাস চালিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেসের গুন্ডারা, যার ফলে জেলায় জেলায় মার খেয়ে পিছু হঠেছেন বিরোধীরা, রক্তাক্ত হয়েছিলেন রিপোর্টাররা, কলকাতায় চার-পাঁচ ঘণ্টা ঘরে আটকে হেনস্থা করা হয়েছিল একটি চ্যানেলের মহিলা রিপোর্টারকে, তখনও সব সংবাদমাধ্যম প্রতিটা আক্রমণের খবর করেছিল। প্রতিবাদ মিছিল বেরিয়েছিল কলকাতায়, জেলায় জেলায়। এসপ্ল্যানেডের মোড়ে গোল করে ক্যামেরা রেখে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন সাংবাদিকরা। সেখানে কেবল নিজেরা মার খাওয়ার ক্ষোভ ছিল, এমন নয়। সাংবাদিক আক্রান্ত হওয়া মানে বাকস্বাধীনতা আক্রান্ত, আর তা হলে গণতন্ত্রও আক্রান্ত, সেই ন্যায্যতার বোধ থেকে প্রতিবাদ উৎসারিত হয়েছে। অনেক সাংবাদিক নাক-মুখ বেঁকিয়ে দূরে থেকেছেন ঠিকই, কিন্তু রাস্তায় নামার লোকেরও অভাব হয়নি। গৌরী লঙ্কেশ হত্যা, কাশ্মিরে সুজাত বুখারির হত্যা, পশ্চিমবঙ্গে একাধিক সাংবাদিক নিগ্রহ, প্রতিবারই গান্ধি মূর্তির সামনে জমায়েত ও শহরের প্রাণকেন্দ্র এসপ্ল্যানেড অবধি মিছিল ও প্রতিবাদ দেখেছে কলকাতা। কিন্তু আজ? আজ এই ২০১৯ সালের ভারতে এসে সাংবাদিকের মাথা ফাটা, হাত ভাঙা, ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া, মাটিতে ফেলে মারধর, কোনওটাই আর ‘প্রতিবাদযোগ্য’ বলে মনে হচ্ছে না। কেন? কেন সাংবাদিকরা প্রতিবাদের জোর খুঁজে পাচ্ছেন না?

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, তাঁদের মধ্যে একটা আত্মগ্লানি কাজ করছে, ভিতর ভিতর তাঁরা গুটিয়ে রয়েছেন। যাঁরা নিজের কাজ দাপটের সঙ্গে করেন, তাঁদের মধ্যে যে নৈতিক শক্তি দেখা যায়, তার বলে সে যে কোনও ভয়ের মোকাবিলা করতে পারে, এমনকী জেলেও যেতে পারে। গৌরকিশোর ঘোষ কিংবা বরুণ সেনগুপ্ত এই শহরেরই মানুষ ছিলেন, ইমার্জেন্সির সময়ে তাঁদের কারাবাস মানুষকে আরও সাহস জুগিয়েছিল। কারণ তা ছিল তাঁদের সাংবাদিকতারই ‘এক্সটেনশন।’ বরং জেলে যাব, তবু হক কথা বলব, এই অবস্থান নেওয়ার মানুষের তখন অভাব হয়নি। অত বড় দৃষ্টান্তই বা কেন, মূক-বধির ফেলানি বসাকের ধর্ষণকাণ্ডের প্রতিবাদে মমতার মহাকরণ যাত্রা, এবং তাঁকে জোর করে বার করে দেওয়ার পর্বটি খবরে প্রকাশিত হওয়ার পর প্রেস কর্নার ঘর ভেঙে দিয়েছিলেন তৎকালীন তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। সেটা ১৯৯২ সাল। প্রেস কর্নার ভাঙার প্রতিবাদ করতে বিধানসভা অধিবেশন বয়কট করার ডাক দিয়েছিল প্রেস ক্লাব। সরকার-ঘনিষ্ঠ কিছু কাগজ বাদ দিলে অধিকাংশ সংস্থার সাংবাদিক বয়কট করেছিলেন অধিবেশন। এরপর সংখ্যাগরিষ্ঠের মত নিয়ে মন্ত্রী ছায়া ঘোষের ঘরে নতুন প্রেস কর্নার তৈরি হয়। কিন্তু সে ঘরে কোনও দিন বসেননি অমিত সর্বাধিকারী, চন্দন নিয়োগী, শ্যাম মল্লিকের মতো রিপোর্টাররা, যাঁরা নতুন ঘর তৈরি করে পুরনো ক্ষত ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় সম্মত হননি। যত দিন কাজ করেছেন, রাইটার্সের বারান্দায় আর পাঁচজনের সঙ্গে বসেছেন, রোদ-বৃষ্টি সহ্য করে। আর আজ? সাংবাদিকের উপর দফায় দফায় নেমে এল আক্রমণ, কলকাতার প্রেস ক্লাব টুঁ শব্দটি করল না। এককভাবে কিংবা সমষ্টিগতভাবে সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করার শক্তি যেন হারিয়ে গিয়েছে।

