এলভিস

বিজয় বোস

 

রোজনামচা

এলভিসের এই হিরো সাইকেলটা সেকেন্ড হ্যান্ড। ওর কাজের জন্য সাইকেলটা খুব দরকার। আর সেটাই ওর চাকরির প্রথম শর্ত। সকালবেলা যাদবপুর, বিক্রমগড়, ইব্রাহিমপুর রোড, গলফগ্রিন, সেন্ট্রাল পার্ক হয়ে শ্রীকলোনির মোড় অবধি ওর টেরিটরি। ওই এলাকার মধ্যে মোটামুটি একশোটা বাড়িতে ভোর ঠিকঠাক হওয়ার আগে পেপার পৌছে দেওয়ার দায়িত্ব ওর। অধিকাংশই বাংলা, কয়েকটা বাড়িতে ইংরেজি আর বেশ কয়েকটা বাড়িতে দুটোই। সঙ্গে ম্যাগাজিন। শেষ পেপারটা পৌছে দিয়ে শ্রীকলোনি মোড়ে দুলালদার চায়ের দোকানে পেটাই পরোটা সঙ্গে ঘুঘনি আর চা সহযোগে ব্রেকফাস্ট সারে। তারপর বাঘাযতীন মোড়ে গিয়ে পেপারের হিসেব দিয়ে সাড়ে নটার মধ্যে বাড়ি ফিরে স্নান করে বেরিয়ে পড়ে কালেকশনে। কালেকশন বলতে কেবল টিভির মাসিক আদায়। এখন অবশ্য বাড়ির সংখ্যা কমে গেছে। বেশিরভাগ বাড়ির ছাদে গোল থালাকৃতি ডিশ অ্যান্টেনা, অনেকে আবার অনলাইনেও রিচার্জ করিয়ে নেয়। দুপুরের দিকে কাজের চাপটা তাই আজকাল একটু কম। বিকেলের দিকে কালেকশনের হিসেব মিটিয়ে একটু দম ফেলার ফুরসত পায় এলভিস। সারাদিন দৌড়ঝাঁপের পরে শরীরটা একটু বিশ্রাম চায়, কিন্তু ইদানিং সেটা হচ্ছে না। কারন বিকেল পাঁচটা নাগাদ যেখানেই থাকুক না কেন, বিদ্যাসাগর ক্লাবের সামনে চলে আসে ও।

রুনু প্রতিদিন ওই সময় ওখান দিয়ে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরে।

রুনুর চেহারাটা সকালে গার্ডারে মোড়ানো পেপারের থেকেও রোগাটে। যদিও রুগ্ন কথাটা একেবারেই মানায় না ওর চেহারার সঙ্গে। বরং সুপারলেটিভে স্লিমেস্ট বলা যেতে পারে। মুখটা গরম রসগোল্লার মত মোলায়েম রকমের মিষ্টি। এলভিস ভেবে পায় না আধপেটা খেয়ে এরকম চেহারা বানানোর পেছনে কোন বিজ্ঞানীর কত নম্বর যুক্তি প্রযোজ্য। ওর নিজের চেহারাও যদিও আহামরি কিছু নয়। রোগা প্যাকাটি মার্কাই বলা চলে। তবে সাইকেল চালিয়ে চালিয়ে পায়ের কাফ মাসল দুটো ইটের মত শক্ত হয়ে গেছে। প্রেম বলতে একটাই— মাঝেমধ্যে কাজের ফাঁকে এপাড়া ওপাড়ায় ফুটবলের খেপ খেলতে যাওয়া। এলভিসের বাবা নেই, মা রুগ্ন ও বারো মাসের নয় মাসই নানারকম রোগে ভোগে। তাও মাঝে মাঝে সেলাই করা, এর ওর বাড়িতে ফাইফরমাস খেটে দেওয়া, ঝাড়াই মসলা প্যাক করা, ফলস পিকো ইত্যাদি করে টুকটাক আয় করে। ওদের একটা একচালা টালির বাড়ি আছে বিদ্যাসাগর কলোনিতে। এলভিস অনেক কষ্ট করে গ্র্যাজুয়েশনটা পাশ করেছে। কিন্তু চাকরির জন্য কথা বলতে জানতে হয়, মুখচোরা এলভিসের তাই অফিসে চাকরি হয়নি। পেপার ও কেবলের থেকে যা আসে তাতে কোনওরকমে চলে যায়। ভালো চাকরি নেই, পকেটে পয়সা নেই, এমনকি একটা ভালো মোবাইলও নেই— এলভিসের মাঝে মাঝে মনে হয় এরকম জীবন রেখে লাভ কী? সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় সাইকেল চালায়, মাঝেসাঝে পথ ভুল করে দু একটা বাস বা লরি ধাক্কা দিয়ে দিলেই তো কেল্লা ফতে। আবার পরক্ষণেই মনে হয়, জীবন তো একটাই, বাঁচার একটু চেষ্টা করে দেখতেই বা এত অনীহা কেন। বেঁচে থাকার কোনও উদ্দেশ্য বা রসদই কি নেই ওর জীবনে। আলবাত আছে, না হলে তো সেবারই কেবলের তার লাগাতে গিয়ে পাঁচিল থেকে পা ফস্কে পড়ে গিয়ে মরেই যেতে পারত। বিদ্যাসাগর ক্লাবের পাশে এলভিসের বন্ধু ও খেপ সঙ্গী বুবুনের একটা ছোট হার্ডওয়ারের দোকান আছে। ময়দানের ক্লাবগুলোতে বুবুন মাঝে মাঝে ট্রায়াল দেয়, অধিকাংশ সময় খেপ খেলে আর বিকেল থেকে রাত অবধি দোকান চালায়। কাজ শেষে বিকেল হলে এলভিস সেখানেই চলে যায় আর রুনুর জন্য অপেক্ষা করে। হয়তো এইজন্যই এলভিস মরেনি সেদিন।

