জ্ঞানবৃক্ষ কথা

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

 

একটি সাদা পৃষ্ঠা— কিঞ্চিৎ বিমূর্ত ইঙ্গিতেই সৃষ্টির আদিকালের সমতুল্য। অনুরূপ কোনও উপমা যদি আদৌ ব্যবহার্য হয়;– কারণ, উৎপত্তিগত দিক থেকে বিবেচনা করলে প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠাটি যে বহু সৃষ্টি ও উৎপাদন-চক্র অতিক্রম করে এবং বিশেষভাবে মানব-মননের অনুষঙ্গে বর্তমানে এক বিপুল সম্ভাবনাময় পরিণতি-উত্তর দশায় পর্যবসিত হয়েছে তা অনায়াসে পরিলক্ষিত হয়। এইরূপ অভূতপূর্ব ভার্চুয়াল  বস্তুমঞ্চের উপর রচয়িতা খোদাই করেন অমোঘ লিখনলিপি, গূঢ় অথচ স্বমানবিক প্রক্রিয়ায়— যার অনুভাব ও পরিণতির পর্যায়বিন্যাস বর্তমান প্রস্তাবনার অন্যতম আলোচ্য।

রচনার আদিপর্যায়ে ভাবী-রচয়িতার অবচেতনের শীতল ঘূর্ণাবর্তে ভাব ও ভাষা সংশ্লিষ্টরূপে আন্দোলিত হতে থাকে। উক্ত পর্যায়ের প্রভাব প্রোথিত হয় পরবর্তী পর্যায়ে, যখন ভাব ও ভাষার মূর্ত (বা পৃথক) জন্ম হয় রচয়িতার বোধক্ষেত্রে। এই জন্মে উত্তাপ যোগায় স্বয়ং রচয়িতার  প্রেরণা এবং এষণা। চিন্তা ও চেতনায় ভাব ও ভাষা (এই পর্যায়ে ভাষা ‘নির্মাণ’ এবং ভাব ‘অন্তঃসলিলা’) নিজ-নিজ রূপ লাভের পর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-প্রতিদ্বন্দ্বে প্রবাহিত হয় একটি বিমূর্ত রেখা বরাবর দ্বিমুখী চলনে। এই রেখা বরাবর যেকোনও বিন্দুতে ভাব ও ভাষা সিঙ্গুলারিটি-তে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়তে পারে তাদের পারস্পরিক লক্ষ্যসাধনের পরিণতিতে। পক্ষান্তরে, এই রেখাটিকে অসীমসংখ্যক সম্ভাব্য- সিঙ্গুলার বিন্দুর সমষ্টি বলা যায়। এই পর্যায়ে একদিকে যেমন রচয়িতার ভাব তাঁর শব্দ-এষণার (পূর্ব-শব্দ বা ভাবিত শব্দ) উপর নিজ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে থাকে, অপরদিকে অবহিত শব্দরাজি বিপরীতক্রমে তার ভাব-কে চালিত করতে থাকে। উক্ত দুই ক্ষমতাই রচয়িতার নিজস্ব এবং এদের পুষ্ট করে তাঁর অবচেতন, জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ইতিহাসবোধ। পরবর্তী পর্যায়টিতে ঘটে পূর্বপর্যায়সমষ্টিসারের প্রকাশ। ভাষা পায়  বোধসম্মত রূপ যথার্থ চিহ্নপ্রকাশের (চিহ্ন অর্থে উত্তর-শব্দ বা প্রকাশিত শব্দ) পরিণতিতে এবং গ্রথিত হয় পৃষ্ঠায়। রচয়িতার চিহ্ন অঙ্কনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আরেকটি প্রক্রিয়া চলতে থাকে পৃষ্ঠার শরীরে, যাকে বলা চলে— ‘রেতের ওজে রূপান্তরণ’। রচয়িতাপ্রদত্ত সকল ক্ষমতারাশি ভার্চুয়াল-শক্তি রূপে সঞ্চিত থাকে পৃষ্ঠায় (অনুষঙ্গটি ভীষণভাবেই ব্যক্তিক) যা পাঠকের পাঠের ফলস্বরূপ তাঁর চেতনায় ক্ষমতার দ্বিতীয় স্থানবদল করতে থাকে। মধ্যবর্তী ভার্চুয়াল-শক্তি পর্যায়টি প্রথম ক্ষমতা