আমার পুজো

মধুময় পাল

 

লোকটা বারান্দায় বসে আছে। বারান্দা বলতে যে বিস্তার বোঝা যেত একদা, সে-রকম নয়, তার ভগ্নাংশ। এখন তো সবকিছুই ছোট হয়ে যাচ্ছে। পিঠের দিকে পুবের জানালায়, শরতের ভোর আর ভোরের আলোবাতাস নিয়ে দাঁড়িয়ে জোড়া দেওদার। সামনে, পশ্চিমের দিকে, পুকুর। পুকুর বলতে জলের যে বিস্তার বোঝা যেত একদা, সে-রকম নয়, তার সার-সংক্ষেপ। তবু আছে, ভয়ে ভয়ে আছে।

আশ্বিন শেষের বাটাহলুদ আলোর বারান্দায় লোকটা বসেছিল বই পড়বে বলে। দুটি দেশের সীমান্তের জীবন নিয়ে লেখা ‘তারকাঁটার মানুষ’। সুযোগ পাওয়া গিয়েছে টানা পড়বার। পড়ার মধ্যে আনমনা থেমে লোকটি একটি ছেলেকে দেখতে পায়। পরনে হাঁটুঝুল জ্যালজেলে ডুরেপ্যান্ট। গায়ে কোট। বেশ পুরনো। সেলাই খুলে নীল সিল্কের আস্তর ঝুলছে। সেলাই ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়েছে মাখনের মতো মসৃণ সাদা পকেট। নিচের দিকে দুটো বোতাম। ওপরের দিকটা হাঁ হয়ে আছে শূন্য বোতামঘরের কান্নাঠোঁট নিয়ে। খালি পায়ের ওপর জ্যালজেলে ডুরেপ্যান্ট আর দামী পশমের যত্নহীন কোট-পরা ছেলেটির ছবি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ছেলেটা একটা নাগরদোলা দেখছিল। শিবতলার মাঠে মেলা বসেছে। দোকান এসেছে মাঠজুড়ে। মাঠের উত্তরভাগে দুর্গাঠাকুরের প্যান্ডেল দক্ষিণমুখো। পশ্চিমে ছোট-ছোট দোকানে জিলাপি-সিঙ্গারা, গজা-খাজা, ঘুগনি, কচুরি-আলুর দম, কাপডিশ, শিলনোড়া, সাঁড়াশি, ঠাকুরদেবতার ছবি, মাকড়শা-মেয়ের ম্যাজিক ইত্যাদি। ছেলেটা দেখতে পায় গোবিনকাকা দাঁড়িয়ে আছেন আবছা আলোয়। একদিকে কাচ-লাগানো টিনের বাক্সে মুড়ির মোয়া, খইয়ের মোয়া, নারকেল নাড়ু, তিলের নাডু, বাদামচাক। দোকান নেই গোবিনকাকার। হাতে ছোট ঘণ্টা বাজাচ্ছেন ঠুনঠুন। ছেলেটি দেখে, গোবিনকাকা কেমন রোগা, বুড়ো বুড়ো হয়ে গিয়েছে। কয়েক বছর আগে, এই শিবতলার মাঠে, তাঁর সঙ্গে দৌড়ে কেউ পারত না। নেতাজি ক্লাবের স্পোর্টসে বেশিরভাগ পুরস্কার ছিল তাঁর বাঁধা। সেই গোবিনকাকা পালটে গেল পেত্নিতে ধরার পর। সিআইটি বিল্ডিং-এর পেত্নি। নাম সন্ধ্যা। ওঝার প্রশ্নে পেত্নি বলেছিল। সিআইটি বিল্ডিং তৈরির সময় মাথায় ইট নিয়ে বাঁশের সিড়ি ভেঙে পড়ে মারা যায়। পুলিশের হাঙ্গামা হবে জেনে তাকে রাতারাতি পুঁতে দেওয়া হয় সিআইটি-র ভিতে। সেই থেকে হাওয়ায় হাওয়ায় অতৃপ্ত আত্মা ঘুরছে। তো গোবিন্দকে ধরলে কেন? ওঝার প্রশ্নে সন্ধ্যা বলেছিল, গোবিন্দ আমার ভালো স্বামী হবে। নেশাভাঙ নেই, ছোঁকছোঁকানি নেই। মন্ত্রপড়া নতুন শলার ঝাঁটা হাতে ওঝা চিৎকার করে ওঠে, যার ঘাড়ে উঠেছিস, তার ঘাড় ছেড়ে এক্ষুণি পালা। যাবার সময় গাজনবাড়ির গাছে প্রমাণ রেখে যাবি। গোবিনকাকা হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে লাফ দিলেন ও আছাড় খেলেন। গাজনবাড়ির গাছে একটা লাউডগা সাপ দেখেছিল কলোনির লোকজন। দেখেছিল, মেয়েদের চুল উড়ছে ঠাকুরবাড়ির টিউবওয়েলের মাথায়। ছেলেটা দেখে, শিবতলায় নাগরদোলা এসেছে। তার বন্ধুরা উঠে বসেছে তাতে। যাদের সঙ্গে সে ভোরে ফুল কুড়োতে যায়, এই তো সেদিন মহালয়া শুনল রানি সিস্টারের জানালায় দাঁড়িয়ে, যাদের সঙ্গে সে দেববাবুর বাজারে পালা শুনতে যায়, তারা হইহই করছে নাগরদোলায়। তার যে পয়সা নেই, তাকে চড়তে দেবে কেন? তার পুজোর জামা নেই। মা সেই কবে থেকে বলছে, তোর বাবা আজ ঠিক আনবে। বাবা নাকি রোজ ভুলে যায়। তার কোট আছে। মামার কোট। কত কত বছর আগে ছোটমামা মারা গেল দুদিনের জ্বরে। সেই মামার কোট। দেশ ছেড়ে পালিয়ে আসার সময় দিদিমা কিছুই আনেননি। শুধু এই কোট, পুঁটুলি করে বেঁধে। যেন তাঁর ভিটের মাটি, যেন তাঁর খোকার হাসি, যেন তাঁর বকুলতলা, যেন তাঁর বসন্তবিকেল, যেন তাঁর স্মৃতির মাটি। ছেলেটা সেই কোট পড়ে শিবতলার মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। ঢাক বাজছে। সে যেখানে দাঁড়িয়ে, তার পাশে ঠুনঠুন বাজছেন গোবিনকাকা।