–কিরে আমার পূজাবার্ষিকী দিলি না?
–এখনও আসেনি গো স্টলে।
–এলেই দিয়ে দিবি কিন্তু।
–মাথায় আছে জেঠু।

–কিরে তোদের খেলার চ্যানেলটা কখন আসবে? বড় ম্যাচটা সাড়ে চারটে থেকে।
–আমি দেখছি।
–হ্যাঁ দ্যাখ, না হলে এ মাসের পয়সা দেব না।

এলভিসের এরকমভাবেই দিন যায়। সারাদিন ঘোরা আর সাইকেল চালাতে চালাতে গান করা। এলভিস ওর আসল নাম নয়, ওর পিতৃদত্ত নাম লালটু। লালটু বিশ্বাস। কর্পোরেশনের দয়ায় সেটা ভিস্বাস হয়ে যায় জন্মের সঙ্গে সঙ্গে। স্কুলে পড়ার সময় ক্লাসমেট অনীশ বলল— লালটু? ছ্যা, এই নাম নিয়ে মেয়ে পটাতে পারবি? এক কাজ কর, নামটাকে চেঞ্জ কর।

–বাবার দেওয়া নাম চেঞ্জ করে দেব?
–পুরো চেঞ্জ কে করতে বলছে? শুধু লালটু থেকে ‘এল’টা নে, আর তোর ভিস্বাস থেকে ‘ভিস’। এল-ভিস।
–এলভিস? এরকম আবার নাম হয় নাকি?
–কী বলছিস রে! এলভিস প্রেসলি একজন ফেমাস আমেরিকান রক এন্ড রোল স্টার। কোনওদিন গান শুনেছিস? শুনে দেখিস, পাগলা হয়ে যাবি।
–তুই শুনিস বুঝি?
–আগে শুনতাম না, কিন্তু আমার দাদা প্রায়ই শোনে। সেই শুনতে শুনতে ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেছে। কী গায় লোকটা!! মানে গাইত। আহা! তোর তো লাইফটাই চেঞ্জ হয়ে গেল রে। এবার জাল পেতে বোস, টপাটপ মেয়ে জালে এসে পড়ল বলে।

ব্যস, সেই থেকে লালটু নামটা রইল সার্টিফিকেটে, বাকিদের কাছে শুধুই এলভিস।

 

এলভিসের প্রেমকাহিনী

রুনুরা এপাড়ায় বেশ কিছুদিন হল এসেছে। পারুলপিসিদের ভাঙা বেড়ার বাড়ির জায়গায় বিশু প্রোমোটার যখন একটা ইট সিমেন্টে বানানো চারতলা দেশলাই বাক্স বসিয়ে দিল, রুনুরাই সেখানে প্রথম ফ্ল্যাটটা কিনেছিল। ফুড কর্পোরেশনের অফিসার বাবা আর কলেজের বাংলা প্রফেসর মায়ের একমাত্র সন্তান রুনু। এলভিসের কাজ ছিল রুনুরা গুছিয়ে ওঠার ও অন্য কেউ ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে পেপার আর কেবলের কানেকশনটা সিকিওর করে নেওয়া। আর কেবলের তারটা লাগাতে গিয়ে বর্ষার দেওয়ালে শ্যাওলা পড়ার আগেই এলভিস বড়রকম একটা স্লিপ খায়, রুনুর প্রেমে। তারপর থেকেই বুবুনের দোকানে বসে রুনুকে দেখা। মাঝে মাঝে চোখাচুখি হলে একটু হাসা। আর মাসের শেষে টাকা কালেকশনের ছুতোয় শুধুই ‘কেমন আছেন?’