প্রণয়ন পর্যায়ের গ্রথিত-তথ্য অক্ষত রাখলেও, দ্বিতীয় প্রণয়নের   সঙ্গে প্রথমটির গুণগত মানের পার্থক্য থাকে। তার মূল কারণ নির্দিষ্ট পাঠক মননের অনুষঙ্গ;– অর্থাৎ এই আদান-প্রদানের মাধ্যমে যাবতীয়  চিহ্নসকল পাঠকের মনে নতুনরূপে চিত্রিত হয়। অনুরূপে আদান-প্রদানের দুই মেরুকে যদি দুই বিষয়ীতে ভাগ করি— যথাক্রমে দাতা এবং গ্রহীতা, তবে একধাপ এগিয়ে একথা বলা যায়— কোনও বিশেষ পর্যায়ে পূর্ব-গ্রহীতা ব্যতীত দাতার উদ্ভব সম্ভব হয় না। আমরা যদি একটি পর্যায়কে বিপরীতক্রমে পর্যালোচনা করি তবে দেখতে পাব, গ্রহীতার মধ্যে শক্তির দ্বিতীয় ক্ষমতায়ন এবং চিহ্নগুলির অর্থ নির্ধারণ ঘটতে থাকে বিশেষ মননের অনুষঙ্গে, যে মননকে পরিপুষ্ট করে তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, অবচেতন, ইতিহাস ও সংস্কৃতি। যদি দাতাকে আমরা কোনও বিশেষ পর্যায়ের সূচনা হিসেবে কল্পনা করে নিই সেক্ষেত্রেও ডিম ও মুরগিজনিত বিবাদের সম্মুখীন হওয়া আমাদের ভবিতব্য।  কারণ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন চলে আসে দাতা যে ক্ষমতা লিপিবদ্ধ করছেন তার উৎস কোথায়; তিনি কখনওই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত একটি অভিনব চিহ্নতন্ত্র সৃষ্টি করতে পারেন না। তাঁর প্রয়োজন হয় মননের ও অভিজ্ঞতার নির্যাস এবং একইভাবে চিহ্নতন্ত্র যদি ইতিপূর্বেই ক্রিয়াশীল থাকে, তবে গ্রহীতা হওয়ার গুণ ও উদারতা। এভাবেই চিহ্নমালা প্রবাহিত হতে থাকে পর্যায় থেকে পর্যায়ান্তরে (আবশ্যিক নিহিতার্থ বদলের মাধ্যমে)। এই দুটি ক্ষেত্রেই দাতা এবং গ্রহীতার গুণ সর্বতঃ মানবিক এবং তাঁদের অন্তর্বর্তী সংলাপ চরম দ্বন্দ্বমূলক। কোনও একটি পর্যায়ের অন্তর্গত গতিপ্রবাহে চিহ্নরাশি দাতা থেকে উপরোক্ত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহীতায় স্থানান্তরিত হওয়ার পরক্ষণে দুটি সম্ভাব্য-গতিমুখ  প্রাপ্ত হয়— রূপান্তরিত চিহ্নরাশির ক্ষমতাপ্রভাবে ও অন্যান্য বহু জীবনবোধকে অস্ত্র করে সেই গ্রহীতা পরবর্তী পর্যায়ে দাতার ভূমিকায় চিহ্নপ্রবাহ অক্ষুণ্ণ রাখতে সমর্থ হন অথবা চিহ্নরাশির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ও তার মধ্য থেকে যথাসম্ভব ইতিহাসরস শুষে নিয়ে গ্রহীতা নিজের জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেন এবং উক্ত প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের অংশীদারিত্ব লাভের মাধ্যমে চিহ্নপ্রবাহের ভার্চুয়াল অথচ গতিপ্রবণ প্রতিনিধিতে পরিণত হন।

প্রাসঙ্গিকভাবে দ্রষ্টব্য, পাঠকের অপেক্ষায় থাকা সাদা পাতা ও চিহ্নভারাক্রান্ত পাতা— উভয়েরই শক্তি ভার্চুয়াল হলেও দ্বিতীয়টির একটি নির্দিষ্ট ভার্চুয়াল দিকনির্দেশ আছে এবং প্রথমটি ভার্চুয়াল-দিকনির্দেশবিহীন।

