আমার অনাগত, আমার অনাহত

অভিজিৎ মুখার্জি

 

দুটোই পুকুরপাড়ের বাড়ি নিয়ে বই। দুটোর একটাও অবশ্য ঠিক বাড়ি নয়, একটা হল কাঠের একটা কেবিন, যুক্তরাষ্ট্রে বস্টন শহরের উপকন্ঠে ওয়ালডেন পন্ড-এর ধারে, আর অন্যটা পৃথিবীর সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর সৌধগুলোর একটা, ওয়র্ল্ড হেরিটেজ সাইট, জাপানে কিওতো শহরের কাছেই, কিংকাকুজি, স্বর্ণমন্দির। আমার এই ঘটনাবিহীন সাদামাটা জীবনেও কী করে যেন এই দুটোই বার তিনেক করে আমার দেখা হয়েছে। কিন্তু এদের সঙ্গে জড়িত বিশ্ববিখ্যাত দুটো বই এখনও পড়া হয়নি। আশ্চর্যের ব্যাপার, দুটোই পড়ার কথা ফিরেই ফিরেই মনে হয়, বই যে পড়ি না এমন তো নয়, তবু কীভাবে যেন পড়া আর হয়নি! বলা যায় : ঘরেতে এলো না সে যে, মনে তার নিত্য আসা যাওয়া।

হেনরি ডেভিড থোরোউ (উচ্চারণটা নিয়ে আমি খুব আত্মবিশ্বাসী নই, মার্কিনিদের কারুকে কারুকে যেমন উচ্চারণ করতে শুনেছি সেটাই লিখলাম। রোমান হরফে : Henry David Thoreau) তাঁর ‘ওয়ালডেন’ বইটা প্রকাশ করেছিলেন ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে। আপনাদের অনেকেরই নিশ্চয়ই বইটা পড়া। গান্ধী এবং তলস্তয় নাকি প্রভূত পরিমাণে প্রভাবিত হয়েছিলেন এই বই পড়ে। ওয়ালডেন পন্ড একটা বেশ বড় জলাশয়, তাকে ঘিরে বড়বড় গাছের এক ঘন বন। পরে কখনও কৃত্রিম উপায়ে সেই পুকুরের পাড়ে বালি দিয়ে একটা তটভূমি বানানো হয়েছে, খুব ঠাণ্ডা না থাকলে একটু বেলা বাড়লেই দেখা যায় সেই তটভূমিতে লোকে সূর্যস্নান করছে, তবে থোরোউ যে সময় ওখানে ছিলেন, সেই সময়ে সম্ভবত এই কৃত্রিম তটভূমিও ছিল না, সূর্যস্নানও করার প্রশ্ন ছিল না। থোরোউ-র সাধনাই তো, যতদূর অনুমান করেছি, ছিল কৃত্রিমতাবর্জিত জীবনের ঐশ্বর্য উপলব্ধির। সেইসব উপলব্ধির কথাই আছে ওই বইটাতে। এখন ওয়ালডেন পন্ডের পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা গাড়ি চালাবার মতো রাস্তা, আর সেটারই অন্য ধারে গাছগাছালির মধ্যে থোরোউ-র সাদামাটা একঘরের ছোট্ট কাঠের কেবিন। আমি যতবার গিয়েছি সেখানে, প্রত্যেকবারই শরৎকালে, ঝরে যাওয়া শুকনো পাতা ছেয়ে ছিল সেই কেবিনের চারধারের জমি। জীবনের যা কিছু ঝরে যাওয়ার মতোই সাময়িক, তার ওপরে উঠে জীবনের যে শাশ্বত ধারণা, তার মতোই থোরোউ-র ওই অনাড়ম্বর কুটির বিনম্রভাবে দাঁড়িয়ে আছে, সময়কে নিজের সঙ্গে নিয়ে। ‘ওয়ালডেন’ বইটা থেকে উদ্ধৃতি হিসেবে তুলে দেওয়া কয়েকটা লাইন একজায়গায় পড়েছিলাম :

I had withdrawn so far within the great ocean of solitude, into which the rivers of society empty, that for the most part, so far as my needs were concerned, only the finest sediment was deposited around me. Beside, there were wafted to me evidences of unexplored and uncultivated continents on the other side.

