গোপাল ও বিষণ্ণ মাঠ

দেবব্রত কর বিশ্বাস

 

ভোর তাড়াতাড়ি আসছে নাকি জলদি ঘুম ভেঙে যাচ্ছে তার, সেটা বুঝতে পারে না গোপাল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে জানলার পর্দাটা সরিয়ে দেয় সে। বাইরে মেঘ করেছে। আবছা আকাশ। টানা দু’সপ্তাহ রোজ বৃষ্টি। সকাল নেই, বিকেল নেই, রাত নেই নেমে পড়লেই হল। জানলার পর্দাটা উড়ল একটু। জানলার গ্রিলে একটা প্লাস্টিকের টব বাঁধা। তাতে একটা ছোট্ট গাছ। বনসাই মনে হয়। দিদা লাগিয়েছে। আবার হাওয়া। এবারে একটু জোরে। সঙ্গে ঝিরিঝিরি জল। বিছানায় সাইড করে মুখ পেতে রেখে বাইরে চোখ রাখল গোপাল। বৃষ্টি ভালো লাগে তার। মনে হয়, সারাদিন শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি দেখি। আজ আর কলেজে যেতে ইচ্ছে করল না। আজ তেমন ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাসও নেই। কিন্তু দিদাকে কী বলবে? গোপাল কলেজ যাবে না শুনলেই দিদা রেগে যাবে। দিদা আজকাল কথায় কথায় খুব রেগে যায়। সে কলেজে যেতে না চাইলে রেগে যায়। টিভি দেখলে, একটু বেশিক্ষণ মোবাইল দেখলে, বাড়িতে ফিরলে লেট হলে রেগে যাচ্ছে দিদা, আজকাল। অথচ মানুষটা আগে এমন ছিল না। গোপাল ছোট থেকেই দেখে এসেছে তার দিদা বেশ বিন্দাস। অনেক কঠিন, অস্বস্তিকর, দুঃখের মুহূর্তেও কখনও নিজের উপর চাপ নেয়নি। ঠান্ডা মাথায় সব সামলেছে। উতরেও গেছে। সেই মানুষটাই এখন কেমন ঘনঘন রেগে যাচ্ছে। গোপাল কদিন একটু বেশি টিভি দেখছিল বলে রাগ করে কেবল কানেকশন বন্ধ করে দিয়েছে। অবাক হয়েছিল গোপাল। দিদাকে বলেছিল — “তুমি টিভি দেখা ছাড়লে কেন দিদা? আমি না হয় দেখব না আর।” দিদা হেসেছিল — “অনেক কিছু ছাড়তে পারিনি বলে অনেক কিছুই ছেড়ে দিতে হয়েছে রে গোপাল। আরও বড় হ, বুঝবি সব।” গোপাল বোঝে। সব বোঝে। মুখে কিছু বলে না। না বোঝার ভান করে থাকে। ছোট থেকে সে শিখেছে, অস্বস্তিকর প্রসঙ্গে চোখ-কান খোলা রাখলেও মুখ বন্ধ রাখতে হয়। বৃষ্টির জোরটা আরও বেড়েছে এখন। দেওয়ালের দিকে তাকাল গোপাল, ন’টা বাজে। ন’টা বেজে গেল! চমকে ওঠে গোপাল। এখনও দিদার গলার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না কেন? সে বিছানায় শুয়ে শুয়েই জোর গলায় ডাকে, দিদা!

