শ্রীযুক্ত জলাভূমি চলে গেলেন, জলাভূমির লড়াইটা রইল

জয়ন্ত বসু

 

ফোন ১ : মাস নয় দশ আগের কথা। “খবর পেয়েছ?” উত্তর দিলাম, “পেয়েছি”। “এটা যদি হয়, তবে আমি তোমায় বলছি পূর্ব কলকাতা জলাভূমিকে আর বাঁচানো যাবে না… যে করেই হোক আটকাতেই হবে।” শুরু হল পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বুজিয়ে রাজ্য সরকারের প্রস্তাবিত ফ্লাইওভারকে বিরোধিতা করে লেখালেখি, ও পরিবেশ আন্দোলন। এবং সেই আন্দোলনের পুরোধা উনি। শুধু কাগজ কলমে, লেখালেখিতে না; এমনকি আক্ষরিক অর্থে মাঠে নেমে। ঘোর গরমে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি জুড়ে প্রচার, সাধারণ মানুষকে জুড়ে নেওয়া; যেন গতকালের কথা। এবং কি আশ্চর্য স্মৃতি শক্তি; মনে হয় যেন ১২৫ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত পূর্ব কলকাতা জলাভূমির প্রতিটি ইঞ্চি ওনার চেনা।

ফোন ২ : কয়েকমাস আগে, সকালে ফোন; “খুব জরুরি, একটু সময় আছে তো?” তারপরে প্রায় দশ মিনিট ধরে জানালেন কীভাবে বহু দিনের চেষ্টার পর পূর্ব কলকাতা জলাভূমি অঞ্চলের ময়লা কুড়ানিদের সরকারি পেনশন পাওয়ার সম্ভাবনা উজ্জল হয়েছে; “অনেক দিন ধরে তো লড়াই চলছে, দেখি কিছু করা যায় কিনা?” আসলে প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি উনি চিরকাল গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন সেই সব মানুষদের, যারা ঐ প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি ও বাঁচিয়ে রাখার মূল কারিগর। একবার জলাভূমি অঞ্চলের এক প্রবীণ কৃষিজীবি মানুষের মৃত্যুর খবর জানিয়ে বলেছিলেন, “জানো, এরা মারা যাওয়া মানে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির এক একটা চ্যাপ্টার চিরদিনের মতো হারিয়ে যাওয়া।” ওনার মৃত্যু মানে তো গোটা বইটাই হারিয়ে যাওয়া!

উনি, অর্থাৎ ড. ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ। একজন প্রাক্তন সরকারি আধিকারিক কিন্তু তার থেকেও অনেক বেশি পরিবেশ বিশেষজ্ঞ; আক্ষরিক অর্থে ইকোলজিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং পূর্ব কলকাতার জলাভূমি নিয়ে কাজ করার সূত্রে বিশ্ববন্দিত ও আন্তর্জাতিক একাধিক পুরস্কারে পুরস্কৃত। দু দশকের ওপর আমার সঙ্গে পরিচয় যেন এক হিসাবে একটা লম্বা সাক্ষাৎকার; অজস্র টুকরো টুকরো কথা, ফোন, মেল ও সাম্প্রতিককালে হোয়াটসআপ; যার অধিকাংশই পূর্ব কলকাতা জলাভূমিকে জুড়ে। মনে পড়ে যাচ্ছে প্রায় পনেরো বছর পুরনো আরেকটা বিকালের কথা, সম্ভবত মোবাইল পূর্ব সময় সেটা। ড. ঘোষ জানালেন যে তার বহুদিনের চেষ্টার ফলে, তৎকালীন রাজ্য সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও, পূর্ব কলকাতা জলাভূমির জন্য আন্তর্জাতিক রামসার স্বীকৃতি এসে গেছে; কিন্তু খবরের কোথাও ওনার নাম লেখা যাবে না… উনি তখন যে সরকারি কর্মী, পরিবেশ দপ্তরের মুখ্য পরিবেশ আধিকারিক! পরের দিন টেলিগ্রাফ খবরের কাগজে সেই খবর প্রথম পাতায় বেরোনোর পর ড. ঘোষের আনন্দ কানে ভাসে।

