দূষিত রাজধানী

ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

 

রাজধানীতে দূষণের মাত্রা ৬০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার কারণে ৩২টি বিমানের গতিপথ ঘুরিয়ে দেওয়া হল। গত ৬ নভেম্বর শনিবার যেখানে দিল্লিতে দূষণের মাত্রা (Delhi AQI) ছিল ৪০৭, সেখানে রবিবার বাতাসে বায়ুদূষণের সূচক বা একিউআই বেড়ে ৬২৫-এ পৌঁছে যায়। গোটা শহর জুড়ে এতটাই ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে যে শ্বাস নেওয়াও দুষ্কর হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এই পরিস্থিতিকে “অসহনীয়” আখ্যা দিয়ে বলেন যে দিল্লির মানুষ এমন ভোগান্তির শিকার (Delhi Pollution) হচ্ছেন যাতে “তাঁদের কোনও দোষ নেই”।

দিল্লি দূষণ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে আর্জি জানিয়ে ক্রিকেটার হরভজন সিং বলছেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, দিল্লি, পাঞ্জাব এবং হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই বিষয়ে নিবেদন জানাচ্ছি। প্রত্যেকের এমনকি চাষীদের কথা মাথায় রেখে প্রত্যেক নেতাদের উচিত নিজেদের মধ্যে বৈঠক করে এই বিষয়ের সমাধান করা।”

সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “প্রধানমন্ত্রী মোদি আপনার কাছে আমার আর্জি কীভাবে ভারতকে আরও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তোলা যায় এবং স্বাস্থ্যকরভাবে জীবনধারণ করা যায়, সেই বিষয়ে আপনি আমাদের পথ দেখান। পরিবেশ পরিষ্কার করে তোলার জন্য প্রত্যেকেই আমরা অবদান রাখতে চাই।”

পরিবেশবিদদের মতে “দিল্লিতে দূষণের স্বাভাবিক উৎস ছাড়াও রয়েছে এক বিশেষ ওয়েদার প্যাটার্ন— অ্যান্টি সাইক্লোন। যার জন্য বাতাসের গতিবেগ প্রায় শূন্যে নেমে গেছে, আর যেটুকু বাতাস আছে তাতে বাইরের পলিউট্যান্টগুলো দিল্লিতে ঢুকছে, কিন্তু দিল্লি থেকে বেরোতে পারছে না।”

এক অফিসযাত্রী বলছিলেন, “কুয়াশার সঙ্গে দিল্লির পরিচয় আছে ভালোই কিন্তু এটা কুয়াশা নয়, কারণ এতে চোখ অসম্ভব জ্বলছে। বাড়ির সিঁড়িতে, গাড়ির ওপর নিমেষে পুরু কালো ধুলোর আস্তরণ পড়ে যাচ্ছে। সেদিন আমি তো শুনলাম দিল্লির এই বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া দিনে ৩৫টা সিগারেট খাওয়ার মতোই সমান ক্ষতিকর।” দিল্লিবাসীরা বলছেন, “পরিস্থিতি অবর্ণনীয়— মানুষ শ্বাস নিতে পারছে না, চোখ জ্বলছে। এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে?” আলোর তেজ এতটাই ফিকে যে মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরের ট্র্যাফিক সিগনালও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

তাহলে পরিবেশবিদ, অফিসযাত্রী এবং সর্বোপরি দিল্লিবাসীর ভাষাকে সঙ্গী করে আমাদের প্রথমেই জানতে হবে দূষণ, কুয়াশা, ধোঁয়াশা বলতে আমরা কি বুঝি? উইকি অনুসারে দূষণ হল সেই অবস্থা যা মানুষের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট ক্ষতিকর পদার্থ ও তা নির্গমনের কারণে স্বাভাবিক পরিবেশের উপর প্রভাব পড়ে।