পাশের ঘরে ডাইনিং টেবিলে বসে তখন সবজি কুটছিলেন রাখী। গোপালের দিদা। ডাক শুনে তিনি মুখ ফেরালেন গোপালের ঘরের দিকে। দরজাটা ভেজানো। ফ্যানের হাওয়ায় যেন আলতো দুলছে দরজাটা। তিনি বললেন, “আজ বাড়ি ফেরার সময় একটু সাদা তেল নিয়ে আসিস তো গোপাল। শেষ হয়ে গেছে। কাল তোকে লুচি করে দেব, সেই তেল নেই। তোর বাবাও দিয়ে যায়নি এখনও।” পাশের ঘরে বিছানায় শুয়ে থেকেই উত্তর দিল গোপাল — “ঠিক আছে।” তারপর বলল, “আজ কলেজে যাব না দিদা। ঘরে পড়ব। সোমবার পরীক্ষা।” দিদা কিছু বলল না। আশ্বস্ত হল গোপাল। বিছানায় আরও এলিয়ে দিল নিজের শরীর। এই বিছানাটাকে তার খুব আপন বলে মনে হয়। দিদা, দাদু, বাবা আর এই বিছানা, নিজের বলতে আর কেউ নেই তার। দাদু যে তাকে খুব একটা ভালোবাসে না, এটা বেশ বোঝে গোপাল। এই দেবীপুর অঞ্চলের নামকরা উকিল তার দাদু। অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম একডাকে সবাই চেনে এই মফস্বল জনপদে। কলকাতা হাইকোর্টের বড় উকিল ছিলেন। জনপ্রিয়তায় তার ধারেকাছে কেউ আসবে না এই দেবীপুরে। অসিত এবং তাঁর স্ত্রী রাখী বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই কন্যা। শেলী এবং লাবণ্য। সাহিত্যপ্রেমিক অসিত রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’র দুই চরিত্রের নামে নামকরণ করেছিলেন তাঁর দুই যমজ মেয়ের। সপ্তাহে শনি আর রবি দেবীপুরের এই বাড়িটায় থাকতেন অসিত। বাকি দিনগুলো কলকাতার ভাড়াবাড়িতে কাটত তাঁর। সারাদিন মামলা-মোকদ্দমা, সন্ধের পর থেকে গল্পের বই আর মদ। এই ছিল অসিতের রোজনামচা। শনি-রবি দেবীপুরের বাড়িতে তো দুপুর থেকে মদ চলত। স্ত্রী রাখীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তেমন নিবিড় ছিল না কোনওকালেই। তবে বড় মেয়ে শেলীকে খুব ভালোবাসতেন। কোনও এক অজানা কারণে লাবণ্যের প্রতি টান ছিল কম। দুই বোন নিজের মতো করে বড় হয়েছে। স্বাধীনভাবে। বাবা অথবা মা, কেউ কখনও তাদের কোনও কাজে বাধা দেয়নি। বাধা দেওয়ার সময়ও ছিল না বোধহয়। ফ্যামিলিতে টাকা পয়সার কোনও অভাব ছিল না। তাই অবাধ হতে হতে অবাধ্য হয়ে গেছিল দুই মেয়েই। মেয়েরা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে জেনেও অসিত আর রাখী নিজেদের অভ্যেস ছাড়তে পারেননি। অসিতের ছিল কাজ-কাজ-মদ-মদ। আর রাখীর ছিল অগুন্তি প্রেম-পরকীয়া। এলাকা ছোট হলে গোপন রাখার জায়গা থাকে না। দেবীপুরের সবাই জানত সব। তাও নামী ফ্যামিলি, মুখে কিছু বলত না কেউ। সব জানত শেলী এবং লাবণ্যও। এত বড় একটা বাড়ির দোতলায় কত রাত একা একা কাটিয়েছে দুই বোন। কত সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে দু’জনের চুপচাপ বসে থাকা অভিমানে। কলেজে পড়তে পড়তেই দারোয়ান সখা’দার প্রেমে পড়ে শেলী। সখা’দার ছিল রঙিন জীবন। মেদিনীপুরের বাড়িতে বউ, দুই ছেলেমেয়ে। আর কলকাতায় প্রেমিকা শেলী। শেলী সব জেনেশুনেই প্রেম করত মাঝবয়সী সখা’দার সঙ্গে, এমনকি দু’জনে পালিয়ে বিয়ে করবে বলেও স্থির করেছিল। তখন মফস্বলের ছেলেমেয়েদের মধ্যে পালিয়ে বিয়ে করার প্রতি অদ্ভুত রোমাঞ্চকর টান কাজ করত। প্রায়ই শোনা যেত, কেউ না কেউ কারও না কারও সঙ্গে পালিয়ে গেছে। শেলীর ব্যাপারটা জানতে পেরেছিলেন অসিত। তড়িঘড়ি হাইকোর্টের উকিল এবং পুরনো বন্ধু বিমানের ছেলে অম্লানের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে ঠিক করেন। অম্লান ব্যাঙ্কের অফিসার দেখে রাজিও হয়ে যায় শেলী। বিয়ে