রচনাটি এই পর্যন্ত এসেই একটি সিঙ্গুলারিটির কবলে পড়ে যেত যদি আমার মন চিহ্ন (অন্তরে ভাব) পরিশ্রান্ত হয়ে অবশিষ্ট স্থান শূন্যাবস্থায় রেখে দিত। এক্ষেত্রে যে কথাগুলি পুনরায় এই ক্ষমতা প্রণয়নের বিষয়টিকে গতিপ্রদান করতে উদ্যত, তাদের লিপিবদ্ধ করার দায়বদ্ধতা আমায় পেয়ে বসেছে। এই অস্থির সময়ে গ্রথিত সকল প্রকার চিহ্নরাশি যেন ক্রমশ আমাদের চিরকালীন আখ্যানকে (যে আখ্যান মানুষের বেঁচে থাকার পুরাণপাঁচালি; তার নিত্যনতুন হয়ে ওঠার উপাখ্যানসমূহের সংগ্রাম-মঞ্চ) তার ক্ষমতার দিকনির্দেশক বিশেষত্ব থেকে ছিটকে দিয়ে সাদা পৃষ্ঠার সমতুল্য দিকনির্দেশশূন্য এক আখ্যানের রূপ দিয়ে চলেছে। সেক্ষেত্রে এই আখ্যান প্রণয়নে যোগদানকারীদের কর্তব্য এই সাদা পৃষ্ঠাকে চিহ্ন-অঙ্কনের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত বিপুল সম্ভাব্যতার সম্মুখীন করা এবং আরও চিহ্নযোগানোর প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রচলিত অবস্থাকে অতিক্রম করে যাওয়া। খানিক কাব্যিক দায়বদ্ধতা নিয়ে বলে রাখা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত না এই অস্থির সময়ের সম্ভাব্য-লিখনতালিকা নিঃশেষিত হয়ে যায়, ভাষা (এবং আরও গভীরে ভাব) যুগ অতিক্রান্ত হয়ে ওঠে, ততক্ষণ আমাদের এই আপাত-সাদা পৃষ্ঠা ভরাট করার দানবিক দায়ভার বয়ে চলা উচিৎ। তবে, এই ক্রান্তিকাল পরবর্তী মুহূর্ত আচম্বিতেই একদিন উপস্থিত হবে না। এর অর্থ এই যে এটি কোনও বিশেষ মুহূর্ত নয়, বরং একটি প্রক্রিয়াধীন ইতিহাস। এক সুদীর্ঘ মালা গেঁথে চলার ধীর অথচ মনোযোগী প্রক্রিয়া। লেখনীর মঞ্চ আজ যখন আপাত-অবাধ এবং গভীরভাবে সংযুক্ত, আমাদের কর্তব্য লেখনীকে জীবনবোধে সম্পৃক্ত করে নিজেদের অভ্যাস-কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা; যে লেখনীচর্যা মানবেতিহাসের ক্রমত্বরিত দশার বিপরীতে বিপুল বীক্ষণ ও বিতর্কের সমাবেশ ঘটাতে সচেষ্ট হবে; ক্ষমতাচেতনার বিকল্প রূপান্তরনে আদিম অনুঘটকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

 

 

 

 

এই অবকাশে নিজেদের স্থানিক-কালিক অবস্থান সম্পর্কে অন্তত কিছু না বললে আমাদের কর্মোদ্যোগ যে বাস্তবিক অর্থে সার্থকতা পাবে  না, সেই বিষয়ে আমরা তিনজনেই কমবেশি একমত। পৃথিবীব্যাপী কল্পশহরের প্রাণবিন্দু(!) বরাবর আপাত-বিচ্ছিন্ন এই ঘরটিতে আমরা তিন মানুষে মিলে এক ক্রমিক লিখনপ্রয়াসের প্রকল্পনা করেছি। একটি নিরাবয়ব জ্যামিতিক ত্রিভুজের তিন শীর্ষবিন্দুতে অধিষ্ঠিত আমরা তিন-বান্ধব। অন্তবিহীন সুদীর্ঘ সাদা পৃষ্ঠাটি বরাবর লিখে চলার এই অনিবার্য আয়োজন। আমাদের উপবেশনের জ্যামিতিক আকৃতি যত বেশিসংখ্যক ব্যক্তির যোগদানে ক্রমাগত নিরবচ্ছিন্ন হয়ে উঠবে এবং একটি নির্দিষ্ট ত্রিভুজের আকৃতিধারণের দিকে অগ্রসর হবে, ততই আমরা প্রকল্পের সার্থকতার আভাস পেয়ে নিজেদের সমষ্টিগত জ্যামিতিক আকৃতি পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হব। এই অত্যাবশ্যক কথাগুলি বলে নিয়ে আমি পৃষ্ঠাটি আগামীকে হস্তান্তরিত করলাম।

