লোভ, প্রেম এবং কনফেশন— প্রগতি বৈরাগী একতারার কবিতা

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 

সালটা ১৯৫৯। সমালোচনার বিষয় কবি রবার্ট লাওয়েলের চতুর্থ কবিতার বই ‘লাইফ স্টাডিজ’। সমালোচক এম রোজেনথাল বইটি সম্পর্কে আলোচনায় ব্যবহার করলেন ‘কনফেশনাল’ শব্দটি। তারপর থেকে লাওয়েল, ডব্লু ডি স্নডগ্রাস, সিলভিয়া প্লাথ, অ্যানে সেক্সটন, জন বেরিম্যান— কনফেশনাল কবিতার ঝড় তুললেন। সেভাবে বিধিবদ্ধ কোনও গোষ্ঠীর পর্যায়ভুক্ত করা না গেলেও একধরনের মনোলগ, প্যাথোজ, ব্যক্তিগত না-পাওয়া, অভিমানবোধ এবং প্রায়শই চলে আসা আত্মহনন কবিতার বিষয় হয়ে উঠল। সে এক অন্য ইতিহাস…

প্রসঙ্গে আসি। তরুণ কবি প্রগতি বৈরাগী একতারার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোভ বলতে যতটুকু বুঝি’। এবছর ‘আজকাল’-এর প্রকাশনায় একগুচ্ছ তরুণ প্রতিভাবান এবং বলিষ্ঠ কবিদের বেরোনো কবিতার বইগুলির ভেতর ‘লোভ বলতে যতটুকু বুঝি’ অন্যতম। সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচ্ছদে এক বোহেমীয় মেদুরতা। কোথায় লোভ? কিসের লোভ? লোভ বলতে কতটুকু বুঝেছেন প্রগতি? আমারই লোভ জাগল। গভীরে ঢুকলাম…

যে কনফেশনের কথা বলছিলাম, প্রগতির কবিতা, স্পেস, বিন্যাস, ভাষা, চলন— আমায়, বিশ্বাস করুন, এক্কেবারে সেই কনফেশনাল পোয়েট্রির কথাই, কেন জানি না, হুবহু মনে করিয়ে দিল। কবিতার সঙ্গে যাপন প্রগতির। প্রেমিকের মতো। সঙ্গমাশ্রিত এক বোধের মতো। তার সঙ্গে কথোপকথন। প্রগতির নির্মাণে প্রেম এক চরিত্র এখানে। রবার্ট লাওয়েলের কথা বলছিলাম। সেই লাওয়েল, যার কথায়, ‘কবিতা কোনও ঘটনার পরম্পরা নয়, কবিতা নিজেই এক ঘটনা।’ প্রগতির লেখায় প্রেম, প্রেমের কবিতাগুলো নিজেই এক একটা ঘটনা, চরিত্র। ওঁর কবিতায় ‘ভলকে ভলকে প্রেম উঠে আসে।’ নিজস্ব পুরুষের সঙ্গে আশ্লেষ। সেতুবন্ধন। ‘ও আমার মধ্যে ঢুকে পড়ছে, আমি ওর …।’ সে কখনও তীব্র অভিমানী মেয়ে, সান্ত্বনাহীনা। তার অভিমান। কথা। মনোলগ। ‘রাস্তা পেরোবার সময়ে একশো আটবার তোমার নাম ফুঁপিয়েছি।’ প্রেমের সংজ্ঞা নির্মাণ। সরাসরি। কোনওরকম আড়াল রাখেননি প্রগতি। ‘প্রেম আসলেই এক দীর্ঘ শুঁড়িখানা।’ পরিণতি? ‘আমাদের মিলনের মতো, বিচ্ছেদও প্রবাদসমান।’ নির্মেদ সত্য। পাশাপাশি, প্রগতি এখানে অনেকরকম সম্ভাবনা দেখেছেন। প্রেমের নিরাকার স্বরূপ দেখেছেন। ক্রুড রিয়েলিটি দেখেছেন। তাই পরকীয়া এসেছে। এসেছে বিবাহ। অথবা রান্নাঘর, বিষাদ, কথা কাটাকাটির শূন্য চরাচর। ‘এইসব দেখাশোনা শান্ত হয়ে যায়/ বিবাহের রাতে/ লোডশেডিং-এর মতো অবসাদ জাগে’। অথবা ‘কমলায় জড়ানো হলুদ/ বিবাহের অনুষঙ্গ জানে’। যে আত্মহননের বোধের কথা শুরুতেই বলছিলাম, প্রগতি তাকে নিয়েই খেলেছেন। নিজস্ব অভিব্যক্তির মতো। যেন এই তো কালকের সকাল। যেন এই তো শিরায় কাটা দাগ, ফ্যানের ব্লেড, কড়িকাঠের দোলায়মানতা। এ কি কবিতার জন্য নির্মাণ? নাকি নিজেই এক পরিণতি? ‘ফলপ্রসূ আত্মপরিচয়?’ ‘লোহিত টুপটাপ’ কিংবা ‘বুজকুড়ি কাটা ফিনকি লাল’ কবির নিজস্ব বর্ণ। তার ‘সেলাই করা বাঁদিক’ তার পরম যত্নে এক বোধ। তবু এও তো শেষ সত্য নয়। কারণ প্রগতি এক সাফিক্স জুড়ে দিয়েছেন। ‘যখন তুমি অন্য কোথাও জমাট বেঁধে/ যখন তোমার মুখ পাথরের মতো’। প্রেম, আসলে বীভৎস এক প্রেমের কাঙাল কবি। তার কবিতা। তার নারীত্ব। ‘বিপন্ন প্রেমিকা’ যেন। যে ‘স্নায়ু থেকে চোখ খুলে রাখে’। তবু সব শেষে, সব সবকিছুর শেষে বাক্স খুলে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে প্যান্ডোরা। প্রগতি বলেন— ‘এঁটো পাতে এঁকে যাব আদ্যন্ত তোমাকে’।