করে নেয়। ওদিকে সখা’দার খোঁজ আর কেউ রাখেনি কোনওদিন। বছর দেড়েক পর গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করে শেলী। কেন করেছিল কেউ জানে না। জানার চেষ্টাও করেনি কেউ। কেন করেনি কেউ জানে না। বিমান নিজেও বড় উকিল বলে অসিত আর ঘাঁটাননি বিষয়টা নিয়ে। মদ খাওয়া আর রাখীকে ঘৃণা করা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। আরেক মেয়ে লাবণ্যকে নিয়ে ভাবতেন না অসিত। লাবণ্য কিন্তু মন দিয়ে পড়াশোনা করছিল। দিদির মৃত্যুর শোক অতিক্রম করে নিজে সুস্থ একটা জীবন চেয়েছিল। এমএ পাশ করে দীর্ঘদিনের প্রেমিক বুম্বাকে বিয়ে করে লাবণ্য। তারপর সোজা শিলিগুড়ি। বাপ-মা-বাড়িহীন বুম্বা ছিল শিলিগুড়িতে মামার হোটেলে ম্যানেজার। ওখানেই জন্ম হয় লাবণ্যর ছেলে বাবানের। দেবীপুরের এই বাড়িতে তখন হাইকোর্টের কাজ হঠাৎ ছেড়ে চলে আসা অসিত আর রাখী থাকছেন। শিলিগুড়িতে বুম্বা, লাবণ্য আর বাবান, এই তিনজনের সুখী পরিবার। বাবান জন্মেছিল জন্মাষ্টমীর দিন। তাই তাকে গুষ্টিসুদ্ধু সবাই গোপাল বলে ডাকে। বাবান নামটা নিরুদ্দেশে চলে গেছে। রাগ হয় গোপালের। গোপাল কেমন একটা পুরনো পুরনো নাম। মা কখনও তাকে গোপাল বলে ডাকত না। মা ডাকত বলেই বাবান নামটা তার এখনও এত প্রিয়। আর মায়ের কথা মনে এলেই শিলিগুড়ির কথা মনে পড়ে। ছোট্ট দু’কামরার একটা বাড়িতে ভাড়া থাকত তারা। শিলিগুড়ি থেকে যখন চলে আসে গোপালের তখন মাত্র ন’বছর বয়স। শেষের দু-তিন বছরের কথা এখনও মনে আছে তার। মায়ের চাহিদা মেটাতে পারত না বাবা। দামী দামী গয়না, দামী দামী শাড়ি। রোজ ঝগড়া। রোজ দাঁত নখ আঁচড়ানো। আঁচড়াত বাবা আর মা, দাগ পড়ত গোপালের মনে। ওদিকে বাবারও চাহিদা কম ছিল না, রোজ দামী মদ, খেলা থাকলে ক্রিকেট বেটিং-এ টাকা লাগানো, দামী দামী জুতো, ঘড়ি… তাই হাত পড়ল হোটেলের ক্যাশবাক্সে, মন পড়ল গরমিল করার। রোজগার বাড়তে লাগল হু হু করে। বাড়তে বাড়তে চোখে পড়ল গোপালের মামাদাদুর। তারপর একদিন দূর দূর করে রীতিমতো তাড়িয়ে দিল তাদের তিনজনকেই। এসে পড়ল দেবীপুরের এই বাড়িতে। ছ’মাস পরে বাবা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি নিল, মা চাকরি নিল কলকাতায় একটি হসপিটালে, রিসপশনিস্টের। বাবা মাঝেমাঝে বাড়ি আসত না, মাও মাঝেমাঝে বাড়িত ফিরত না। গোপাল মানুষ হতে লাগল দিদার কাছে। উটকো দায়িত্ব ঘাড়ে এল বলে রেগে গেল ততদিনে পাঁড় মাতাল হয়ে যাওয়া দাদু। গোপালের জন্মদিনের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দ্যাখে মা নেই বিছানায়। বালিশের পাশে রাখা একটা বড় ক্যাডবেরি আর একটি সাদা পাতা, লেখা আছে “হ্যাপি বার্থডে। ভালো থাকিস বাবান। আবার দেখা হবে।” প্রথমে কিছু বুঝতে পারেনি গোপাল। ভয় পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে দিদার কাছে গিয়ে সব বলেছিল। দিদা বলেছিল — “তোর মা একজনকে বিয়ে করে চলে গেছে। আর ফিরবে না।” থতমত খেয়ে গেছিল গোপাল। দশ বছরের একটা ছেলের কাছে এ যেন পাহাড়ি রাস্তায় নেমে আসা হঠাৎ ল্যান্ডস্লাইড। সেই খবর শুনে বাবা চলে এসেছিল গোপালের কাছে, নতুন করে রাস্তা তৈরি করতে। সারাদিন ঘুরে বেরিয়ে জন্মদিন কাটিয়ে আবার দিয়ে গেছিল এই বাড়িতে। সেই থেকে মাঝেমাঝে আসে বাবা। এটা ওটা সেটা মাসকাবারি জিনিসপত্র কিনে দিয়ে যায়। রোগা হয়ে গেছে বাবা। হোটেলে খায়, হোটেলেই ঘুমিয়ে পড়ে। গোপাল খুব ভালোবাসে তার বাবাকে। বাবা যখন জিনিসপত্র দিতে আসে, খুব