একাধিক অদেখা, অচর্চিত মহাদেশের মতোই বিশালা অজানা দিক রয়ে গেছে এই মানুষী অস্তিত্বের, যার আভাস ওইখানে সরল জীবনযাপন ও ধ্যানের ভিতর দিয়ে পেয়েছিলেন সাধক। শুধুমাত্র যেটুকু মানুষের সীমিত জ্ঞানে কাজে লাগার মতো, যেটুকু মানুষের গড়ে তোলা, মানুষের দৈনন্দিন যেটুকু, তাকে অতিক্রম করে প্রকৃতির মাঝখানে, প্রকৃতির অংশ হিসেবে নিজেকে বিবেচনা করে এক পূর্ণতর সত্যের সন্ধান পেয়ে সেই জীবন-দর্শনের কথা ওয়ালডেন বইটাতে লিখেছিলেন থোরোউ — এরকমই আপাতত আমার ধারণা।

কিংকাকুজি কথাটার অর্থ স্বর্ণমন্দির। জাপানের প্রাক্তন রাজধানী, এবং এখনও সূক্ষ্মতম ও আভিজাত্যময় সৌন্দর্যচর্চার ঐতিহ্যগত কেন্দ্র কিওতো শহর। তার অদূরেই এই মন্দির। আগেই বলেছি, এক জলাশয়ের ধারে। দর্শনার্থী পর্যটক যাঁরা যান, তাঁরা পুকুরের অন্য পাড়ে দাঁড়িয়ে, একটু দূর থেকে দর্শন করে আসেন সেই অকল্পনীয় সৌন্দর্যময় মন্দির আর তার স্থাপত্যের সুষমা। চতুর্দশ শতকে শোগুন, অর্থাৎ মুখ্য সেনাপতি য়োশিমিৎসু এই সৌধ নির্মাণ করেন এবং তাঁর ছেলের সময়ে এটি হয়ে ওঠে বৌদ্ধধর্মের জেন শাখাবলম্বী সাধনার এক কেন্দ্র। ১৯৫০ সালে এক তরুণ শিক্ষানবিশ সন্ন্যাসী মানসিক রোগগ্রস্ত হয়ে পড়ে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় মন্দিরটাকে। অবিলম্বেই আবার নতুন করে গড়েও তোলা হয় অবশ্য, আগের মতো করেই। ঠিক কী ভেবে, কোন উদ্দেশ্যে সেই তরুণ আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দিতে চেয়েছিল তা আর জানা যায় না, কিন্তু জাপানের বিশ্ববন্দিত সাহিত্যিক মিশিমা ইউকিও সেই ঘটনাকে অবলম্বন করে কিংকাকুজি নামে একটা উপন্যাস লেখেন। এই উপন্যাসের কাহিনীতেও এক তরুণ সন্ন্যাসী মন্দিরটাতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির কয়েক বছর পরেই। উপন্যাসে নাকি তরুণের এই সিদ্ধান্তের একটা মনস্তাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ আছে। খুব সম্ভবত আগুন লাগানোর সেই ঐতিহাসিক ঘটনার সত্য উদ্ঘাটন এটা নয়, এই উপন্যাসের মাধ্যমে মানবসভ্যতা ও তার ইতিহাস বিষয়ে মিশিমা তাঁর নিজের চিন্তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, জগৎকে একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন। সৌন্দর্য বিষয়ে এরকম একটা কথা নাকি এই উপন্যাসে আছে বলে যেন পড়েছিলাম এক আলোচনায়, যে সৌন্দর্য তার সৃষ্টির অল্পসময় পরেই নাকি ঘুমিয়ে পড়ে, যেটা থেকে যায় সেটা নাকি সেই সম্পর্কে জ্ঞান। পড়ে মনে হয়েছিল, তবে কি উনি এরকম আভাস দিলেন যে জ্ঞানের ধারাবাহিকতায় ছেদ না টানলে সৌন্দর্য আর নতুন করে সৃষ্টি হবে না?

কিংকাকুজি-র প্রচ্ছদ

বেশ ক’বার বিভিন্ন জায়গায় জাপানি সাহিত্য নিয়ে, জাপানের ইতিহাস নিয়ে আলোচনায় বইটা থেকে দু’চারটে করে লাইন ব্যবহার হতে দেখেছি। প্রত্যেকবার পড়বার ইচ্ছেটাকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে। এক জায়গায় পড়েছিলাম (খুঁজে খুঁজে বের করলাম সেটা) :