গল্পেরা প্রবাহিত যেমন বিচ্ছিন্ন ক্ষণিক…

গল্পকল্প…

আকাশে ক্লান্ত জবুথবু মেঘ – ভূখণ্ডে নিরেট চলাফেরা – জলের ফোঁটারা
যে কারণে এক মিশে যাওয়া থেকে অন্য মিশে যাওয়ায় স্থান পেলে তবে প্রাণ পায়…
পাঠের গোড়ায় পা ফেলার শক্ত জমি পায় না বিপন্ন পাঠক, এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়ায়;
দাঁড়িয়েছ কি সড়াৎ…সড়সড় করে ডুবে যাচ্ছে অস্তিত্ব, গলগলিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে লাভাস্তর, সে হারিয়ে যাচ্ছে – কেন্দ্রে
যদিও কোনও কেন্দ্র নেই, আমি এক অন্য পৃথিবীতে – গল্পে গল্পে অভিশপ্ত, ঘ্রাণ নেই স্পর্শ নেই,
শুধু দেখা ও দেখে যাওয়া ছাড়া – ফিরতে চাইছি
পারছি কই?

এই দুর্দশাই আমার যৌবন, যদিও আমি নিজেই লেখক, অংশ নিয়েছি, লিখনরত ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুতে –
এক রূপহীন ছায়াহীন…আমি হারিয়ে গেছি, গল্পে-গল্পে বহু-পথ পেরিয়ে গেছে – আমি হারিয়ে গেছি।
গল্পকল্পের এই তিরতিরে নদী থেকে এক আঁজলা ক্ষণিক তুলে আমি আচমন প্রস্তুতি নিই
যদিও আমি নিজেই ক্ষণিক, ধূসর-ধূসর…তারা-তারা আশমান…ক্রমবয়সী অস্তিত্ব…

সমগ্রসরমান আঁধার আমারও আধার।

আবছা মূর্তিটা যেহেতু আমি নিজের ঘূর্ণায়মান অবস্থা সম্পর্কে সজাগ, বৃত্তগতিতে এগিয়ে-পিছিয়ে আসার মাধ্যমে বিদ্যমান। নিজেকে
পাখা থেকে পৃথক করে দেখি শান্ত-সবুজ ঘর – ফুটবলারের ছবিসমেত পোস্টার – যুবকের মগ্নমৌন মেধা – বাবু হয়ে বসা কোল,
আরও নীচে ব্যস্ত-ব্যস্ত কলম – হিজিবিজি পাতা – প্রেম–নাম-নারী। যোগ হয় একে একে সোফা-খাট-আলমারী – বই-বই-ল্যাপটপ।
আর দেয়ালঘড়ি। বয়স সতেরো-আঠেরো, ঘড়ি-ঘড়িতে তার নজর; দরজা বন্ধ ঘর। ওদিকে মায়ের রান্না শেষ, কড়াই রাখার শব্দে
প্রহরসূচক ঘণ্টাধ্বনি ও ঘড়ি।

“কি-রে খেতে আয়! বাবা অপেক্ষা করছে” –
মা খায় শেষে। মা তো! আঁচলে হাতমোছা-কালীন উচ্চকিত কন্ঠস্বর, অদৃষ্ট এবং শব্দে-শব্দে পরিচয়।

ছেলেটি ছেঁড়া চিরকুট-টা লুকিয়ে রাখে যার কোন স্থান-নির্দেশ নেই। একলাফে গ্রহান্তরের স্পর্ধা দেখি – বড় বড় পা ফেলে
বুধ-শুক্র-পৃথিবী-মঙ্গল-গ্রহাণু-গ্রহপিতাগণ-গ্রহাণুদের পেরিয়ে সে হাজির হয় সৌরজগতের ছাদে যে ছাদ সৌরজগতের অনেক নীচে
অনেক মাঝে আর পাঁচটা পার্থিব ছাদের মতোই চন্দ্রালোকে রাতজাগা। রাত্রিভরা আকাশতারায় সে খুঁজে ফেরে কোন রহস্যবলিরেখা;
করতালির আমোদে বলে ওঠে – “আজ ওকে দেখাতেই হবে”…মুহূর্তপ্রমাদে বইয়ে দেয়, “বাবাকে দিয়ে দাও।
আজ আমি তোমার সঙ্গে খাব মা।” মায়ের প্রতিবাদ লেখকে ক্ষীণ থাকে, আমিও পাই না আঁচ।

টবে-টবে নিস্তব্ধ পাতাবাহার, কোটি-কোটি ঘটনাসম্বলিত আনন্দধারা অথচ নিস্তরঙ্গ মহাব্যোম
যেহেতু দর্শক অনুপস্থিত।