হয়তো আজ সাংবাদিকের প্রতিবাদ-বিমুখতার উৎস তার নৈতিক শক্তিতে ঘাটতি। ‘‘যা দেখছি, তা লিখতে পারছি না,’’ এই তিক্ত আক্ষেপ। মহকুমা-ব্লক স্তরের রিপোর্টার থেকে নিয়মিত নবান্ন থেকে খবর-করা চিফ রিপোর্টার, সকলের মুখে এক কথা। এ কি কেবল অকারণ হা হুতাশ? ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গে যে প্রবল মমতা-বিরোধী হাওয়া ছিল, তা কোনও রিপোর্টার টের পায়নি, তা কি হতে পারে? তৃণমূল নেতাদের ঔদ্ধত্য-দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ, পঞ্চায়েত নির্বাচনে ভোট না দিতে পারার ক্ষোভ, স্কুল সার্ভিস কমিশনে নিয়োগ না হওয়ার ক্ষোভের আঁচ বুঝতে পারেনি, এমন কোনও রিপোর্টার আছে, তা বিশ্বাস করা অসম্ভব। অথচ কোনও বড় কাগজ, বড় চ্যানেল সে খবর করেনি। তাতে হয়তো কাগজের মালিকদের বিজ্ঞাপন বেঁচেছে, অন্যান্য ব্যবসায়িক স্বার্থ বেঁচেছে, সাংবাদিকের মাইনেও বেঁচেছে, নকুলদানার সাইজের ইনক্রিমেন্টও হয়ে থাকতে পারে কারও কারও। কিন্তু মাটিতে ফেলে বাঁশপেটার মতোই ধূলিসাৎ হয়েছে সাংবাদিকের পেশাদারিত্ব, তার আত্মমর্যাদা। কোন লজ্জায় আর সে মিছিল করবে? মানুষের ভোটে পরাজিত নেতা হয়তো শিক্ষা নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়, কিন্তু সাংবাদিকের মিথ্যা খবর তার সম্যক পরাজয়। তার খবরকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষ তাকেও প্রত্যাখ্যান করল, তা সাংবাদিক হাড়ে হাড়ে বোঝে। তারপরেও সে চাকরি করে যেতে পারে, কিন্তু জার্নালিজ়ম করছে কি না, সে প্রশ্ন তাকে কুরে কুরে খাবেই।

এই লজ্জিত, সঙ্কুচিত সাংবাদিকরাই আজকের রাজনীতি এবং মিডিয়া ব্যবসার মূলধন। পাঠকদের সঙ্গে যার সম্পর্ক চুকেবুকে গিয়েছে, সত্যের হদিশ আর যে পায় না, সে হল আজকের আদর্শ জার্নালিস্ট। এক সময়ে সংবাদের নোঙর ছিল সত্যে, সাংবাদিকেরও। আজ তারা হয়ে গিয়েছে বয়া, সীমা নির্দেশ করছে শুধু। না, সত্য আর মিথ্যার সীমা নয়। যা বলা যাবে, আর যা বলা চলবে না, তার সীমায় ভাসছে চ্যানেলের নিউজ অ্যাঙ্কর আর কাগজের সম্পাদকীয় লেখকরা। একই সঙ্গে, সাংবাদিকের স্বেচ্ছা-সেন্সরশিপ আর প্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে-দেওয়া সেন্সরশিপ, এই দুটিরও সীমায় ওঠা-নামা করে চলেছেন। পথেঘাটে কাজ-করা রিপোর্টার তো কাটা সেপাই, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা দিয়ে আর কী হবে।

