বাংলার ক্যাক্সটন— পঞ্চানন কর্মকার

ইন্দ্রনীল  মজুমদার

 

সাহেবদের মুন্সি বা দোভাষী প্রত্যেকেই উনিশ শতকের নব্য মহারাজ বা জমিদার হয়ে যাননি। তাঁদের নামও জানা নেই, জন্মের বার্ষিকী দূরে থাক জন্মের তারিখই নেই। সেরকমই এক অখ্যাত কারিগর বিখ্যাত সাহেবদের মুন্সি হয়ে গড়ে দিয়েছিলেন বাংলা ভাষার মুদ্রনশোভন লিপি, কেটে দিয়েছিলেন ছাপাই ছবির ধাতব ব্লক। সেই মুদ্রনযোগ্য বাংলা লিপির চাকায় ভর করেই জয়যাত্রায় নেমে পড়েছিল উনিশ শতকীয় নবজাগরণের বিজয়রথ। হ্যালহেড সাহেবের Grammar of the Bengali language (১৭৭৮) থেকে ‘ফুলমণি ও করুণার বিবরণ’ (১৮৫২), পাঁজি থেকে বটতলার বই আর ছাপাই ছবি— এক অখ্যাত বাঙালির এক অঘোষিত সংস্কৃতি যাত্রার পথ। সেই যুগ পরিবর্তনের কারিগরের নাম শ্রী পঞ্চানন কর্মকার, পরিচয় শ্রীরামপুরের পাদ্রী উইলিয়াম কেরি সাহেবের মুন্সি বলেই। তার আগেই কিন্তু হুগলি থেকে ছাপা হয়ে গেছে হ্যালহেডের বাংলা ব্যাকরণের বই। সেই বইয়ের লিপি তৈরি হয়েছিল পঞ্চাননের হাতেই। পঞ্চাননের জন্মতারিখ-সাল পাওয়া যায়নি। ১৭৪০-এর আশেপাশে হতে পারে। জন্ম ত্রিবেণীতে। আদিবাস বলাগড়, উপাধি মল্লিক। বংশপরম্পরায় তাঁদের কাজ ছিল তামার পাতে দানপত্র বা অলঙ্করণ খোদাই, অস্ত্রশস্ত্রে নাম লেখা ও নকশা আঁকা। তাই ধাতব অক্ষর খোদাই করার কাজে তাঁর অসুবিধা হয়নি কারণ পারিবারিকভাবেই ধাতুর ওপরে কাজ করা তাঁর জানা ছিল। তাঁর নিজস্বতা দিয়েই তিনি এমন কাজ করলেন যা তাঁর আগে কেউ করতে পারেননি বলেই বাংলা অক্ষরে বই ছাপা সম্ভব হয়নি। পশ্চিমনন্দিত উইলিয়াম বোল্ট বা ইতিহাসগর্বী চার্লস উইলকিন্সও শেষ কাজটুকু করতে পারেননি। সেটি হল চলনযোগ্য অক্ষর, এবং তার আদি মধ্য অন্তে ব্যাঞ্জন বা স্বরবর্ণের চিহ্ন যুক্ত করেও (আলাদা করে কেটে বসানো নয়) তাকে মাপের মধ্যে রাখা। হ্যালহেডের ব্যাকরণে ফন্টের মাপ প্রথমে একটু বড় দেখালেও কেরি সাহেবের বাইবেল ছাপায় তা অনেক সমতা পেল। এজন্যই তিনি বাংলার ক্যাক্সটন শুধু নন, বাংলার গুটেনবার্গও। তাঁকে নিয়ে কলকাতা-শ্রীরামপুর হাস্যকর টানাটানি করেও কেউ তাঁর নাম নিলেন না। কেরি সাহেব শুধু লিখলেন, I have found out a man who can cast them, the person who works for the company’s Press. অথচ কেরি জানতেন ইংল্যান্ড থেকে হরফ কাটিয়ে আনার পয়সা তাঁর নেই আর পঞ্চাননের মজুরি অক্ষরপ্রতি দু আনা মাত্র। এর আগেই এন্ড্রুজ সাহেবের হুগলির ছাপাখানা থেকে ১৭৭৮-এ যখন হ্যালহেডের বহুপ্রশংসিত বাংলা ব্যাকরণ বই বেরিয়েছিল তখনও হ্যালহেড সাহেব ভূমিকায় চার্লস উইলকিন্সের প্রশংসায় ভাসিয়ে দিলেন, কিন্তু চার্লসের আনা কারিগর পঞ্চানন ও দেশি হস্তরেখাবিদ খুসমতের নাম নিলেন না। পঞ্চাননের মৃত্যু আনুমানিক ১৮০৪। তারপরেও শ্রীরামপুর থেকেই বাংলা ছাপার কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন পঞ্চাননের উত্তরসূরিরা একদম বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় ছাপা পর্যন্ত। সে ইতিহাস প্রাজ্ঞ গবেষকরা এখন সামনে আনছেন। আচার্য সুকুমার সেন তাঁর বটতলা সম্পর্কিত বইটিতে একটু হদিশ দিয়েছেন যে শেষ জীবনে পঞ্চানন বটতলার বইয়ের ছবি কাটতে এসেছিলেন।

