মহাশ্বেতাদিকে (খোলা চিঠি)

Mahasweta Devi, Woman Writer and Magasaysay Award Winner ( Books, Portrait )

get link অনিল আচার্য

 

 

 

অনিল আচার্য এই সময়ের একজন অগ্রগণ্য প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও কবি। এ কালের অন্যতম প্রধান সাহিত্যপত্র ‘অনুষ্টুপ’-এর সম্পাদক। মহাশ্বেতা দেবীর জীবন ও কাজ সম্বন্ধে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার অধিকারী। ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক দ্বারা ২০১২ সালে টেগোর ন্যাশনাল স্কলার হিসাবে স্বীকৃত। এই লেখা প্রকাশ করবার অনুমতি দেবার জন্য আমরা ‘অনুষ্টুপ ‘-এর কাছে ঋণী।

 

 

 

ভেবেছিলাম আমরাই অনুষ্টুপ থেকে একটি বিশেষ সংখ্যা করব আপনাকে নিয়ে। সূচিও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার জন্য কেউ রাজি হচ্ছে না যে! আশা করি শেষ অবধি একটা কিছু হয়ে যাবেই। তার আগে কোরক-এর বন্ধুরা করেছেন। আমিও আনন্দিত। আপনাকে নিয়ে যত বেশি আলোচনা হবে ততই লাভ হবে বাংলা অন্ত্যজদের। কী সাহিত্যে কী সমাজে।

আপনাকে নিয়ে কাজ করা বা ভাবা সত্যি একটু অস্বস্তিকর। আপনাকে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলাদের কোনও ছাঁচে ফেলা যায় না। আবার লেখক হিসেবে আপনি রূপরাখা, ঝাঁসিবাই, লাইলী আসমানের আয়না থেকে হঠাৎ কী করে হাজার চুরাশির মা, অপারেশন? বসাই টুডু-তে চলে আসতে পারেন ভাবাই মুশকিল। ভাবা মুশকিল, আবার মুশকিল নয়ও। কেননা আপনি কালের পুতুল নন, আপনি কালের কন্যা। সময় আপনাকে জারিত করেছে, সময় আপনার ভেতর দিয়ে কথা বলেছে। তাই আমরা হাজার চুরাশির মা, অপারেশন? বসাই টুডু, চেট্টি মুন্ডা ও তার তীর– এর মতো উপন্যাস পেয়েছি। সত্তর দশকের অগ্নিস্রাবী সময় আপনার মতো অগ্নিকন্যাকে জন্ম দিয়েছিল। তার আগেও যখন ঝাঁসির রানিকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন তখনও আপনার প্রতিবাদী সত্তার সামান্য হলেও স্ফুরণ ঘটেছিল। আপনার উপন্যাস ও গল্পের প্রথম পর্যায়ে যে রোমান্টিকতা তা আপনাকে তৈরি করেছিল আগামীদিনের বাস্তবতাকে চিহ্নিত করতে। কেননা আপনার মননে অতীতের সেই বাস্তবতার কাঙ্খিত রূপ ধরা পড়েনি। পড়বেই বা কেন? সে বাস্তবতার আঘাত তো পৌঁছোবার কথা নয়। সে চরিত্রগুলো তো কল্পনার বা মূলত ইতিহাসের। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভ্যাক এই বিষয় ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন তাঁর A Literary Representation of the Subaltern প্রবন্ধে।

…that history deals with the real events and literature with imagined ones may not be seen as a difference in degree rather than in kind. The difference between cases historical and literary events will always be there as a differential moment in forms of what is called ‘the effect of the real’. What is called history will always be seen more real to us than what is called literature.