মৃত মানুষের হৃদস্পন্দনের গ্রাফ মনিটরে যেমন দেখা যায়, এলভিসের একতরফা প্রেমকাহিনীটা সেরকমই সরলরেখায় চলছিল, যদি না সেদিন রুনুর মা বাবা একদিনের জন্য ছোটপিসোর বাড়িতে যেত, যদি না সেদিন রুনুর কোচিংয়ে যাওয়ার থাকত আর যদি না সেদিন ওরকম ঝমঝমিয়ে বৃষ্টিটা নামত। বাসস্ট্যান্ডে এলভিস দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল, আর নিজের জীবনের ব্যর্থতার কথা চিন্তা করছিল, এমন সময় বাস থেকে রুনু নামল। দৌড়ে নামতে গিয়ে সালোয়ারের খানিকটা ভিজে গিয়েছিল, ঠান্ডা হাওয়ায় পাতলা শরীর হি হি করে কাঁপছিল, ভেজা চুলগুলো এলোমেলো। রুনুকে দেখেই ও সিগারেটটা লুকোল। এলভিসের মনে হল বুকের মাঝে আদিবাসীরা নৃত্য করছে আর দামামা বাজাচ্ছে। নিজের হার্টবিট বৃষ্টির অত আওয়াজের মধ্যেও স্পষ্ট শুনতে পেল ও। আর চোখাচোখি হতেই ক্যাবলা হাসি হেসে বলল— আজকে খুব বৃষ্টি, তাই না!

রুনু বলল— হ্যাঁ। ভিজে গেছি একদম।

–আপনি ছাতা আনেননি?
–না একদম ভুল হয়ে গেছে।
–যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আপনি আমার ছাতাটা ধার নিতে পারেন।
–থ্যাঙ্ক ইউ। কিন্তু আপনি তাহলে কীভাবে যাবেন?
–আমি বৃষ্টি কমলে বেরিয়ে যাব।
–এই বৃষ্টি কমবে বলে তো মনে হচ্ছে না।

ওর পিসির বাড়ি যাওয়ার কথা আজকে। পিসি খুব সুন্দর তালের বড়া বানায়, ও খেতে চেয়েছিল। এলভিস মাথা চুলকে বলল— মনে হয় কমে যাবে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে।

–আপনি কি ওদিকেই যাচ্ছেন? রুনু জিজ্ঞেস করল।
–না মানে আমি পাটুলির দিকে যেতাম।
–তাহলে আমাকে ছাতা দিয়ে দিলে কী করে যাবেন?

এমনিই মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে এলভিসের গলা শুকিয়ে তাকলামাকান হয়ে যায়। তারপর এত প্রশ্নের কৈফিয়ত দিতে দিতে মনে হচ্ছে পৃথিবীর তিন ভাগ জল একচুমুকে খেলেও গলার কাঠ কাঠ ভাবটা কাটবে না। ও কিছুই বলল না।

রুনুই উপায় বাতলে দিল— তার চেয়ে এক কাজ করুন না, আমাকে ছেড়ে দিয়ে আপনি যেখানে যাওয়ার সেখানে চলে যান।

–আমি… মানে আপনাকে!!
–ওটা আপনার সাইকেল তো? পাশের সাইকেলটাকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল রুনু।
–হ্যাঁ।
–ডবল ক্যারি করতে পারেন তো?
–হ্যাঁ মানে পারি।
–দেখুন আমার একটু তাড়া আছে আর একটা সলিউশন তো দিয়েই দিলাম। যদি রাস্তায় ফেলে না দেন তো আপনার সঙ্গে যেতে আমার কোনও আপত্তি নেই। অবশ্য আপনার যদি আপত্তি…
–না না আপত্তি থাকবে কেন? এলভিস রুনুর মুখের কথা প্রায় কেড়ে নিয়ে বলল।

রুনুকে সামনে বসিয়ে এলভিস যখন সাইকেল চেপে যাচ্ছিল, ওর মনে হছিল ও আর ওর মধ্যে নেই। ও কোনও স্বপ্ন দেখছে। রুনু ছাতাটা ধরে আছে ওর মাথায়। এলভিসের মনে হয়েছিল, কে জানে জীবনে আর কিছু হয়তো পাওয়ার ছিল না। রুনু যদি পাড়ায় নতুন হত তাহলে এগলি ওগলি একটু ঘুরিয়ে আনা যেত। কিন্তু এ মেয়ে সব গলি চেনে। তাই হৃদপিণ্ড গলার কাছে আটকে রেখে যতটা সম্ভব আস্তে চালানো যায় চালিয়ে এলভিস রুনুকে ফ্ল্যাটের সামনে পৌঁছে দিল। আর তারপরেই ওর মধ্যে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা প্রবলভাবে ফিরে আসতে শুরু করল।

 

এমনিতেই জীবনের সঙ্গে লড়তে লড়তে এলভিসের অনুভূতিগুলোর অস্তিত্ব প্রায় মুছেই যাচ্ছিল, কিন্তু কালকের ঘটনাটা না ঘটলে ও বুঝতেই পারত না যে কিছু কিছু অনুভূতির দেহাবশেষ এখনও ওর মধ্যে জীবিত আছে। গত দু সপ্তাহের ঘটনাগুলোকে এলভিস পরপর সাজানোর চেষ্টা করল। সেদিন রুনুকে ছেড়ে দেবার কিছুক্ষণ পরেই বৃষ্টিটা ইলশেগুঁড়ি হয়ে যায়। আর তারপর এলভিস সত্যিই খানিকক্ষণের জন্য প্রেসলি হয়ে গেছিল। আপন মনে গুন্ গুন্ করে গান করতে করতে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিল। পিসি যে তালের বড়া নিয়ে অপেক্ষা করছে, সেখান থেকে ফিরে যে মাকে টুকটাক কিছু মাসকাবাড়ি করে দেবার কথা, রাঙাপিসিমার বাড়িতে যে সিরিয়ালের চ্যানেলগুলো ঠিকঠাক আসছে না সেটা দেখতে যাবার কথা, ওর কিছুই মনে ছিল না। সেদিন রাতে ঘুম হল না ঠিকমতো। সারারাত এপাশ ওপাশ করে পরদিন সকাল হতে না হতেই বুবুনের দোকানে ছুটে গেল ও।

সব শুনে বুবুন বলল— সবই মায়া, এসব কিছুই না। ছাতা থাকলে কি আর তোকে পাত্তা দিত?

–আরে ভগবান ওই জন্যই বোধহয় ওকে ছাতা দিয়ে পাঠায়নি সেদিন। না হলে আমি কে যে আমার থেকে লিফট চাইবে?
–আরে মেয়েরা এরকমই হয়। কাল দরকার ছিল চিনেছে, আজ রাস্তায় দেখলেও চিনতে পারবে না।
–যা কী বলছিস! আমাকে দেখলে হাসে।
–তো কী হল? সে আমাকে দেখলেও বাঘাযতীন বাজারে মাছ বিক্রি করে মাসি দাঁত ক্যালায়, তার মানে মাসির সঙ্গে আমার চক্কর চলছে?
–আরে এ হাসি সে হাসি নয়। এলভিস আপ্রাণ বোঝানোর চেষ্টা করল— অনেক মানে আছে এ হাসির।
–হ্যাঁ আছে তো। টুথপেস্টে লবণ আছে কিনা দেখাচ্ছিল তোকে।
–ধুস তোর কাছে আসাটাই ভুল হয়েছে আমার। ফালতু ডিসকারেজ করছিস।

এলভিস মাথা গরম করে বুবুনের দোকান থেকে বেরিয়ে বাসস্ট্যান্ডে আসতেই রুনুর দেখা পেল। রুনু হালকা করে মুচকি হেসে বলল— কালকের জন্য থ্যাঙ্কস এলভিসদা।

এলভিস দা? একমুহূর্তের জন্য ওর মনে হল একটা লং জাম্প মেরে সামনের লরিটার তলায় শুয়ে পড়ে। দাদা? ইয়ার্কি হচ্ছে? ওর নিজের মামাতো বোন পর্যন্ত ওকে দাদা ডাকে না, শুধু লালটু। বাসের ভিড়েও কেউ ওকে বলে না— দাদা একটু সাইড দিন। পাড়ার বাচ্চারাও কেউ দাদা বলে না, বলে এলভিস ভাইয়া বলটা দাও। কোন অ্যাঙ্গেল থেকে ওকে দাদা লাগে? ও মনে মনে বলল প্রেমিক না ভাবতে পারিস, সমবয়সী কেউ তো ভাব! তা বলে ডাইরেক্ট দাদা? অপমানটা ইনোর মতো ছ সেকেন্ডে হজম করে ও বলল— আমাকে প্লিজ দাদা বোলো না। আমি এতটাও বুড়ো নই।

রুনু এবার হেসে ফেলল। এলভিসের মনে হল এত সুন্দর আওয়াজ বোধহয় পৃথিবীতে ও কোনওদিন শোনেনি। রুনু বলল— আচ্ছা, তাহলে শুধু এলভিস বলি?

এলভিস মাথা নামিয়ে একটা লাজুক হাসি দিল।

–কোল্ড ড্রিঙ্কস খাও? খাও ঠিক আছে তো? নাকি খাবেন বলব?
–না না তুমিই ঠিক আছে, কিন্তু কোল্ড ড্রিঙ্কস কেন?
–বারে, কালকের হেল্পের জন্য থ্যাঙ্ক ইউ জানাব না?
–না না এসবের আবার কী দরকার? সামান্য একটু উপকার।
–তা বললে হয়? এসো আমার সঙ্গে।

বিয়েবাড়িতে এলভিসের চেনাশোনা ক্যাটারার বন্ধুরা কেউ ওকে কোল্ড ড্রিঙ্কস অফার করে না। কার সানাই বাজছে প্রশ্নের উত্তরে বিসমিল্লা বলার আগেই তিন গ্লাস ও সাবড়ে দেয়। সেই এলভিস একটা তিনশোর কোকা কোলা পাক্কা দশ মিনিট ধরে খেল। সঙ্গে শুনল রুনুর গল্প। আর তার সঙ্গে নিজের জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত ও রুনুর জীবনের মিসিং লিঙ্কগুলোর ফাঁকে ফাঁকে বসিয়ে দিয়ে একটা পরিপূর্ণ গল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করল।

–চিঠি? রুনুকে? ইথিওপিয়ান আরশোলায় কামড়েছে তোকে? বুবুন চেয়ার ছেড়ে প্রায় তিন হাত লাফিয়ে উঠে বলল।

–এটা একটু করে দে না ভাই। আমার সত্যি ওকে ভালো লেগে গেছে।
–তুই কি এক্সপায়ারি ডেট পেরিয়ে যাওয়া মাথামোটা? মেয়েদের কাছে মারধর খেলে পাড়ায় মুখ দেখাতে পারবি? চাকরিটা থাকবে?
–আমি কিছু জানি না। আমি নিজেই পেপারের ভাজে চিঠিটা ওকে দিতাম, কিন্তু ওর বাবা মাঝে মাঝে পেপারটা নিয়ে যায় তাই ফেঁসে যাওয়ার চান্স আছে।
–আমি ভালো বলছি এলভিস এটা কিন্তু তুই নিজের পায়ে কুড়ুল মারছিস। খাচ্ছিস, দাচ্ছিস, সাইকেল চালাচ্ছিস, সেটাই কর না ভাই। কেন ঝাড় থেকে বাঁশকে নেমন্তন্ন করে ডেকে এনে…
–কুড়ুল কি শাবল আমি জানি না, কিন্তু এই উপকারটা একটু করে দে ভাই। কাউকে ভালোবাসা কি অপরাধ? আর তুই ছাড়া আমার কে আছে বল?

বুবুন যখন রুনুকে চিঠিটা দিল, ও একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সাহস করে সামনে যেতে পারেনি। ও দূর থেকেই দেখল রুনু চিঠিতে বেশ খানিকক্ষণ চোখ বুলালো, তারপর বুবুনকে কিছু একটা বলে ওর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।

এলভিস শুধু বুঝেছিল একটা ভয়াবহ ঝড় এগিয়ে আসছে।

 

সামন্তকের ডাইরি

১৩ই জুন রাত একটা 

‘আমার মানিব্যাগে সায়নীর একটা ছবি থাকে সবসময়। স্ট্রেট ফরোয়ার্ডরা বলবে ন্যাকামো টু দি পাওয়ার আলোকবর্ষ। সে যে যা ইচ্ছে বলুক, কিন্তু আমার ওকে ভালো লাগে। সেই কলেজের প্রথম দিন থেকেই। ওর গালে টোল পড়া হাসি, হালকা খয়েরি চোখের ইশারা আমাকে পেনাল্টি বক্সের মধ্যে ফাউল করে দেয় বারে বারে, যদিও আমি গোল করতে পারি না। দোষ আমার কারেজের নয়, হাঁটুর। হাঁটুতে ভূমিকম্প রোগ আমার বরাবরের। ইদানিং আরও বেড়েছে। আর আজ যখন সায়নী আমার সঙ্গে ক্যান্টিনে কফি খেতে যেতে চাইল আমার মনে হল হাঁটুর মালাইচাকি দুটো বোধহয় এবার খুলে টেনিস বলের মতো রাস্তায় গড়াগড়ি খাবে। আজ সকাল থেকে আবার আকাশের মুখ ভার। রোমিতা ওকে না করে দিয়েছে। রোমিতা আবার সায়নীর বাডি, আমি আকাশের। তাই ঠিক হয়েছিল বাডিরা মিট করে ব্যাপারটার বিচার বিশ্লেষণ করে ক্লিয়ার করে দেবে যাতে করে কারও কাছে কোনও রং মেসেজ না পৌঁছায়। যদিও আমার এসবের থেকে সায়নীর সঙ্গে দেখা করার প্রতিই বেশি ইন্টারেস্ট ছিল। আর সেই ক্যাবলামার্কা ইন্টারেস্টটা আমার চশমার ফাক দিয়ে ধরাও পড়ে যাচ্ছিল। সায়নী আমাকে বাই বলার পরেই আমার সো-কলড ক্যাবলামোটা হঠাৎ করে ডেসপ্যারেডো হয়ে উঠল। আমি ঠিক করলাম সায়নীকে আজ যা বলার বলবই। কিন্তু কীভাবে? আমার তো কোনও প্রিপারেশনই ছিল না। আমি সায়নীকে ফলো করলাম। সায়নী যে বাসটার সামনের দরজা দিয়ে উঠল আমি সেটারই পেছন দরজা দিয়ে। বাসটা যখন যাদবপুর পেরিয়ে সুলেখা মোড়ে এল মনে হল মাথার ওপর আকাশের ট্যাঙ্কটা মেশিনগানের গুলিতে হঠাৎ করে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। তারপর সায়নী যখন বিদ্যাসাগর কলোনির স্টপে নামল, ও বৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করতেই ব্যস্ত ছিল। তাই আমায় নিজেকে বিশেষ আড়াল করতে হয়নি। আমি জানি এই এলাকায় ওর বাড়ি। ওকে যা বলার আজই বলব। কিন্তু আমি পাশের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে দেখলাম একটা টিংটিঙে রোগা চেহারার ছেলের সঙ্গে সায়নী কথায় মগ্ন। সায়নীর এই এলাকায় পাড়ায় একটা বয়ফ্রেন্ড আছে আমি জানতাম না। ছেলেটাকে দেখে আহামরি কিছু মনে হয় না, কেমন একটা হাবাগোবা টাইপের। চ্যাংড়া। আমার সত্যি রাগ হয়েছিল নিজের ওপর। এখনও হচ্ছে। আমি বোধহয় একটু বেশিই ভেবে ফেলেছিলাম। সেই সময় এতটাই বৃষ্টি হচ্ছিল যে চার হাত দূরের জিনিস ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু আমি স্পষ্ট দেখলাম সায়নী ছেলেটার সাইকেলে চেপে রাস্তা পার হয়ে উল্টো দিকে চলে গেল। যেন শুধু বৃষ্টির মধ্যে নয়, আমার জীবন থেকেও হারিয়ে গেল।’