চিত্র ১

চিত্র ২

শুরু হয়েছিল এইভাবে। সাহেবদের রাজ্যশাসনের জন্য বাংলা ভাষা শেখা ও শেখানোর প্রয়োজনেই হ্যালহেডের বাংলা ভাষার ব্যাকরণ লেখা হল। কিন্তু  ছাপার বাংলা অক্ষর তৈরির কাজে উইলিয়াম বোল্ট বা হুগলির কাঠখোদাই জানা রাজকর্মচারী চার্লস উইলকিন্স কেউ পুরো সফলতা পাননি। কারণ সেই বাংলা হরফের জটিলতা যার কথা আগে বলা হয়েছে। উইলকিন্সই খুঁজে আনেন ত্রিবেণীর ধাতুতক্ষণ শিল্পী পঞ্চাননকে। পারিবারিকভাবে এ কাজ তাঁর জানা ছিল। কিন্তু পঞ্চাননের সমস্যা হল একটা স্পষ্ট সরল সর্বজনগ্রাহ্য লিপির ছাঁদ খুঁজে পাওয়া।পুঁথির হরফশৈলী তো বিভিন্ন পুঁথিলেখকের বিভিন্ন। তাঁর একজন ভালো অক্ষরলেখকের দরকার ছিল যাঁর লিপি আদর্শ, সর্বজনগ্রাহ্য লিপি হতে পারে। পঞ্চানন নিজে খুঁজে বার করলেন খুসমৎ মুন্সি নামে এক দলিল লেখককে যাঁর হাতের লেখা সত্যিই মুক্তোর মতো। খুসমতের হাতের লেখার ছাঁদে তৈরি হল প্রধম ধাতব, চলনশীল বাংলা হরফ বর্ণচিহ্ন সংযুক্ত হয়েই। বাকিটুকু ইতিহাস। ১৭৯৯ সালে হেস্টিংস কলকাতায় চালু করলেন কোম্পানি প্রেস, তুলে নিয়ে এলেন উইলকিন্স ও বাংলা হরফের জনক পঞ্চাননকে। শুরু হল ফোর্ট উইলিয়ামের ছাত্রদের জন্য বই ছাপার কাজ। ওদিকে শ্রীরামপুরে উইলিয়াম কেরি তাঁর মনিবের কাছ থেকে একটা ছোট প্রেস উপহার পান। বাংলা ভাষায় অত্যুৎসাহী কেরি ইতিমধ্যেই তাঁর বিখ্যাত মুন্সি রামরাম বসুর সাহায্যে নিউ টেস্টামেন্ট অনুবাদ করে ফেলেছেন। তাঁর এখন শুধু সেটি ছাপার জন্য হরফ চাই  কম খরচে। ইংল্যান্ড থেকে করিয়ে আনাতে গেলে ঢাকের দায়ে মনসা বিকিয়ে যাবে। অগত্যা কলকাতা থেকে পঞ্চাননকে আনার জন্য কোলব্রুকের সঙ্গে টানাটানি। শেষ পর্যন্ত কেরির পঞ্চাননলাভ ১৭৯৮ সালে। এবার আরও বড় অধ্যায়। ১৮০১ সালে কেরির অনুদিত নিউ টেস্টামেন্ট বাংলায় ছাপা হল পঞ্চাননের তৈরি হরফে। এক হাজারে খরচ পড়ল ১৬ হাজার টাকা। ঐ মিশন প্রেস থেকেই ছাপা হতে লাগল ক্যালকাটা স্কুলবুক সোসাইটির সব বই পঞ্চাননের প্রযত্নে। পরীক্ষামূলকভাবেই তিনি কেরির সংস্কৃত ব্যাকরণ ছাপার সময়ে এমন এক সাঁট নাগরী হরফ ব্যবহার করলেন যেটি অন্যান্য ভারতীয় ভাষার হরফ তৈরিতেও লেগে যাবে। তিনি তার থেকেই এর পরে ওড়িয়া হরফ তৈরি করে মারাঠি হরফ তৈরির কাজ ধরেন। সে কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। অর্থাৎ পঞ্চাননের ও তাঁর গুণী কারিগরদের ছাপাখানা তখন গোটা ভারতের জ্ঞানযাত্রার কেন্দ্রে। সেই প্রেসের আজ কোনও চিহ্ন নেই। অথচ হালেই বিশাল আড়ম্বরে ভারত-ড্যানিশ যৌথ উদ্যোগে  রিনোভেশান হয়েছে শ্রীরামপুরের ওলাভ চার্চ, ড্যানিশ ট্যাভার্ন সব। সেখানে চা খাবার ছবিতে ফেসবুক সুন্দর হচ্ছে। পঞ্চানন মারা যাবার পর তাঁর সদাব্যস্ত প্রেসের দায়িত্ব নেন তাঁর হাতেই তৈরি তাঁর উত্তরসূরি, তাঁর জামাই মনোহর কর্মকার। ১৮১২ সালে আগুনে ছাই হয়ে যায় পঞ্চাননের জমজমাট প্রেস আর তৈরি করা ফন্ট। কিন্তু মনোহর আর সহকর্মীরা পঞ্চাননের তৈরি ভারতীয় আঞ্চলিক ভাষার ফন্টগুলি পুনরুদ্ধার করেন। মনোহর ও তাঁর সহযোগীরা এরপরে ফার্শি আরবি সহ পনেরোটি ভারতীয় ভাষার হরফ তৈরি করে দেন। শুধু চিনা ভাষায় হরফ খোদাই করে দেন চল্লিশ হাজার! মনোহরের সংস্কৃত হরফেই ছাপা হয় সংস্কৃত নিউ টেস্টামেন্ট। ১৮১৮ থেকে ১৮২২ পর্যন্ত সেখান থেকে বিভিন্ন ভাষায় বারোটি বইয়ের পঞ্চাশ হাজার কপি ছাপা হয়। এ সবই পঞ্চাননের উত্তরাধিকার। মনোহরের ছেলে কৃষ্ণচন্দ্র, তার ভাই রামচন্দ্র নতুন প্রেস করেন শ্রীরামপুরের বটতলায় অধর টাইপ ফাউন্ড্রি নামে। বিদ্যাসাগর সেখানে আসেন প্রথম বর্ণপরিচয় ছাপাতে। শুরু হল হরফ নির্মাণ ও সংস্কারে নতুন বিদ্যাসাগরীয় যুগ।