পাঠক অবশ্য তা-ই করেন। কিছু সাংবাদিকের নেতাদের সঙ্গে দহরম-মহরম, ক্রমশ ‘প্রভাবশালী’ হয়ে ওঠা, সুবিধে ভোগ ও বিতরণ, এই সব দেখে তাঁরা বিলক্ষণ চটে থাকেন। ফলে সাংবাদিকদের মার খেতে দেখলে বলেন, ‘দালালি করলে এমনই হয়।’ কেউ বা বড় জোর গলা মোলায়েম করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনাদের আর দোষ কী, উপর থেকে যা বলবে তা-ই তো করতে হবে।’ কিন্তু সমস্যাটা হয়তো আর একটু তলিয়ে দেখা দাবি করে। ভুলে গেলে চলবে না, প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স, বা সংবাদের স্বাধীনতার যে সূচক একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে, সেই সূচকে গত পাঁচ বছরে ক্রমশ পতন হচ্ছে ভারতের। সাংবাদিকের স্বাধীন সত্তা, তার মুক্ত কণ্ঠ যে প্রতিহত হচ্ছে, তা কেবল কিছু মন্দ লোকের মাত্রাতিরিক্ত লোভের জন্য নয়, তা এই বৃহৎ ছবিটা দেখলেই মালুম হয়। কাছ থেকে দেখলে যাকে নেতা-সাংবাদিকের ক্ষুদ্রস্বার্থে দুর্নীতি বলে মনে হয়, একটু উপর থেকে সামগ্রিক চিত্রটা দেখলে তাকে এক বৃহৎ নকশার অংশ বলে ঠাহর করা যায়। পশ্চিমবঙ্গে যা কিছু ঘটছে, তা সেই বড় নকশার ব্যতিক্রম নয়। হতে পারত না, এমন নয়। কিন্তু ব্যতিক্রম হয়নি।

গত পাঁচ বছরে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর কর্পোরেট স্যাঙাতরা সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সেই যুদ্ধ কতটা কৌশলী, কত বিস্তৃত, এবং তার পিছনে কী বিপুল টাকার খেলা, আমাদের হাতে-থাকা তথ্য-পরিসংখ্যান তার ইঙ্গিতমাত্র।

একটি তথ্য অবশ্যই মালিকানার। কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রকের অধীনস্থ রেজিস্ট্রার অব কোম্পানিজ় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, পাঁচটি কোম্পানির মালিকানায় ভাগ রয়েছে মুকেশ অম্বানি বা তাঁর ঘনিষ্ঠদের। এগুলো হল এনডিটিভি, নিউজ় নেশন, ইন্ডিয়া টিভি, নিউজ় ২৪ এবং নেটওয়ার্ক ১৮। এ ছাড়া রিপাবলিক টিভি এবং জ়ি টিভি (যার বাংলা চ্যানেল জ়ি ২৪ ঘণ্টা)-র মালিকানা বিজেপি-ঘনিষ্ঠদের। কংগ্রেস, ডিএমকে, প্রভৃতি বিভিন্ন দলের ঘনিষ্ঠ চ্যানেল, কাগজও রয়েছে। কিন্তু মোদির মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে দুটি বিষয় লক্ষ করা যায়। এক, তিনি নিজে সাংবাদিকদের কখনওই কাছে ঘেঁষতে দেননি। তাঁর সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারে যে বিস্ফোরণ হয়েছে তাকে কাজে লাগিয়েছেন সরাসরি বার্তা পৌঁছতে, আর সেই সঙ্গে মিডিয়াতে তাঁর যে কোনও বিরুদ্ধতার মোকাবিলা করতে। সাংবাদিকদের ট্রোলিং, হুমকি, অশ্লীল বার্তা দিয়ে স্তব্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, রাষ্ট্রায়ত্ত রেডিওকে ব্যবহার করেছেন ‘মন কি বাত’ সম্প্রচারে, আর অনুগত টিভি চ্যানেলকে তাঁর জনসভা প্রচারে।

এর ফলে দুটো জিনিস হয়েছে। এক, তিনি জনমানসে সতত উপস্থিত থেকেছেন, ‘ছুটলে কথা থামায় কে’ হল তাঁর জনসংযোগ নীতি। বোর্ড পরীক্ষার উদ্বেগ থেকে পাকিস্তানের হামলা, সব বিষয়ে কথা বলেই চলেছেন। সে কথায় কোনও প্রশ্নের অবকাশ নেই, সবটাই একতরফা। তিনি পাঁচ বছর একটাও সাংবাদিক সম্মেলন করেননি, এবং সেই প্রশ্ন না করতে-দেওয়ার ঔচিত্য নিয়েও প্রশ্ন করতে দেননি। দুই, তিনি মিডিয়ার পরিসরকে এমনভাবে ভরিয়ে দিয়েছেন তাঁর কথায় এবং উপস্থিতিতে, যে মিডিয়া নিজে থেকে ‘বিষয়’ তৈরি করে উঠতে পারেনি, তাঁর কথা আর কাজের প্রতিক্রিয়া খাড়া করেছে। এই জিনিসটা গ্রামসভাতেও দেখা যায়। পঞ্চায়েতের প্রতিনিধি কোনও এক ব্যক্তি এক দীর্ঘ লিখিত হিসেব গড়গড় করে পড়েই চলেন, সমবেত লোকেরা নানা কথা বলবে ভেবে এসে বসে থেকে থেকে বিফল হয়ে চলে যায়। একটা লোকের কণ্ঠই থাকে, আর কারও কোনও কথা থাকার সুযোগই তৈরি হয় না। যদিও লোক অনেক ছিল, কথাও কম ছিল না। সেই সঙ্গে, বিরোধী মিডিয়ার অনেক সময় আর পরিশ্রম গিয়েছে ‘ফেক নিউজ়’ নস্যাৎ করতে। এক একটা গোটা মিডিয়া তৈরি হয়ে গিয়েছে ‘মর্ফ’ করা ছবি, কিংবা এক ছবির অন্য ক্যাপশান, আর তার ভিত্তিতে ভ্রান্ত, বিদ্বেষমূলক খবর খারিজ করে সত্যটা প্রকাশ করার কাজটা করতে। এ কাজটা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তার জন্য মৌলিক সাংবাদিকতার পরিসর সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে।