 

এলভিস রাতে কিছু খেল না। রাগে গা রি রি করছে। নিশ্বাস ওঠানামা করছে খুব দ্রুত। বিছানায় বসে ছটফট করছে। ঘটনাটা যত ওর সামনে ফিরে ফিরে আসতে লাগল, ওর মধ্যেকার রোমান্টিক প্রেসলিটা সরে গিয়ে দাঁত নখ যুক্ত লালটুটা তত বেরিয়ে আসতে লাগল আর একটা প্রতিহিংসার দাবানল ছড়িয়ে পড়তে লাগল ওর সারা শরীরে। ও ঠিক করল রুনুর রূপের দেমাক ও অহঙ্কার ও চিরদিনের মতো মিটিয়ে দেবে। কীভাবে, ভাবতে ভাবতে ওর মাথায় একটা পৈশাচিক প্ল্যান দানা বাঁধতে শুরু করল।

 

রুনুর কথোপকথন

–শালা চিঠি লিখে বলে কিনা আই লাভ ইউ? রুনু বলল।
–তারপর? রোমি জিজ্ঞেস করল।
–আমি ভাবলাম কোথাও একটা ভুল হচ্ছে, ওর সামনে গিয়ে সোজাসুজি আরেকবার জিজ্ঞেস করতে থতমত হয়ে বাংলায় বলল আমাকে নাকি ওর ভালো লাগে।
–তারপর?
–আমার মাথা গরম ছিল, টেনে এক চড় কষিয়ে দিয়েছি জানোয়ারটার গালে।
–আর ইউ সিরিয়াস! এসব ছেলের সঙ্গে ফালতু ঝামেলায় কেন জড়াতে গেলি? ইগনোর করে গেলেই তো পারতি। বা অ্যাটলিস্ট পুলিশের ভয় দেখিয়ে ছেড়ে দিলেই তো হত।
–আমার মাথা গরম ছিল রোমি, আমি সামলাতে পারিনি।
–তুই নিজেও জানিস না কী করেছিস। বই দ্য ওয়ে, ছেলেটা কে?
–আরে আমাদের বাড়িতে পেপার দেয় আর কেবলের টাকা নিতে আসে। একদিন বিপদে পরে সাইকেলে লিফট নিয়েছি কি মাথায় চড়ে বসতে চাইছে। ডাইরেক্ট প্রোপোজ! তুই ভাব একবার!
–আমার ভয় হচ্ছে সায়নী, ছেলেটা যদি উল্টোপাল্টা কিছু করে বসে? তোর যদি কোনও ক্ষতি করে?
–আরে ছাড়, ক্যালানে মাল একটা। একটা চড় খেয়েই মিনমিন করতে করতে পালাল।
–কী মিনমিন করছিল?
–কী সব বলছিল, রূপের এত দেমাক ভালো নয়। আমি অত পাত্তা দেইনি।
–আশেপাশে আর কেউ ছিল?
–বেশ কয়েকজন ছিল। ওর এক বন্ধু যে চিঠিটা নিয়ে এসেছিল সেও ছিল। সবাই দেখেছে ঘটনাটা।
–বাট বি কেয়ারফুল সায়নী। এই ধরনের ছেলেরা কিন্তু ঘরে বসে কানে হেডফোন লাগিয়ে কিশোরকুমার বা অরিজিৎ সিং শুনবে না। পরেরদিন দেখা হলে একটা সরি চেয়ে কেন সম্ভব নয় বলে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিস। বেশি ঝামেলায় জড়াস না। পারলে কেবল টিভির অফিসে ফোন করে অন্য ছেলেকে কালেকশনে পাঠাতে বলিস, আর পেপারটাও।
–তুই ঠিকই বলেছিস। আমারও এখন মনে হচ্ছে গায়ে হাতটা না তুললেই হত।
–যাক গে বাদ দে, যা হওয়ার তা হয়েছে। আমি শুতে গেলাম। টেক কেয়ার।

 