আমাদের জীবনের পূর্বাপর ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখতে যেটা প্রয়োজন, সেটা হল চারপাশের সময়কে, কিছুকাল ধরে অতিক্রান্ত সময়কে প্রস্তরীভূত হয়ে যেতে হয়। উদাহরণ হিসেবে ধরুন, একটা দেরাজ, কোনও বাড়িতে কাজে লাগবে বলে একজন ছুতোর সেটা তৈরি করেছে। যতই সময় অতিক্রান্ত হতে থেকেছে, সেটার প্রকৃত অবয়বকে ছাপিয়ে গেছে সময় নিজেই, এবং দশকের পর দশক, শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যাওয়ার পরে মনে হবে যেন সময়ই জমাট বেঁধে ওটার আকৃতি ধারণ করেছে। নির্দিষ্ট একটা ছোট্ট পরিসর, প্রথমে সেটা জুড়ে ছিল একটা বস্তু, আর এখন সেই জায়গাটা অধিকার করে আছে প্রস্তরীভূত সময়। প্রকৃতপক্ষে, কীসের একটা আত্মা যেন ঐটে হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। ‘ৎসুকুমোগামি-কি’ হচ্ছে মধ্যযুগীয় রূপকথার এক সংকলন। তার একদম শুরুতেই আছে নিচের এই অংশটা :

“মহাজাগতিক শক্তি য়িন্‌ আর ইয়াং, এদের নিয়ে নানা কথার মধ্যে একজায়গায় লেখা আছে, শত শত বৎসর কেটে যাওয়ার পর, বস্তু যখন কোনও একটা আত্মায় রূপান্তরিত হয়, মানুষের হৃদয় সেটির দ্বারা প্রতারিত হয়; তখন একে বলা হয় ৎসুকুমোগামি, শোকাহত আত্মার বছর। প্রত্যেক বছর বসন্তোদ্‌গমের আগে, বাড়ির বাসনপত্র বাতিল করে দিয়ে গলিতে ফেলে রেখে আসার প্রথা এ জগতে আছে; একে বলা হয় বাড়ি পরিষ্কার করা। একইভাবে, প্রতি একশোবছর অন্তর মানুষকেও ৎসুকুমোগামির বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হয়।”

একথাকে কি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আস্থাহীনতা বলে ধরে নেব? তবে তো মানুষের সভ্যতার ইতিহাস থেকে সত্য বলে যেসব সূত্রকে এযাবৎ মেনে নিয়েছি, সেগুলোকে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন উনি! তবে তো ইতিহাসের মানুষকেই অস্বীকার করছেন, আমাদের হিউম্যানিস্টদের আমল দিচ্ছেন না!

অমল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উত্তর-আধুনিক চিন্তা ও কয়েকজন ফরাসি ভাবুক’ বইতে পড়েছি ফুকোর সেই ভয়ংকর ভবিষ্যতবাণী : ‘মানুষ একটি আবিষ্কার, যার জন্ম-তারিখ — যা আমাদের চিন্তার প্রশ্নতত্ত্ব সহজেই দেখায় —সাম্প্রতিক। এবং সম্ভবত তার সম্ভাব্য সমাপ্তি আসন্ন’! এই নিয়ে আলোচনায় শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ‘যুদ্ধোত্তর ইতিহাস-চিন্তা ঘটনার ক্রমান্বয়ে আস্থাহীন ও তার অন্তর্নিহিত কোনও সামূহিক তাৎপর্যে অবিশ্বাসী। যেখানে প্রাচীনরা দেখতেন ধারাবাহিকতা, আধুনিকরা সেখানে দেখেছেন একটি ছেদ (interruption)–এর পর আরেকটি ছেদ… এক ছেদ থেকে আর এক ছেদে পৌঁছানোর মধ্যে কোনও কার্যকারণ সম্পর্কও নেই।’ এই সূত্রেই ফুকো নাকি একথাও বলেছেন, ‘এটা সহজে বিশ্বাস করা যায় যে মানুষ তার নিজের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছে এটা আবিষ্কার করা মাত্র যে সৃষ্টির কেন্দ্র সে নয়, সে বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রের মধ্যস্থলও নয়, সম্ভবত সে সবকিছুর শীর্ষেও নয় এবং নয় জীবনের শেষ।’ এই কথাই কি থোরোউ-র ‘ওয়ালডেন’ নামে বই থেকে যে উদ্ধৃতি আমি এখানে উল্লেখ করেছি, তারও ইঙ্গিত নয়?

সম্প্রতি অমিতাভ ঘোষের বিশ্ব জুড়ে সাড়া জাগানো বই, ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’ তো যেন আরও স্পষ্টভাবেই সেকথা উচ্চারণ করছে। পুকুরপাড়ের বাড়ির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বইদুটো না পড়ে আর কি উপায় আছে এখন?
 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*