আর যেটা এ বার প্রথম দেখা গেল তা হল, মোদি-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকরা অন্য সাংবাদিকদের প্রতিও সমান নিষ্করুণ। অন্য সংবাদমাধ্যম, সাংবাদিকদের ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’ তকমা দিতেও তাঁরা পিছপা নন। এমনকী রিপাবলিক টিভির মালিক রাজীব চন্দ্রশেখর মানহানির মোকদ্দমা করেছিলেন ‘দ্য ওয়্যার’ নামে খবরের ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধে, আপাতদৃষ্টিতে তাঁর বিরুদ্ধে খবর করার জন্য, কিন্তু সম্ভবত তার প্রধান কারণ এই যে ‘দ্য ওয়্যার’ আগাগোড়া মোদির সমালোচনা করে চলেছে। ভাগ্যক্রমে মামলাটি খারিজ হয়েছে, কিন্তু এতটা পেশাগত অসৌজন্য আগে ভাবা যেত না।

অনেক বেড়ে গিয়েছে সঙ্ঘের কার্যক্রম, হিন্দুত্ববাদ, বা মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কথা-বলা সাংবাদিকদের উপর মামলা ঠুসে দেওয়া। কখনও দেশদ্রোহিতার, কখনও অশান্তি উস্কানোর, কখনও মানহানির জন্য মোকদ্দমা। সম্ভবত এর সব চাইতে বড় নিদর্শন দ্য ওয়্যারের চার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অমিত শাহের ছেলে জয়ের একশো কোটি টাকা মানহানির মামলা। এগুলো আদতে ভয় দেখানোর প্রয়াস। অনেকেরই হয়তো মনে নেই, গৌরী লঙ্কেশকে হত্যার পূর্বে তাঁর বিরুদ্ধে অগণিত মামলা করেছিল সঙ্ঘ-ঘনিষ্ঠরা, এবং তা করা হয় নানা জেলায়, যাতে তাঁকে সর্বত্র ছুটে গিয়ে আদালতে হাজিরা দিতে হয়। গৌরী অবশ্য তাকে কাজে লাগিয়ে মিটিং সেরে নিতেন। কিন্তু গৌরীর মতোই, নেহা দীক্ষিৎ, মালিনী সুব্রহ্মণ্যম, সন্ধ্যা রবিশঙ্করের মতো ক্ষমতাসীনের সমালোচক সাংবাদিকরা যে বারবার আক্রমণের শিকার হন, তার অন্যতম কারণ তাঁরা স্বাধীন সাংবাদিক, কোনও সংস্থার হয়ে কাজ করেন না। মালিক-সম্পাদককে দিয়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