তাই হাজার চুরাশির মা-এর পর আপনাকে আর কখনও পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আপনার অরণ্যের অধিকার পুরস্কৃত, বিরসা মুন্ডাকে আপনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন আবেগ ও কল্পনায়। কিন্তু তার মধ্যে একটুখানি হলেও হিস্ট্রির হিস্টিরিয়া আছে। তুলনায় অপারেশন? বসাই টুডু-তে আপনার কল্পনার স্বাধীনতা জন্ম দিয়েছে শুধু ‘বসাই’ নয়, কালীবাবুর মতো এক অসাধারণ চরিত্রকে। এখানেই হল differential moment। আমাদের কাছে বিরসা মুন্ডা ঐতিহাসিক চরিত্র এবং সে লেখায় ইতিহাসের পুনঃনির্মাণ আছে হয়তো। কিন্তু ‘বসাই টুডু’ একেবারে বুকের মধ্যে ঢুকে পড়ে, আর কালী সাঁতরা অজস্র, অগণ্য হয়ে কেবল বসাই টুডুকে identify করতে যায়। বিরসা মুন্ডার ইতিহাস কতটা ‘real’ তা জানা জরুরি। কালী সাঁতরা বা বসাই-এর বাস্তবতা তথাকথিত ইতিহাসের চৌহদ্দির বাইরে, অভিজ্ঞতার পৌনঃপুনিকতায়। হাজার চুরাশির মা এবং ইতিহাসের প্রশ্নটি বিবেচনা করতে গিয়ে গায়ত্রী যখন বলেন :

Mahasweta Devi’s own relationship to historical discourse seems clear. She has always been gripped by the individual in history upto and including Hajar Churasir Ma (1973-74). The prose belonged to the generally sentimental style of the mainstream Bengali novel of the fifties and the sixties. To this reader it seems as if the vision of Hajar Churasir Ma the bringing to crisis of the personal through a political event of immediate magnitude (the “climatic phase of the annihiliation of the urban Naxalities”) pushed Mahasweta from what was perceived as “literary” or “subjective” into an experiment with a form perceived as “historical”.

এখানে মহাশ্বেতার গদ্যশৈলী সম্পর্কে মন্ত্যবটি নেহাত প্রক্ষিপ্ত হলেও, মন্ত্যবটির গুরুত্ব অপরিসীম। সে বিষয়টি নিয়ে পরে কিছু বলার আছে। আপাতত ব্যক্তিগত বা বিষয়ীগত ভাবনা থেকে ঐতিহাসিক ‘রূপ’ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার কথা যে গায়ত্রী বলেছেন, সেখানে ‘pushed’ কথাটির তাৎপর্য আছে। কিন্তু তখনকার বহু লেখক যারা আগে বহু উল্লেখযোগ্য ‘প্রগতিশীল’ লেখালেখি করেছেন তাঁরা কেউ ‘pushed’ হননি। মহাশ্বেতা হয়েছেন, রূপরাখা, লাইলী-আসমানের আয়না, বা ঝাঁসির রানি-র স্টাইল তাঁর তখনও যায়নি। কিন্তু প্রস্তুতি ছিল মনের গহনে, বেড়ে ওঠার মধ্যে, ঘটক পরিবারে এবং চল্লিশ থেকে সত্তরের উচ্চাবচ যাত্রায়। সময় যে কেবল ফেটে পড়েছিল তাই নয়, মহাশ্বেতাও পরম মমতায় ও দারুণ ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন। হাজার চুরাশির মা-র সাথে মহাশ্বেতা একাত্ম। ফলে সেই আবেগে কোনও কৃত্রিমতা ছিল না। প্রতিটি উচ্চারণ ছিল বাস্তব এবং মমতাময়। তাই স্টাইলের বালাই নেই। কেউ কেউ বলেন, ভয়াবহ দুর্বল গদ্য বা প্রায় পদীপিসির পদ্য, কিন্তু সে গদ্য কত টান-টান সংলাপ নির্ভর এবং বর্ণনাহীন বলেই মনে ঘা দেয়। একটু কোথায় অন্যরকম। আর এর পরেই প্রায় একধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়ায় গদ্য গেল বদলে। একদম অন্যরকম। লিপস্টিক, রুজ, পাউডার সব মুছে ফেলে এক সদর্প কমনীয় সুন্দর অথচ স্পর্ধীয়সী গদ্য। আমার অস্বস্তি হয় এই ‘এক্সপেরিমেন্ট’ শব্দটি নিয়ে। হয়ত অন্যদের কাছে ব্যাখ্যা করতে গেলে শব্দটি সুপ্রযুক্ত মনে হয়। কিন্তু আমরা যারা সত্তরের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছি, আমাদের এই শব্দটি ‘কৃত্রিম’ মনে হয়। মহাশ্বেতার অনিবার্য বিস্ফোরণ বলে যে উপন্যাস বারবার পড়তে হয়, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ শব্দটি কেমন যেন মেনে নিতে বাধো বাধো ঠেকে।