চিত্র ৩

শ্রীরামপুরে কেরি মার্শম্যান ওয়ার্ড সাহেবদের সমাধিক্ষেত্র, জননগরের মিশন চার্চ, কাছারি বাড়ি, ড্যানিশ ট্যাভার্ন, শ্রীরামপুর কলেজের ডাচ স্থাপত্য দেখে কেউ যদি রেস্টোরড সন্ত ওলাভ চার্চের গগন ছোঁয়া শিখরের সামনে দাঁড়ান তবে তাঁর পিছনেই থাকবে ছোট একটি পৌর উদ্যান। ভিতরে একটি সাম্প্রতিককালে স্থাপিত ফলকে পাতার মত ছড়ানো আছে কয়েকটি মুখাবয়ব। তার মধ্যেই রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রানি রাসমণির সঙ্গে মিশে আছেন রামরাম বসু ও বাংলা লিপির আদি পুরুষ পঞ্চানন কর্মকার। তাঁর মুখ পাতার আড়ালে ঢেকে আছে। ইচ্ছা হল তাঁর বাড়ি বা তাঁর ফাউন্ড্রির চিহ্ন খুঁজে নেব। কেউ বলতে পারলেন না, নামও পরিচিত নয়। যথারীতি এক বৃদ্ধ পথ বলে দিয়ে বললেন, কিছুই পাবেন না। শেষে একটা পুকুরের ওপরেই দাঁড়িয়ে থাকা এক আধুনিক বহুতল দেখা গেল। মাথায় লম্বালম্বি ফলক— “পঞ্চা-ন ভবন”। একজন বললেন ওই তো ওইটাই। পুকুরের পাড়ে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে মনে হল, বাংলা হরফের জনক তাঁর নামেরই একটা অক্ষর হারিয়ে ফেলেছেন। তাতে কি আর এসে যায়! ফ্ল্যাটবাড়ির গার্ড বললেন, এখানে পঞ্চানন বলে কেউ থাকে না। তিনি এই নামে কাউকে চেনেন না।

বাংলার মাটি বাংলার জল ধন্য হউক হে ভগবান।

 

চিত্রসূচি:

  1. চার্লস্ উইলকিন্সের হরফ।
  2. A GRAMMAR OF THE BENGAL LANGUAGE-এর আখ্যাপত্র।
  3. শ্রীরামপুরে পঞ্চাননের কথিত বাসভূমিতে নির্মিত বহুতল “পঞ্চানন ভবন”।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1906 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...