গর্ব হয় গোপালের। বেশি খরচ হচ্ছে বলে কথা শোনানোর মুখ নেই দাদুর। দাদুর জন্যই এই বাড়িতে থাকতে মাঝেমাঝে ভালো লাগে না গোপালের। চাকরি পেলে একটা ফ্ল্যাট কিনবে গোপাল, কলকাতায়। তারপর বাবাকে নিয়ে যাবে সেখানে। আর কাজ করতে দেবে না। এমনটাই ভেবে রেখেছে। দিদাকেও নিয়ে যেতে চায়। দিদার তো আর কেউ নেই। বাড়িটা দিনেদিনে গভীর রাতের ছোট্ট স্টেশনের মতো হয়ে যাচ্ছে। সবাই চলে গেছে, আবার সবাই হয়তো ফিরেও আসবে একদিন… চিড়ের পোলাও খেতে খেতে হঠাৎ মদের গন্ধ পেল গোপাল। পেছন ফিরে দেখল দাদু দাঁড়িয়ে আছে। ঢুলু-ঢুলু চোখ। গায়ে একটা সাদা ফতুয়া। বোতাম লাগানো নেই বুকে। সাদা-সাদা লোম উঁকি মারছে বুড়ো হয়ে যাওয়া অহংকারের মতো। গোপাল জিজ্ঞেস করল — “কিছু বলবে?” দাদু কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল, “মায়ের কোনও খবর পেয়েছিস?” মাথা নাড়ল গোপাল। “তোর মা’কে মনে হয় দেখলাম কাল, ওই শীতলামায়ের মাঠে।” চোখ ছোট ছোট করে গোপাল বলল, “মানে? মা’কে দেখেছ মানে?” দাদু হাসার চেষ্টা করল সামান্য, “না মানে, বয়স বাড়ছে তো, ভুল দেখেছি নিশ্চই। দুই মেয়েই আমার কোথায় যেন হারিয়ে গেল!” গোপাল কিছু বলল না, মুখ ফিরিয়ে চোখ রাখল নোটসের খাতায়। মন দিয়ে পড়তে শুরু করল। খানিকক্ষণ পরে খেয়াল হল, একটাই লাইন বারবার পড়ে চলেছে সে। মন নেই পড়ায়। মাথায় ঘুরছে একটাই কথা, দাদু জানল কীভাবে? তাহলে একা গোপাল নয়? আরও অনেকেই তার মা’কে দেখতে পায়? শীতলামায়ের মাঠ একটু দূরে। আগে হেঁটে অথবা সাইকেলে করে যেতে হত। এখন টোটো যায়। তবে সন্ধের পরে মানুষের পা, সাইকেল বা সদ্য আসা টোটো কেউই যেতে চায় না। একটা বিরাট মাঠ, তার পাশে একটু জলা জঙ্গল মতো জায়গায় ছোট্ট ভাঙাচোরা মন্দির। শীতলা মায়ের মূর্তিও আছে। সারা বছর অনাদরে পড়ে থাকে সব। শীতলাপুজোর সময় একটু সাজিয়ে গুছিয়ে পূজা-অর্চনা চলে। তারপর বাকি বছর একলা মানুষের মতো চুপ করে মুখ গুঁজে সে পড়ে থাকে মাঠের ধারে। সবাই বলে, শীতলা মা-ই নাকি চান না সারা বছর কেউ ওখানে যাক। তাই যেই যায় তাকে ভয় দেখায়। গোপাল মাঝেমাঝে যায়। কাউকে না বলে, টিউশন পড়তে যাওয়ার নাম করে ঢুকে পড়ে অন্ধকার মাঠে। জনমানবহীন, প্রাণহীন, সাড়াশব্দহীন একটা মাঠ তাকে যেন ভালোবাসে। মাঠের ঘাস মখমলের মতো। মাঝেমাঝে সেখানে শুয়ে থাকে গোপাল। শুয়ে মনে হয় নিজের বিছানায় শুয়ে আছে। রাত একটু বাড়লে হাওয়া দেয়। শীতের রাতে আগুন পোহানো মানুষ যেরকম স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়, ঠিক সেরকম হাওয়া। শান্তির। হাওয়া যেন মায়ের মতো। গোপালের মাথার চুল ছুঁয়ে যায়। হাওয়া থামে। গোপাল চোখ বোজে। অনুভব করে, মা এসেছে। এমন সুন্দর গন্ধ মায়ের গা থেকেই বেরোয়। কী যে পরম পবিত্র! সবাই বলে ওর মা ভালো নয়। চরিত্র ঠিক নেই। গোপাল মেনে নিতে পারে না। চরিত্র আবার কী? চরিত্র একটা গাছ। ওই যে মাঠের ধারে যে অন্ধকার বটগাছটা দেখা যাচ্ছে ওটা চরিত্র আর গাছটার নিচে কী একটা যেন অন্ধকার মতো নড়াচড়া করছে ওটা হল মানুষের মন। আসলে অন্ধকার। নির্দিষ্ট কোনও রূপ নেই। সমাজ তার আলো ফেললে কিছু একটা দেখা যাবে। কিন্তু সেটাই আসল রূপ কিনা কেই বা নিশ্চিত করে বলতে পারে! গোপাল হাতড়াতে থাকে, কী যুক্তিতে মা’কে বাঁচানো যায়। তাই তো করে আসছে গোপাল, মা’কে সমাজের হাত থেকে বাঁচিয়ে আসছে। গোপাল বুঝতে পারে, মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