রুনু জানালাটা খুলল। আজকে বিকেলের দিকে হালকা বৃষ্টি হওয়ায় বাতাসে কেমন একটা ভ্যাপসা ভাব। গুমোট গরম। তাও জানালাটা খোলায় একটা হালকা হাওয়া দিচ্ছে। ও ঠিক করল জানালাটা খুলেই শোবে। রুনু জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আজকের বিকেলটা কিছুক্ষণ রিওয়াইন্ড করল। তারপর নিজেকেই দুষতে লাগল। ছেলেটা প্রোপোজই তো করেছে, হরিণ তো মারেনি বা গাড়িও চাপা দেয়নি। ওরকমভাবে রাস্তায় গায়ে হাত না তুললেই হত। এলভিসের জন্য খারাপ লাগল রুনুর। ছেলেটা এমনিতে নম্র, লাজুক, পরোপকারী। মুখে না বলে দিলেও চলে যেত। কেন যে খামোখা চড় মারতে গেল কে জানে। আসলে ও নিজে যখন সামন্তককে আলেয়ার সঙ্গে ক্লাসে খুনসুটি করতে দেখেছিল, তখন থেকেই মাথাটা গরম ছিল। তারপর রাজীব ওকে হালকা টোন করায় আরও মেজাজটা খিচড়ে ছিল, যার সব রাগটা গিয়ে পড়েছিল এলভিসের ওপর। রুনুর বিছানাটা জানালার পাশেই, জানালা লাগোয়া একটা আম গাছ আছে। কী জাতের জানে না কিন্তু এই ভরা বর্ষাতেও দু একটা ফলন হয়েছে আর অপার্থিব এক সুগন্ধ বেরোচ্ছে। বিছানায় শুয়ে রুনু ভাবতে লাগল আগামীকাল দেখা হলে ও এলভিসকে সরি বলবে। সরি বললে কেউ ছোট হয় না, আর তাছাড়া সামন্তকের নিশ্বাসে ও একটা ভালোবাসার গন্ধ পেয়েছে। আর সেই গন্ধটা এখন ও নিজের নিশ্বাসেও পাচ্ছে। মোবাইলটা নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে একসময় ওর দু চোখ জুড়ে স্বপ্ন নেমে এল।

মাঝরাতে বাথরুম করতে যাওয়ার সময় সামন্তক হোয়াটস্যাপে দেখল একটা মেসেজ— ‘আমার সঙ্গে কাল সেকেন্ড পিরিয়ডের পর ক্লাস ব্যাঙ্ক মারতে পারবি? কথা আছে।’ সেন্ডারের নাম দেখে সে রাতে সামন্তকের আর ঘুম এল না। সায়নী কী বলতে চায়?

হাইড্রোফ্লুওরিক অ্যাসিডের কেমিক্যাল উপাদান নিয়ে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই এলভিসের। ও শুধু জানে এই অ্যাসিড মুখে মারলে সারা জীবনের মতো সব শেষ। অহঙ্কার, দেমাক, রূপ, অ্যারোগ্যান্সি সব। বুবুন একবার বলেছিল। এলভিস ঠিক করল এটাই ওর অপমানের সেরা প্রতিশোধ। বুবুনের পাঁচ মিনিট বাথরুমে যাওয়ার দরকার পড়তেই ও টুক করে দোকান থেকে সেই অ্যাসিডটা চুরি করে নিজের ঝোলায় পুড়ে নিয়েছিল। তারপর অপেক্ষা করছিল রাত গভীর হওয়ার। রাত গভীর হতেই ও চুপি চুপি বেরিয়ে পড়ল রুনুদের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে। ওর গা এখনও রি রি করছে। চড়টা কিছুতেই হজম হচ্ছে না। নিজেকে কুকুরের চাইতেও অধম মনে হচ্ছে। রুনুদের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দেখল রুনুর ঘরের জানাল খোলা। আর পাশেই আম গাছ। চড়চড় করে গাছ বেয়ে উঠেই ও দেখতে পেল রুনুকে। বিছানায় শুয়ে আছে, অকাতরে ঘুমোচ্ছে। হাতের মুঠোয় ওর মোবাইল। চুলগুলো এলোমেলো ছড়ানো। চোখটা একবার জ্বালা করে উঠল এলভিসের। মনে মনে বলল— জ্বালা কী জিনিস এবার তুমি বুঝবে রুনু।

 

