হাসনাহেনা

ইফতি

লাজ্জ্বাতুল কাওনাইন

 

–ওই ছ্যামড়া ওই! সইর‍্যা বইতে পারোছ না!

অবাক হয়ে ভ্যান্দা চোখে তাকিয়ে আছে ইফতি। সে তার মতো পার্কে বসে আছে। এই মহিলা তাকে কেন ধমকাচ্ছে কারণ বুঝতে পারছে না। তার প্রচণ্ড মন খারাপ। বাসায় টাকা পাঠাতে হবে। বাবার কিডনির সমস্যা বেড়ে গিয়েছে। এই মাসে টিউশনির টাকাগুলোও পায়নি। মেসে একজনের মোবাইল চুরি হয়েছে, সবাই অদ্ভুত বাজেভাবে তাকে চোর বানাচ্ছে। সে যতই বলেছে তার মোবাইলটাও চুরি হয়েছে মেস থেকেই একই সাথে, না তারা বলছে, এটা ইফতিরই কাজ! চুরি করে নাকি বেচে দিয়েছে। মোবাইলটার দাম ছিল সাত হাজার টাকা, তারা দয়া করে বলেছে তিন হাজার টাকা মুচলেকা দিলেই নাকি আর হ্যাঙ্গাম করবে না। সে কোথায় পাবে টাকা! ওরা ওর ঘড়ি, প্রয়োজনীয় বই আটকে রেখেছে। টাকা দিলে দিয়ে দিবে। মেসে থেকে সেই মাগরিবের সময় বের হয়ে যে পার্কে বসে আছে, এখন বাজে রাত প্রায় পৌনে বারো। আর ফিরেনি! এর ভিতর আবার ধমকাধমকি!

–আরে বালটা আমার শাড়ির আঁচলের উপরে তো হুইয়্যা পড়োস! সইর‍্যা শো না!

ওহ! ও খেয়াল করেনি! মরা ঘাসের উপর কখন যেন শুয়ে পড়েছিল কিন্তু খেয়াল তো করেনি কারও জামাকাপড়ের উপর শুয়েছিল কিনা। হড়গড় করে উঠে বসেছে। সোডিয়ামের আলো আঁধারিতে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না মহিলার চেহারা, তবে স্বর বাজেরকম কর্কশ!

–জ্বী সরি!
–ওরে ম্মা! কি ভদ্দরলুকের বাচ্চা গো! আবার সরিও কয় দেহি! ওই তোর লাগলে গায়ের উপ্রে আয়া উঠ। বেহুদা আঁচলের উপ্রে উঠলে খায়েশ মিটব রে!

আস্তাগফিরুল্লাহ! মহিলা এসব কী বলছে। ইফতি খুব আলাভোলা ধরনের একটা ছেলে। এইচএসসিতে প্রচণ্ড রকম ভালো ফলাফল করার পর খুব সাধ করে ঢাকাতে এসেছে উচ্চশিক্ষা নিতে। তেমন কোনওই বন্ধুবান্ধব নেই। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলে সিট পায়নি অনেক দু বছর! রাজনীতি আর বড়ভাইদের তুমুল অত্যাচার! তাই একটা মেসে কজনার সাথে থাকে। সেটাও বহুবার হল পাল্টেছে। এবার কতগুলো নেশাখোর কপালে জুটেছে। ওদের সাথে বনিবনা হয় না। মেস ছাড়ি ছাড়বে করে, আর টাকা সময় ভালো মেস পাচ্ছে না, হচ্ছেও না। এর ভিতর এই অঘটন। বাড়িতে ওর খুব একটা টাকা আগে পাঠাতে হত না। শুধু নিজের চলা আর পড়ার খরচ নিজেই বহন করত। ছোটখাটো চাকুরিজীবী বাবা পুরো সংসার চালিয়ে নিচ্ছিল মফস্বলে। কিন্তু কিডনির অসুখে চাকরিটাও আর করতে পারল না সাথে জলের মতো টাকাও গেল। চিকিৎসা হচ্ছে, তবে সুচিকিৎসা না। গত ছ’মাস হল ইফতিকে টাকা পাঠাতে হচ্ছে। জমিজমা আর জমানো টাকা প্রায় শেষ পর্যায়ে! ইফতির ফাইনাল পরীক্ষার আরও সাত মাস বাকি। মাস্টার্সটাও আর হবে কিনা জানা নেই। ধুমাই চাকরি খোঁজা দরকার বা বিসিএস দিবে কিন্তু সবকিছুর জন্যই তো পর্যাপ্ত টাকা দরকার আর বাবাকেও বাঁচানো। মনটা এতই খারাপ ওর! বাজে কথা বলা বা অযথা আড্ডার সময় কোথায় তার। তবু ক্লাসমেটদের উড়াধুড়া গল্পের সময় তার কান লাল হতে থাকে। সরে উঠে যায় টিউশনির কথা বলে।

–কী বলেন আপনি! আচ্ছা আমি যাচ্ছি।
–ওরে ওরে কুতায় যাচ্ছ বাবু। প্যাট ভরা নাকি… হিহিহিহি

কী বাজেভাবে মহিলাটা হাসছে। ইফতি উঠে চলে যাচ্ছিল। আজব তো! মহিলাটা আবার বলে বসল,

–ক্যা রে! আমার শইলডা ফোলা, প্যাট ভরা তাই রুচিত আহে না নাকি রে। গ্যারান্টি যা কমতি হবে নারে কিছু! আচ্ছা যা ট্যা কিছু কম দিস। চিকনি মাগীগুলান ৫০০ হাঁকে… তুই ব্যাটা ৩০০ দিস!

হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে ইফতি। ওর রাগ বলতে কিছু আছে বলে মনে হয় না। ওর ছোট ভাইবোনেরা যখন জিদ রাগ চেঁচামিচি করে ওর মা খুব বলে, তোরা আমার ইফুর মতো হলি না। সব শোনে কী লক্ষ্মীর মতো। কোনওদিন একটু রাগও দেখায়নি। আজ সেই আস্তরণটা খুলে যাচ্ছে মনে হল ইফতির। হুট করে সে জোরে ঠাস করে একটা চড় মেরে বসল মহিলাটার গালে। চড় খেয়ে মহিলা খিলখিল করে হাসছে। খুব কাছে থেকে দেখল অদ্ভুত সুন্দর প্রতিমার মতো একটা নারীমুখ, লাল টকটকে রঙ মাখা ঠোঁট। বাজেভাবে এলোমেলো শাড়ি পরা। ও চোখ নামিয়ে নিয়ে পিছন ফিরে হাঁটা শুরু করল। পিছন ফিরে যদি দেখত তবে দেখতে পেত, নারীটি মাটিতে বসে অসহায়ের মতো কাঁদছে….

রাতে ফিরল না ইফতি। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটল। বাসার গেট সাড়ে এগোরোতে বন্ধ হয়। আর মোবাইল নাই যে কাউকে ফোন দিয়ে বলবে গেট খুলে দিতে। কিন্তু খুব বাজে হল। কেন সে একটা মহিলার গায়ে হাত তুলল? আচ্ছা ওই বিশ্রী কথাগুলো ওকে কেন বলছিল সে। ওকে দেখতে কি বাজে মানুষগুলোর মতো লাগে। সব মিলিয়ে মনটা বিষাক্ত হয়ে গেল। মোবাইল চুরির বিষয়টা থেকেও এই বিষয়টা তাকে বেশি মানসিক যন্ত্রণা দিচ্ছে। সকাল ছয়টায় সে মেসে ফিরে অনেক পানি দিয়ে গোসল দিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিল। ক্লাসে মিডটার্ম ছিল, যাওয়া হল না। উঠল ঠিক আসর ওয়াক্তে। উঠেই হোটেলে গিয়ে কিছু ভাত গিলেই টিউশনিতে চলে গেল। সেরে হেঁটেই ফেরে সে। প্রায় রাত সাড়ে দশ হয়। আজও ফিরছিল। কিন্তু তার মেসে আবার ফিরতে মন চাইল না। কেন যেন পার্ক আবার তাকে টানছে। ইফতি পার্কের সেই জায়গাতে গিয়েই বসে রইল, যেখানে সে কাল শুয়েছিল। রাত প্রায় ১২টা। সে কি কারও জন্য অপেক্ষা করছে? না তো! কিন্তু উঠেও এল না। এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। কাউকে খুঁজচ্ছে সে…

–চোদানির পোলারা… রাস্তার মাল পাইয়্যা ইচ্ছামতো মারায়… দয়া মায়া নাই… দুজুকের শোওয়ারের বাচ্চাগুলান! অহন তো আবার ভালা মানুষ সাইজ্জ্যা বউগো জড়ায় ঘুমাবি বাইত গিয়্যা… নাই দ্যাশে মুবাইল কইর্যা  মিষ্টি গিলাবি! এইহানে কী করোস তা তো আর বেকুব বউগুলান জানে না!

প্রচণ্ড হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কেউ কথা বলছে। ঠিক কথা না, চিৎকার দিচ্ছে কেউ। কয়টা বাজে ইফতি বুঝতে পারছে না! ঘড়ি বা মোবাইল ওর কাছে নেই। তবে ঘুমিয়ে পড়েছিল মনে হয় বেঞ্চে। কর্কশ আওয়াজে ধড়ফড় করে উঠে বসল সে। কালকের সেই মহিলা!