কুয়াশা হল ভূমির সংস্পর্শে থাকা মেঘমালা। মেঘকেও আংশিকভাবে কুয়াশা বিবেচনা করা যায়, মেঘের যে অংশটুকু মাটির ওপরে বাতাসে ভাসমান থাকে তা কুয়াশা হিসেবে বিবেচিত নয়, তবে মেঘের ভূমির উঁচু অংশের সংস্পর্শে থাকা মেঘকে কুয়াশা বলা হয়। আর সংক্ষেপে ধোঁয়া আর কুয়াশার সংমিশ্রণকে ধোঁয়াশা বলে। কুয়াশা আর ধোঁয়াশার মধ্যে পার্থক্য হল এদের ঘনত্বে, যা কিনা এদের ফলে সৃষ্ট দর্শনযোগ্যতার হ্রাস দ্বারা হিসাব করা হয়: কুয়াশার কারণে দর্শনযোগ্যতা ১ কিমির কম হয়, যেখানে ধোঁয়াশা দর্শনযোগ্যতা ২ কিমির বেশি হ্রাস করে না।

তবে ধোঁয়াশা যে কত বিপজ্জনক হতে পারে সে ঘটনা হয়ত আপনাদের অনেকেরই জানা আছে।

১৯৫২ সালের ডিসেম্বরে লন্ডন এক বিরাট বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়ে ভয়ঙ্কর বায়ু দূষণের শিকারে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে মারা গিয়েছিল হাজার হাজার মানুষ। ‘দ্য গ্রেট স্মগ’ বা ভয়ঙ্কর ধোঁয়াশা নামে পরিচিতি পাওয়া সেই ঘটনার আজও ইতিহাস সাক্ষী। বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ‘গ্রেট স্মগ’ কেড়ে নিয়েছিল ৮,০০০ থেকে ১২,০০০ প্রাণ। কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না সে মৃত্যুর মিছিল। কুয়াশায় পথ হারিয়ে ফেলা পাখিরা অহরহ বিল্ডিংয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে প্রাণ হারাতে শুরু করে।

লন্ডনের আকাশ এমন অন্ধকার ছিল কেউ যেন ঘন কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছিল পুরো নগরী। ১৯৫২ সালের সেই ডিসেম্বরে লন্ডন পরিণত হয়েছিল এক মৃত্যুকূপে। ব্রিটেনে তখন জ্বালানির প্রধান উৎস কয়লা। আর এই কয়লা পোড়ানো ধোঁয়ার সঙ্গে মিশল শীতের ঘন কুয়াশা। দূষিত বায়ুতে ঢাকা পড়ে গেল পুরো নগরী। স্মরণকালের ইতিহাসে এরকম ভয়ঙ্কর স্মগ বা ধোঁয়াশা মানুষ আর দেখেনি। এই ধোঁয়াশা শুরু হয়েছিল এক শুক্রবারে। একেবারে কালো। কখনও একটু হলদেটে। হলদেটে হওয়ার জন্য এটাকে ‘পি স্যুপ’ বলে বর্ণনা করা হয়েছিল। অনেক ধরনের দূষিত জিনিস মিশে এই স্মগ তৈরি করেছিল। সেই দূষিত কণাগুলি আবার মিশেছিল কুয়াশার সঙ্গে। গন্ধ ছিল, স্বাদও ছিল— একটু অম্লজাতীয়। এই ধোঁয়াশা যেখানেই লেগেছে, গায়ে, পোশাকে— সব নোংরা হয়ে গেছে। ভয়ঙ্কর এক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছিল। যে মাত্রার দূষণ তৈরি হয়েছিল, তা অবিশ্বাস্য। এক মিটারের বেশি দৃষ্টি যাচ্ছিল না। ব্যবসায়ীদের সংগ্রহে থাকা কফিন আর ফুলের দোকানের তোড়া শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত বোঝাই যায়নি অবস্থা ঠিক কতটা ভয়ানক হয়ে পড়েছে। ব্রঙ্কাইটিস আর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায় সাতগুণ। লন্ডনের ইতিহাসে মৃত্যুহার বেড়ে যায় নয়গুণ। এক ধোঁয়াশা কী ভয়াবহতা দেখাতে পারে, হাঁ করে কেবল যেন তা-ই প্রত্যক্ষ করেছিল লন্ডনবাসী। প্রাথমিক তথ্য মতে, স্মগ বা ধোঁয়াশা শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই প্রায় ৪,০০০ ব্যক্তি অকালে প্রাণ হারায়।

