সব চরিত্র কাল্পনিক নয়…

চিরশ্রী দাশগুপ্ত

 

সলমা বিবির সুইসাইড নোট

সকাল না হতেই কীসের এত চেল্লামেল্লি, কে জানে। শোওয়ার ঘরের জানলা থেকে দেখা যাচ্ছে, গলির মুখটা ভিড়ে থিকথিক করছে। বার কয়েক উঁকিঝুঁকি দিয়েও কিছুই বোঝা গেল না। এদিকে ঘড়ির কাঁটা বলছে, ঠিকে কাজের মাসি আসার সময় পেরিয়ে যাচ্ছে… তাই রণে ভঙ্গ দিয়ে গৃহকর্মে নামতে হল। বেলা গড়িয়ে দুপুর হতে মেয়ের বাসস্টপে গিয়ে খবর পাওয়া গেল, সুইসাইড কেস। বয়স ৪৫, নাম সলমা বিবি। মাঝারি উচ্চতা, গায়ের রং কালো, স্বাস্থ্যবতী সলমা যে পাঁচমাসের গর্ভবতী জানা ছিল না। অপটু হাতের সুইসাইড নোট বলছে,… ‘বাচ্চার বাপের শাস্তি চাই।’ সমাজমতে সলমা বিবির একটা ১৭ বছর আর ১০ বছরের মেয়েবাচ্চার বাবা রফিককে পুলিশভ্যান এসে তো সেই সাতসকালেই তুলে নিয়ে গ্যাছে। তাহলে?

সপ্তাহ কয়েক আগে পুজো পুজো মরশুমের এক বিকেলে সলমা বিকেলের কাজে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল… ওবাড়ির বৌদি আজ জানিয়েছে, পুজোর মুখে একসাথে অত টাকা দেওয়া যাবে না। কত টাকা? পাঁচশো-হাজার নয়, একেবারে ৫০ হাজার টাকা। ধারের অঙ্ক শুনে যত না চমক, এর পরের কাহিনীতে কেউটের ছোবল। ওবাড়ির বৌদির শাশুড়ি-মা নেই আজ প্রায় বছর চারেক হল। দাদা-বৌদি সকাল না হতেই ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়েন যে যার স্কুল-অফিসের গন্তব্যে। ফেলে-ছড়িয়ে রেখে যাওয়া সংসারের হাল আর বৌদির বিপত্নীক শ্বশুরকে আর নিজের আলুথালু শাড়ি-কাপড় সামলায় তো ওই সলমা। সেই যে যেদিন প্রথম ঘর মোছার সময় আচমকা বারান্দাতেই পেছন থেকে জাপটে ধরেছিল বড়বাবু… বৌদিরা বেরিয়ে যাওয়ার পর ওই বুড়োর তেজ সামলাতে প্রত্যেকদিন অন্তত দু’ঘণ্টা করে সলমাকে বুড়োর বিছানায় কাটাতে হয়। অঘটন যে ঘটেনি এমন নয়। তবে বুড়ো বেশ ভালোই সামাল দেয়। সলমারই কষ্ট… সাতদিন কাজ-কাম বন্ধ করে বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকা। বিনিময়ে মাসমাইনে ছাড়াও বেশ মোটা হাতখরচ-ভালো সাবান-দামি শ্যাম্পু-ক্রিম… এমনকী স্মার্টফোনও। এই নিয়ম চলছে আজ প্রায় তিনবছর পার হতে চলল।

সলমার বড়টা এই আষাঢ়ে ১৭ পেরোল। আর ঘরে রাখা যাবে না, তাই বহিন-জামাই সম্বন্ধ করেছে রতুয়ার ওদিকে। রাজমিস্ত্রির কাজ জানে, ভাড়ার টোটো চালায় ফাঁকা টাইমে। এমনিতে ছেলে ভালো, হালকা পরিবার, নেশা-ভাং নেই। শুধু টোটো কিনতে চায় নিজে। তাই মেয়ের বাড়িতে ১ লাখ চাওয়া। এতদিনে নিজের হাতখরচ বাঁচিয়ে যেটুকু জমেছে, সবই চলে যাবে। যাক। তবু তো মেয়েটা পার হবে। আরও একটা আছে তো। বিয়ের বাকি খরচটা জোগাড়ে আর চিন্তা করেনি। বড়বাবু তো আছেই। বলেই রেখেছে, মেয়ের বিয়াতে নগদ ছাড়াও সলমাকেও সাজিয়ে দেবে। এর জন্যই না শেষের দু’মাস সলমা বুড়োর বরাদ্দ আরও একঘণ্টা বাড়িয়েছে। পাড়া-প্রতিবেশী কাউকে পাত্তা দেয়নি কোনওদিন সলমা। এই শীতেই মেয়েটাকে পার করে দেবে। আর এতকিছুর পরে এখন বৌদির এই কথা! বড়বাবুও টাকার কথা তুললেই আজকাল কেমন এড়িয়ে যায়… এমনকি একদিন বিকেলে রুটি করার সময় রান্নাঘর থেকে আড়ি পেতে বসার ঘরে বড়বাবু আর বৌদির সলমাকে নিয়ে কথা বলার সময় ওদের হাসাহাসিটাও শুনে ফেলে সলমা।

মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল সলমার, তবে কীনা তখন যখন জানল, ছেলের বাড়ি থেকে বাড়ি বয়ে এসে বিয়েটা ভেঙে দিয়ে গ্যাছে। ওরা জানতে চেয়েছে, সলমা’র পেটের পাঁচ মাসেরটার বাপের পরিচয়???

লক্ষ্মী মেয়ে

লক্ষ্মী! ও লক্ষ্মী! উঠ… উঠ মা! …লক্ষ্মীর ডাক পড়েছে। লক্ষ্মী জানে খুব ভালো, প্রথমদিকের এই এক-দু’বারই নরম সকালের ডাক। এরপরই চড়চড়ে বেলার রোদ্দুরের মতো মায়ের খরখরে গলাটাও তীব্র হবে। ঘাড় গোঁজ করে বসে থাকতে থাকতে একসময় খর চোখে তাকায় লক্ষ্মী আর তীব্র গলায় বলতে গিয়েও ঢোঁক গিলে নেয়… রোজ রোজ আমার ভালো লাগে না ওখানে যেতে। ভাটাবাবু যেন কেমন করে তাকায় আর সুযোগ পেলেই নোংরা হাতে জাপটে ধরে। কী বিচ্ছিরি পচা গন্ধ মুখে আর নিঃশ্বাসে। সারা গা ঘুলিয়ে ওঠে। ইচ্ছা করেই বিকেলে পেমেন্ট দেওয়ার সময় ভাটাবাবু পিন্টু-মদনদের সরিয়ে দেয় আর লক্ষ্মীমেয়েকে জোর করে ওই কাঠের ঘরের দরজা পেরনোর জন্য। দরজার ওপারে কোন রাক্ষস আছে জানে না, কিন্তু দরজা পেরোলেই যে মদনদের সমান না হোক কম করে একটা দিনের ফুল পেমেন্টের সাথে কিছু এক্সট্রাও আসবে, সেটা খুব ভালোই জানে লক্ষ্মী মেয়ে।

শেফালি-রিনাদিরা খুব গা-ঢলানি করে। ও পালিয়ে বেড়ায়, তাই লক্ষ্মী মেয়ে। যদিও জানে, আর বেশিদিন না। ভাটাবাবুর ঘিনঘিনে নজর এড়িয়ে এখানে বাঁচা খুব মুশকিল। পদ্মরানি সেই যে গুম হল, কেউ আর খোঁজও করেনি কোনওদিন। পুজোর পর এখন পাঁচটা না বাজতেই ঝুপ করে অন্ধকার নামে। লক্ষ্মীপুজোর দিন বিকেলে পেমেন্টের টেবিলে হ্যাঁচকা টান পড়ল হাতে… কী রে, লক্ষ্মীমেয়ে! সতীপনা দ্যাখাস না বেশি… আবার সেই বিকট পচা গন্ধ… গা গুলিয়ে উঠল। কোনওমতে পালিয়ে এসেছিল লক্ষ্মী, ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে।

সারারাত জেগে ভোররাতে কোজাগরীও যখন প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিল, ঝপ করে শব্দ হল পাশের পুকুরে। চাঁদ ডুবল তারও পরে… না, ডোবেনি। পরদিন ভেসে উঠেছিল ক্ষত-বিক্ষত লক্ষ্মীমেয়ে, ছেঁড়াখোঁড়া জামাকাপড় পাশের ঝোপে।

