বুদ্ধিবিরোধী সংস্কৃতির বিপ্রতীপে দাঁড়ানো একটি বই

দেবাশিস্‌ ভট্টাচার্য

 

 

আশীষ লাহিড়ীর বই যখনই পড়তে বসি, তখন মনের মধ্যে এক ভরসামাখা প্রত্যাশা কাজ করে — এ বই পড়ে, আর যাই হোক, মানুষের বোধবুদ্ধিতে বিশ্বাস হারানো বিষণ্ণতার তোবড়ানো বদনখানি দেখতে হবে না। এ রকম ভরসার খুব দরকার পড়ছে আজকাল। পৃথিবী জুড়ে নানা বর্ণের মৌলবাদীদের বিধর্মী-নিধন উৎসব, তার পিছনে আধুনিক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক শক্তিবর্গের গোপন সমর্থন, বৈদিক বিমানে সওয়ার হওয়া প্রধানমন্ত্রী, নবান্নের উঁচুতলায় বাস্তুশাস্ত্রীয় নিরাপত্তায় সুরক্ষিত বাস্তুঘুঘুদের বাস্তুতন্ত্র। এ পরিস্থিতির এক পিঠে যদি থাকে অযৌক্তিক ঘৃণা ও বে-লাগাম হিংস্রতা চর্চার দক্ষিণপন্থী আহ্বান, তো উল্টো পিঠে নিশ্চিতভাবেই আছে যুক্তি আর বিজ্ঞানকে মোটাদাগে ক্ষমতা ও আধিপত্যের সাথে সমীকৃত করবার লিবারেল-সাবঅল্টার্নিস্ট ভেগোলজি আর ননসেন্সবাজি। যুক্তি-বুদ্ধি-জ্ঞান জারিত অকুণ্ঠিত মানবতাবাদের পরিসর সেখানে কোথায়? সে পরিসর ছিনিয়ে আনার উস্কানিওয়ালা বই, অতএব, ভীষণই জরুরি আজ।

‘বুদ্ধিজীবী’ শব্দটি আজ বহু-ব্যবহারে জীর্ণ তো বটেই, তার পেছনকার ধারণাটি বোধহয় বিদ্রূপে শতছিন্নও। এ বইয়ের গোড়াতেই, তাই, শ্রীলাহিড়ী এ শব্দটিকে ‘বৈতরণী পার’ করিয়ে দিতে চান, আবার, তা চেয়েও একটু থমকে দাঁড়ান। কেননা, “খাঁটি বুদ্ধিজীবিত্ব বলেও একটা চিরজীবী ব্যাপার আছে, তার গুরুত্বকে নতুন করে কুর্নিশ করাটা আজকের এই ভাঙা-স্বপ্নের দুনিয়ায় বিশেষ করে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।” কিন্তু, এই ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবিত্ব’ বস্তুটি ঠিক কী? লেখক সেটাই ব্যাখ্যা করেছেন তাঁর ‘প্রতিষ্ঠান, বুদ্ধিজীবী ও অভক্তিচর্চা’ শীর্ষক প্রথম প্রবন্ধটিতে, যা কিনা তাঁর নিজের বয়ানে, এ বইটির ‘প্রবেশিকা’। বুঝে আহ্লাদিত হই, তাঁর কাছে ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবিত্ব’ ধারণাটির অপরিহার্য উপাদান বা ‘সামান্য লক্ষণ’ হল ‘অভক্তিচর্চা’। ধারণাটিকে তিনি  ধরতে চান  নানা ডাইমেনশনে — সার্ত্রের মতানুযায়ী জৈবনিক প্রয়োজন ছাড়িয়ে বৃহতের আহ্বানে সাড়া দেবার প্রবণতায় (রাবীন্দ্রিক ‘মানুষের ধর্ম’?), চমস্কির মতো করে ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়াবার দুঃসাহসে, বা এডওয়ার্ড সঈদের বিবরণ-মাফিক ক্ষমতাবৃত্ত থেকে স্বনির্বাসিত হয়ে ক্ষমতাহীনের পক্ষে দাঁড়ানোয়, কিম্বা হয়ত নিপীড়িত শ্রেণির সাথে ‘অর্গ্যানিক’ সম্পর্কে অন্বিত হয়ে থাকার গ্রামসীয় সংজ্ঞার্থে। আবার, ব্রিটিশ সংস্কৃতিতে যেভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত বিজ্ঞানকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল বুদ্ধিজীবিত্বের গৌরবান্বিত বৃত্ত থেকে, সেও এখানে এক প্রাসঙ্গিক কথা। কারণ, তার প্রভাবেই তো সুধীন দত্ত আমাদের বুদ্ধিজীবী হতে পারেন, মেঘনাদ সাহা সেভাবে পারেন না। এ সবেরই অনুষঙ্গে আসে ‘ইন্টেগ্রিটি’-র ধারণা, সুধীন-দত্তীয় বাংলায় যা হয়ে দাঁড়ায় ‘অবৈকল্য’, বাঙালি বৃত্তে যার সেরা দৃষ্টান্ত লেখক খুঁজে পান সমর সেনের মধ্যে। ‘ইন্টেগ্রিটি’-র প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সরকারি পদ, বা বড় মিডিয়া হাউসে সাংবাদিকের চাকরি, এইসব পেয়ে গেলে বাঙালি ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবী’ আর তত খাঁটি থাকেন না।

