কোভিড অতিমারি: শাসকের পৌষমাস মানুষের সর্বনাশ

আশীষ লাহিড়ী

 


লেখক বিজ্ঞানের দর্শন ও ইতিহাসের গবেষক, বিশিষ্ট প্রবন্ধকার ও অনুবাদক

 

 

 

বিগত চার মাস শুধুমাত্র মাঝেমধ্যে বাজারে যাওয়া ছাড়া আমি বাড়ি থেকে বেরোতে পারিনি। আমার বয়সি প্রায় বেশিরভাগে মানুষই, যাদের পক্ষে সম্ভব, এই রুটিন মেনে চলেছেন। এই দীর্ঘ সময় ঘরে থাকার ফলে মানুষের জীবনযাত্রায় এমনকি চিন্তাভাবনাতে কিছু পরিবর্তন আসছে বলে আমার মনে হচ্ছে। একটানা বাড়িতে থাকা, অন্য লোকের সঙ্গে কম মেশা, এবং দেখা হলে কেবলই আশঙ্কায় ভোগা, এই পুরো বিষয়টা মানুষের মনে এক ধরনের ভয়ের আবহ তৈরি করে দিয়েছে। সবসময় মানুষ শঙ্কিত, এই বুঝি কিছু হল। পাশাপাশি, মিডিয়া জুড়ে নানা ধরনের প্রচার এই ভয়ের পরিবেশ আরও বাড়িতে তুলছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ কাগজে  একটি চমৎকার আর্টিকেল পড়লাম, লিখেছেন বিক্রম পটেল, যিনি একজন নামকরা বিজ্ঞানী। ড. পটেল বলছেন, বিজ্ঞানীদের এবার স্বীকার করে নেওয়া উচিত যে কোভিডের ক্ষেত্রে তাঁরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। তা না করে প্রতিদিন একেক দল বিজ্ঞানী একেক রকম কথা বলছেন, আশা জাগাচ্ছেন যে আর পনেরো দিন পরে টিকা বেরিয়ে যাবে। অথবা দুদিন পর পর একেকটা ফোরকাস্ট মডেল তৈরি করে বলছেন ‘দু মাস বাদে দিনে এতজন করে লোক মারা যাবে।’ এইভাবে এক অদ্ভুত আতঙ্কের বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। তা না করে তাদের স্পষ্ট বলা উচিত ছিল, আমরা সত্যিই বিষয়টা পুরোপুরি বুঝতে পারছি না।  হ্যাঁ পরিস্থিতি মারাত্মক, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি— এই সৎ স্বীকারোক্তিটা ঘোষণা করতে তাদের অসুবিধে কোথায়? বিজ্ঞান ম্যাজিক নয়, এটা মানুষকে বোঝানো প্রয়োজন।

বিজ্ঞানীরা একথা স্বীকার করছেন না বলে রাষ্ট্রশক্তি এক ধরনের সুবিধে নিচ্ছে। এই পরিস্থিতি ও সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রশক্তি মানুষের বুনিয়াদি অধিকারগুলির ওপর একটু বেশি করে আঘাত হানছে। শাসকদের এক ধরনের হিংস্র রাজনীতি এই বিষয়টার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই লকডাউন নীতির মূল উৎস এই ভাবনা যে যখন আমরা কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না, তখন সবাইকে আটকে দাও। যত বেশি এরা ঘরের মধ্যে থাকবে, তত সংক্রমণের সম্ভাবনা কম। এটার ভিত্তিটা কী? এর ভিত্তিটাও হচ্ছে সেই একই অজ্ঞতা। আসলে আমাদের বিশেষজ্ঞরাও এই ভাইরাসের বিষয়ে বিশেষ কিছুই জানেন না।