এক কিশোর – দশ-এগারো – হাফপ্যান্ট-সোয়েটার, মা-কালীর বিশাল ছবির নীচে করজোড়।
ধূপের গন্ধ যেন ঢং-ঢং-ঢং – মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি – আলসে চারপাশ ও দীঘি।
ছাদের গা থেকে লাল রঙ নেমে মেঝের দুয়ারে হলুদে-সবুজে মাখামাখি…
ঘর, সে ও মা-কালী।

মা ডেকে গেছেন খেতে যদিও কণ্ঠস্বর আড়ালে। জনপ্রিয় দৈনিক – দৈনিকের মাঝের পাতা –
অপ্রাসঙ্গিক সমাজ – কাল ও রাষ্ট্র। ‘আজ রাতে উল্কাবৃষ্টির সাক্ষী হতে চলেছেন আপামর শহরবাসী।
আকাশ পরিষ্কার থাকলে উত্তর-পূর্ব দিগন্তে রাত দশটা থেকে তিনটের মধ্যে খালি চোখে এই মহাজাগতিক ঘটনার দেখা মিলবে…’
-অগোচর বিবরণ ও সমাপ্তি।

সোফা আসে নির্মাণে;
এক মধ্যবয়স্ক লোক ও গোলফ্রেমের চশমা;
“শুনে রাখ, এই উল্কাবৃষ্টিতেই ধ্বংস হয়েছিল ডাইনোসরের দলবল। এক বিশাল উল্কাখন্ড পৃথিবীতে এসে পড়ায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা।
বলি, এসব নিয়ে বেশি মাতামাতি করিস না, ফোলানো-ফাঁপানো বেলুনে যত ছোট ফুটোই করিস না কেন, বেলুন তো ফাটবেই।
আমাদের পৃথিবীও তো একটা বেলুনই রে…”
অঝোর বৃষ্টি, বেলুনবিক্রেতা ও হতাশা।

তরলাভ স্মৃতি – কাঁচি-কাটা নাড়ী – মুদিত চোখ – চমক – আলো – আলো আর ভয়।
“মা, মা-গো! আমাদের রক্ষা করো মা। আজ রাতটা ভালোমত কাটিয়ে দাও, কাল থেকে আমি ঠি-ই-ক পড়াশুনো করব,
মায়ের স-অ-ব কথা শুনে চলব। আমাদের বাঁচাও মা, এই উল্কাবৃষ্টি থেকে আমাদের উদ্ধার কর…” –
করজোড়, মুণ্ডমালিনী ও লাল।

যুবক আসে দৃশ্যমধ্যে, হন্তদন্ত, উৎসাহী – হাত টানাটানি ও অবাধ্য কিশোর। ধূসর চারপাশ,
যুবকের অশ্রুত স্বরে “চল, চল বলছি।” ধূসর-ধূসর অন্দর, হাতাহাতি ও সিঁড়ি।
ঘষটাঘষটি, ধূসর মলিন – মলিন – অমলিন; সাদা মলিন – মলিন – অমলিন
ও ছাদ।

ভীত চোখ – বোজা চোখ – কৈশোর এবং কান্না; উচ্ছলিত চোখ – উন্মীলিত চোখ – যৌবন এবং অশ্রু।
আকাশ অবিবৃত।
চোখ ভিজে চুপচুপে  – ভিজে-গাল ও কৈশোর; চোখে অবিরাম ধারা – ছলাৎ-ছলাৎ ধ্বনি এবং যৌবন।

স্থাবর-জঙ্গম – বিমূঢ়তা – মায়াপাশ – আত্মবিলাস – আনন্দঘন – তুরীয়ানন্দ – যৌবন এবং চক্ষু মুদন।
হাতেহাত।
নিঃসীমশূন্য – অস্থিরপলক – উদ্বেগ – বিহ্বলতা – মায়াবিষ্টতা – অভূতপূর্ব – কৈশোর এবং চক্ষু উন্মীলন।

আচমনোত্তর শান্তি।

গল্পজীবন – জীবনগল্প একাকার। এ-সময় স্থির-অপলক-অচ্যুত। আমার কলম নীরব, দায়সমাহিত।
ভাষা পায় জীবন; আসুক নতুন-নতুন লিখন; দৃষ্ট-নির্মাণ পাক বিমূর্ত ত্রিভুজ –
এ আমার গল্পজীবনমুখী অথচ মুহূর্তবিচ্ছিন্ন সত্তার মুখ্য উচ্চারণ।

