উর্জিতের পদত্যাগ : ঋণনীতিতে আমূল বদলের ঈঙ্গিত

বিশ্বরূপ কোনার

 

সরকারের খবরদারির কারণে গেল মাসের দশ তারিখে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর উর্জিত প্যাটেল পদত্যাগ করেছেন। ওঁর জায়গায় এসেছেন শশীকান্ত দাস। দাস অর্থনীতিবিদ নন, প্রাক্তন আমলা (এঁকে আপনি টিভির পর্দায় দেখেছেন ডিমনিটাইজেশনের কালে) – এই নিয়ে জলঘোলাও হয়েছে বিস্তর।

এই নিয়ে দু’বছরের কম সময়ে দু’জন গভর্নরকে বিদায় জানাল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। এমন আগে কখনও ঘটেনি।

সত্যিই কি ঘটেনি? সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের বিবাদ কি আমাদের দেশের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসে নতুন? যেটা ঘটেনি, সেটা হল – এত অল্প সময়ের মধ্যে দুই গভর্নরের বিদায়। আর যেটা ঘটেছে, সেটা ঘটেছে এর আগে তিন বার। প্রথম বার ১৯৫৭ সালে, যখন সরকারের সঙ্গে বচসার জেরে পদত্যাগ করলেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সবথেকে লম্বা সময় ধরে গভর্নরের পদে থাকা বেনেগাল রামা রাউ। এর পর ১৯৭৭। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির সঙ্গে মতবিরোধের জেরে পদত্যাগ করলেন কে. আর. পুরি। তারপর সোজা ১৯৯০। আর. এন. মালহোত্রা। প্রধানমন্ত্রী চন্দ্রশেখর।[1] সাহেবি আমলেও অবশ্য একজনের চাকরি যায় – অসবোর্ন স্মিথ – কিন্তু তাঁর কথা আর না-আনাই ভালো।

প্যাটেল সাহেব অবশ্য বলেছেন তাঁর এই পদত্যাগ একান্তই ব্যক্তিগত কারণে। এ-কথা অবশ্যই আমরা সঠিক বলে ধরে নেব, কারণ আমরা সদ্য একটি সাক্ষাৎকারে জেনেছি যে প্যাটেল সাহেব দীর্ঘদিন ধরেই পদত্যাগের জন্য আমাদের প্রিয় মাননীয় স্বাস্থ্যবান ‘খোলামেলা’ প্রধানমন্ত্রীর কাছে তদ্বির করছিলেন।

কিন্তু ভবি ভোলে না! সে কেবল হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে। সে কেবল মনে করে, কারণ রয়েছে অন্য কোথা, অন্য কোনওখানে। কিছু কিছু কারণ সে কাগজপত্র ঘেঁটে বারও করে ফেলে। কী সেসব?

 

রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ব্যালান্সশিট

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজের কাছে কতটা মূলধন বা ক্যাপিটাল রাখবেন, এই তর্কটা বহু পুরোনো। অরভিন্দ সুব্রমনিয়ন, প্রাক্তন মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা গত বছরের জুলাই মাসে, তাঁর অবসরগ্রহণের কিছু আগে এই নিয়ে যথেষ্ট সরব হয়েছেন।[2] তাঁর, বা এই তত্ত্বের যাঁরা উদ্গাতা তাঁদের, বক্তব্য— যে বিপুল পরিমাণ অর্থ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ক্যাপিটাল হিসাবে নিজের কাছে রেখেছেন, তার যোগ্যতর ব্যবহার সম্ভব, এবং এ অবশ্যকর্তব্য। এই প্রশ্ন রঘুরাম রাজনের সময়েও উঠেছিল। কিন্তু রাজন এর বিরোধিতা করেন। রাজনের বক্তব্য, বা এই মূলধন কমানোর বিরুদ্ধে যাঁরা তাঁদের বক্তব্য– রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হাতে এই টাকা রাখার উদ্দেশ্য দেশ যে কোনও আর্থিক সঙ্কটে পড়লে সামাল দেওয়া।