–তুমি যে এখানে থাকো, যে কোনও দিন যে কোনও কেউ ঠিক জেনে যাবে মা। কতদিন তোমাকে আমি আড়াল করে রাখব?
–না না, তুমি এত নিশ্চিন্ত থেকো না। দাদু অলরেডি জেনে গেছে। তোমাকে দেখেছে। আমাকে বলেছে।
–বাবা জানে কিনা আমি জানি না। তুমি যা শুরু করেছ সবাই ঠিক জেনে যাবে।

গোপালের অনেক বারণ সত্ত্বেও মা তাকে এটা ওটা খেতে দেয়। মাঠের পাশে যে ভাড়াবাড়িতে গোপালের মা থাকে সেই বাড়ির বাড়িওলা থাকেন না। শোনা গেছে ভয়েই নাকি তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন। এখন অল্প টাকায় যখন যা ভাড়া পান দেন, আর বাড়ি বিক্রির চেষ্টা করেন। গোপালই সন্ধান করে দিয়েছে এই বাড়ির। মা ও তার বর্তমান স্বামী থাকেন এখানে। জালিয়াতির অভিযোগে তাঁরা দুজনেই পালাচ্ছেন। গোপাল ছাড়া তাঁদের আর কোনও গতি নেই। গোপাল ভয় পায়, তবু মায়া ছাড়তে পারে না। দাদু জেনে গেছে বলে ভয় পায়। দিদা যদি জেনে যায় তো কেলেঙ্কারি হবে একেবারে! গোপাল চোখ বোজে। মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। গোপাল টের পায়, হাওয়ার তেজ বাড়ছে। জ্বর-জ্বর লাগছে। কিচ্ছু বলে না সে। জ্বরের সময় মা পাশে থাকলে তার চেয়ে বড় ওষুধ আর কিছু নেই। সেই কতদিন পর গোপাল আবার মায়ের আদর খাচ্ছে।