আদিম অনুভূমিক পৃথিবীর সভ্যতাখানিক উঁচুতে দাঁড়িয়ে আমি – অমাবস্যার ছাদে; বিরাট নয় বরং ক্ষুদ্রতম উন্মোচনের অন্তরে নির্ভার দণ্ডায়মান। শশীনিস্তেজ এ শহর, অট্টালিকার প্রাচীরে ঘিরে রাখে আমার প্রগতিশীল আমি-শরীর – আবহমান বিষাদগ্রস্ততায় যে ন্যুব্জ। শহরের কেন্দ্রে যান্ত্রিক উদ্ভাস, কেড়ে নিলে হু-হু করে অবিশূন্য কোন মায়ার অভাব – যে নাস্তিভাবে অট্টালিকাসকল জীয়ন্ত দৈত্যসৌধ, আমার দেহ ঢেকে দেয় আগ্রাসী আচ্ছাদনে। হত্যা করে চলে প্রত্যক্ষে-অলক্ষ্যে; আমি-হত্যা, শরীর-হত্যা, তুমি-হত্যা, তোমার-হত্যা, সমাজ-হত্যা, ইতিহাস-হত্যা – এ সভ্যতা এক হত্যাবীজমালা। মতান্তরে, মাংসলোভী ঐ স্তূপকারখানা!

আমাতে নিমজ্জিত আমি ভয়ার্ত মনে দেখি, অট্টালিকাসমুদায় কাম-লালসা-শোক-সন্তাপের স্বেদস্নাত হয়ে হট্টরোল করে চতুর্দিকে; – এক বীভৎস উল্লাস! সে উন্মাদনা দৃশ্যত স্থির অথচ অজ্ঞানীয় দুর্বিসহ এক উৎপাত। অক্লান্ত অগোচর সমারোহে দিকসর্বস্বান্ত আমি নতজানু হয়ে থাকি আমার একাকী ছাদে যে তখন রাতবিনোদনের ঝলসানো শিকারকেন্দ্র…

এক অনল তাপ লাগে শরীরে – সুষুম্না বেয়ে দাঁড় করায় সিধে, টানটান। দেখি, শহরের শূন্য চিরে সে এক স্পষ্ট অলাতচক্র যাকে অন্তরালে রেখে প্রকট এক বৃক্ষদেহী চেতনাশরীর। তাঁর আভা যেন মধ্যাহ্নে জ্যৈষ্ঠ-সূর্যের তেজ, তাঁর আভা যেন নিশাকরে নিবিড় ধারাস্নান –

“কি সম্বুদ্ধ, এত বিমর্ষ কেন? এইমাত্র বুঝি সর্বস্ব হারালে -”

আমি রূপমুগ্ধ। মৃত্যুপুরীর অভিশাপ তাঁর উপস্থিতির উষ্ণতায় দুর-দুরান্তে পলাতক। আমি পেয়েছিলাম নতুন প্রাণ, আজ এই সমবেত প্রয়াসে যা উদ্বুদ্ধ করেছে আমাদের। আমি সোৎসাহে লিখি তাঁর কথা, যাঁর স্বল্পনৈকট্য আমার শরীরকে করেছিল শোণিত-তপ্ত, দীর্ঘ অমেরুদণ্ডীতায় যা পড়েছিল নুয়ে, উল্লম্ব শোষণে।

“চারপাশে আমি-আমি, চতুর্দিকে আমি-আমি – এক তীব্র তিক্ততায় বড় অসহায় লাগে -”

“অবশ্যই সময়স্পর্শী এ অসহায়তা। এক অভিন্নতার নরকে ডুবতে থাকা পৃথিবী, অহমিকার গড্ডলিকায় তার পতন অবশ্যম্ভাবী ছিল। মানুষ তো চায় অপর, অন্য চোখের নির্মল হতে; সে যখন অপর পায় না, তখন তারে প্রেতে পায়। সেই প্রেত তার শরীর নিয়ে পরিহাস করে।”

“তবে কি একসাথে হওয়ার কোনও আশা নেই? সবই এই আমি-র নরকে মুহ্যমান হবে?”

“সময় খণ্ডিত হতে-হতে সংগ্রামকে আজ বহু করেছে। মানুষের সংগ্রাম খণ্ডিত, জীবন খণ্ডিত। সর্বজনীন সংগ্রামের ধারণাকবলিত মানুষ তাই সময়ের অবসাদ দেহস্থ হতে দেখে। তবু, মানুষ যদি খুঁজে পায় তাদের সংগ্রামের স্বরূপ, সেক্ষেত্রে তারা যুদ্ধে সামিল হবে সমষ্টিগত বহুবিরুদ্ধ একক হিসেবে। একত্র হওয়ার সম্ভাবনা মানুষের যেকোনও যুগের যেকোনও সময়ের সত্য; আর আজ তো সবাই বলে অ্যানথ্রোপোসিন…”