খাঁটি বুদ্ধিজীবিত্বের সংজ্ঞার্থ খোঁজার পালা সাঙ্গ হলে লেখক মন দেন দৃষ্টান্ত অন্বেষণে, ঘরে ও বাইরে। সেখানে উঠে আসে তাঁর নানা ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার কথা, উজ্জ্বল বর্ণময় মানুষদের সাথে সান্নিধ্যের কথা। সমর সেন, ভূমেন্দ্র গুহ, অশোক সেন, এমনকি, অমর্ত্য সেন ও মার্টিন বার্নাল (এবং আরও অনেকেই)। এ বইয়ের অনেকটাই জুড়ে রয়েছে এইসব ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা। বুদ্ধিজীবীর দৃষ্টান্ত অন্বেষণে তার প্রাসঙ্গিকতা তো রয়েইছে, কিন্তু আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের টুকরো হিসেবেও তার মূল্য কিছু কম হত না। সেই হিসেবে, বুদ্ধিজীবিতার প্রসঙ্গটি বাদ দিলে, এ বই হয়ত হতে পারত তাঁর পূর্ববর্তী আরেক বই ‘সংস্কৃতির বাংলা বাজার’-এর এক অনবদ্য সিকুয়েল। কীভাবে তিনি অনুবাদকর্মের মধ্যে দিয়ে সন্ধান পেলেন ভাষার অন্তর্নিহিত গুপ্ত রহস্যের, কীভাবে অপ্রাতিষ্ঠানিক অবাণিজ্যিক পত্রিকায় লেখালিখি তাঁকে নিয়ত জুগিয়েছে অমৃতের স্পর্শ, কীভাবে তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন এক তন্নিষ্ঠ জীবনানন্দ-গবেষকের দরদী চিকিৎসকমূর্তি, দেখেছেন অমর্ত্য সেনের অহংশূন্য নিরভিমান অথচ তীব্র মনন, লিট্‌ল্‌ ম্যাগ সম্পাদকের উৎকর্ষ-আর্তি, আর মার্টিন বার্নালের ঋজু অথচ নম্র পাণ্ডিত্য। অবশ্য, স্মৃতিচারণই সব নয় এ বইয়ের, সেটা আছে শুধু ‘অন্তর্বৃত্তে’ অংশে।