এখানে একটু দিগভ্রম হল। অবশ্য আমি সদাই দিগভ্রান্ত। আপনিও তা জানেন। আপনি আমাকে বলেছিলেন কীভাবে ডায়েরি রাখতে হয়, রাখতে হয় হাতের কাছে পোস্টকার্ড। আপনি তো শুধু লেখিকা নন। আপনি ‘আ্যক্টিভিস্ট’ বা বাঘা কর্মীও বটে। শৃঙ্খলা এবং অনুশীলন যে আপনার সাফল্যের দুটি বড় কারণ তা আপনার লেখা পড়ে বুঝিনি, ব্যক্তিগত সংস্পর্শে গিয়ে বুঝতে পারি; সুতরাং বুঝতে অসুবিধা হয় না যে গায়ত্রী কেন ‘bringing-to-crisis of the personal’ এইরকম একটি কথা বলেন। এই মোক্ষম কথাটি যেমন আপনার কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি সেটা সত্যি মনে হয় আপনার লেখকসত্তার ক্ষেত্রেও। প্রশ্ন উঠতে পারে আমি গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের লেখার এত বেশি উদ্ধৃতি দিচ্ছি কেন? দিতে হচ্ছে কারণ গায়ত্রীর বিশ্লেষণে আমি যা ভেবেছি তার অনেক মিল খুঁজে পাচ্ছি। পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রটি বাদ দিলে গায়ত্রীর দেখার মধ্যে যে আন্তরিকতা তা থিয়োরির শক্ত কাঠামো ভেদ করে মহাশ্বেতাকে ভালবেসে কাছ থেকে দেখার মধ্যে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। গায়ত্রীর সঙ্গে এই ক্ষেত্রে সত্যানুসন্ধান প্রয়াসে সঙ্গী হতে আমি রাজি। গায়ত্রী আমার মতো ব্যক্তির এই অপচেষ্টায় অখুশি হতে পারেন। তাতে আমার কিছু যায়-আসে না।

যেমন তিনি তাঁর প্রবন্ধে অগ্নিগর্ভ (১৯৭৮) ও অরণ্যের অধিকার সম্পর্কে বলেছেন যে এই উপন্যাসগুলিতে সাহিত্যিক ও বিষয়ীগত (literary and subjective) স্থান থেকে ঐতিহাসিক রূপের অনুধাবন অথবা দুটি ক্ষেত্রের মধ্যে নড়াচড়া দেখা যায় অগ্নিগর্ভ-এর গল্পগুলোয়। তাঁর মতে তাঁর গদ্য পূর্ণ ঐতিহাসিক উপন্যাসের রূপ দিয়েছে অরণ্যের অধিকার-কে। গায়ত্রী আরও বলেছেন– মহাশ্বেতা গবেষণায় একনিষ্ঠ। তথ্য বিকৃতি না করে মহাশ্বেতা আবেগের সদ্ব্যবহার জানেন। ঠিকই বলেছেন তিনি। মহাশ্বেতার উপন্যাসের পেছনে তাঁর শৃঙ্খলাপূর্ণ অধ্যবসায় এবং সুপরিকল্পিত কাঠামো বর্তমান। তিনি যে জগৎ নিয়ে লিখেছেন তার সবটা তাঁর জানা নয়। কিছুটা জানা, কিছুটা শোনা এবং সেই জানা-শোনার ভিত্তিতে তথ্য-সংগ্রহ করা, আবেগ ও কল্পনা দিয়ে যে অসাধারণ গল্প বা উপন্যাস তৈরি হল তা কেবল সার্থক শিল্পের সেই ‘art lies in concealment of art’ মনে করিয়ে দেয়। (যদিও কথাটা এখন বহুব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেছে)। আর এই উপন্যাসগুলি যোগ করে অন্য এক মাত্রা– যেখানে একজন মধ্যবিত্ত লেখক পাশে দাঁড়ান দরিদ্র-অবহেলিত মানুষের। মহাশ্বেতা সারা জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছেন ‘ঐতিহাসিক সাফল্য সত্ত্বেও ধনতান্ত্রিক সমাজ যুক্তিহীন এবং নীতিহীন।’ সুতরাং মহাশ্বেতার অভ্যুত্থান কেউ যদি মনে করেন কেবল শৃঙ্খলাজনিত অধ্যবসায় ইত্যাদি কারণে হয়েছে তাহলে তিনি ভুল করবেন। সত্তরের উত্তাল সময়ে মহাশ্বেতা সঠিক ঐতিহাসিক অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। সহধর্মিতা বোধ ও অসহায় মানুষকে তাঁর লেখার কেন্দ্রস্থলে টেনে এনেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ধরতে চেয়েছিলেন সেই দেশীয় ধারাটিকে যেখানে ভারতীয় জনগণ নিরন্তর সংগ্রাম করতে চেয়েছে এবং করছে। সাব-অলটার্নদের মধ্যে গায়ত্রী-ই মহাশ্বেতার এই গুরুত্বের জায়গাটা ধরতে চাইছিলেন এবং যেহেতু লেখা পড়েই সবসময় লেখককে বোঝা যায় না, সেজন্যই ব্যক্তিগত জীবনও বুঝতে চেয়েছেন। অর্থাৎ গায়ত্রী নিজেও এক অর্থে মহাশ্বেতাকে চিনে নিতেন, কারণ পাশ্চাত্যে তাকে অন্য এক লড়াই করতে হয় যা বিস্তর ফারাক হলেও মহাশ্বেতার ব্যক্তিগত লড়াইয়ের সঙ্গে খানিকটা মেলে। লম্বা ছিপছিপে প্রবল বুদ্ধিদীপ্ত পরম বিদুষী এই ব্যক্তি না হলে মহাশ্বেতাকে বিশ্বের তাবড় পণ্ডিতমহলে পরিচিতি দেবার জন্য লড়বেন কেন? কেননা সাব-অলটার্ন ইস্কুলের মতে তাদের মোদ্দা জায়গাটা হল ‘Un-historical historiography politics of the people’। তাঁদের মতে ‘elite politics’-এর সঙ্গে সমান্তরালভাবে সারা ঔপনিবেশিক সময় জুড়ে প্রবাহিত হয়েছে ভারতীয় রাজনীতির আর একটি ধারা যার মুখ্য চরিত্র হল ‘sub-altern classes and groups constituting the mass of the labouring population and the intermediate strata in town and country– that is the people’।