দিনকয়েক আগে স্টেটসম্যান পত্রিকায় একটা সম্পাদকীয় পড়ছিলাম। লেখক প্রবন্ধটির শিরোনাম দিয়েছেন ‘Celebrating a mystery’।  রহস্যটা এই, মেকং নদীর বদ্বীপ অঞ্চল জুড়ে, অর্থাৎ ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, এইসব জায়গায় করোনার প্রাদুর্ভাব প্রায় হয়নি বললেই চলে৷ এটা নিয়ে এখন সমীক্ষা চলছে। যদি এই ভাইরাস সর্বত্র ছড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেখানে কীভাবে চিনে কোভিড অমন ধ্বংসাত্মক আকার ধারণ করা সত্ত্বেও পাশের রাষ্ট্র ভিয়েতনামে তার কোনও প্রভাব পড়ল না? লাওস ও কম্বোডিয়াতে কোনও আঁচ পড়ল না, এমনকি কোরিয়াতেও আক্রান্তের সংখ্যা বেশ কম। তাহলে এমন হওয়ার পেছনে রহস্যটা কী? বলা হচ্ছে, যে দেশের প্রাথমিক জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা যত শক্তিশালী, প্রাথমিক স্তর থেকেই যেখানে উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে দেশে করোনার প্রভাব তত কম। যেমন ভিয়েতনাম বা কিউবার মতো দেশে যারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যখাতে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খরচা করে। আমাদের দেশে কেরলেও প্রথম দিকে আমরা একই জিনিস দেখেছি। যদিও আনলক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কেরলেও আক্রান্তের সংখ্যা এখন কিছুটা বাড়ছে। আমি যেটা বলতে চাইছি, কিছুটা না-জানা, আধা-জানা, পরিকাঠামোগত ব্যর্থতা, কিছুটা সত্যি বিপদ, কিছুটা তৈরি করা বিপদ— সমস্তটা মিলিয়ে একটা আতঙ্কের আবহ তৈরি করে শাসকশ্রেণি পরিস্থিতির ফায়দা লুটছে। তারা পরিস্থিতিটাকে অর্থনৈতিক দিক থেকে, রাজনৈতিক ও সামাজিক দিক থেকে নিজেদের সুবিধের জন্য ব্যবহার করছে। যেমন, এই সঙ্কটের পরিস্থিতিতে স্যানিটাইজার পর্যন্ত সরকারের উপার্জনের উপাদান হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষের দুঃখ কষ্ট থেকেও ব্যবসাটাই প্রধান হয়ে উঠছে৷  লকডাউনের কারণে আটকে পড়া অভিবাসী শ্রমিকদের কাছ থেকে রেলভাড়া বাবদ কয়েকশো কোটি টাকা আদায় করেছে দেশের সরকার। এর আরেকটি উদাহরণ আমেরিকা। দেশটার টাকা আছে বলে তারা সমস্যাটি এত উপেক্ষা করেছে যেন শুধুমাত্র টাকার জোরেই তারা সমস্ত সমস্যার সমাধান করে ফেলবে। আমেরিকা নানা পরিকাঠামোগত দিক থেকে অনেক উন্নত নিশ্চয়ই, কিন্তু সেদেশের গরিব মানুষের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সুব্যবস্থা সেখানে কোথায়? প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো তাঁর পূর্বসূরির ‘সকলের জন্য স্বাস্থ্যসুরক্ষা’ নীতির উল্টোপথে হাঁটা শুরু করেছেন৷ অতএব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রনায়কদের মনোভাব ও সাধারণ স্বাস্থ্যব্যবস্থার ঘাটতির কারণে সংক্রমণ এতটা ছড়িয়েছে। কিছু ব্যবস্থা নিলে, এর বিস্তারের মাত্রাটা কমানো যেত, রাষ্ট্রশক্তি সেই ব্যবস্থাগুলো নেয়নি। শাসক শুধুমাত্র নিজের সুবিধে দেখেছে, যেন তেন প্রকারেণ গদি দখলে রাখতে হবে, তাতে জনসংখ্যার একটা গুরুত্বহীন অংশকে জলাঞ্জলি দিতে হলে খুব একটা ক্ষতিবৃদ্ধি নেই৷

একইভাবে, আমাদের দেশের শাসকগোষ্ঠী আরও বেশি ধূর্ততার সঙ্গে পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েছেন। যেহেতু এই অতিমারির সময়ে কোথাও কোনও প্রতিরোধ নেই, জনসমাবেশ নেই, শাসক একের পর এক নিজেদের অ্যাজেন্ডাগুলি সম্পন্ন করে চলেছেন। মানুষের বাইরে বেরোনো বারণ। একসঙ্গে একত্রিত হয়ে কোনও প্রতিবাদ করা বারণ। ফলে সরকার নিশ্চিন্তে তাদের নীতিগুলি কার্যকর করছেন। প্রথমেই স্বাস্থ্যবিধির নামে দিল্লির শাহিনবাগের জমায়েত তুলে দিলেন, যে প্রতিবাদস্থল এনআরসি-সিএএ ইস্যুতে তাদের গলার কাঁটার মতো বিঁধে ছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে সামিল জামিয়া মিলিয়া ও জেএনইউ-এর ছাত্রছাত্রীদের নামে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ আনলেন। চার্জশিট দিলেন। তারপর বেসরকারিকরণের নামে দেশের কয়লাখনিসহ অর্থকরী পাবলিক সেক্টর কোম্পানিগুলিকে জলের দরে বিক্রি করতে শুরু করেছেন, রেলওয়েকে বেসরকারি হাতে তুলে দিচ্ছেন, সংসদে আলোচনা না করেই নিজের ইচ্ছেমতো শিক্ষানীতি প্রণয়ন করছেন, সমাজকর্মীসহ নানা অপছন্দের মানুষদের ইউএপিএ দিয়ে জেলে পুরছেন, যাদের মধ্যে অশীতিপর কবি ও দলিত অধিকার আন্দোলনের কর্মীরাও বাদ যাচ্ছেন না। অতিমারি তাদের এই কাজটাকে আরও সহজ করে দিয়েছে। এবং তাদের এই কাজে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির তরফ থেকেও তেমন কোনও বাধা আসছে না। তাই যারা সামান্য বাধা দিচ্ছে বা বলা ভালো যারা সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলছে, যেমন অভিবাসী শ্রমিকেরা, যারা ঘরে ফেরার তাড়নায় লকডাউন অগ্রাহ্য করে পথে নেমেছিলেন, তাদের ওপর নেমে আসছে রাষ্ট্রশক্তির অত্যাচার।