এমন নয় যে সাংবাদিকের অমর্যাদায় সাংবাদিকরা কখনও এক যোগে প্রতিবাদ করেনি। এনডিটিভি-র অফিসে ‘রেড’ করার নামে হামলা করার পরে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ় একযোগে তার প্রতিবাদ করেছিল, সিনিয়র সাংবাদিক এন রাম রাফাল চুক্তির দুর্নীতি ফাঁস করার পর তাঁকে কার্যত ‘চোর’ বলার প্রতিবাদ করেছিল, স্মৃতি ইরানি ফেক নিউজ়ের অজুহাতে বাকস্বাধীনতার উপর কোপ আনার চেষ্টা করলে ফের একযোগে প্রতিবাদ করেছিল। প্রতিটা ক্ষেত্রেই পিছু হঠেছিল সরকার। ইমার্জেন্সির সময়ের মতো আইন তৈরি করে বাকরুদ্ধ করতে গেলে সমস্যা হবে, বুঝে আইনি পথে হাঁটেনি। কাজ হাসিল করেছে ভয় দেখিয়ে, লোভ দেখিয়ে। যেখানে সরাসরি মালিকানা নেই, সেখানে ভয় একটা বড় যন্ত্র হয়ে এসেছে। বিদ্বেষমূলক অপরাধ ‘ট্র্যাকিং’ শুরু করায় ববি ঘোষকে হিন্দুস্তান টাইমস কাগজ ছাড়তে হয়েছে বলে মনে করা হয়, তা আরও এই কারণে যে তিনি যাবার পর ‘হেট ট্র্যাকার’ তুলে দেওয়া হয়। মোদির বিরুদ্ধে খবর করার জন্য তাঁকে এবিপি নিউজ় চ্যানেল ছাড়তে হয়েছে, অভিযোগ করেছেন ‘মাস্টারস্ট্রোক’ অনুষ্ঠানের অ্যাঙ্কর পুণ্যপ্রসূন বাজপায়ি। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজের একটি পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে নরেন্দ্র মোদি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জ্ঞান বিতরণের পর প্রধান সম্পাদক রাজকমল ঝা বলেছিলেন, ‘সরকারের তিরস্কারই সাংবাদিকের পুরস্কার,’ — তার জন্যও নাকি বিস্তর বিপাকে পড়তে হয়েছিল কাগজকে। অন্তত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস কাগজটি যে আগের চাইতে অনেক সাবধানী অবস্থান নিয়েছে, তা পাঠকের চোখেও ধরা পড়ছে। এমন প্রতিটি ঘটনা সাংবাদিকদের মেরুদণ্ড দিয়ে হিমশীতল ধারা বইয়ে দিয়েছে। তবে মোদি সরকারের সব চাইতে কৃতিত্ব সম্ভবত এইখানে যে, কোনও ভয় না দেখিয়েও তারা বহু সংবাদসংস্থাকে আনতে পেরেছে তাদের প্রভাবের ছায়ায়। রাফাল কাণ্ডে তাঁর হেনস্থার পর প্রবীণ এন রাম ‘দ্য ওয়্যার’-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘ভয়ের যে বাতাবরণ এখন তৈরি হয়েছে, সাম্প্রতিক কালে তা দেখা যায়নি। আরও বলতে হচ্ছে যে, বৃহৎ সংবাদ সংস্থাগুলো প্রোপাগান্ডা করার ভূমিকা বেছে নিয়েছে।’

সে কথাটা সমর্থন করেছে ‘কোবরা পোস্ট’ নামে একটি ওয়েবসাইটের তরফে ‘স্টিং অপারেশন,’ যা দেখায় যে বিজ্ঞাপনের জন্য দেশের বড় বড় মিডিয়া সংস্থাগুলি বিজেপির হয়ে প্রচারে প্রস্তুত। এমনকী সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বার্তাতেও পিছপা নয়। লুকোনো ক্যামেরায় বক্তব্য রেকর্ড করা উচিত কিনা, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়। কিন্তু এটা অনস্বীকার্য যে, বিজ্ঞাপন পাওয়ার জন্য খবরের বিষয়ে আপসে যাওয়ার প্রবণতা যে সংবাদমাধ্যমের রয়েছে, তার ইঙ্গিত মিলেছে।

মোদি সরকার মনে করে, তাদের বিপুল জয় সব মিথ্যা প্রচারকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। ঠিক যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিবিধ মন্ত্রী ও নেতা যে কোনও প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘মানুষ এর জবাব দেবেন।’ প্রশ্নই সাংবাদিকের মূলধন, সুতরাং প্রশ্নের মূল্যহ্রাস হলে সাংবাদিকতা নেহাৎ অভিনয় হয়ে দাঁড়ায়। মমতাও ঠিক মোদির মতো কিছু সাংবাদিক নামধারী অভিনেতা তৈরি করা, এবং তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার-সাক্ষাৎকার খেলার নাটক করতে চেয়েছেন বরাবর। তবে তাঁর ইতিহাসে গোধরার নরমেধ যজ্ঞের মতো কোনও ভয়ানক ঘটনা না থাকার জন্যই হোক, আর সমাজমাধ্যমের মহিমা বুঝতে না পেরে থাকার জন্যই হোক (সম্প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে ট্রোল হয়েছেন সোশ্যাল মিডিয়াতে, তার একমাত্র তুলনা মদন মিত্র), তিনি সংবাদমাধ্যম দিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছনোর সাবেকি ধাঁচটা থেকে বেরোতে পারেননি।