বারান্দা থেকে লোকটা শোনে, শোনো গো দখিন হাওয়া, প্রেম করেছি আমি/লেগেছে চোখেতে নেশা, দিক ভুলেছি আমি। পল্লীশ্রীর পুজোর মাইক বাজছে। দু-চার বছর হল, পুজোর গোড়ার দিকে বাংলা গান বাজে সকালে সন্ধ্যায়। রাতে অবশ্যই ডিস্কোজকিতে হুল্লমহুল্লা হিন্দি। না হলে ইয়ং জেনারেশন হড়কে যায়। চন্দনা এসেছে বকশিস চাইতে। পুরসভা আট মাস বেতন দিচ্ছে না। সরকারের টাকা নেই। মার ঝাড়ু পুরসভার মুখে। লিডাররা ঝেড়ে ফাঁক করে দিচ্ছে। তিয়াত্তর টাকা রোজ। বলেন দাদা, খাব কী? তার ওপর মাইনা বনধ।

বারান্দা থেকে লোকটা দেখে শোভা এসেছে কলমির বনে। তিতলি-ভাঙা বাটাহলুদ রোদ্দুর এখন আকাশ থেকে নামছে। পুকুরের যে পারে এক টুকরো মাঠ আত্মগোপন করে আছে, সেখানে মাটির সবুজ খুশি আর কলমির অগাধ করুণা। শোভার হাতে হেঁসো, কাঁধে বস্তা। বস্তা না ভরা পর্যন্ত কাটবে। ওর বর কুঞ্জকে পুলিশ হাপিস করে দিয়েছে। বাবু, মায়ের দিব্যি বলছি, ওই পাগড়িওলা পুলিশটা দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল। কুঞ্জ তো মদ গিলে ঘুমোচ্ছে। হাত ধরে হেঁচকা টান মেরে ওকে তুলল। টানতে টানতে হিঁচড়ে হিঁচড়ে ওকে বের করে নিয়ে গেল। ওই পাগড়ি পুলিশটা বুটের লাথি মারল। কুঞ্জর মুখ দিয়ে রক্ত আর রক্ত। কুঞ্জঅঅ রেএএ। একটা চিৎকার দেবীপক্ষের আকাশে এখনও ডানা ঝাপটায়। বোনাসের বিক্ষোভ ছিল জুটমিলের গেটে। ইউনিয়ন অফিসে আগুন লেগেছিল। মালিক আর সরকার জোট করলে গরীব মানুষ তো মরবেই৷ কুঞ্জর খোঁজ মেলেনি। পাগড়িওলা পুলিশটা আরও বড় অপিসার হল।

বাবু, বসে বসে কী করেন? আগে তো কথা বলতেন। আমার ছেলে চান্দু। পাণ্ডের ডাক্তারখানায় কাজ পেল তিন মাস হল। পূজার আগে ওকে পুলিশ তুলে নিল। একবার বলে, মার্ডার কেসে হাত আছে। আবার বলে, পাণ্ডে চান্দুর নামে থানায় কমপ্লেন করেছে। আবার বলে, পূজার আগে তুলতে হয়। দাঙ্গাফাসাদ হতে পারে। বাবু, চান্দুকে ওরা ফেরত দেবে তো?

পানকৌড়ি ডেকে ওঠে দুপুরের জলে আকাশে। একটা কালো মেঘ আসে, যার কথা খবরের কাগজ লেখেনি। হুশ করে সব আলো শুষে নিলে ঠান্ডা হাওয়া বয়। পল্লীশ্রীর মাইক অষ্টমীর অঞ্জলির খবর ঘোষণা করে।

বারান্দা বলতে যে বিস্তার বোঝা যেত একদা, তার ভগ্নাংশে বসে লোকটা দেখে, বস্তা বোঝাই হয়ে গেল কলমির বন কেটে। কষ্টেসৃষ্টে কাঁধে তুলে নিল শোভা। হাঁটতে শুরু করল। একটা বক উড়ে এসে বসল শোভার মাথায়। মুকুটের মতো। শোভার পেছনে সেই ছেলেটা। পরনে হাঁটুঝুল ডুরেপ্যান্ট। গায়ে পশমের যত্নহীন কোট। সেলাই খুলে সিল্কের নীল আস্তর ঝুলছে। সেলাই ছিঁড়ে মাখনের মতো কাপড়ের পকেট। হাতে তীর-ধনুক। কালো মেঘ সরে গেলে রোদের পথে শোভা হাঁটে। ছেলেটা শুনতে পায়, গোবিনকাকার হাতে বাজছে ঠুনঠুন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 956 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*