তিনটি অণুগল্প

অভীক দত্ত  

 

সংসার

গাড়িটা যখন তাদের পাড়ার গলি পেরোল, চোখের জল ধরে রাখতে পারছিল না পূরবী। পাশে অয়ন ছিল ভুলেই যাচ্ছিল সে। অয়ন কিছুই বলেনি। চুপ করে বসে ছিল। অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ, কথাটার মতো মারাত্মক কথা বোধহয় আর কিছু হয় না। মা নেই, করবে না করবে না করেও বিয়েটা করতেই হল শেষতক। বাবার মুখ চেয়েই মেনে নিল সবটা। অয়নকে দেখেছিল, বাবা বলেছিল “না বলিস না মা”, পূরবীও আর না বলেনি। কাঁদছিল সে। রাস্তা ধরে গাড়ি চলেছে, অয়ন বসে চুপ করে। এক মনে কেঁদে চলেছে পূরবী। অনেকটা রাস্তার পর গ্রামের রাস্তায় ঢুকল গাড়ি। অয়ন বলল “জল খাবে?” পূরবী মাথা নাড়ল। অয়ন চুপ করে গেল। অনেকক্ষণ পরে গাড়িটা অয়নের বাড়ি পৌঁছল। স্কুল শিক্ষক অয়ন। বাবা মা নেই। পাড়ার কয়েকজন এসেছিল। গাড়ি দাঁড়াবার পর অয়নের কাকিমা পিসিমারা বরণ করে নিল পূরবীকে। ছোট ঘর। পূরবী চারদিক তাকাল। কান্না পাচ্ছিল না আর। অয়ন বলল “জল খাবে?” পূরবী দেখল ঘরের অবস্থা করুণ। জামাকাপড় অবিন্যস্ত আলমারিতে। পায়েও ধুলো লাগছে৷ বলল “ঝাঁটা দিন!” অয়ন ঘাবড়ে গিয়ে বলল “ও আমি করে নেব।” পূরবী ধমক দিয়ে বলল “কী করেন তা তো দেখতেই পাচ্ছি। দিন দিন!” অয়ন ঘরের কোণ থেকে ঝাঁটা এনে দিল। পূরবী ঘর ঝাঁট দিতে শুরু করল। ঝাঁট দিতে দিতে বাবার কথা ভেবে একটু কেঁদেও নিল অবশ্য। অয়নের দিকে কিছুক্ষণ পরে একগাদা কাপড় এগিয়ে দিয়ে বলল “আয়রন করতে দিয়ে আসুন!” অয়ন বলল “সেকী, কাল বউভাত যে। তারপরেই না হয়!” পূরবী বলল “যান তো আগে। বউভাত টাত পরে হবে। আগে দিয়ে আসুন। ঈস, ঘরদোরের কী অবস্থা। আগে ঠিক করি সব তারপর দেখছি বউভাত না কী!” অয়ন হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল। পূরবী আরও খানিকক্ষণ ঘর পরিষ্কার করার পর শান্ত হয়ে বসল। একটু একটু কাঁদে আর মাঝে মাঝে হাসে। এত মনখারাপের মাঝে এই হাসিটা কেন আসছে কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছিল না সে।

 

বমি

ডাউন কালকা মেল গয়া পৌঁছতে অনির্বাণবাবু টের পেলেন কেউ তার পা ধরে টানছে। স্লিপার কোচের তেতলায় শুয়েছিলেন। বিরক্ত গলায় বললেন “কেয়া চাহিয়ে?” টিটির গলা ভেসে এল “টিকেট দিখাইয়ে।” অনির্বাণবাবু গলায় বিরক্তিভাব বজায় রেখে জানালেন তিনি দিল্লি থেকে ফিরছেন। পথে টিকিট চেক হয়ে গেছে। টিটি মানলেন না। অনির্বাণবাবু উঠে পকেট হাতড়ে টিকিটটা টিটির হাতে দিলেন। টিটি চেক করে ফেরত দিলেন। অনির্বাণ ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। গোটা কামরা অন্ধকার। টিটির ওপর রাগ হচ্ছিল। রাত এগারোটা বাজে। ট্রেন সকালে কলকাতা পৌঁছবে। ঘুম ভাঙলেই অনির্বাণের ছোট বাইরে পায়। অগত্যা তাকে উপর থেকে নেমে আসতে হল। নিচের আর মাঝের বার্থের লোকজন নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। অনির্বাণ বাথরুমে ঢুকলেন। খানিকক্ষণ থেকে বেরিয়ে এসে আবার তেতলায় চাপলেন। শুনতে পেলেন কাছেপিঠেই দুজন ফিসফিসিয়ে আলোচনা করছে “হাজারিবাগে নামিয়ে দিয়ে চলে যাব। ঘুমের ওষুধটা ধরেছে বোধ হয়। তোমার বাবা টের পাবে না।” “তুমি ধোরো কিন্তু। খুব ওজন বুড়োর।” “সে তো ধরবই। ঘাড় থেকে নামলে বাঁচি। সব থেকে ভালো হত চলন্ত ট্রেন থেকে নামিয়ে ফেলে দিতে পারলে। তুমি মানলে না।” “না না, কেউ দেখতে পারলে বাজে ব্যাপার হয়ে যাবে।” “হাজারিবাগ দুটো নাগাদ আসবে তাই তো?” “হুঁ।” “একটু ঘুমিয়ে নি। অ্যালার্ম দিয়ে দাও দেড়টায়।” “ঠিক আছে।” সব চুপচাপ হয়ে গেল। অনির্বাণ উকি মেরে পাশের সিটে দেখার চেষ্টা করলেন। কিছু দেখা গেল না। ট্রেন ছুটে চলেছে বেশ জোরে। অনির্বাণের ঘুম আসছিল না। টেনশন হচ্ছিল। একটা ছেলে নিজের বাবাকে ট্রেন থেকে ঘুমন্ত অবস্থায় একটা অজানা স্টেশনে নামিয়ে দেবে? পারবে কী করে? অনির্বাণ বসে থাকলেন ঠায়। দেড়টা নাগাদ শুনলেন কারও একটা অ্যালার্ম বেজে উঠেছে। একটু পরেই সে অ্যালার্ম থেমে গেল। পুরুষকণ্ঠ গলা নামিয়ে উত্তেজিতভাবে বলছে “এই, ওঠো, তৈরি হতে হবে।” নারীকণ্ঠ ঘুমজড়ানো গলায় বলল “ধীরে ধীরে বাবাকে দরজার কাছে নিয়ে চলো।” অনির্বাণ শুনলেন পায়ের শব্দ। খসখস করছে। একটু পরেই দেখলেন এক বৃদ্ধকে দুজন দরজার কাছে নিয়ে যাচ্ছে। অনির্বাণের মাথা কাজ করছিল না। তড়িঘড়ি তেতলা থেকে নামলেন। বাথরুমের দিকে রওনা হলেন। দেখলেন বৃদ্ধকে দরজার কাছে বসিয়ে রেখেছেন মধ্যবয়স্ক এক লোক। অনির্বাণ সেদিকে না তাকিয়ে বাথরুম ঢুকলেন। বেশ খানিকক্ষণ মুখে জল দিয়ে আয়নার দিকে তাকিয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন। বেরিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন। মধ্যবয়স্ক লোকটি তাকে হেসে জিজ্ঞেস করল “আপ উতরোগে ক্যা?” অনির্বাণ ঘাড় নাড়লেন। মধ্যবয়স্ক লোকটি বললেন “ওহ”। অনির্বাণের হঠাৎ কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। বৃদ্ধের ঘুমন্ত মুখটা কোথায় দেখেছেন মনে হচ্ছিল। ট্রেনের আলো জ্বলছিল নিভছিল। হঠাৎ বেসিনের ওপরের আলোটা দপ করে জ্বলে উঠল অনির্বাণ আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে পেয়ে শিউরে উঠলেন। তিনিই যে এই বৃদ্ধের মতো দেখতে! তার মানে এই বৃদ্ধ আসলে… তিনিই… বৃদ্ধ তার দিক ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে আছেন… মাঝবয়সী লোকটা হো হো করে হাসতে শুরু করল… … অনির্বাণ ধড়মড় করে উঠে বসলেন। এ কি দুঃস্বপ্ন ছিল এটা? ও পাশে বউ ঘুমোচ্ছে। মাঝে ছেলে। ছেলের মুখটা কি বড় হয়ে ওই মাঝবয়সী লোকটার মত হবে? মার মুখটা মনে পড়ে গেল হঠাৎ করে। বিহারের কোন এক অজানা স্টেশনে মাকে ঘুমন্ত অবস্থায় নামিয়ে দিয়ে… অনির্বাণের বমি পাচ্ছিল ভীষণ…

 