সাংবাদিকের প্রশ্ন সব শাসকের কাছেই অস্বস্তিকর। কিন্তু বামফ্রন্ট যেভাবে সাংবাদিকদের মোকাবিলা করেছিল, তা অনেক বদলে গেল তৃণমূলে এসে। বামফ্রন্ট যে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ বা ‘সাম্রাজ্যবাদী’ তকমা দিয়েই রেখেছিল বড় কাগজ-চ্যানেলকে, সেই কারণেই হোক, অথবা প্রতিষ্ঠানের চাইতে ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তার অধিক কার্যকর হবে এই বিশ্বাস থেকেই হোক, মিডিয়া হাউজ়ের মালিকদের উপর প্রভাব বিস্তার করে বা ভয় দেখিয়ে বশংবাদ করার চেষ্টা করেনি। তবে প্রতিটি সংবাদসংস্থায় এমন কিছু সাংবাদিক ছিলেন যাঁরা দলের ঘনিষ্ঠ, বলা চলে তাঁদের একটা ‘গোষ্ঠী’ ছিল, যাঁরা পার্টির ভিতরের কথা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন, অনেকেই বাম মনোভাবাপন্ন, অ্যাকটিভিস্ট গোছেরও ছিলেন। এই সাংবাদিকরা যথোচিত সরকারি সুবিধে পেয়েছেন, কখনও স্ত্রীর চাকরি, কখনও সরকারি ফ্ল্যাট। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, বিরুদ্ধ কাগজ-চ্যানেলের সাংবাদিকরাও পেয়েছেন। যদিও এর মধ্যে কোনও ‘গণতান্ত্রিক’ চিন্তা ছিল, তা ঠিক বলা চলে না।  তা ছাড়া, সিপিএম একেবারে নীচের স্তর পর্যন্ত নিজস্ব জনসংযোগ তৈরি করেছিল, তার ফলও পেয়েছে বহু দিন।

তৃণমূল জমানায় দেখা গেল, সরাসরি সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে অনেক বেশি। প্রতিষ্ঠানের উপর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে সাংবাদিকের নিয়ন্ত্রণ, এই স্ট্র্যাটেজির ফলে সাংবাদিক পড়েছেন উভয়সঙ্কটে। নেতাকে বেয়াড়া প্রশ্ন করলে তাঁর কাছেও অপমানিত হতে হচ্ছে, অফিসে ফিরে এসেও বিপদে পড়তে হতে পারে, এমন পরিস্থিতি হচ্ছে। সিনিয়র সাংবাদিকরা এমন বেশ কিছু দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন, যেখান সরকারের পক্ষে অস্বস্তিকর খবর পরপর কয়েকটি করায় সাংবাদিককে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে সেই ‘বিট’ থেকে। পাঠক সব সময়ে বোঝেন না, নেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাটা কেবল তাঁকে খুশি করে ফায়দা আদায়ের ব্যাপার নয়।  সাংবাদিকের মূলধন ‘অ্যাকসেস’— নেতার সঙ্গে যোগাযোগ। যত বড় নেতার সঙ্গে যত বেশি ঘনিষ্ঠতা, রিপোর্টার হিসেবে তত দর বাড়ে। এটা রিপোর্টারের পেশাদারিত্বের প্রশ্ন। আর এখানে নেতারও পরীক্ষা। তিনি ততটাই গণতান্ত্রিক, ততটা স্বচ্ছ, যতটা তিনি ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শী মিডিয়া হাউজ়ের সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে তৈরি।

বাম নেতা-মন্ত্রীরা সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার বিষয়ে কাগজ-চ্যানেল নিয়ে বাছবিচার কম করতেন কি না, এ বিষয়ে রিপোর্টারদের মধ্যে মতান্তর আছে। অনেকে বলছেন, জ্যোতি বসু যখন রাইটার্সে লিফটে উঠতেন, তখন সব সংস্থার সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করার সুযোগ পেতেন। এবং তিনিও প্রায় সকলেরই প্রশ্নের উত্তর দিতেন। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বরং ‘কোন কাগজ’ প্রশ্ন করেছেন বেশি দেখতেন। একবার বর্তমান পত্রিকার এক সাংবাদিকের প্রশ্ন নিতে অস্বীকার করেছিলেন, তৎকালীন সম্পাদক বরুণ সেনগুপ্ত কাগজে সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়াও জানিয়েছিলেন। ততদিনে নন্দীগ্রাম ঘটে গিয়েছে, বাম নেতা-মন্ত্রীরা সংবেদনশীল হয়ে পড়েছেন, পেটোয়া চ্যানেলকে ছাড়া বিশেষ সাক্ষাৎকার দিতেন না। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সময়ে ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকের বৃত্ত অনেক ছোট হয়ে এসেছে, মনে করেন এই রিপোর্টাররা। আবার অনেকে মনে করেন, এ নেহাৎ উনিশ-বিশ। দুই আমলেই কেবল ঘনিষ্ঠ, অনুগত রিপোর্টাররা সুযোগ পেয়েছে মমতার সঙ্গে কথা বলার।