এটাকেই তাঁরা বলছেন autonomous domain। এই ক্ষেত্রে কুশীলবদের নিয়ে মহাশ্বেতা প্রায় মহাভারত তুল্য শোরগোল তুলে ফেললেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এবং ভারতের অন্যান্য ভাষায় মহাশ্বেতা যে সম্মানের আসন অর্জন করেছেন তা হয়তো নতুন চিন্তাচেতনার ক্ষেত্র তৈরি করবে এবং সত্তরের মতো আবার যদি পোড়া বাংলায় জাগরণ ঘটে মহাশ্বেতাকে আবার বারবার পড়তে হবে।

পাঠক ঠিকই ধরেছেন, মহাশ্বেতার যে দীপ্তি চোখ ধাঁধিয়েছিল তা হয়ত কিছুটা ম্লান হয়েছে। কিন্তু মহাশ্বেতা নিজের জীবনে মেয়েদের স্বনির্ভরতার জন্য আদিবাসী কল্যাণের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। লেখার চাইতে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আর্তি অনেক বড় হয়ে উঠেছে। কিন্ত তবুও মহাশ্বেতা যা দিয়েছেন, শরীর মন নিংড়ে এখনও যা দিয়ে চলেছেন তার মূল্য আমরা এখনও বুঝি না। কবে বুঝব, জানা নেই।

এই যে লেখাটা আপনার উদ্দেশে লিখলুম, তা না চিঠি, না প্রবন্ধ না অন্য কিছু। আপনি অনায়াসে এ-লেখাটাকে নাও পড়তে পারেন। ধরে নিন, একা-একা নিজের মনে কিছু কথা বলার ছিল। তবে পরে দেখা হলে প্রাপ্য গালাগালটুকু পেলেই খুশি হব।


তথ্যসূত্র:
১,২,৩,৪. In Other Worlds, Essay in Cultural Politics, Gayatri Chakraborty Spivak, Methuen, New York and London, 1987, pp 243-244

৫. মানবসত্তা, জর্জ টমসন, অনুবাদ জয়ন্ত চৌধুরী, পৃ: ৮২

৬,৭. Subaltern Studies I, Ed. Ranajit Guha, O.U.P 1982 p.4

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*