রাজু বনাম রাজু

আমাদের কোম্পানির অফিসারদের জন্য কোয়ার্টারগুলো বেশ বড়। এক কলিগের কোয়ার্টারে গেছি, রাজু নাম। রাজু ভালো চা করে। অফিস থেকে ফেরার পর মাঝে মাঝে ওর বাড়ি ঘুরে যাই। অফিস থেকে ফেরার সময় মোড়ের মাথা পেরিয়ে দেখি রাজু যাচ্ছে। গাড়ি থামিয়ে রাজুকে গাড়িতে বসতে বললাম। বললাম “কোথায় গেছিলে?” রাজু বলল “বাজার। চা নিয়ে ফিরছি। ভালোই হল লিফট পেয়ে গেলাম তোমার গাড়িতে।” আমি রাজুকে নিয়ে রাজুর কোয়ার্টারে গেলাম। টিভি চালিয়ে বসেছি। রাজু চা বসাতে গেছে। আমার অফিসের কোন একটা কথা মনে পড়তে রাজুকে ডাকলাম, “রাজু”। সাড়া এল “হু”। আমি বললাম “শুনতে পারছ”। রাজুর গলা পেলাম “হু”। আমি বললাম “ধুর বাল কী হু হু করছ?” আবার শব্দ এল “হু”। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দেখি কোয়ার্টারে কেউ নেই। রাজু কোয়ার্টারের গেটের বাইরে একটা লোকের সঙ্গে কথা বলছে। সম্ভবত চাঁদা চাইতে এসেছে। অবাক হলাম। ঘরে এলে জিজ্ঞেস করলাম “তোমাকে ডাকছিলাম তুমি সাড়া দিচ্ছিলে?” রাজু বলল “না তো।” আমি বললাম “মারিয়েছে। কে সাড়া দিল?” রাজু হেসে বলল “আমারও দু চারবার এরকম হয়েছে। তিন চার দিন আগে দেখলাম খাবার টেবিলে একজন কেউ বসে আছে। কাছে গিয়ে দেখি নেই।” আমি আর কী বলি। হাতে গরমে এক্সপেরিয়েন্স হয়েছে। শুনেছি ভূতেরা অত্যন্ত ডেলিকেট জিনিস। বেশি ভিড় টিড়ে থাকতে পারে না। একেবারেই শব্দ সহ্য করতে পারে না। এসব জায়গায় থাকতেই পারে। জঙ্গলের মধ্যে কোম্পানি কোয়ার্টার। শীতের সন্ধে নেমেছে। তাছাড়া রাজুকেই বা বলি কী করে, আমার নিজের কোয়ার্টারেও তো এরকম একেবারে হয়নি তা নয়। পরিপাটি জামাকাপড় এদিক ওদিক করে দিয়ে গেছে তিন চার বার। রাজু চা নিয়ে এলে বললাম “এ বাড়িতে ক’জন থাকে কিছু বুঝতে পেরেছ?” রাজু বলল “একজনই হবে।” আমি বললাম “কিছুই করে না যখন তখন আর চাপ নিয়ে কী হবে।” রাজু বলল “আমি চাপ নিই না একেবারেই। একা একা থাকতে হয়। এরকম কেউ থাকলে ভালো লাগে।” আমি বললাম “সেই। আমারও একই কেস”। রাজু হাসতে হাসতে বলল “কার কোথায় কত গল্প আছে কে জানে! যদি কোনওদিন জানতে পারি, তোমাকে জানাব, গল্প লিখে ফেলো।” দুজনেই হো হো করে হাসলাম খানিকক্ষণ। খানিকক্ষণ পরে রাজুর কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলাম। কিছুটা রাস্তা যাবার পর দেখি রাজু হাঁটতে হাঁটতে আসছে। আমি গাড়ি থামিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম “একী? তুমি কোথায় গেলে এর মধ্যে?” রাজু অবাক গলায় বলল “কোথায় যাব আবার? এই তো বাজার গেছিলাম। এখন ফিরছি।” আমি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেলাম। এই লোকটা রাজু না অন্য কেউ, কে দেখতে যাচ্ছে? গাড়ির কাঁচে দেখা গেল রাজু আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। যাই হোক, নিজের কোয়ার্টারে পৌঁছে দেখলাম রাজু দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে হেসে বলল “বাজার থেকে ফিরছিলাম। ভাবলাম তোমার সঙ্গে দেখা করে যাই।” আমি নিজের হাতে চিমটি কাটলাম। এ তো মহা জ্বালা হল! রাজুকে নিয়ে দরজা খুলে ভেতরে বসালাম। তখনই ফোনটা বেজে উঠল। দেখলাম অরিত্র ফোন করছে। ধরলাম “বল রে”। অরিত্র হাঁফাতে হাঁফাতে বলল “ভাই রাজু মারা গেছে রে। বাস অ্যাক্সিডেন্টে। এই খানিকক্ষণ আগে।” আমি চমকে সোফার দিকে তাকালাম। রাজু কেন, কেউই নেই। শুধু মনে হল পাশের ঘর থেকে রাজু জোরে বলে উঠল “হু”।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1319 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. তিন স্বাদের তিনটে অনুগল্প। ভালো লেগেছে পড়ে। আচ্ছা অনুগল্পের ‘শেষ মোচড়ে চমক, বা টুইস্ট না থাকলে যথার্থ অনুগল্প হয়ে ওঠে না’ এ সম্পর্কে আপনি কী ভাবেন অভীক দত্ত’দা? ব্যাপারটা বেশ ভাবিত করেছে, তাই আপনার ভাবনা জানবার কৌতূহল হলো। আশা করি আপনার আরো লেখা পড়বার সুযোগ পাবো।

আপনার মতামত...