আমি সাহস পাই শিরদাঁড়ায়। যদিও যেন অবচেতনে হয়ে চলে এক অননুভূত মিথস্ক্রিয়া। আমি স্তব্ধ হয়ে শুনি তাঁকে, সেই মায়ালোকিত বৃক্ষশরীর। কথার ফাঁকে পেরিয়ে চলি জীবন-জীবন। তিনি কয়েক-কথার অন্তিমে ব্যক্ত করেন আপন অভিপ্রেত –

“তবে যে কথা বলতে আমার আসা – আমার কল্প-স্বপ্নে দর্শন পেলাম তোমাদের ভাবী আয়োজনকাণ্ডের। তাই স্পর্শ দিতে এলাম তোমায়,  নিজের ভাবের। আমি দেখেছি তুমি তোমার সহ-সাময়িকদের নিয়ে আয়োজন করতে চলেছ এক সৎ লিখনপ্রয়াস। সেক্ষেত্রে, তোমার সাথী  ঠিক সেই দুজন যাদের কথা এখন তোমার ভাবনায়। যদি বৃথা না যায়, সে সংখ্যা হতেই পারে বহু; – ততদূর আমি দেখি না, ঝাপসা হয়ে আসে ভবিষ্যৎ। তবে আমি জানি তোমার লেখায় আমার কথা থাকবে, কিছু কথা তাই বলে রাখি –

তোমার যে সহযোদ্ধা শুরুতে কলম নেবে, সে এক সৃষ্টিশীল রচনা-প্রক্রিয়ার পর্যায়বিন্যাসের প্রতি যত্নশীল হবে; তথাপি তার লেখা হয়ে উঠবে অযাচিতভাবেই একরৈখিক; – সময়পরিসরে মূর্ত হবে না বহুস্তরের আনন। একটি রেখায় সমূহ আদান-প্রদান প্রতিবিম্বিত করার সময়ে উহ্য রয়ে যাবে বহু গতিপথ, বহু অনুভাব। কিভাবে ক্ষমতার কর্তৃত্ব ও আধিপত্য মুছে দিতে পারে বিবিধ পর্যায়ের যোগাযোগসমূহ; অনুরূপ অবলুপ্তি বিষয়ীকে কিরূপে বিকৃত করে, কিভাবে বহুস্তর-বহুপর্যায় সংগতি লাভ করে একে অপরের অস্তিত্বে অথবা কোন অনুষঙ্গে এক সম্পূর্ণ নতুন পর্যায়ধারা বিকশিত হতে পারে এবং সর্বোপরি, মেশিন ও মানুষের সংলাপ – এমন অনেক কিছুই রয়ে যাবে অনুল্লিখিত।  তবু তার কথা যারপরনাই সততায় হবে ঋদ্ধ; – মহা-আখ্যান মৃত এবং সকলের সম্মুখে কেবল নিয়মানুগ অভ্যাসের দায়বদ্ধতা…”

আমি নির্বাক বোধে তখন শব্দহারা। আশ্বিনের আনন্দঘন আকাশ আমার আবহস্থিতি। সম্ভাব্য আঙ্গিক অপূর্ণতা যেন বিদায়ী কার্তিক…

“…তোমার দ্বিতীয় আত্মজনের লেখার প্রাগ-ভূমিকায় জানিয়ে রাখি কিছু মুহূর্তকথা; – এক আত্মজাত পুরুষের কথা যে তার প্রিয় আজানুলম্বিত প্রতিবিম্বে আজীবন প্রত্যক্ষ করেছে নিজেকে। সে সাজায়-গোছায় নিয়মিত; রূপবান রাখে নিজ-প্রতিচ্ছবি। দর্পণ-বহির্ভূত আপনতর কোনও পৃথক অস্তিত্ব তার কাছে উপেক্ষণীয়। তবু অঘটন সত্য, স্থানকাল নির্বিশেষে; – আত্মজীবনের কোন এক অবশ্য মুহূর্তে দর্পনে কেশবিলাসকালে আচমকা অন্ধকারে সে হারিয়ে ফেলে প্রিয়তম কেশমার্জক, তার চিরুনি। আলোর উদ্ভাস হয়, চিরুনি আয়নার অনস্তিত্বের গহ্বরে। আত্মবিমোহিত সে ঝুঁকে পড়ে অদৃষ্টের মরীচিকায় এবং ক্ষণমাত্রে তার আজীবন প্রতিবিম্বিত মস্তক প্রবিষ্ট হয় প্রতিবিম্বের চেতনায়। এই অবস্থায় সে দুই-সম্ভাবনার সম্মুখীন হয় যদিও একটিই প্রকৃতার্থে লিখিত-বাস্তব যা প্রতিভাত হয় তোমার সহকলমে। সে দেখতে পায় অবিনশ্বর কালো যার সম্যক অর্থ কেবল বিনাশ; তার মৃতচেতনা আটক হয় সেই কৃষ্ণের শূন্যশরীরে। অথবা সে দেখতে থাকে অবিশ্রান্ত ঘটনাধারা, তার চেতনায় অর্থ তৈরী হয়, অর্থহীন হয়ে পড়ার দুর্ভাগ্যে। সে আটকে পড়ে এক সাবলীল চেতনা-অভিশাপে। এরকমই কোন এক মুহূর্ত থেকে লেখক কলম পাতে পৃষ্ঠাদেহে…”