এখানে প্রশ্নটা ক্যাপিটাল না-রাখার বনাম রাখার নয়। কতটা রাখা ঠিক, বিতর্কের কারণ সেটাই। সরকারি সমালোচকদের মতে দুনিয়ার অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক তাদের সম্পদ বা অ্যাসেটের তেরো থেকে চোদ্দ শতাংশ ভাগ সংরক্ষিত রাখে। সে-ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক রাখছে সাতাশ শতাংশ। আর বিপক্ষের দেখানো কারণ দুটো। এক, এটা খাতায়-কলমে সাতাশ শতাংশ হলেও অনুপাতটা কার্যক্ষেত্রে এগারো শতাংশের কিছু বেশি। দুই, এই রিজার্ভ ঠিক করার দুটো পদ্ধতি রয়েছে। ভ্যালু অ্যাট রিস্ক পদ্ধতি ও স্ট্রেসড ভ্যালু অ্যাট রিস্ক পদ্ধতি। দ্বিতীয় পদ্ধতি জনপ্রিয় হতে থাকে বিশ্ববাজারের মন্দা-পরবর্তী সময় থেকে। এই পদ্ধতি প্রথমের তুলনায় কিছু বেশি আঁটো। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই দ্বিতীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে। বলে রাখা ভালো, যে গত বছর গভর্নর প্যাটেলের তীব্র অনিচ্ছা সত্ত্বেও দশ হাজার কোটি টাকা সরকারি তহবিলে অন্তর্বর্তীকালীন লভ্যাংশ বা ইন্টারিম ডিভিডেন্ড হিসাবে পাঠানো হয়।

তাৎক্ষণিক সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিয়মাবলী বা Prompt Corrective Action Framework

এই নিয়মাবলী নতুন কিছু নয়। এর উদ্দেশ্য দুর্বল কোনও ব্যাঙ্ক যাতে আরও দুর্বল হয়ে না-পড়ে তা নিশ্চিত করা। এই নিয়ম নতুন না হলেও এর প্রয়োগ খুব সফলভাবে হয়নি। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই নিয়মাবলীকে আরও ঘষামাজা করে, যাতে করে এই নিয়মাবলীর প্রয়োগ আরও সফলভাবে করা যায়, এবং ব্যাঙ্কগুলোর অবস্থার উন্নতির মাধ্যমে দেশের আর্থিক স্বাস্থ্য আরও কিছুটা ফেরানো যায়। এই নিয়মে এগারোটা ব্যাঙ্ক— ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক, ইউনাইটেড ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, কর্পোরেশন ব্যাঙ্ক, আইডিবিআই ব্যাঙ্ক, ইউকো ব্যাঙ্ক ইত্যাদি-র মূলধন, সম্পদের মান বা অ্যাসেট কোয়ালিটি এবং লাভজনকতা নিম্নসীমা লঙ্ঘন করলেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে খবর পৌঁছয়। খবরে প্রকাশ, এই নিয়ম লাগু করে এই ব্যাঙ্কগুলোর ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো সম্ভব হয়েছে।[3]

এপ্রিলের নিয়মগুচ্ছ বলবৎ হলেও প্রথমটায় সরকারের তরফে কোনওরকম আপত্তি জানানো হয়নি। কিন্তু গত কয়েকমাস ধরে সরকার মনে করছেন যে এর ফলে দেশের অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বা ক্রেডিট ফ্লো মার খাচ্ছে।

ব্যাসেল নিয়মাবলীর লঘুকরণ ও পীড়িত সম্পদ বা স্ট্রেসড অ্যাসেট-সংক্রান্ত নির্দেশাবলী

ব্যাসেল নর্মস বা নিয়মাবলীর উৎপত্তি ১৯৮৮ সালে, সুইৎজারল্যান্ডের ব্যাসেল শহরে। এই নিয়মাবলীর মূল প্রতিপাদ্য হল বিভিন্ন ঝুঁকির থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার উদ্দেশ্যে ঘোষিত কিছু কর্তব্য, যা সারা বিশ্বের ব্যাঙ্কগুলোকে মেনে চলতে হবে। ২০০৮ সালে বিশ্ববাজারে মন্দার পর ২০১০ সালে ঘোষিত হয় ব্যাসেল-৩ নিয়মাবলী, যাতে এই মন্দার সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাবগুলোর থেকে বেঁচে থাকা যায়।