–আরে বাব্বা তু! আজও আইসোস! কিরে আইজ্জা কি চাক্কু মাক্কু আনোছ নি! ফুডাফুডা করতে??? হিহিহিহি… যে ত্যাজ রে তোর হিহিহিহি…

বিশ্রী হাসি দিতে দিতে মাটিতে পা ছড়িয়ে মহিলাটি বসে পড়ল! ইফতি বোকার মতো বলে বসল,

–কাল ভুল হয়ে গিয়েছে! মাফ করবেন!
–হাহাহা! আচ্ছা বসেন গো! বুজতে পারছি। আমাগো কাছে কেউ মাফ চাইব ক্যা! যে যাই করব তাই সই! কুনু অসুবিদা নাই গো! তয় কি মাইর্যাা দুইডা ট্যা দিয়া গেলে উফকার হইত! যাউজ্ঞা রাইত বিরাতে এইহানে কী করেন

আপনে? এইডা হইল বেইশ্যা, দালাল আর খদ্দর গো আস্তানা! খুব বাজে জায়গা! আর আইসেন না!

মহিলাটি খুব সুন্দর শান্ত হয়ে কথাগুলো ইফতিকে বলছিল। হঠাৎ ওর আরও খারাপ লাগল। এরাও মানুষ! এরাও এত সুন্দর করে কথা বলে! কালকের এই মহিলাটির সাথে আজ আর মিলাতে পারল না। হঠাৎ মহিলাটি জোরে আহা আহা মাগো বলে পেট ধরে রইল। ইফতি মহিলার পাশে বসে জিজ্ঞেস করল,

–কী হয়েছে আপনার?
–কিছু না রে ভাই! প্যাডে বাচ্চা। তিড়িংবিড়িং করে বাইর হওনের লাইগ্যা।

খুব কষ্টে মহিলাটি হাসি দিল একটা। তবে পাশ ফিরে মাটিতে শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। ইফতি ঠিক কী করবে বুঝতে পারছে না।

–তুমি যাও গা ভাই। এই মাটির ভিত্রেই একটু পর একটা বাচ্চা হইয়্যা পইড়্যা থাকব নে।
–আচ্ছা চলুন আপনাকে হাসপাতাল নিয়ে যাই। দেখি রিক্সা পাই কিনা…

প্রচণ্ড ব্যথাতেও কিন্তু মাথা ভালো কাজ করছে মহিলাটির! তার শাড়ি পানি রক্তে ভিজে যাচ্ছে ভয়াবহভাবে। ইফতি না পারছে ফেলে যেতে না পারছে কিছু ভাবতে, তবে মোটামুটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে উনাকে হাসপাতাল অবধি পৌঁছে দিবে।

–ওরে ছাগলের হদ্দ! এক বেইশ্যা নিয়া তুই রিক্সাত উঠবি। এরপর পুলিশ কেস খাবি ইজ্জত যাইব। ভালা ঘরের পোলা ঘরে ফিইর্যা  যা।
–না আপনি তো এইভাবে মারা যাবেন। হাসপাতাল কাছেই।

মহিলাটি আবারও বলল,

–ভাল বাড়ির পুলা, বাইত ফেরো। বহু বাজে কিছু হইব!

এবার ইফতি একটু শক্ত হল। এভাবে মানুষকে ফেলে যাওয়া চলে না। সে জোর করেই মহিলাটাকে হাসপাতালে নেবার কথা ভাবল…

–আচ্ছা যা হবার হবে। আমি দেখি রিক্সা পাই কিনা!
–আমার কাছত বাচ্চা হওনের কুনু ট্যা পয়সা নাই ভাই। এমনিই হইব। আর মইর্যাে গেলে তো গেলই।

ইফতি মহিলার কথাবার্তা ঠিক বুঝতে পারছে না। হঠাৎ খুব শক্ত করে মহিলা ইফতির হাতটা ধরল। আহা আহা আহা মাগো মা….ও মা মা মা… জোরে কাতরানি দিল।

–ভাই যাও গা! আমার কিছুই হইব না! এর আগে দুইটা বাচ্চা এরাম হইসে। অনেক ধারকর্জ আছে আমার। ঘরভাড়াও বাকি। দালাল ঠিক করাই আছে রে ভাই। বাচ্চাডা হইলেই নিয়া বেইচ্যা দিমু। ধারগুলান শোধ দিতে হইব…

এই অস্বাভাবিক কথাগুলো এত স্বাভাবিকভাবে কোনওদিনও ইফতি শোনেনি। এটা শুনে জেনে কি একটা মায়ের মুখে থুথু ছিটাতে হয় নাকি বুঝে চুপচাপ সরে আসতে হয় ওর জানা নেই। তবে মানুষ তো চমকপ্রদ প্রাণী। সে ঠিক ঠিক সঠিক বিবেচনাটা করে ফেলতে পারে মুহূর্তেই। সে মহিলাটিকে কাঁধে তুলে নিল। মহিলা অজ্ঞান হয়ে যাওয়াতে আর পাকনা কথা বলছে না। একটা রিক্সার খুব প্রয়োজন খুব। দুটো মানুষকে বাঁচাতে হবে যেভাবেই হোক। আর তার পুরো ভার এখন ইফতির হাতে! আচ্ছা আর একটু পরই কি ফজরের আযান হবে…. ইসস দারুণ ঝিরঝির বাতাস… কোথাও পাখিও ডাকছে বোধহয়!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1430 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*