সুবর্ণা রায়ের লেখা

সুবর্ণা রায়

 

The Mummy সিনেমার সেই স্ক্যারাব বিটল্‌গুলোকে মনে আছে তো? পিলপিল করে বেরিয়ে আসছিল। মানুষদের চামড়ার ভিতর দিয়ে ঢুকে ক্রল করছিল আর জ্যান্ত খেয়ে ফেলছিল।

এরকম একটা স্পাইন চিলিং অনুভূতি হল কাল।

বারাসাত চাঁপাডালি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। অটোর লাইনে। বিকেল পাঁচটা মতো হবে। বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল। যানবাহনের অবস্থা তার চেয়েও খারাপ।

এমনিতে জায়গাটা বাস, প্রাইভেট কার, বাইক, অটো, টোটো আর সাইকেল ভ্যানে গিজগিজ করে দিনরাত। কিন্তু কাল গিজগিজ করছিল মানুষ। রাস্তা দেখা যাচ্ছে না– প্রায় এরকম অবস্থা। বিশাল লাইনে দাঁড়িয়ে ভাবছি কী করব, কারণ লাইন নড়ছে না। অটো আসছেই না।

ঠিক এই সময় স্ক্যারাব বিটল্‌দের মতো স্রোতে মানুষ ঢুকতে শুরু করল বাস স্টেশনের দিক দিয়ে। হতচকিত হয়েই ছিলাম। এবার আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। মনে হচ্ছিল পাড়িয়ে থেঁতলে চলে যাবে সব। জ্যান্ত খেয়ে ফেলবে।

কিন্তু মানুষগুলো একবার ধাক্কাও দিল না। হইহই করে, বাস যে দু-একটা ছিল, ভরিয়ে ফেলল, ঝুলে ঝুলে রওনা হল। যে যা পেল তাতে চড়তে শুরু করল। সে টেম্পো হোক, কি ম্যাটাডোর! অপেক্ষাকৃত দুর্বলরা স্বগতোক্তি করল, কেমনে যাব বাড়ি?

১০০% মানুষ সাধারণ। খেটে খাওয়া। আধময়লা জামাকাপড়। হাতে ছোট পোঁটলা অথবা নাইলনের ব্যাগ। গাড়ি দেখলেই লাফিয়ে উঠে পড়ছে। যতদূর যাওয়া যায়।

শুনলাম, ট্রেন বন্ধ।

একটু ধাতস্থ হলাম। থইথই করছে মানুষ। যারা পাঁচ-ছয়-দশ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে, তারা হাঁটা শুরু করল।

এত বিপর্যয়ের মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ করলাম। এই দু-পেয়ে বিটল্‌দের অদম্য জীবনীশক্তি। বেঁচে থাকার লড়াই কি গা-সওয়া এদের! এ যেন আর একটা সাধারণ দিন, শুধু একটু ঝোড়ো বাতাস বইছে। এই যা!

খুব সিরিয়াস মুভিতেও কমিক রিলিফ থাকে। বাড়ি ফিরেই পেলাম সেটা। বাংলা নিউজ চ্যানেল। “থেট” দেওয়া হয়েছে ওনাকে। ভেবেছিলেন ছেড়ে দেবেন পদ। এগারো বছর বয়স থেকে রাজনীতি করছেন, এরকম “অপমান হননি” ইত্যাদি ইত্যাদি।

তারপর চাপান-উতোরের খেলা শুরু। এ যেন পৃথিবীর অন্য প্রান্ত। যার সাথে ওই স্ক্যারাব বিটল্‌দের কোনও সম্পর্ক নেই। কেউ কাউকে চেনে না, দেখেইনি কোনওদিন! কোথায় বিধ্বস্ত নাকাল কাদামাখা জনজীবন, আর কোথায় ঝকঝকে প্রেস কনফারেন্স!

আরও বড় ঝটকা এল রাতে। ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হল। রাত আটটা নাগাদ থেকে আজ রাত আট-সাড়ে আটটা অবধি বন্ধ ছিল। সকালে এয়ারপোর্টের দিকে যেতে যেতে ক্রমাগত চেক করছিলাম দেখার জন্য যে ঠিক কোনখান অবধি এই ব্যান রয়েছে। আড়াই নম্বর গেটের কাছে গিয়ে পেলাম ইন্টারনেট। বেশ একটা কাশ্মীর কাশ্মীর ফিল হল।

কিন্তু আগা না কেটে গোড়ার দিকে একটু নজর দিলে হত না, দাদামণি আর দিদিমণিরা? একটা পোস্ট থেকে আঘাত লেগে যাওয়ার মতো দুর্বল ধর্ম তো এটা নয়! পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে এর পিছনে রাজনীতির হস্তক্ষেপ। সেদিকে দেখলে হয় না? নাকি?

আমি অবশ্য ওসব বিশেষ বুঝিটুঝি না। সাধারণ মানুষ বলল, পরিষ্কার করেই বলল, যে এসব তারা করে না, চায়ও না। কিছুদিন আগে এক ডাক্তারের চেম্বারে দেগঙ্গার এক মুসলিম যুবকের সাথে কথা হয়েছিল। বলেছিল, বাড়ি বাড়ি এসে ধমকে যায়, একঘরে হওয়ার ভয় দেখায়। আমাদের সায় না দিয়ে উপায় নেই।

কারা? বলে দিতে হবে?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*