সরকারের বক্তব্য, আমাদের দেশের ক্যাপিটাল নর্মস যা আছে তা যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে ব্যাসেল ৩ নিয়মাবলী পুরোপুরি মেনে নেবার কোনও প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশের ক্যাপিটাল টু অ্যাসেট্‌স ওয়েটেড রেশিও ৯ শতাংশ। ব্যাসেল ৩ নিয়ম অনুযায়ী হওয়া উচিত ১০.৫ শতাংশ। আর সরকার বাহাদুর চাইছেন ৮ শতাংশ। সরকারের বক্তব্য— এই রেশিও এক শতাংশ বিন্দু কমালে ব্যাঙ্কগুলোর হাতে একবারে চলে আসবে পঞ্চান্ন হাজার কোটি টাকা, যা সুদে খাটিয়ে ব্যাঙ্কগুলো মুনাফা করতে পারে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বক্তব্য, ক্যাপিটাল নর্মস আরও শক্তিশালী করার অর্থ খাতায়-কলমে নয়, কাজে ব্যাঙ্কগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যকে পুষ্ট রাখা।

ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সমস্ত ব্যাঙ্ককে স্ট্রেসড অ্যাসেট-সংক্রান্ত নতুন নিয়মাবলী পাঠান। তাতে বলা হয়, কোনও লোনঅ্যাকাউন্টেএকদিনের জন্য ডিফল্ট হলেও তাকে স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এর ফলে আতান্তরে পড়ে বেশ কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানি। প্রসঙ্গত বলে রাখা যায়, এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কোম্পানিগুলো ব্যাঙ্কগুলোর দেওয়া মোট ধারের টাকার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিয়ে রেখেছে। এই বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর স্ট্রেসড অ্যাসেটের সমস্যা এতই প্রবল হয়েছে, যে সরকার এ-বিষয়ে সুরাহার লক্ষ্যে একটি মন্ত্রীদল গঠন করেছেন।[4] বিদ্যুৎ কোম্পানির কথা বলার আরেকটা উদ্দেশ্য হল, সরকার চাইছেন রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এই স্ট্রেসড অ্যাসেট ফ্রেমওয়ার্ক থেকে তাদের মুক্তি দিন। দেশ গঠনে তাদের সাংঘাতিক ভূমিকার কথা স্মরণ করে তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হোক। এতেও, এখনও পর্যন্ত রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নারাজ।

ক্ষুদ্রঋণ

এই লেখাটা ঠিক সময়ে পত্রিকাকে না-দেবার একটা সুবিধে পেলাম। পয়লা তারিখের খবর, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নবনিযুক্ত গভর্নর সাহেব এসে একটা নতুন নিয়ম দিয়েছেন। এই নিয়মে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি কোম্পানিগুলো, যারা ব্যাঙ্কের টাকা নিয়ে ফেরত করতে পারেনি, তারা এককালীন ঋণ-পুনর্গঠন সুবিধা পাবে। সকলে নয়, যাদের ঋণ পঁচিশ কোটি টাকার সমান বা কম কেবল তারাই। প্রাক্তন দুই গভর্নর সরকারের এ-জাতীয় একটা দাবি মানেননি। সেই দাবি ছিল ‘ডিউডিলিজেন্স’ না করে ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি সংস্থাগুলোকে ঋণ দিতে হবে। নতুন বাবু এসে কিছুটা হলেও তার থেকে সরে আসতে পারলেন। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নতুন নিয়মগুলোর ফলে ‘মন্দ ঋণ’ যখন কমে আসছে, তখন এ-জাতীয় সিদ্ধান্ত পুনরায় প্যান্ডোরার বাক্স খুলে বসে কী না সেটা দেখার।