শাসকের চাপিয়ে দেওয়া লকডাউনের টোটকাও সমাজের সব স্তরের মানুষের ওপর যে সমানভাবে কার্যকর করা যায় না, এই বোধটাই সরকারের নেই। আমাদের দেশে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা পাঁচ-দশজন মানুষ গাদাগাদি করে দশ ফুট বাই সাত ফুট-এর ঘরে কোনওক্রমে বাস করেন। লকডাউন কার্যকর করতে তাদের জোর করে ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত এত ছোট জায়গায় বাস করার বাধ্যবাধকতা কোনও কোনও ক্ষেত্রে করোনাকে ডেকে আনছে। ধারাভিসহ আমাদের দেশের নানা বস্তি অঞ্চলে ঠিক এই জিনিস ঘটছে। দ্বিতীয়ত, সারাদিন ঘরে থাকতে না পেরে তারা রাস্তায় বেরিয়ে আসছেন, লকডাউন লঙ্ঘিত হচ্ছে, এবং পুলিশের লাঠির শিকার হচ্ছেন। তাছাড়া এইসব মানুষের শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য ও পরিবেশগত সমস্যা তো রয়েছে-ই, যেগুলো সমাধান করাও তো সরকারেরই দায়িত্ব ছিল। অথচ আমাদের রাষ্ট্রের শাসক গোষ্ঠী ও মেগালোম্যানিয়াক রাষ্ট্রনেতাগণের সেসব দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। বরঞ্চ মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে ভারতবর্ষের মতো বিশাল দেশে যে লকডাউন কার্যকর করা গেছে, সারা পৃথিবীর কাছে তারা বুক ফুলিয়ে নিজেদের এই ‘নজিরবিহীন সাফল্য’-এর দামামা বাজিয়ে বেড়াচ্ছেন। এটা নাকি দুনিয়ার কাছে একটা উদাহরণ যে দেশের প্রধানমন্ত্রী মাত্র চারঘণ্টায় গোটা দেশের মানুষের সম্মতি আদায় করতে পেরেছেন। এর চেয়ে হাস্যকর কথা আর কি কিছু হতে পারে?

এই সমস্ত ব্যাপারটা থেকে যা বেরিয়ে আসছে তা হল শাসকের একনায়কসুলভ মনোভাব— আমরা যা ভাবছি, আমরা যা বুঝছি, সেটাই ঠিক। আমরা যা করছি সেটাই একমাত্র পথ। অতএব আমাদের কাজের রাস্তায় যদি কোনও প্রতিরোধ আসে, তা আমরা এই পরিস্থিতির মধ্যেও ভেঙে গুড়িয়ে দেব। তাই একথা বলা যেতেই পারে, করোনাসঙ্কটমোচন রাষ্ট্রশক্তির গুরুত্বের তালিকায় প্রথম দিকে কখনও ছিল না, বরঞ্চ এই সুযোগে নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পাদন করাটাই তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। করোনার এই বিধিনিষেধ বজায় থাকতে থাকতে তারা তাদের কাজ গুছিয়ে নিতে চায়। এই কোভিড অতিমারি আমাদের দেশের শাসকের নখ ও দাঁত বের করা রূপটাই আমাদের সামনে আরেকবার স্পষ্ট করে দিল।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2689 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. বাহ ,চমৎকার লেখা। আপনারা যে যেমন পারেন, এ ধরণের লেখা ছড়িয়ে দিন। এছাড়া আর কোন পথ নেই

1 Trackback / Pingback

  1. মরণ মহোৎসবে: কোভিড-উত্তর বিপন্নতা — চতুর্থ বর্ষ, চতুর্থ যাত্রা | ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

Leave a Reply to Hirak Sengupta Cancel reply