‘বহির্বৃত্তে’ অংশে আছে পাঁচটি প্রবন্ধ, তার মধ্যে প্রথম দুটি পুরোপুরি তত্ত্বমুখিন। একটি কার্ল মার্ক্সের পরিবেশ-ভাবনা নিয়ে, অপরটিতে আছে ‘বাস্তবতা’-র স্বরূপ বিষয়ে গ্রামসির তত্ত্বচিন্তা ও রবীন্দ্র-আইনস্টাইন বিতর্কের মধ্যে কোনও এক সাধারণ বিন্দুর সন্ধান। প্রথমটি যতটা আবিষ্ট করে, প্রশ্ন তুলে দেয় তার চেয়েও বেশি। প্রশ্নের শুরু সমাজতন্ত্র সম্পর্কে একটি সমস্যাকে ঘিরে। একটি বহুশ্রুত অভিযোগ হচ্ছে, সমাজতন্ত্র শুধু উৎপাদনের যৌথ মালিকানা আর সমবণ্টনের কথাই বলে, কিন্তু উৎপাদন করতে গিয়ে প্রকৃতি ধ্বংসের ব্যাপারে তার কোনও মাথাব্যথা নেই। ফলে, সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে ধনতান্ত্রিক অসাম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকলেও, ধনতন্ত্রের আরেকটি কু-প্রবণতা তার মধ্যে সম্পূর্ণ বিদ্যমান — প্রকৃতিকে নিংড়ে নিয়ে শুধু আরও আরও ভোগ। এই প্রশ্নেরই প্রেক্ষিতে আধুনিক গবেষণা উদ্ধৃত করে লেখক দেখাতে চান, আধুনিক সমাজতন্ত্রের প্রধান প্রবক্তা কার্ল মার্ক্স আসলে কত গভীরভাবে পরিবেশ-সঙ্কট নিয়ে চিন্তিত ছিলেন। কীভাবে তিনি কৃষিবিজ্ঞানী ফন লিবিগের পরিবেশ-চিন্তা অনুধাবন করেন, প্রভাবিত হন, এবং সে সম্পর্কে তাঁর মূল্যায়ন সময়ের সাথে কীভাবে বিবর্তিত হয়, তন্নিষ্ঠ পাঠকের কাছে তা যথেষ্ট উত্তেজক বিষয় হয়ে উঠতে পারে। লেখক শেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছন, যে, “পরিণত মার্ক্সের বার্তা খুব পরিষ্কার: শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে ভবিষ্যতে যে-সমাজতন্ত্র আসবে, দেদার সামগ্রী উৎপাদন নয়, ইকোলজি হবে তার প্রধান স্তম্ভ।” তবু, প্রশ্ন  তো থেকে যায়ই। ধনতন্ত্র তো শখ করে প্রকৃতি ধ্বংস করে না, করে মুনাফার তাড়নায়, যা অর্থনীতির চালিকাশক্তি। সেই রকম, সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি যদি হয় ‘সামর্থ্য অনুযায়ী দেওয়া আর প্রয়োজন অনুযায়ী নেওয়া’, তো তার সাথেও প্রকৃতির বিরোধ না হবার কারণ নেই। মানে, নীতিটির মধ্যে অন্তত সে বিরোধ মেটবার কোনও অনিবার্য যৌক্তিক সম্ভাবনা নিহিত নেই। সমাজ হয়ত বড়জোর প্রযুক্তি ও আইনের সাহায্যে সে বিরোধকে ‘মিনিমাইজ’ করতে চাইবে, ঠিক যেমনটি এখনও ঘটে থাকে। একটি পরিণত ও সুশৃঙ্খল সমাজ হয়ত সেটা এখনকার থেকে অনেক বেশি ভালোভাবে পারবেও। কিন্তু, ইকোলজি তার ‘প্রধান স্তম্ভ’ কীভাবে হতে পারে?

বুদ্ধিজীবীর ভাববিশ্ব  : সংশয়ে  প্রত্যয়ে  নির্মাণে  বর্জনে,  আশীষ লাহিড়ী,  মনফকিরা,  অগস্ট ২০১৭,  ১৬০ টাকা