সালফারের তৈরি এক নরকের মধ্যে বসবাসরত লন্ডনের প্রতিটি প্রাণী কিছুটা মুক্তি পায় ঠিক পাঁচদিন পর, অর্থাৎ ডিসেম্বরের ৯ তারিখে। উত্তর সাগর থেকে ভেসে আসা প্রচণ্ড বাতাসের বেগ লন্ডনের আকাশ থেকে বিষাক্ত মেঘপুঞ্জ কিছুটা হলেও তাড়িয়ে দিয়ে পরিষ্কার আকাশ দেখাতে সক্ষম হয়।

কয়লার প্রাধান্য থাকা শহরটি থেকে প্রাথমিক তাপের উৎস কয়লা সরিয়ে ফেলে জনগণকে গ্যাস, তেল এবং বিদ্যুৎমুখী করতে সময় লেগে যায় প্রায় ৬৫ বছর। আর এই সুদীর্ঘ সময় জুড়ে বারংবার লন্ডনের আকাশে-বাতাসে ফিরে আসে ধোঁয়াশা, ঠিক যেন হরর মুভির কোনও দৃশ্যের অবতারণা করে কেড়ে নিয়ে যায় নিরীহ কিছু জীবন। ১৯৬২ সালের ধোঁয়াশার ফলে মারা যায় প্রায় ৭৫০ মানুষ। ধাপে ধাপে ধোঁয়াশা আসা-যাওয়া করতে থাকলেও কোনওটিই ১৯৫২ সালের মতো ভয়াবহ রূপ নেয়নি সেটাই বাঁচোয়া।

ধোঁয়াশার ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ বিষয়ক সরকারি তদন্তের উপর ভিত্তি করে একপ্রকার বাধ্য হয়ে ১৯৫৬ সালে ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ বা বিশুদ্ধ বাতাস আইন পাস করে সংসদ। এই আইন অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে কয়লা পোড়ানো একদম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। স্থানীয় কাউন্সিলের পরামর্শ অনুযায়ী, শহরের প্রধান প্রধান এলাকাগুলোকে ধূমপান মুক্ত এলাকা ঘোষণা করা হয়। এমনকি ঘরে ফায়ারপ্লেস জ্বালানোর কাজেও কয়লার পরিবর্তে বিদ্যুৎ বা অন্য কোনও তাপ উৎপাদী পদ্ধতি ব্যবহারেও বাধ্য করা হয় নগরবাসীকে।

 

দিল্লির বাতাস কেন এত দূষিত?

এই প্রশ্নের উত্তর নিহিত রয়েছে দিল্লির বাতাসের ধোঁয়াশা (ধোঁয়া+কুয়াশা)-র মধ্যে। একটি কারণ হল দিল্লির ভৌগোলিক অবস্থান। উর্বর সমতলভূমিবিশিষ্ট দিল্লির বায়ু চলাচল ব্যবস্থা হিমালয় পর্বতমালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং বায়ু চলাচল এই পর্বতমালা দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়। গ্রীষ্মকালীন সময়ে ঘনীভূত উত্তাপ ধোঁয়াশাকে বায়ুমণ্ডলের উচ্চতর স্তরে পাঠিয়ে দেয় এবং একই সময়ে ভারত মহাসাগর থেকে আসা মৌসুমী বায়ু এই ধোঁয়াশাকে আরও বৃহৎ পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়। শীতকালে সকালের কুয়াশা ধুলোকে ঘনীভূত করে মাটির সংস্পর্শে রাখে এবং কদাচিৎ পর্বতমালা থেকে আগত শীতল বায়ুপ্রবাহে এই ধুলো ঘনীভূত অবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ধুলো এবং ধোঁয়া একত্রিত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি করে।

 

দূষণকারী উপাদানগুলোর উৎস কোথায়?

