শরণার্থী নাগরিক

স্টেশন মাস্টার

 

চল মিনি আসাম যাব
দেশে বড় দুখ রে-
চল মিনি আসাম যাব দেশে বড় দুখ রে, আসাম দ্যাশে রে মিনি চা বাগান হরিয়া।

আসাম দ্যাশে রে মিনি চা বাগান হরিয়া..
(প্রচলিত)

 

মিনিকে নিয়ে অসম যাবে যদুরাম। ব্রিটিশ রাজের কৃষক-অবান্ধব নীতি ও দুর্ভিক্ষের সাঁড়াশি চাপে হাঁসফাঁস করা সামান্য মানুষ অবিভক্ত বাংলা, বিহার ওড়িশা থেকে পাড়ি দিচ্ছে অসমে। এদের মধ্যে একটা বিশাল অংশ বাঙালি। অসমে তখন ঢালাও চা বাগান বসাচ্ছে সাহেবরা। সেখানে সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে উপরের নানা পদে লোক নিযুক্ত হবে। বাংলাদেশ যখন দুঃখে ভরা, সেই দুঃখ লাঘবের সুযোগ করে দিচ্ছে ‘আসাম দ্যাশ’।

এভাবেই দেড়-দু শতক আগেকার সামাজিক উথাল-পাথালের ইতিহাস ধরা থাকছে লোকগানে, সাহিত্যে। কথানদী বয়ে গেছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। লিখিত ইতিহাস, আকাদেমিক নথি বিকৃত করার চেষ্টা হয় মাঝে মাঝে, শাসকের চাপে৷ অস্বস্তির, প্রতিবাদের ইতিহাস সুকৌশলে চেপে দেওয়ার প্রবণতা থাকে৷ এর বিপরীতে, অসংগঠিত ব্যক্তি-মানুষের অথবা কৌম্যের সংস্কৃতি লিপিবদ্ধ রেখে দেয় আনন্দ-বেদনার অভিজ্ঞতা, গোপনতম রক্তপাতকে।

অতঃপর ব্রহ্মপুত্রের বুকের ওপর দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতের জন্মক্ষণ থেকে পরবর্তী নানা সময়ে সংঘাত বেঁধেছে অহমিয়া অস্মিতা বনাম বাঙালি জাতিসত্তার৷ নিজেদের জাতিসত্তা বজায় রেখে বাঙালি মিশতে চেয়েছে অসমের সমাজের মূলস্রোতে। কায়েমি স্বার্থের জায়গা থেকে বাধা এসেছে। অসমের ঐতিহাসিক ও ভাষাবিদ সঞ্জীব দেবলস্কর এ প্রসঙ্গে তাঁর প্রবন্ধে লিখছেন–

… স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই, ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর তৎকালীন রাজধানী শিলঙে বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে মাননীয় রাজ্যপাল স্যার আকবর হায়দরির মুখ দিয়েই স্পষ্ট ভাষায়ই এ কথাটি বাঙালিদের শুনিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ওই ভাষণে অসমিয়াদের ‘masters of their own house’ অর্থাৎ ‘প্রভু’ এবং বাঙালিদের ‘strangers in our midst’ (উড়ে এসে জুড়ে বসা) ‘আগন্তুক’ বলে অভিহিত করা হয়েছিল৷ একসঙ্গে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে, নির্যাতন ভোগ করে, কারাবরণ করে, শহিদত্ব বরণ করেও স্বাধীনতাপ্রাপ্তি ঘটতে না ঘটতেই এ কী নির্মম বাক্য লোকপ্রিয় বরদলুই মন্ত্রীসভা অনুমোদিত এ ভাষণে!