একটা মাঠ। মাঠের পাশে শীতলামন্দির খুব জাগ্রত। এই যে জায়গাটার নাম ‘দেবীপুর’, সেই দেবী তো আসলে মা শীতলাই। কত যে গল্প ওই মাঠ ঘিরে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় মাঠ। কত প্রেম, কত খেলা, কত প্রতিযোগিতা, কত পিকনিকের সাক্ষী ওই মাঠ। এতই বড় তার আয়তন, যে একবার গোটা মাঠে দৌড়লেই হাঁপিয়ে পড়া নিশ্চিত। আর বড় বলেই এই মাঠের প্রতি বহুদিনের লোভ অনেকের। আগে কারখানা বানানোর তাল করত ব্যবসায়ীরা, কিছু না কিছু ভাবে ঠিক ব্যাগড়া পড়ত সেই কাজে। তারপর এল আবাসন বানানোর হিড়িক, সেখানেও অসাফল্য। কাজ শুরু করার একদিনের মাথায় নানান বিপত্তি, এমনকি একজন লেবারের মৃত্যুও হয়েছিল। সবই মাঠের কার্যকলাপ। সবই শীতলা মায়ের কীর্তি। সেসব বহুদিন আগেকার কথা। মা শীতলা তারপর থেকে সন্ধের পর সেই মাঠে ঢোকা বন্ধই করে দিলেন। কেন মানুষ ভয় পায় ওখানে যেতে, কেন মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, কেন অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস দেখা যায় ওই মাঠে কেউ জানে না। কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। জীবনে অনেক কিছুরই যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। নিশ্চয়ই যুক্তি আছে, কিন্তু সেসব অধরা থেকে গেছে। তাই মানুষ ভয় পায়, দূরে দূরে থাকে। এমনকি আশেপাশের বেশ কিছু বাড়ির লোকেরাও চলে গেল বাড়ি ছেড়ে। তেমনই একটা বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে লাবণ্য। গোপাল জানলার দিকে তাকিয়ে এসব কথাই ভাবে। বাইরে তখন সন্ধে হয়ে এসেছে। উসখুস করতে থাকে গোপাল। সন্ধে নামলেই টিউশন পড়তে যাওয়ার ছুতো করে মায়ের কাছে যেতে হবে। এই ভেবে পাশ ফিরতে যাবে গোপাল, দ্যাখে দাদু বসে আছে বিছানায়। চমকে ওঠে গোপাল। জিজ্ঞেস করে — “তুমি এখানে? কিছু বলবে?” উত্তরে গোপালের কাঁধে হাত রাখেন অসিত। হাতের শিরাগুলো ফুটে উঠছে ধীরে ধীরে। বয়স বাড়লে মানুষের শিকড় বংশবৃদ্ধি করে। সেই শিকড় হল এই হাতের শিরা, যা আঁকড়ে ধরতে চায়, “মা কেমন আছে রে গোপাল?” অস্বস্তি হতে শুরু করে গোপালের, ধরা পড়ে যাওয়ার, “আমি কী করে বলব?”

–লুকোস না আমার থেকে। আমার থেকে লুকোলে ধরা পড়বি কী করে নিজের কাছে?
–আমি কিছু লুকোইনি তো!
–তুই যে রোজ ওই মাঠে যাস, আমি জানি। লাবণ্য যে মাঠের পাশে ওই একতলা বাড়িটাতে থাকে সেটাও আমি জানি।

গোপাল চুপ করে থাকে। প্রবল কান্না পায় তার। মা’কে সে গোপন রাখতে চায়। মা’কে সে কারও সঙ্গে ভাগ করতে চায় না। বাবার সঙ্গেও না। দাদু সব জানতে পেরে গেল? এবার যদি দিদা জেনে যায়?

–ওই যে মাঠটা, ওটার স্বভাব চরিত্র কেমন জানিস?

গোপাল খুব অবাক হয়ে যায়। মাঠের স্বভাব চরিত্র?

–ওই মাঠ ডিপ্রেশনের রোগী।

দাদু ঘোরলাগা চোখে হাসে। তারপর বলতে থাকে, “কলকাতায় আমার এক বন্ধু ছিল। মস্ত বড় ডাক্তার। সাইকিয়াট্রিস্ট। সে একবার এসেছিল আমাদের এই বাড়িতে। তাকে আমি নিয়ে গেছিলাম ওই মাঠে। সন্ধের পর। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকার বলেছিল, মাঠটা ক্রনিক ডিপ্রেশনে ভুগছে। এছাড়াও স্প্লিট পার্সোনালিটি ডিসর্ডার আছে। একই সঙ্গে অনেকগুলো আইডেন্টিটি নিয়ে বেঁচে আছে মাঠটা। সকালে একরকম, দুপুরে একরকম, আবার সন্ধের পরে একদম আলাদা। আমি তখন ওকে বলেছিলাম, আমারও তাই মনে হয়। এই মাঠটা আসলে অসম্ভব সুন্দরী এক মেয়ে, যাকে পাওয়ার জন্য সবাই পেছনে পড়ে থাকে। কিন্তু মেয়েটি কাউকে চায় না। কিছুই তার ভালো লাগে না। সে ঘাসের নরম বিছানায় মুখ ডুবিয়ে রাখে। হাওয়া এসে তার কপালের চুল সরিয়ে দিয়ে যায়। আর ওই শীতলামন্দিরটা কী জানিস গোপাল? ওটা হল মা। ওই মাঠের মা হল ওই মন্দির। আগলে রাখে। তাই তো কেউ মাঠটা দখল করতে চাইলে মা আজব আজব কাণ্ডকারখানা ঘটিয়ে সব পণ্ড করে দেয়।”

গোপাল হেসে ফেলে। বলে, “কী সব আজগুবি গল্প দেওয়া শুরু করলে বলো তো?”

অসিত বলেন, “এই ভুলটাই তো করেছিল আমার বন্ধু। আমার কথাকে মানতে চায়নি। তড়িঘড়ি কলকাতায় ফিরে যাওয়ার দুদিন পরেই হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল!”

গোপাল চুপ করে রইল। আড়চোখে দেখল, বাইরে সন্ধে ঘন হচ্ছে।

–আমার কথা শুনতে তোর ভালো লাগছে না, তাই না রে দাদুভাই? তুই বিশ্বাস করছিস না আমি জানি। আমিও তো করতাম না। যাদের মা স্বইচ্ছায় সন্তানকে ছেড়ে দূরে চলে যায় তারা কেউই বিশ্বাস করে না।

গোপাল চুপ করে থাকে। অসিত তার মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বলতে থাকে, “আমি আর তোর জীবনটা একদম এক। হুবহু। আমার মাও তো তোর মায়ের মতন… আমিও তো হুবহু তোর মতন মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কাতর হয়ে বসে থাকতাম।”

“আর বড় হয়ে?” প্রশ্ন করে বসে গোপাল।

–বড় হয়ে তুই এই আমার মতো হবি। একদম হুবহু আমার মতো। দেখতেও এক, স্বভাবেও এক।

গোপালকে ইশারায় ডাকলেন রাখী। সাইকেল নিয়ে টিউশনে যাচ্ছিল গোপাল। দিদার ডাক শুনে ফিরে এল। দেখল দাদু তার ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছে। রাখী হেসে বললেন — “দেখছিস তোর দাদুর কাণ্ড? তুই ঘরে নেই আর তোর সঙ্গেই কথার ভান করে নিজের সঙ্গে কথা বলছে। সাধে কী আর বলি পাগলের গুষ্টি!”

মিথ্যে হাসে গোপাল। কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। মা, মাঠ, শীতলামায়ের মন্দির, মনখারাপ এসব বুঝতে পারেনি তো দিদা? নিজের মুখোমুখি দাঁড়ালেই শীতলামায়ের মাঠে হাওয়া দেয়। মনখারাপ করে গোপালের। খুব।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*