উষ্ণ আবহাওয়ার ফলে সৃষ্ট চিরাচরিত ধুলোবালির পাশাপাশি অসংখ্য নির্মাণাধীন স্থাপনা, লক্ষাধিক নিম্নমানের আস্তরবিশিষ্ট সড়ক, সড়ক নির্মাণে উচ্ছিষ্ট জ্বালানি দ্বারা বিটুমিন পোড়ানো, কয়লা জ্বালানি দ্বারা চালিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শ্মশান চুল্লি, চাষের জমিতে আগাছা ও খড় পোড়ানো, কারখানা ও জ্বালানি চুল্লিতে সস্তা ও নিম্নমানের জ্বালানি তেলের ব্যবহার, লক্ষাধিক নিম্নমানের যন্ত্রাংশে চালিত যানবাহন এবং এগুলো কর্তৃক ব্যবহৃত নিম্নমানের জ্বালানি তেল, ডিজেলচালিত লোকোমোটিভ রেল ইঞ্জিন ও জেনারেটর এবং রান্নার কাজে গরুর গোবর ও কাঠের চুল্লি ব্যবহার এখানে বায়ু দূষণের প্রধান কারণ।

হেমন্ত পরবর্তী সময়ে গম বা ধান তোলার পরপরই তাৎক্ষণিকভাবে জমিকে ধান চাষের উপযুক্ত করার জন্য ফসলের উচ্ছিষ্ট গোড়া বা শিকড় অপসারণ করার মতো ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কৃষকের কাছে নেই। তাই এই উচ্ছিষ্ট আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলা কৃষকের কাছে সহজসাধ্য এবং এই চর্চা বহুকাল ধরে চলে আসছে। বছর দশেক আগে ভূ-গর্ভস্থ জলের স্তর ভয়াবহভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজ্যগুলির ধানচাষিরা বর্ষাকালের আগমন পর্যন্ত ধানচাষ বিলম্বিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন। যদিও বর্ষাকালে জলের স্তর স্থিতাবস্থায় এসেছিল কিন্তু তাদের এই বিলম্বে চাষ করার ফলে ফসলের উত্তোলনকাল সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। এখন ধান উত্তোলনের পর কৃষকেরা যখন উচ্ছিষ্ট আগাছা পোড়ানো শুরু করেন তার আগেই বর্ষা মৌসুম শেষ হয়ে যায়। এই বিপুল পরিমাণ ধোঁয়ার মেঘকে অদৃশ্য করার মতো কোনও বায়ুর প্রবাহ ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না থাকায় ধোঁয়াগুলি দক্ষিণ-পূর্বদিকে গিয়ে দিল্লির আকাশে জড়ো হয়। তাই দিল্লি লাগোয়া রাজ্যে অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে খড় পোড়ানো। রাজধানীর দূষণ রোধে এটাই সুপ্রিম কোর্টের নিদান৷ বিচারপতি অরুণ মিশ্র এবং বিচারপতি দীপক গুপ্তার বেঞ্চ কৃষকদের নিরাশ করেননি৷ তাঁরা নির্দেশ দিয়েছেন, পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তরপ্রদেশের যে সব ছোট এবং মাঝারি কৃষক খড় পোড়াননি, তাঁদের কাছ থেকে কুইন্টাল প্রতি ১০০ টাকা দরে খড় কিনে নেবে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার৷ সাত দিনের মধ্যে সেটা করতে হবে। খড় প্রক্রিয়াকরণের জন্য চাষিদের বিনামূল্যে যন্ত্রপাতিও সরবরাহ করবে সরকার, নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত৷

 

দিল্লির দূষণের বিরুদ্ধে পদেক্ষেপ: গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান (GRAP)

দিল্লির বাতাসে দ্রুত বাড়তে থাকা দূষণের মোকাবিলায় ভাবা হয়েছে কয়েক ধাপের গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যান (GRAP), যার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গৃহীত হয়েছে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলি।

গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের আওতায় চলতি বছরের ১৫ অক্টোবর দিল্লি এবং সংলগ্ন এলাকায় দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বলবৎ হয় বেশ কিছু কড়া পদক্ষেপ। এই অ্যাকশন প্ল্যান গত দু’বছর ধরে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দিল্লি এবং এনসিআর (ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়ন বা দিল্লি মহানগর অঞ্চল) এলাকায় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পরিবেশের মান উন্নয়নের জন্য চালু করা হয়েছে। কিন্তু এবছর যা নতুন, তা হল ডিজেল জেনারেটরের ব্যবহার রুখতে যা যা পদক্ষেপ, তা দিল্লি ছাড়িয়ে সমগ্র এনসিআর-এই বলবৎ করা হবে।

ইপিসিএ-র সঙ্গে বিভিন্ন রাজ্য সরকারের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের বৈঠকের ফলেই তৈরি হয় GRAP, এবং ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন পাওয়ার পর ২০১৭-য় বিজ্ঞাপিত হয় তা। দূষণ যত বাড়তে থাকে, তত ক্রমবর্ধমানভাবে লাগু হতে থাকে এই প্ল্যানের নিয়মাবলী।

তবে GRAP একটি আপৎকালীন পদক্ষেপ। বছরের অন্যান্য সময় কলকারখানা, যানবাহন, বা জ্বালানিজনিত দূষণের মোকাবিলায় বিভিন্ন রাজ্য সরকার সাধারণভাবে যা যা পদেক্ষেপ নেয়, সেগুলি GRAP-এর আওতায় পড়ে না।

বাতাসের মান ‘খারাপ’ (poor) থেকে ‘খুব খারাপ’ (very poor) হলেই মেনে চলতে হবে এই দুটি বিভাগের অন্তর্গত বিধিনিষেধ। বাতাসের মান যদি ‘গুরুতর+’ (severe+) হয়, GRAP-এর বিধান হল, বন্ধ করতে হবে স্কুল, এবং লাগু হবে সড়ক পরিবহণে ‘অড-ইভেন’ বা জোড়-বিজোড় নীতি, যা গাড়ির নম্বরের জোড় বা বিজোড় সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত।

সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত জোড় সংখ্যার গাড়িগুলো চলবে রাস্তায়। অর্থাৎ যে গাড়ির নম্বরের শেষে ০, ২, ৪, ৬, এবং ৮ সংখ্যা রয়েছে সেই গাড়িই চলবে রাস্তায়। এর জেরে রাজধানীর রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা কিছুটা কমবে। গোটা ঘটনাটিতে নজরদারি চালানোর জন্য প্রায় ২০০ বাহিনী ট্রাফিক পুলিশ ও ৫০০ সিভিল ডিফেন্স ভলান্টিয়ার মোতায়েন করা হয়েছে।

তা দিল্লির স্কুল তো বন্ধ হয়েছে। এবং জোড়-বিজোড় নীতি এমনিতেও ৪ নভেম্বর থেকে লাগু হওয়ার কথা।

দূষণের মাত্রা অনুযায়ী বাতাসের বিভাগগুলি একটু বিস্তারে জানা যাক—

‘গুরুতর+’ অথবা ‘আপৎকালীন’ (emergency), অর্থাৎ ৪৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৩০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার বা পিএম ১০-এর মাত্রা ৫০০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার হলে। এর জন্য GRAP-এর দুটি বিধান আগেই বলা হয়েছে। আরও দুটি বিধান হল:

  • দিল্লিতে ট্রাকের প্রবেশ বন্ধ করা (জরুরি সামগ্রী বহনকারী ট্রাক বাদে),
  • নির্মাণের কাজ বন্ধ করা।

‘গুরুতর’ (severe): এক্ষেত্রে বাতাসের মান সামান্য উন্নত, (পিএম ২.৫-এর মাত্রা ২৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার বা পিএম ১০-এর মাত্রা ৪৩০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটারের বেশি)। GRAP-র নিয়ম হল:

  • ইট ভাটা, হট মিক্স কারখানা, স্টোন ক্রাশার বন্ধ করে দেওয়া;
  • কয়লা যথাসম্ভব কম পুড়িয়ে ন্যাচারাল গ্যাস থেকে শক্তি উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া;
  • নাগরিকদের জনপরিবহণ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করা;
  • যান্ত্রিক উপায়ে রাস্তাঘাটের সাফাই বাড়ানো, জল ছড়িয়ে দেওয়া।

খুব খারাপ’: পিএম ২.৫-এর মাত্রা ১২১-২৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার বা পিএম ১০-এর মাত্রা ৩৫১-৪৩০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার। এক্ষেত্রে নিয়ম:

  • ডিজেল জেনারেটর ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা,
  • গাড়ির পার্কিং ফি তিন-চার গুণ বাড়িয়ে দেওয়া,
  • বাস এবং মেট্রো পরিষেবা বাড়িয়ে দেওয়া,
  • বহুতল বাড়ির বাসিন্দাদের শীতকালে আগুন না জ্বালিয়ে ইলেকট্রিক হিটার ব্যবহার করতে উৎসাহ দেওয়া,
  • শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগের সমস্যা থাকলে বাড়ির বাইরে বেশি না যাওয়া।

মাঝারি’ (moderate) থেকে ‘খারাপ’: পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৬১-১২০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার বা পিএম ১০-এর মাত্রা ১০১-৩৫০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার।

  • – জঞ্জাল পুড়িয়ে সাফ করতে গেলে ভারী জরিমানা;
  • – ইটভাটা বা অন্যান্য কারখানায় হয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধি বলবৎ করা, অথবা সেগুলি বন্ধ করে দেওয়া;
  • – বেশি যান চলাচল করে এমন রাস্তা যন্ত্রের সাহায্যে সাফ করা এবং জল ছিটোনো;
  • – কড়াভাবে আতসবাজির ওপর নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা।

 

আমার শহর কলকাতার কি অবস্থা?

দূষণ নিয়ে গোটা রাজধানীজুড়ে যখন ত্রাহি ত্রাহি রব, তখন কলকাতার বাসিন্দাদের কাছে একটাই প্রশ্ন আমার শহর কেমন আছে? দূষণের মাত্রা কি পরিমাণে আছে? কলকাতা কতটা সুরক্ষিত আছে? এই মুহূর্তে কলকাতা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের হিসাব অনুযায়ী বাতাসের গুণগত মানের পরিমাণ (০৭/১১/২০১৯)— কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল থেকে মাপা দূষণের মাত্রা রাত ৮টায় ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৫১ মাইক্রোগ্রাম৷ রাত ৯টায় ৩৫৩ মাইক্রোগ্রাম এবং রাত ১০টায় ছিল ৩৫০ মাইক্রোগ্রাম। সেখানে দিল্লিতে বুধবার রাত আটটায় ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৩৩০ মাইক্রোগ্রাম৷ রাত ৯টায় ৩২৯ মাইক্রোগ্রাম এবং রাত ১০টায় ৩৩৪ মাইক্রোগ্রাম৷ সহনীয় মাত্রা যেখানে ৬০ মাইক্রোগ্রাম৷ অর্থাৎ, দিওয়ালির দিল্লিতেও দূষণ মাত্রাছাড়া। কিন্তু, কলকাতায় তার থেকেও বেশি ৷

মানুষকে যদি সুস্থ রাখতে হয় তবে WHOর নিয়ম অনুসারে বাতাসে পিএম ০.২৫-এর গুণগত মানের সূচক রাখা উচিত ২৫ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার। আর ২০০৯ সালে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে তা ৬০ মাইক্রোগ্রাম প্রতি ঘনমিটার রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সরকারের তরফে। কিন্তু গত ১০ বছরে পরিবেশ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে, সে ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্তের মাপকাঠিতেও কলকাতার বাতাসের গুণগত মানের সূচক নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে ছয় গুণ বেশি! আর যদি WHOর মাপকাঠিতে বিচার করা যায়, সেক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে কলকাতার বাতাসের গুণগত মানের সূচক নির্দিষ্ট মাত্রার থেকে প্রায় বারো-তেরো গুণ বেশি, যা বিপদসীমার অনেকটাই ওপরে।