শেষের কথা

শাসকদলের দেশের মানুষের প্রকৃত উপকারের চেষ্টা যত বিস্তৃতি পাচ্ছে, ততই দেখা যাচ্ছে হতচ্ছাড়া কামবখত জেনেগেন ভোটবাক্সে লীলা দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি কয় রাজ্যের নির্বাচনে নেতামন্ত্রীদের কপালে ভাঁজ। বিমুদ্রাকরণই বলুন চাই মুদ্রারহিতকরণ, যা হয়েছে তাতে দেশের জাতীয় আয় দুই শতাংশ কমে গেছে বলে বিশেষজ্ঞদের মত। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমিক বা সি.এম.আই.ই-র মতে এর ফলে অন্তত পনেরো লক্ষ চাকরির সুযোগ কমেছে। অক্টোবর ২০১৮-তে বেকারির হার ৬.৯ শতাংশ। জি.এস.টি-র ফলে ছোট ব্যবসার সঙ্গে মার খেয়েছেন মুমূর্ষু কৃষকেরাও— তাঁদের চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। দেশের কৃষকদের প্রকৃত অবস্থা কী, তা ঠান্ডা ঘরের মানুষেরাও স্পষ্টই বুঝতে পারছেন। এমতাবস্থায় লোনের কল খুল দিলে যে পঞ্চান্ন হাজার কোটি টাকা বাজারে আসবে, হাত ঘুরে কিছু ভাগ পকেটে না-এলে বড় বড়ফ্লেক্সই বা তৈরি হবে কী করে, আর ফেক নিউজের কারখানাগুলোই কীভাবে ছাপিয়ে চলবে আজগুবি কিন্তু বিশ্বাস্য খবর? আর সবথেকে বড় কথা হল, বীরকেষ্ট দাঁ-র আঙুলের জড়োয়া-আংটির শোভা না-দেখে লোকে যদি কোথাকার রাজন না প্যাটেলের ডিগ্রি নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় সেটাই বা কাঁহাতক সহ্য করা যাবে? সুতরাং, সময় এসেছে নতুন খবর আনার! সরকারের দূত এখন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের মাথায়। বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে এর আগেই স্থান পেয়েছেন স্বয়ংসেবক শ্রী গুরুমূর্তি। ব্যাঙ্কের ঋণনীতির পরিবর্তন তাই কেবল সময়ের অপেক্ষা।

ব্যাঙ্ক ও সরকারের কাজিয়া যখন তুঙ্গে, ব্যাঙ্কের এক ডেপুটি গভর্নর— ড. ভিরলভি. আচারিয়া— মুম্বাইতে এক বক্তৃতায় নিচের কথাগুলো তুলেছিলেন। কথা না বলে সাবধানবাণী বলা ভালো। সেই সাবধানবাণীতে কেউ কর্ণপাত না-করলে ফল তো আমাদেরই ভুগতে হবে। তাই ভালো করে শুনে নেওয়া যাক কথা ক’টা-–

Governments that do not respect central bank independence will sooner or later incur the wrath of financial markets, ignite economic fire, and come to rue the day they undermined an important regulatory institution; their wiser counterparts who invest in central bank independence will enjoy lower costs of borrowing, the love of international investors, and longer life spans.[5]

অন্যে বাক্য কবে, তুমি রবে নিরুত্তর!

——

[1]https://www.financialexpress.com/economy/conflict-between-rbi-and-government-not-new-heres-what-happened-in-past/1409843/

[2]https://www.bloombergquint.com/business/outgoing-chief-economic-adviser-arvind-subramanian-pitches-to-put-rbis-reserves-to-better-use

[3]https://www.theweek.in/news/biz-tech/2018/12/31/PCA-framework-helped-reduce-contagion-losses-RBI-report.html

4]https://energy.economictimes.indiatimes.com/news/power/govt-sets-up-gom-headed-by-arun-jaitley-on-stressed-power-assets/67074150

5]https://rbidocs.rbi.org.in/rdocs/Speeches/PDFs/ADSML51EEB918B7194BC6AA8B764B05006B15.PDF

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 1320 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...