এলভিসের কথা

কিছু কিছু মেয়েরা শপিং মলে রাখা দামি শোপিসের মতো হয়। কাছ থেকে দেখো, যত পারো কাছ থেকে দেখো কিন্তু ছোঁয়া নিষেধ। একবার আলতো করে ছুঁয়ে দেখলেও দেখতে পারো কিন্তু বাড়ি নিয়ে যেও না। আমার কাছে রুনু অনেকটা তাই। আমি তো শুধু ওকে দেখেছি, যতটা পারা যায় কাছ থেকে দেখেছি, আলতো করে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে থাকলেও ছুঁইনি কোনওদিন। হাউইকে কি ছোঁয়া যায়? মাথার অনেক ওপর দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আগুন জ্বালিয়ে একসময় অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। আর সেই অবস্থায় ছুঁতে গেলে আগুনের ছোঁয়াচ লাগে। আমি সেই আগুন ছুঁতে গিয়েছিলাম। হাত পুড়িয়েছি। আমার নিজেরই বোঝা উচিত ছিল মগডালে ফুটে থাকা ফুলের সৌন্দর্য শুধু দেখাতেই। তাই গতকাল যখন বুকে সাহস ও ধুকপুকানি দুটো নিয়েই রুনুকে প্রোপোজ করলাম, রুনু কিন্তু এক মুহূর্ত দেরি করেনি আমাকে একটা থাপ্পড় মারতে। হয়তো থাপ্পড়টার দরকার ছিল, না হলে আমি আমার কল্পনাকে মহাকাশ ছাড়িয়ে কোথায় যে নিয়ে গিয়ে ফেলছিলাম তা আমি নিজেও জানি না। বাস্তব যখন সামনে ধরা দিল তখন আমার গা হাতপা জ্বলছিল। রাগে। আমি ঠিক করলাম রুনুর মুখটা অ্যাসিডে পুড়িয়ে দেব। অ্যাসিড নেওয়া আমার কাছে কোনও বড় ব্যাপার না, আর সেটা ছোড়াও না। আমি গাছ বেয়ে জানালা দিয়ে রুনুর ঘরে উঁকি মারতেই দেখি রুনু ঘুমোচ্ছে, আমারই দিকে মুখ করে। শুধু চোখ দুটো বন্ধ। রুনুর এরকম রূপ আমি আগে কখনও দেখিনি। চুলটা খুলে মুখের ওপর পড়েছে তাতে একটা চোখ ঢাকা, ঠোঁটের কোণে একটা হালকা হাসিরেখা। আমার ইচ্ছে করছিল আলতো করে চুলটা মুখের ওপর থেকে সরিয়ে দি। কিন্তু আমার এক হাতে অ্যাসিড। রুনুকে ভালো করে লক্ষ করলাম আমি। ওর নির্ভুল চোখের পাতা। মানুষই তো ও, তাহলে যে বলে কোনও মানুষ একশো ভাগ পারফেক্ট হয় না? বোধহয় ভুল বলে। অবশ্য আমি অ্যাসিডটা ছুড়লে নিমেষে সব শেষ। যেমন ওর ঠোঁট। ফিনফিনে। ভয় হয় যেই ওর ঠোঁট ছুঁক যেন অমানুষ না হয়, আলতোর থেকে আরেকটু বেশি চাপ সহ্য করার ক্ষমতা বোধহয় নেই ওই ঠোঁটের। অবশ্য অ্যাসিড মারার পর ওই ঠোঁট আর ঠোঁট থাকবে না, দলাপাকানো কিছু একটা হয়ে যাবে। যেমন ওর চিবুকের ভাঁজ। এতটাই হালকা মনে হয় নরম থাকা অবস্থায় ওখানে কেউ আলতো আদর করে টোল ফেলে দিয়েছে। অ্যাসিড মারার পর কোথায় হারিয়ে যাবে সেই ভাঁজ কে জানে। আমার আর তর সইছে না। এখুনি কাজটা করে ফেলতে হবে। না হলে কেউ দেখে ফেললে জেলের ঘানি পাক্কা। তুমি খুব সুন্দর রুনু, কিন্তু সারা পৃথিবী জানবে তুমি খুব সুন্দর ছিলে। আর নেই। আমি অ্যাসিড ভরা বোতল সুদ্ধু হাতটা তুললাম। তারপর বোতলটা কাঁধের ঝোলায় রেখে দু হাতে গাছ বেয়ে নিচে নেমে এলাম।

আমি পারিনি, রুনুকে নষ্ট হতে দিতে আমি পারিনি। আমার জীবনের ব্যর্থ প্রেমের মত এটাও আমার একটা ব্যর্থতা। যারা ভালোবাসে তারা কখনওই তাদের ভালোবাসার মানুষটাকে নষ্ট হতে দিতে পারে না। দেওয়া উচিতও নয়। আর আমার নাম তো এলভিস। এলভিসরা জন্মায় সমাজের মুখে অ্যাসিড মারার জন্য, আর কারও মুখে মারার জন্য নয়। এলভিসরা জন্মায় মানুষকে ভালোবাসতে, ভালোবাসা শেখাতে। যুগে যুগে। একসময় যে নামটা আমার কাছে বড্ড অচেনা ছিল আজ সেটাই মনে হল আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো সার্থকতা। রুনু আমার জীবনে যে ভাবেই থাকুক না কেন, রুনু হয়েই থাকুক। অ্যাসিড হয়ে নয়। আবার কোনও একটা বৃষ্টির বিকেলে ও আসুক ছাতা হারিয়ে। আবার কোনও একটা সকালে কোনও একটা কোল্ড ড্রিঙ্কসের দোকানে এভাবেই দেখা হয়ে যাক। সেই সকাল বা সেই বিকেলেগুলোর অপেক্ষায় থাকাই তো আসলে বেঁচে থাকা। পেরেছি, আমার ভালোবাসাকে আমি বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি। ওই যে এলভিসের একটা গান আছে না— But I can’t help falling in love with you? ফাঁকা রাস্তায় হঠাৎ করে আসা বৃষ্টিটা আবার আমাকে নিজেকে ভালোবাসতে শেখাল।

 

পুনশ্চ: আপনারা ভাবছেন তাহলে অ্যাসিডের বোতলটার কি হল? কলোনি এলাকায় ঝোপঝাড়ের সংখ্যা কি কম? আর আমার থেকে এমনিতেও বুবুনের একশো টাকা মতো ধার ছিল।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...