প্রমিতার প্রতিদিন

ছুটি হয়েছে অনেকক্ষণ… প্রমিতা এখনও চেয়ারম্যানের ঘরে। উচ্চগ্রামের কথার ফুলঝুরি থেকে দু-একটা শব্দ ছিটকে মাঝে মাঝেই বন্ধ কাঁচঘরের এপারে চলে আসছে। বোঝাই যাচ্ছে, দর কষাকষি চলছে। প্রমিতার মেয়ের বয়স দুই হতে চলল কিন্তু সেই সাড়ে চারমাসের মেটারনিটি লিভ-এর আফটার এফেক্ট এখনও লাগু। পাক্কা দু’বছর প্রমিতার সবরকম ইনক্রিমেন্ট বন্ধ। আচমকা পাঁচ বছরের পুরনো ফ্যাকাল্টির ফিডব্যাক খারাপ আসতে শুরু করেছে, প্রোমোশন আটকে গ্যাছে। বাচ্চা ছোট, হাজারো ছোটখাটো সমস্যায় প্রমিতাকেই ছুটি নিতে হয়। ফলত লিভ রেকর্ডও উপচে গ্যাছে। আমরা বুঝলেও ইন্সটিটিউশন বুঝবে কেন? তারপরে আবার প্রাইভেট অরগ্যানাইজেশন বলে কথা। প্রতিবারের মতো এবারেও থমথমে মুখে বেরিয়ে রেলিঙের ধারে দাঁড়িয়ে চোখ মুছল প্রমিতা তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল।

পরদিন সকালে প্রিন্সিপ্যালের চেম্বারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পলিতকেশ সৌম্যদর্শন প্রিন্সিপ্যালের স্বর কানে এল… ‘আপনাকে তো প্রোপোজ্যাল দেওয়াই আছে ম্যাম, আপনিই তো কানে তুলছেন না সেকথা!’ ঘষা কাঁচের এপার থেকে দেখা যায়… প্রমিতা হাসিমুখে সাদা খাম বাড়িয়ে বলছে, ‘থ্যাঙ্ক উ স্যার। ওসব বরং অন্য কারও জন্য রাখুন কারণ আমি আর কাল থেকে আসছি না।’ গুড বাই।।

এবং আমিও

‘এই নে… একদম টাটকা গরম কপি, দেখিস আবার খেয়ে ফেলিস না যেন!’… কুন্তলের স্বভাবসিদ্ধ রসিকতায় হাসতে গিয়েও হাসি এল না। এবারেও আমার কপিটা লিডে নেই। সেই পাঁচের পাতায়। দেবেই না যদি তো বলে কেন কভার করতে আর এত দৌড়ই বা করায় কেন? পাল্টা প্রশ্ন করার হিম্মতও নেই তো তখন। সবে একুশ, মফস্বল ডানা মেলছে একটু একটু করে। যথারীতি এরপরের ঝাড়গুলো হজম করতেও হল… ‘এটা কি একটা কপি হয়েছে নাকি? কিস্যু মাল-মেটেরিয়াল নেই… কতবার বলেছি, আমার সাথে বেরোতে। চোখ চাই বুঝলে, চোখ।’ ব্যর্থতার দায়ের ভার অনেক… ঘাড়ে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে পাশের নিউজরুম থেকে পল্লবদা আর মানসদা’র খিল্লিগুলোও কানে আসে। বেরিয়ে আসার অনেক পরে তাপসদা’র কথাগুলো মনে পড়ে… ‘ওরে, মফস্বলের মেয়ে! পালা এখান থেকে। ছোট কাগজ মানেই বাঁচার লড়াই। হয় বাঁচ, নয় ধরা দে জালে। ওরা যা চাইছে, না পেলে কোনওদিনই তোকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দেবে না।’

‘ফ্রি-ল্যান্স করে কতদিন চলবে তোর? সিরিয়াসলি ভেবেছিস কিছু? বিয়ে করছিস না কেন?…’ এগুলো তো রেগুলার এবং কমন কোয়েশ্চেন। তাই একেকটা প্রশ্নের উত্তরে বালিব্রিজ থেকে টুপ টুপ করে ঢিল পড়ল নিচের গঙ্গায়। পরের প্রশ্ন এল বড়জোর মাস তিনেকের পরিচয়, আমার চেয়ে অন্তত বছর কুড়ি বড় মানুষটির থেকে, যাকে আরেকটু হলেই ফেরেশতা ভাবতে শুরু করেছিলাম। ডুবন্ত মানুষ তো খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরতে চায়, আর সেখানে আমি তো তখন সদ্য বাবাকে হারানো একটুকরো মফস্বল। পরের প্রশ্ন, ‘আমার সাথে থাকবি প্লিজ? রুমা’র সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই আজ বছর পাঁচেক। রাজি হয়ে যা প্লিজ… তুই লিখতে চাস তো? তোর লেখা ছাপানোর সব দায়িত্ব আমার। কী লিখবি, কোথায় লিখবি… সব আমি দেখব।’

পড়ন্ত বিকেলেও সেদিন বালি ব্রিজে অনেক অচেনা মুখের ভিড় ছিল।।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1860 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...