এখন ভাবলে হাসি পেতে পারে যে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের সামনে থেকে প্রেস কর্নার তুলে নিয়ে যাওয়ায় যে সাংবাদিকরা বিধানসভা বয়কট করেছিলেন, নবান্নে তাঁদের কী দশা। মুখ্যমন্ত্রীর ঘর চোদ্দতলায়, সেখানে সাংবাদিকের প্রবেশ হাজারগুণ কঠিন। লিফটে ওঠার সময়েও কর্ডন করে রাখা হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। এমনকী দলীয় কার্যালয়ে প্রার্থীর তালিকা ঘোষণার সময়েও মুখ্যমন্ত্রীর মঞ্চ আর সাংবাদিকদের আসনের মধ্যে নিরাপত্তার দড়ি দিয়ে রাখা হয়। রিপোর্টারই কি তবে ‘সিকিউরিটি রিস্ক?’ এত সিকিউরিটি চেক করে নবান্নে প্রবেশের ছাড়পত্র মেলার পরেও তাকে এত সন্দেহ? নাকি রিপোর্টারের প্রশ্ন ঝুঁকিপূর্ণ হতে হতে এখন রিপোর্টারকেই ঝুঁকি মনে হচ্ছে মন্ত্রী-আমলাদের?

তৃণমূল বহু পিছনে ফেলেছে বামেদের বিজ্ঞাপনের রাজনীতিতে। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে বিজ্ঞাপনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ বহু বার উঠেছে। গণশক্তির গ্রাহক কম হলেও বিজ্ঞাপন পেয়েছে বেশি, এটা খোলাখুলি ঘটেছে। কিন্তু কোনও কাগজ সরকার-বিরোধিতার জন্য একেবারে বিজ্ঞাপন পায়নি, এমন হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার গঠনের পর, ২০১২ সালে, সরকারি লাইব্রেরিগুলোতে তাঁর সরকারের সমালোচক কাগজগুলি না রাখার যে নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন, তা-ই ছিল অশনিসঙ্কেত। তারপর থেকে কেবল বিজ্ঞাপন বন্ধ নয়, যে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে গিয়েছে তার টাকা মেটানোও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। নানা উপলক্ষে, নানা বড় মিডিয়া হাউজ়ের সঙ্গে এমন হয়েছে। সাংবাদিক মহলে অন্তত এটা অবিদিত নেই যে, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে বিরোধিতা বন্ধ করার বিষয়টিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার কত তৎপর।

আরও আক্ষেপের কথা, জেলার ছোট ছোট কাগজগুলিতে বিজ্ঞাপন দেওয়া কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে তৃণমূল সরকার। একেই বড় কাগজের জেলা সংস্করণ বেড়েছে, তার চাপে বিজ্ঞাপন হারিয়েছে জেলার নিজস্ব কাগজগুলি। তার উপর সরকারের নির্বিচার অসহযোগিতায় সেগুলো প্রায় উঠে যেতে বসেছে। অবশ্য জলে বাস করে কুমিরের সঙ্গে বিরোধিতার সাধ্যও নেই তাদের। কাগজ বার করতে পারলেও সম্পাদক-রিপোর্টাররা বিশেষ রাজনৈতিক বিরোধিতার দিকে যান না। অনেকেই আধা-সাহিত্য পত্রিকা তৈরি করে ফেলেছেন, সংবাদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। অথচ ‘ডিপেনিং অব ডেমোক্রেসি’ – গণতন্ত্র গভীরে যাবে, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করবে, এই ধারণার ধারক-বাহক হওয়ার কথা ছিল এই কাগজগুলির। যে চাহিদা, যে ক্ষোভ, ছোট এলাকায় বা অল্প মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ বলে বড় কাগজ-চ্যানেল শুনবে না, তা শোনার কথা ছিল এই সব কাগজের।

সংবাদের সঙ্গে কাগজের দূরত্ব মানেই মানুষের সঙ্গে সাংবাদিকের দূরত্ব। নেতা-মন্ত্রীর শক্তির যা উৎস, সাংবাদিকের শক্তির উৎস সেই একই — জনতার নাড়ির স্পন্দন নিজের হৃদস্পন্দনে বোঝার ক্ষমতা। সাংবাদিক তা হারিয়ে ফেললে নেতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে কোন শক্তিতে? অথচ তার সংযোগ সাংবাদিককে দূরে ঠেলে দিচ্ছেন নেতা-মন্ত্রী, এবং তাঁদের দ্বারা পরিচালিত-প্রভাবিত মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি। মমতাই হন বা মোদি-মুকুল, নেতা চাইছেন সাংবাদিকের ভেক-ধরা প্রচারকের। ক্লাউনের মতো খেলনা বন্দুক হাতে, সেনার পোশাক পরে, বায়ুসেনার পাক-আক্রমণের (সন্দেহজনক) খবর সম্প্রচার করতেও যে দ্বিধা করবে না। যে প্রশ্ন করবে, আমের আঁটি কি আপনি চুষে খান? ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্বের পর পশ্চিমবঙ্গের অনেক রিপোর্টার অবশ্য বলছেন, মোদি-অমিত শাহের বিরুদ্ধে, তাঁদের দুর্নীতি ফাঁস করে যত লেখালেখি হয়েছে মিডিয়াতে, তার ভগ্নাংশও হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিষয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ শুনতে পাওয়া যায়, তার পক্ষে সাক্ষ্য-প্রমাণ খুঁজে বার করার সাধ্য হয়নি কোনও মিডিয়ার।