আসলে কিছু মানুষ এমনভাবে কোনও কোনও বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যান যে তাদের আর বিষয় থেকে আলাদা করা যায় না। জীবনে আরও নানান উল্লেখযোগ্য কাজ করলেও — যেমন ধ্রুবজ্যোতিবাবুও করেছিলেন — সেগুলি মূল কাজের আলোয় চাপা পড়ে যায়। ড. ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ আর পূর্ব কলকাতার জলাভূমি ঠিক তেমনভাবেই মিলেমিশে গেছে। শুরু প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে। ১৯৮১ সালে রাজ্য সরকারের কর্তাব্যক্তিদের হঠাৎ খেয়াল হল যে শহর থেকে প্রতিদিন যে লক্ষ লক্ষ লিটার ময়লা জল বের হচ্ছে তা যাচ্ছে কোথায়? কেননা তখন পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন শহরে ময়লা জল পরিশোধনের জন্য বিশাল বিশাল ট্রিটমেন্ট প্লান্ট বসছে কিন্তু কলকাতার তো কোনও প্লান্টই নেই, তবে? এই রহস্য উদ্ধার করতে গিয়ে ধ্রুবজ্যোতিবাবু এমন এক লুকোনো রত্নের সন্ধান পেলেন যা ওনার বাকি জীবনটাকেই পাল্টে দিল। হয়তবা কলকাতা শহরের ভবিষ্যতকেও। ওনার নিজের কথায়, “তখন তো বিশেষ রাস্তা টাস্তা নেই…. কোনও ক্রমে ময়লা জল যাওয়ার নালা ধরে ধরে পৌছে দেখি এক অদ্ভুত ম্যাজিক; সাধারণ মানুষ দেখাল কীভাবে তারা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে নিজে থেকে খানিকটা শোধিত হওয়া শহর থেকে বেরোনো ময়লা জল ব্যবহার করে ধান, সবজি আর মাছ চাষ করছে।” চটজলদি ধ্রুবজ্যোতিবাবু বুঝে গেলেন যে কলকাতা শহরের বাঁচা মরার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়ে আছে শহরের পূর্ব দিকে থাকা ১২৫০০ হেক্টার বিস্তৃত এই জলাভূমির ভবিষ্যত, যা শুধুমাত্র প্রতিদিন শহর থেকে নিষ্কাশিত হওয়া প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন লিটার ময়লা জলকেই প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে পরিশোধন করে না; সেই জল ব্যবহার করে এই অঞ্চলে থাকা হাজার হাজার কৃষিজীবি ও জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ পরম্পরাগতভাবে জীবিকা নির্বাহ করেন ও সেই কৃষিজাত পণ্য ও মাছ সুলভে পাওয়ার কারণে কলকাতা শহরে গড়পড়তা বেঁচে থাকার খরচ অন্যান্য বড় শহরের তুলনায় কম। তিনি নব-আবিষ্কৃত এই আশ্চর্য জলাভূমিকে ‘পূর্ব কলকাতা জলাভূমি’ নাম দিয়ে বাকি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরলেন। শোনালেন এক আশ্চর্য কথা; “আসলে কলকাতা হল ইকলোজিকালি সাবসিডাইসড সিটি অর্থাৎ পরিবেশের অপার দাক্ষিণ্য পাওয়া শহর, যার একদিকে গঙ্গা নদী যেখান থেকে আমাদের পানীয় জল আসে, অন্যদিকে বিশাল পূর্ব কলকাতার জলাভূমি যা কিডনির মতো শহরের যাবতীয় ময়লা জল বিনা খরচে শোধন করছে ও শোধিত জলে মাছ, সবজি চাষ হচ্ছে; আর মাটির তলায় জলের ভাণ্ডার। আমরা বড়লোকের বাউণ্ডুলে ছেলের মতো সেই সুবিধা হেলায় হারাচ্ছি।”

বলাই বাহুল্য দ্রুত ধ্রুবজ্যোতিবাবু ও পূর্ব কলকাতা জলাভূমি সমার্থক হয়ে উঠল। কিন্তু বাধ সাধল তত্কালীন সরকার, বা বলা ভালো ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল। তথাকথিত উন্নয়নের গাজর ঝুলিয়ে জলাভূমি বুজিয়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও আরও নানা প্রকল্পর পরিকল্পনা হতে শুরু করল, প্রমাদ গুনলেন ড. ঘোষ। ফলে নব্বই দশকের গোড়ায় ‘পাবলিক’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা যখন পূর্ব কলকাতা জলাভূমি বাঁচাতে কলকাতা হাইকোর্ট-এ মামলা করল তখন সরকারি আধিকারিক হওয়া সত্ত্বেও পিছন থেকে যাবতীয় সহায়তা করেছিলেন ধ্রুবজ্যোতিবাবুই। “মনে আছে কীভাবে রাতের অন্ধকারে মামলার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠিয়ে দিতেন ড. ঘোষ” বলছিলেন মামলার সঙ্গে যুক্ত একজন; “যে ম্যাপের ভিত্তিতে পূর্ব কলকাতা জলাভূমির ১২৫০০ হেক্টার হাইকোর্ট সংরক্ষিত বলে নির্দেশ দিয়েছিলেন, আদেশ দিয়েছিলেন এখানে জমির চরিত্র পাল্টানো বা নির্মাণকার্য করা যাবে না বলে, সেই ম্যাপ তো আমিই তৈরি করে দিয়েছিলাম গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়ে” হাসতে হাসতে বলেছিলেন প্রযুক্তিকে পরিবেশ আর মানুষের সঙ্গে জুড়ে নেওয়া বিশেষজ্ঞ। আসলে আরও অনেক পরিবেশবিদদের মতন মানুষকে বাদ দিয়ে পরিবেশ রক্ষার কথা ভাবেননি একসময় প্রবল বামপন্থী রাজনীতি করা ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ।