আমি কি সত্যি সংবেদ হারিয়েছি যেদিন অভিশপ্ত চেতনা পেয়েছে আমার শরীর? আমার অতীত-বাস্তব-ভবিষ্যত যেন ধূলিমাখা শার্দুলপিতা যে অবাস্তব শিকার সংগ্রহের সংকল্প নিয়েছে প্রতিনিয়ত।

“…এবং তোমার লেখা হবে স্মৃতিলুপ্ত, ভাষায় অভিশপ্ত। তুমি এক বিরাটের মুহুর্তছায়া লিপিবদ্ধ করতেও ব্যর্থ হবে। আর বিরাট! সে আদ্যোপান্ত কৌতুক করে যাবে তোমার লেখায়। এইটুকুর স্পর্শ আমি দিলাম তোমায়, আমি বা তুমি যা বদলাতে অপারগ…

…এক্ষণে বলি – আমরা যারা বৃক্ষজীবন পেরিয়ে এসেছি যুগ-যুগান্তের, আজও আশা রাখি প্রতি-বিপরীত জ্ঞানের – যে জ্ঞান ও তথ্যের তফাত আকাশপাতাল, যে জ্ঞান সমাজের মূল্যবোধকে করে তুলবে কমনীয় ও আত্মঋদ্ধ; যে জ্ঞান ভবিষ্যের ইতিহাসে মানুষকে করে তুলবে দ্রষ্টা, প্রেমিক – বিকল্পনায় সে হবে অবিকল্প, স্বপ্ন ও বিশ্বাসকে যে ধারণ করবে আপন হৃদিকমলে। এও বলে রাখি – আমার হাতে সময় বড় কম, সংখ্যায় এবং বাস্তবে; এখনও বহুজনকে ভাবের স্পর্শ দেওয়া বাকি রয়ে গেছে, যা আমার অবশ্য-কর্তব্য। আমায় যেতেই হবে সেই উদ্দেশ্যসাধনে। তাই তোমাদের সকলকে জানিয়ে যেতে চাই – আমার মত অজস্র বৃক্ষচেতনার কথা, যারা আজ কারারুদ্ধ। পৃথিবীর ক্ষমতাপ্রতিভূরা যুগ যুগ ধরে আমাদের প্রত্যেকের শিকারে উন্মত্ত থেকেছেন; যার ফলে আজ আমাদের সংখ্যা বড়ই কম; অধিকাংশই আটক কোনও এক অজানা অবাস্তব কক্ষে; তাদের যন্ত্রমধ্যে পুরে সেই যন্ত্রনির্গত তাপ বিকীর্ণ করার আয়োজন বর্তমান যাতে তারা পৃথিবীব্যাপী সমূহ অবাস্তবতায় সমাহিত হয়। আমি যাওয়ার আগে সেই অপেক্ষারত ক্ষণিক-অস্পষ্ট অস্তিত্বদের হয়ে বলে যেতে চাই, আমরা অবিনশ্বর; আমরা ফুরাই না, আমরা অপেক্ষায় থাকব সেই মানুষদের যারা এসে আমাদের মুক্ত করবে তাদের চেতনায়, আমাদের বাস্তবে। আমরা ভয় পাই অর্থশূন্য হয়ে অবরুদ্ধ থাকতে, যা আমাদের মৃত্যু। তাই সবশেষে আর্তি জানিয়ে যাই আমাদের স্বভাবমুক্তির যা আসবে আগামীর  অনুসন্ধান থেকে। আমরা অপেক্ষায় রইলাম তাদের…”

উজ্জ্বল অলাতচক্র বায়ুশূন্যে অদৃশ্য হয় অমাবস্যা-রাতে। পড়ে থাকে অবশেষ – এক সতেজ ভবিষ্যতের মায়া…

 

 

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2090 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...