এই নিষ্ক্রিয়তা দিয়ে সাংবাদিক হয়তো আপাত-নিরাপত্তা খুঁজছে। কিন্তু পায়ের নীচ থেকে মাটিই যদি সরে যায়, তবে মানুষ দাঁড়াবে কোথায়? আক্ষেপ এই যে, নেতাদের সামনে চুপ করে থাকার সিদ্ধান্ত যারা নিচ্ছে, উপরমহলের সেই সাংবাদিকরাই নীচের ‘ফুট সোলজার’ রিপোর্টারদের পাঠাচ্ছেন নির্বাচনের দিন, নেতার চ্যালা-চামুন্ডাদের মোকাবিলা করতে। এই জুনিয়র রিপোর্টার, ক্যামেরাম্যান ‘ক্ষমতার সামনে নির্ভীক সত্যবাদিতা’ গোছের কোনও চ্যালেঞ্জ নিয়ে যাচ্ছে না, যাচ্ছে স্রেফ চাকরি রাখতে। কিন্তু মারধর খেয়ে, চরম অপমানিত হয়ে ফিরে আসছে। যদি সে বড় কাগজ-চ্যানেলের মাইনে-করা কর্মী হয়,  তা হলে হয়তো তার মার খাওয়াটুকু খবর হচ্ছে। আর জেলার কপি-প্রতি, ছবি-প্রতি দু’চার আনা পাওয়া ফ্রিলান্সার হলে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হচ্ছে।

এই পুরো বিষয়টার মধ্যে একটা এমন অন্যায্যতা রয়েছে, যে ন্যায় দাবি করার সাহসটাই হারিয়ে যাচ্ছে সাংবাদিকদের।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1866 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. আজকের দিনে এমন একটি লেখার অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। স্বাতী ভট্টাচার্যকে অনেক, অনেক ধন্যবাদ। ধন্যবাদ চারনম্বর প্ল্যাটফর্মকেও।

  2. একটি অসামান্য প্রতিবেদন! রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে ক্ষমতা বনাম মুক্ত কণ্ঠের অসম লড়াইয়ের দিকে আমাদের মনোযোগ আরেকবার ফেরাতে যেন একটু চাবকেই দিলেন স্বাতী ভট্টাচার্য।

    আমার কয়েকটি বিষয় মনে হয় – (১) ইরাক যুদ্ধ পরবর্তীতে “কোল্যাটারাল ড্যামেজ” বলে যে ধারনাটি জনমানসে তথা সোশ্যাল সাইকিতে জারিয়ে দেওয়া হয়েছে তারই একটি প্রকাশ সাংবাদিকদের ওপরে আক্রমণ। একইসাথে “numbing of our collective sensitivity” একটি বাস্তব দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি। এজন্য শুধু এ রাজ্য নয় কাশ্মীর, উত্তর প্রদেশ বা গুজরাটে সাংবাদিকেরা খুন হলেও আমরা ভার্চুয়াল জগতের বাইরে প্রতিবাদে যেতে পারিনা। (২) মানুষের বহু কণ্ঠ, বহু স্বর subsumed হয়ে যাচ্ছে অতিরাষ্ট্রের একক ভাষ্যের মধ্যে। (৩) সিভিল স্পেস তথা তৃতীয় পরিসর ক্রমসংকুচিত, অপসৃয়মান। (৪) গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাধীন সংগঠন এবং সংস্থাগুলো রাষ্ট্রের একটি প্রসারিত রূপ হয়ে উঠছে। বিচার বিভাগও বোধহয় আর ব্যতিক্রম থাকছেনা।

    কোথায় দাঁড়াবো আমরা? কিভাবে? কোন রাস্তায়? এতগুলো রক্তাক্ত প্রশ্নের মুখে স্বাতী ভট্টাচার্য আমাদের দাঁড় করালেন।
    আমার অভিবাদন!

আপনার মতামত...