এই প্রাতিষ্ঠানিক অসূয়ার সম্প্রসারণ আমরা দেখেছি পরবর্তী নানা সময়ে। নেলি হত্যাকাণ্ড, ৬০-এর দশকে বরাক উপত্যকার বঙ্গাল খেদা ও ভাষাসন্ত্রাস, সাম্প্রতিক অতীতে নয়া বঙ্গাল খেদা– এই সমস্ত ঝড়ের দিকে পিঠ পেতে দাঁড়িয়ে অসমের বাঙালি শেষমেশ যখন একুশ শতকে পৌঁছতে পারল, সে দেখল আরও বড়, দিগন্তছোঁয়া হাহাকার তার জন্য অপেক্ষা করে আছে। ‘জাতীয় নাগরিকপঞ্জি’ বা এনআরসি৷ না, এনআরসি অসমের বাঙালিদের কাছে কোনও নতুন উৎপাত নয়৷ অতীতে বিভিন্ন সরকার নানা সময়ে বাঙালিকে ‘অনাগরিক’ তকমা দিতে আস্তিন থেকে বের করেছে এই সাপ। কিন্তু বর্তমান সরকারের হাতে পৌঁছে এনআরসি যেভাবে মানবনিধনের অস্ত্র হয়ে উঠেছে, তা আগে কখনও হয়নি। সংখ্যাগুরুর ভোটে বলীয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যবাদী এই সরকারের ঘোরতর সমস্যা আছে ‘ভারত’ নামের সংবিধানসম্মত ইনক্লুসিভ ধারণার সঙ্গে। অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাশ্মিরের ৩৭০ ধারা রদ করার পরের মাসেই অসামান্য ক্ষিপ্রতায় সীমান্তে ‘ঘুষপেটিয়া’দের শিক্ষা দিতে কলমের এক আঁচড়ে উনিশ লক্ষ মানুষকে রাষ্ট্রহীন করে দেওয়া হল। ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ‘কল্যাণকর’ গণতন্ত্র পরিত্যাগ করল শুধুমাত্র কিছু কাগজ গুছিয়ে না রাখার জন্য। কী হবে এই উনিশ লক্ষ ‘অনাগরিক’ মানুষের? ফরেনার্স ট্রাইবুনাল হয়তো স্বীকৃতি দেবে এর মধ্যে কিছু মানুষকে। যাঁরা স্বীকৃতি পাবেন না, তাঁদের সমস্ত নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে কি রাখা হবে স্বাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় কারাগারে, গোয়ালপাড়া বা মাটিয়ার ডিটেনশন ক্যাম্পে? ক্রীতদাসের মতো? কারণ অনুপ্রবেশকারী প্রমাণ হলেও তো প্রতিবেশী রাষ্ট্রে তাদের ফিরে যাওয়ার সব পথ বন্ধ। নাকি, হাইলাকান্দি জেলায় জন্মানো কিন্তু কাগজের অভাবে ডি-ভোটার হয়ে পড়া দুই ভাই, দুই গরিব রিক্সাচালক, সন্তোষ ও মনোতোষ শব্দকারের মতো অবস্থা হবে আজকের ডি-ভোটারদের? ১২ই জুলাই, ২০১১-তে সন্তোষ ও মনোতোষকে করিমগঞ্জ বিএসএফ-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল, যারা জোর করে বাংলাদেশের সীমান্ত পার করে দেয় দুই ভাইকে৷ তারপর থেকে আর তাঁদের কোথাও দেখা যায়নি, না এপারে, না ওপারে।

যাই ঘটুক না কেন, সন্দেহ নেই, স্বাধীনতা-উত্তর ভারতবর্ষকে এযাবৎ সবচেয়ে মারক ও দীর্ঘমেয়াদি মানবসঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এনআরসি।

এনআরসি-র প্রেক্ষিতে চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর অবস্থান স্পষ্ট, তা সরাসরি বিরোধিতার৷ বিগত দেড় বছর ধরে আমরা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছি এনআরসি সংক্রান্ত একের পর এক প্রবন্ধ। ৩১শে অগাস্ট নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর শীতল সন্ত্রাস আরও ছড়িয়েছে। অসমে গত এক বছর ধরেই চালু ছিল মৃতের মিছিল। অনাগত ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় আত্মহত্যা করেছেন প্রায় শতাধিক মানুষ, যাদের বেশিরভাগই নিম্নবর্গের হিন্দু ও মুসলমান। তাতে অবশ্য দেশের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কোনও তাপ-উত্তাপ নেই। সন্ত্রাসের আবহ তৈরি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গেও, ক্ষমতায় এলে যেখানে এনআরসি কার্যকর হবেই, নিজের বুকে আঘাত করে এই সদম্ভ ঘোষণা করেছিলেন বিজেপির তৎকালীন দোর্দণ্ডপ্রতাপ সর্বভারতীয় সভাপতি, যিনি বর্তমানে প্রতাপের থাবা আরও প্রসারিত করে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এই ঘোষণায় ভীত, গত কদিনে আমাদের রাজ্যে আত্মহত্যা করেছেন কমবেশি দশজন মানুষ।

ঠিক সেই মুহূর্তে, আমরা, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর সম্পাদকমণ্ডলী সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এনআরসি-র যন্ত্রণাকে গল্প, কবিতা, কথকতায় ধরে রাখার। যে যদুরাম মিনিকে নিয়ে অসমে গেছিল সামান্য সুখের আশায়, সে এখন কেমন আছে? কতটা ভয়ে দিন কাটাচ্ছে খেটেখাওয়া নিম্নবর্গের মানুষের দল? সাহিত্যের নানা ধারায় আমরা শুনতে চেয়েছি রাষ্ট্রহীন মানুষের আর্তস্বর, ছুঁতে চেয়েছি ব্যক্তিগত ও সমষ্টির রক্তক্ষরণকে।

এই স্পেশাল ট্রেন বা বিশেষ ক্রোড়পত্রে লিখেছেন অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, বাংলাদেশ থেকে রুখসানা কাজলদুই বাংলা ও অসম থেকে আখ্যান লিখেছেন গল্পকার মধুময় পাল, অভিষেক ঝা, শুভ্র মৈত্র, তানিয়া লস্কর এবং রোমেল রহমান। এছাড়াও রয়েছে অসমের মিঞা কবিতার একটি সুনির্বাচিত সংকলন৷

প্রিয় পাঠক, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম-এর এই বিশেষ ‘শরণার্থী নাগরিক‘ সংখ্যায় আমরা আপনাকে বিরক্ত ও বিষণ্ণ করতে চাই, একাধারে সচেতন এবং ক্রুদ্ধ করতে চাই। আমরা চাই, বালুরঘাটের মণ্টু সরকার অথবা হিঙ্গলগঞ্জের আমিনা বেওয়ার ঝুলতে থাকা লাশ যেন ছায়া ফেলে আমার-আপনার আপাত-নিরাপদ ভাতের থালায়।

 

সূচি:

কথা

কবিতা

গল্প

প্যারাবল