আরও আশঙ্কা করা যায় যখন নভেম্বরের শেষের দিকে আরও ঠান্ডা পড়বে অর্থাৎ শীত পাকাপাকিভাবে এ রাজ্যে প্রবেশ করবে, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে এবং দূষণের মাত্রা অনেকটাই বেড়ে যাবে এই শহরে। সূত্রের খবর যে  সমস্ত যন্ত্রের মাধ্যমে বাতাসের গুণগতমান বিচার করা হয় সেই সমস্ত যন্ত্র কলকাতার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কম পরিমাণে রয়েছে। যেখানে দিল্লিতে চল্লিশটিরও বেশি যন্ত্র রয়েছে, সেখানে কলকাতায় রয়েছে মাত্র সাতটি। দিল্লির ক্ষেত্রে এই সমস্ত যন্ত্রগুলি জনবহুল এলাকা, যেখানে জনঘনত্ব বেশি, যেখানে দূষণের মাত্রা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা, সেই সমস্ত জায়গাতেই বসানো রয়েছে কিন্তু কলকাতার ক্ষেত্রে তা একেবারেই অন্যরকম।

কলকাতার ক্ষেত্রে বাতাসের গুণগত মান পরীক্ষা করার যে যন্ত্রগুলি, সেগুলির মধ্যে অনেক গুলি বসানো রয়েছে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জায়গায়। যেমন রবীন্দ্র সরোবর, ভিক্টোরিয়া চত্বর, ময়দান চত্বর, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অথচ যেখানে জনঘনত্ব বেশি যেমন খিদিরপুর, শিয়ালদা, মৌলালি, পার্ক সার্কাস, শ্যামবাজার, ভবানীপুর, কালীঘাট, রাজাবাজার, ট্যাংরা, বেহালা, টালিগঞ্জ বা দমদম এলাকায় বাতাসের গুণগত মান পরীক্ষা করার যথেষ্ট যন্ত্রই নেই আর তাই কলকাতাকে দূষণমুক্ত করার সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। যদি কলকাতার এই সমস্ত জনবহুল এলাকায় দূষণ বা বাতাসের গুণগতমান পরীক্ষা করার যন্ত্র বসানো যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে হয়ত দেখা যাবে দিল্লির মতই ভয়ঙ্কর অবস্থা কলকাতার বাতাসেরও।

বাতাসের গুণগত মানের সূচক যদি অনেকটাই উপরে চলে যায় অর্থাৎ ২০০-৩০০তে পৌঁছে যায় সেক্ষেত্রে সবক্ষেত্রেই যেটা দেখা যায় সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং করা হয়, মানুষকে সতর্ক করা হয় যাতে তারা যতটা সম্ভব বাড়ির ভিতরে থাকেন বা যাদের বেরোতে হবে, ঠিক কী ধরনের সুরক্ষা নিয়ে তারা বেরোবেন, ইত্যাদি তাদের জানানো হয়। কিন্তু কলকাতার ক্ষেত্রে এই ধরনের কোনও জনসচেতনতার উদ্যোগ এখনও সেভাবে চোখে পড়েনি। তাই দূষণ মানচিত্রে এইমুহূর্তে কলকাতার অবস্থান ঠিক কোথায় সেই চিত্রই তুলেই ধরা যাচ্ছে না।

অবশ্য কলকাতার দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ আশ্বাস দিয়েছেন দূষণের নিরিখে কলকাতার পরিস্থিতি দিল্লির থেকে অনেকটাই ভালো, তবে বেশকিছু জনসচেতনতার উদ্যোগ খুব শীঘ্রই নেওয়া হচ্ছে যাতে দূষণমুক্ত করা যায় কলকাতাকে। শুধু কলকাতাই নয় গোটা রাজ্যে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন তারা।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...