আর সেই চিন্তা থেকেই, আদালতের রায়ের পাশাপাশি পূর্ব কলকাতা জলাভূমির জন্য আন্তর্জাতিক রামসার তকমা আনতে সচেষ্ট হন প্রকৃতি বিজ্ঞানী; এবং রাজ্য সরকারের আপাত আপত্তি এড়িয়ে এনেও ফেলেন ২০০২ সালে। কিন্তু পরের প্রায় দেড় দশক রামসার বা আদালতের নির্দেশ মেনে জলাভূমি রক্ষা করার বদলে তাকে নষ্ট করার ইতিহাস। ২০০৬ সালে এ নিয়ে একটি সরকারি অথরিটি তৈরি হলেও তা জলা বন্ধ আটকানোর বদলে পিছনের দরজা দিয়ে বেনিয়মকে নিয়মে পরিণত করার জন্য বেশি সচেষ্ট থেকেছে; কেয়ার অফ একপ্রকার রাজনীতিবিদ, প্রশাসনিক আধিকারিক ও জমি লুটেরাদের যোগসাজস। আর তৃণমূল সরকারের দ্বিতীয় দফায় স্বয়ং পরিবেশমন্ত্রীই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন সরকারিভাবে জলাভূমি বুজিয়ে উন্নয়ন করতে। সেই চেষ্টাতেও অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ধ্রুবজ্যোতিবাবু, যদিও তাকে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি কমিটির অন্যতম বিশেষজ্ঞ মনোনীত করে বর্তমান সরকার। একটিমাত্র মিটিংয়ের পর পদত্যাগও করেন, “ভেবেছিলাম কমিটিতে থেকে কিছু করতে পারব, কিন্তু এখন বুঝছি পারব না; ফলে এভাবে থেকে কী লাভ?” ফোনে আক্ষেপ করেছিলেন।

সেই আক্ষেপ থেকে জীবনের শেষের দিকে একটি লেখায় নিজেকে তকমা দিয়েছিলেন ‘ব্যর্থ প্রকৃতিবিদ’ বলে। ইমেলে মজা করে বলেছিলাম ‘সেনাপতি হেরে গেলে সৈনিকরা যুদ্ধ করবে কী করে?” উত্তরে বলেছিলেন, “সত্যি খুব খারাপ অবস্থা।” সেই “খুব খারাপ অবস্থা”র মধ্যে পূর্ব কলকাতার জলাভূমিকে ফেলে ড. ঘোষ চলে গেলেন, লড়াইটা আরও কঠিন হয়ে গেল! কিন্ত তা সত্ত্বেও ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ ব্যর্থ হতে পারেন না, কেননা তাঁর ব্যর্থতা মানে পূর্ব কলকাতার জলাভূমি তথা কলকাতাকে বাঁচানোর লড়াই ব্যর্থ হয়ে যাওয়া, কলকাতার অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া। ফলে নিশ্চিতভাবেই ড. ঘোষের পাশাপাশি কাজ করা রাজ্যের পরিবেশবিদদের দায়িত্ব বেড়ে গেল, পূর্ব কলকাতা জলাভূমিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই বজায় রাখার দায়িত্ব ধ্রুবজ্যোতিবাবুর দেখানো পথ ধরে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. অত্যন্ত জরুরি রচনা। ধ্রুবজ্যোতিবাবুর লড়াইটাকে কাঁধ দেওয়ার দায়িত্ব, তাঁর চিন্তাভাবনার ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের দায়িত্ব এখন আমাদের সবার।

Leave a Reply to কল্পেশ দস্তিদার Cancel reply