অসম্ভব এক শব্দকল্পের নির্মাণ প্রগতির কবিতার জুড়ে। ভাষাগত দখল, তার প্রয়োগ এতটাই সাহসী এবং পর্যাপ্ত— মাঝে মাঝে মনে হয় প্রথম কাব্যগ্রন্থ তো? কবিকে চিনতে ইচ্ছে হয়। সে এক মেয়ে। যে ‘জ্বলে উঠছে, নিভে যাচ্ছে লিখনস্বভাবে’। প্রগতি তাঁর নিজস্ব ভাষায় স্বরূপ খুজেছেন। চিনিয়েছেন। ‘পৃথিবীর পেট থেকে শব্দ তুলে আনি/ শব্দ আমাকে খায়—’। মায়াজালের বিস্তার। ‘সংসারবর্ণ অক্ষর ছড়িয়ে বসেছেন ঈশ্বর/  আমি তাঁকে গর্ভে নিয়ে কবিতা পোহাচ্ছি’। আঃ। কী এক আরাম প্রগতি। ‘স্তবকে স্তবকে ফোটে আদিশস্য/  শব্দস্মারক’। ঠিক, এই শব্দবন্ধই মনে গেঁথে যায়। ‘শব্দস্মারক’। অথবা প্রগতির নিজের কথায় ‘সঙ্গভুক ইমেজারি’। কিভাবে যেন তার চলাচল। ভাষা হারায় তার ব্যাখ্যায়— ‘মেঘডম্বরু/ নিরন্তর জলপ্রপাতের শব্দ/ শনৈ শনৈ উপচে ওঠা দুর্মর হৃদিপ্রবাহ’।

এই প্রগতিই নিজেকে কখনও ভেঙেছেন। প্রথম কাব্যগ্রন্থের স্বভাবসিদ্ধ থিম্যাটিক কোনও মূর্তি দেননি। যে প্যাথোজ, যে তীব্রতার কথা বলছিলাম, তার ঠিক পাশাপাশিই ছবি এঁকেছেন পায়ে পায়ে আসা ‘সবচেয়ে ছোট্ট মাধবীলতা’র। উঠে এসেছে ‘দীঘল চোখের পুঁইলতা’। ‘ছিপছিপে কিশোর জারুল’। ‘বালিকামুখের দুটি সূর্যমুখী চারা’। সেই নির্মাণ প্রগতি নিজেই কোথাও গড়েন। পাশাপাশি পাঠক হিসেবে আমিও। পরের পাতায় আবার হোঁচট। অন্য প্রগতি। যে ইমেজ আমিই পড়তে পড়তে দাঁড় করালাম, প্রগতির কথায় ‘আমি তাকে ভেঙে দিচ্ছি ভেঙে দিচ্ছি ভেঙে দিচ্ছি …।’ সরাসরি উচ্চারণ। ‘দুমাসের মজুরি না পেলে/ মধুর পৃথিবীখানি নিকৃষ্ট তৃতীয়ে নেমে আসে’। স্যাটায়ার। ‘ন্যায়বিচারের দেশে/ চিহ্ন ছাড়া মেলে না আহার’। অথবা, ‘রাষ্ট্র আমাকে উদার করেছে, রঙিন।’ এই প্রগতি কোথায় ছিল? কোথায় জমে ছিল? ঘোর লাগে। পড়ি। ‘আর কতবার ঘর পুড়লে, বুকে কটা ছ্যাঁদা হলে/ মানুষে বিশ্বাস হারাবেন আপনারা!’ ছেঁড়া পর্দা। কামড়ের আগে উপকথার ভালুকের মতো সরিয়ে নেওয়া সাবধানী চোয়াল। অথবা বেগুনি চিঠি। ‘যার শেষটুকু অগুন্তি এক্সো এক্সো-এর পর ভেঙেচুরে যাচ্ছে, ‘আমি অ্যাম, আই অ্যাম, আই অ্যাম’’। চলে আসেন সেই সিলভিয়া প্লাথ। তাঁর ‘বেল জার’। সমগ্র জীবন জুড়ে থাকা মৃত্যুবোধ। নাকি মৃত্যু জুড়ে থাকা জীবনবোধ? দুটোই হয়ত। ‘আই টুক এ ডিপ ব্রেথ অ্যান্ড লিসন টু দ্য ওল্ড ব্র্যাগ অফ মাই হার্ট। আমি অ্যাম, আই অ্যাম, আই অ্যাম।’

আর এখানেই লোভের কথা। তীব্র এক জীবনের লোভ কবির। শেষমেশ নির্মাণের লোভ। সবটুকুর শেষে তো সেই মায়াটুকুই লুকিয়ে থাকে। থাকে উৎসব। ‘বায়োস্কোপে চোখ রেখে দেখি/ দৈত্যপুরী ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে, চল্লিশ বছর ধরে/ মা, আসছেন …।’ মৃত্যুবোধ, হননেচ্ছা, মৃতশষ্প প্রসবের পরেও এক কাঠামোর বিনির্মাণ। উৎসব শেষের পরেও। এবং, প্রিয় প্রগতি, কেউ না জানুক, অন্তত আপনি তো জানেন, ‘…তাতে শুধু প্রাণ জেগে থাকে।’

‘লোভ বলতে যতটুকু বুঝি’
প্রগতি বৈরাগী একতারা
২০১৯, আজকাল, দাম ১০০ টাকা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...