বাস্তবতার স্বরূপ বিষয়ে গ্রামসি-আইনস্টাইন-রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেণী-সঙ্গমের খোঁজ পড়েছে যে লেখায়, তাতে ডুব দেবার প্ররোচনা যথেষ্টই, যদিও স্বচ্ছতা ততটা নয় বলেই মনে হল। শ্রীলাহিড়ীর রচনায় যে ধরনের চাঁচাছোলা যৌক্তিক স্পষ্টতা আমরা অনায়াসে পেয়ে থাকি, এখানে তা কেমন একটু অনুজ্জ্বল ঠেকল। হয়ত ও ধরনের বিষয়ের ক্ষেত্রে তা অনিবার্য, কিম্বা হয়ত আমি পাঠক হিসেবে যথেষ্ট প্রস্তুত নই। গ্রামসি বাস্তবতার স্বরূপ উদ্‌ঘাটন করতে চান বুখারিনের ‘যান্ত্রিক বস্তুবাদের’ বিপক্ষে দাঁড়িয়ে, এবং তা করতে গিয়ে তিনি সাবজেক্টিভিটি ও অবজেক্টিভিটি-র এমন এক দ্বান্দ্বিক সমন্বয় ঘটাতে চান, যা লেখককে মনে করিয়ে দেয় জগতের অস্তিত্ব নিয়ে রবীন্দ্র-আইনস্টাইন বিতর্কের কথা, এবং লেখককে নামিয়ে দেয় দুই সম্পূর্ণ ভিন্ন বিতর্কের স্পর্শবিন্দুর অন্বেষণে। কিন্তু, যে অর্থে মার্ক্সবাদীরা সতেরো-আঠেরো শতকের দার্শনিকদের ‘যান্ত্রিক বস্তুবাদী’ বলে অভিহিত করতেন তা বুখারিনের ক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য হতে পারে না, কারণ, তিনি ছিলেন সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার এক জানে-মানে মার্ক্সবাদী দার্শনিক। যে কারণে গ্রামসি তাঁকে ‘যান্ত্রিক বস্তুবাদী’ বলে আখ্যা দিচ্ছেন, আমি যতটুকু বুঝলাম, তা শুধু এইটা যে, বুখারিন যেভাবে চেতনা-বহির্ভূত বস্তুজগতের অস্তিত্ব স্বীকার করে নেন সেটা অনেকটা ধর্মবিশ্বাসীর ঈশ্বরসৃষ্ট জগতের মতো (অতএব, চেতনা-বহির্ভূত স্বাধীন বস্তুজগতের ধারণাটি একটি থিওলজিক্যাল কন্সট্রাক্ট বা ধর্মতাত্ত্বিক নির্মাণ) । এ ধরনের যুক্তি আমার কাছে খুব দুর্বল লেগেছে। ধর্মের মধ্যে যা যা থাকে সবই কি থিওলজিক্যাল? ধর্ম তো ক্ষুধা-মৃত্যু-দারিদ্র সবই স্বীকার করে (তার ব্যাখ্যা যা-ই দিক না কেন), সেগুলো কি সবই তবে ধর্মতাত্ত্বিক নির্মাণ? ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে মাত্রই কয়েক হাজার বছর আগে, তার আগের লক্ষ বছরের মানুষী জীবনযাপনের বাস্তব বোধ কি ধর্মের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়নি, বিশেষত যখন ধর্ম ছাড়া তত্ত্বচিন্তার আর কোনও আধার ছিল না?

আরও তিনটি প্রবন্ধ আছে এ বইয়ে। একটি ফ্যাসিবাদী ইতালিতে বিজ্ঞান গবেষণার অধঃপতন নিয়ে, মেঘনাদ সাহা যা বাইরের জাঁকজমক দেখে বুঝতে পারেননি, কিন্তু জে. ডি. বার্নাল  যা সহজেই বুঝেছিলেন। শেষের দুটি প্রবন্ধ দুই কৃতী কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত বাঙালির জীবন ও চিন্তা নিয়ে — পদার্থবিদ শ্যামল সেনগুপ্ত ও যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ শিবনারায়ণ রায়কে নিয়ে। এঁদের রচনাবলী আছে, যদিও তত সহজলভ্য নয়, এবং পড়ুয়া বাঙালির মধ্যেও সম্ভবত বেশিরভাগই এঁদের চিন্তার সাথে পরিচিত নন। সে ঐশ্বর্যকে সবার সামনে তুলে ধরার মূল্য অসীম, যদিও সে মূল্যের স্বীকৃতি পেতে বোধহয় দেরি হবে।

আশীষ লাহিড়ীর গদ্য সবসময়ই যৌক্তিক স্বচ্ছতায় উজ্জ্বল, কখনও বা তাতে ঝলসে ওঠে রসিকতা ও বিদ্রূপ। অমর্ত্য সেনের বক্তৃতা বাংলায় অনুবাদ করার পর তা প্রকাশের সময়কাল সম্পর্কে তিনি জানান, “সে বই যথাকালে, অর্থাৎ বেশ দেরি করে, বেরোল ‘ভারতের অতীত ব্যাখ্যা’ শিরোনামে।” আবার, সম্মানসূচক ফরাসি ‘আঁতেলেকতুয়েল’ বাংলায় এসে যেভাবে ‘আঁতেল’ হল তার প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি রায় দেন, “চালাক বাঙালি আপন মনের কালিমা মিশিয়ে শব্দটি পয়দা করেছেন।”

মনফকিরার অন্যান্য পেপারব্যাকের মতো এই বইটিরও গড়ন সুঠাম ও শোভন। প্রচ্ছদে সগর্বে বিরাজ করছেন রোদ্যাঁ-র ‘থিঙ্কার’। বহুব্যবহারে জীর্ণ প্রতীক, তবু আজও চোখ টানে। ‘খাঁটি বুদ্ধিজীবিত্ব’ যেমন, এ-ও বুঝি তেমনই এক ‘চিরজীবী ব্যাপার’!

 

      

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*