#আমিও, #আমরাও

স্টেশন মাস্টার

যাঁরা ভেবেছিলেন ওসব বিদেশে হলেও সনাতন সংস্কৃতির এই দেশে ধোপে টিকবে না; যারা ভেবেছিলেন গুটিকয় মহিলা বিলিতি কায়দায় খবরের শিরোনামে আসার জন্য এসব করছেন; যাঁরা ভেবেছিলেন এসব নেহাৎই দু’পাতা ইংরেজি পড়া শহুরে মহিলাদের ধাষ্টামো বই আর কিছু নয়— তাঁদের সকলের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে #মিটু আন্দোলন। শুধু বাড়া ভাতে ছাই দেওয়াই নয়, গত মাসদুয়েকের মধ্যে বুঝিয়েও দিয়েছে যে সামান্য দুটো হেডলাইন পাওয়ার জন্য এই মহিলারা নেমিং-শেমিং করতে আসেননি, এ আন্দোলনের উৎস তার চেয়ে অনেক গভীরে।

যে দেশে ঋতুমতী মহিলাদের ধর্মস্থানে প্রবেশ ও ধর্মাচরণ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ আদালতকে নির্দেশ জারি করতে হয়, এবং সে নির্দেশের বিরোধিতা করতেও মহিলাদের অভাব হয় না, সে-দেশে এমন একটি আন্দোলন আচমকা এতখানি শোরগোল তুলে দিলে তাতে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের দুশ্চিন্তার কারণ ঘটে। এবং সাহস যেহেতু সংক্রামক, অতএব যেনতেন প্রকারে সে আন্দোলনের গতিরোধ করতে সক্রিয় হয়ে ওঠারও কারণ সম্যক বোঝা যায়। তনুশ্রী দত্ত বা প্রিয়া রামানিদের প্রকাশ্য অভিযোগের পরপরই আরও অনেকের একই ধরনের অভিযোগ নিয়ে মুখ খোলা, এবং তার বিরুদ্ধে অনেক মহিলাদেরও পালটা অভিযোগ থেকে ক্রমে প্রকাশ্য হয়ে আসে যে, কর্মক্ষেত্রে বা অন্যত্র মহিলাদের যৌন লাঞ্ছনার বিষয়টি প্রসঙ্গত প্রাধান্য পেলেও মৌলিক ও ব্যাপকতর অর্থে আক্রমণের নিশানা কেবল সেটুকুই নয়— অবশেষে পুরুষতান্ত্রিকতার মূলগত নির্মাণটিই তার ভিত-কাঠামো ইত্যাদি সবকিছু নিয়ে প্রবল একটি ধাক্কার মুখোমুখি হয়ে আপাতত দিশেহারা।

এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখা জরুরি যে, এই আন্দোলনটিকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে যে অবলোকনগুলি তৈরি হয়ে উঠছে, তাকে উল্লিখিত দুটি প্রধান প্রেক্ষিৎ থেকে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, আন্দোলনটি দৃশ্যত কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হেনস্থাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠলেও, এর পিছনে ক্রিয়াশীল বৃহত্তর এক লিঙ্গবৈষম্যের ধারণা যা আসলে, আমরা মানি বা না-ই মানি, মূলত একটি পুরুষনিয়ন্ত্রিত সমাজভাষ্যের প্রত্যক্ষ উপজাত। এবং দ্বিতীয় অবলোকনটি হল, আন্দোলনটিকে অনেকেই বলছেন, ‘সকলের নয়, কারও-কারও’। তাঁদের অনেকেই পরোক্ষে জানাচ্ছেন যে, অভিযোগগুলির অধিকাংশই মনগড়া ও অতিরঞ্জিত, এমনকী মাত্রাতিরিক্ত স্পর্শকাতরতা দোষে দুষ্ট।

একটু তলিয়ে ভাবলে দেখা যাবে যে, কর্মক্ষেত্রে পুরুষতান্ত্রিক প্রাধান্য ও তজ্জনিত একটি অলিখিত আচরণবিধি (বস্তুত, সেটিও একটি লিঙ্গ-নির্মাণ) বরাবর ক্রিয়াশীল ছিল— মহিলারা, যে কোনও পেশাতেই যোগ দিতে আসা মহিলারা, সেটা মেনে নিয়েই কাজ করেছেন। এই মেনে নেওয়াটা, বলা বাহুল্য, স্বেচ্ছাকৃত চয়নের দৃষ্টান্ত ততদূর নয়, যতটা নেহাৎ দায়ে পড়ে মানিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা।

একেবারে শুরু থেকেই আন্দোলনটিকে খুব মনোযোগের সঙ্গে অনুধাবন করার চেষ্টা করে এসেছে চারনম্বর প্ল্যাটফর্ম। আপনাদের স্মরণে থাকবে, গত মাসের শেষ লোকাল ট্রেনে এই বিষয়ে শতাব্দী দাশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশও করেছি আমরা। কিন্তু তারপরেও মনে হচ্ছিল, #মিটু নিয়ে একটি লেখাই হয়তো যথেষ্ট নয়, সময় এসেছে এ-বিষয়ে খুব স্পষ্ট একটি অবস্থান নেওয়ার, এবং সেই অবস্থান থেকে বিষয়টির নানা দিক খতিয়ে দেখার। সেই ভাবনা থেকেই এই বিশেষ সংখ্যার অবতারণা। লিখেছেন তসলিমা নাসরিন, সত্যব্রত ঘোষ, চিরশ্রী দাশগুপ্ত, আত্রেয়ী কর, সৌমিত দেবমৌমিতা সেন। একইসঙ্গে জানিয়ে রাখি, এই বিষয়ে সময়ান্তরে আরও একাধিক লেখা প্রকাশ করব আমরা।

সূচি: