‘সহজ পাঠের গপ্পো’; বাংলা সিনেমার উজ্জ্বল উদ্ধার

শতঞ্জীব গুপ্ত

 

দিয়াগো মারাদোনা তখন আর্জেন্টিনা দলের কোচিং-এর দায়িত্ব নেবেন। তার ঠিক আগেই তাঁর কলকাতা সফর। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে কোচ হিসেবে এই নতুন দায়িত্ব তাঁর কাছে কত বড় ‘চ্যালেঞ্জ’, ইত্যাদি। মারাদোনা উত্তর দেন,– “আরে, এসব তো কোনও চ্যালেঞ্জই নয়। আসল ‘চ্যালেঞ্জ’ তো লড়ছেন আপনার বা আমার মতো দেশের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, দু’বেলা, দু’মুঠো খাবার জোগাড় করার জন্য যাঁদের কালঘাম ছুটে যায়। তার থেকে বড় ‘চ্যালেঞ্জ’ আর নেই দুনিয়ায়।” প্রকৃত মারাদোনা-সুলভ উত্তর পেয়েছিলেন সাংবাদিক।

একটা বাংলা ছবি নিয়ে লিখতে গিয়ে মারাদোনার এই গল্প উল্লেখ করলাম ইচ্ছে করেই। আরে, ড্রয়িং রুম, ককপিট, রেড ওয়াইন, রহস্য, ইয়েতি-– এসব নিয়ে ছবি বানানো তো কোনও ব্যাপারই নয়। আসল চ্যালেঞ্জ তো মানুষের কঠিনতম রূঢ় বাস্তবকে ও তার সামাজিক কার্যকারণকে খুব সহজ ভাষায় ইঙ্গিত করা। হ্যাঁ, ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ ছবিটি খুব সহজভাবেই এই কঠিন কাজটি করে ফেলেছে। চরম দারিদ্রের মধ্যে দিয়ে যাওয়া একটি পরিবার, দুই বালকের স্বপ্ন ও বাস্তব, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ এবং প্রকৃতির সঙ্গে সেই যাপনের নিবিড়তা-– এইসব নিয়েই একটি সহজ গল্প বলতে চেয়েছে ছবিটি।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চার পাতার ছোটগল্প– ‘তালনবমী’। এই গল্প অবলম্বনে সার্থক চিত্রনাট্য লিখেছেন চলচ্চিত্রকার মানস মুকুল পাল। এটি তাঁর পরিচালিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি। বিভূতিভূষণের গল্পে স্বাধীনতা-পূর্ব গ্রামবাংলার একটি দারিদ্রক্লিষ্ট ব্রাহ্মণ পরিবারের দু’টি বালকের কথা ছিল। বড় ছেলেটি তাল কুড়িয়ে এনে বাজারে বেচে মরসুমে। এদিকে তালনবমীর পুজো উপলক্ষে গ্রামের অবস্থাপন্ন একটি বাড়িতে অনেকে নিমন্ত্রণ পায়। ছোট ছেলেটির আশা সেও যাবে ঐ বাড়িতে, ভালোমন্দ খাবে। কিন্তু নিমন্ত্রণ আর আসে না। জন্মাষ্টমী পুজোর পরদিন, প্রায় অভুক্ত গোপালের স্বপ্নভঙ্গ হয়। এই ছিল মূল গল্প। মানস মুকুলের চিত্রনাট্যের মূল গল্পও এটি। শুধু তার মধ্যে অনেক সংযোজন করা হয়েছে। কাহিনীকে আনা হয়েছে সমসাময়িক গ্রামবাংলায়। ছবিতে বড় ছেলের নাম গোপাল, বয়স ১০-১২, আর তার ভাই ছোটু, বয়স ৬-৭। তাদের বাবা পেশায় ছিলেন ভ্যানচালক। গুরুতর অসুস্থতার কারণে অনেকদিন ধরে শয্যাশায়ী। পরিবারটি ক্রমশ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। দু’বেলা দুই ছেলেকে একটু ভাত জোগানোই তখন তাদের মায়ের কাছে কঠিন। এই অবস্থায় তাদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দুই ভাই মিলে গ্রামের বাজারে পুঁইশাক, তাল ইত্যাদি বেচতে শুরু করে। শুরু করে একটু অবস্থাপন্ন, মধ্যবিত্ত বাড়িতে টুকটাক কাজকম্ম। গোপাল বাস্তবকে চিনতে শিখে যায়। সামান্য পাওয়া পয়সা সে ঘুমন্ত মায়ের আঁচলে বেঁধে দেয়। কখনও আবার দু’টো ডিমসেদ্ধ কিনে মায়ের কাছে বকা খেতে হয়। এইসব নানা দৃশ্য নিয়েই ছবি এগিয়ে যায়।

‘তালনবমী’ প্রায় ৭৩ বছর আগে প্রকাশিত একটি গল্প। সেই গল্প যে এখনও প্রাসঙ্গিক হতে পারে এটা যতটা না বিস্ময়ের, তার মতোই বিস্ময়ের সেটা নিয়ে এই সময়ে দাঁড়িয়ে একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক সিনেমা বানিয়ে ফেলা।

এই ছবির মূল শক্তি অনবদ্যভাবে লেখা একটি realistic চিত্রনাট্য ও সংলাপ। অত্যন্ত সহজ, কায়দাবিহীন কিছু দৃশ্য। সংলাপ ও দৃশ্যের ফাঁকে অজান্তে এসে পড়ে অন্য কোনও প্রশ্নের ইঙ্গিত এবং দর্শক সেই ভাবনার পরিসরটুকু পান সহজভাবেই।

ছবির অন্য একটি সম্পদ অবশ্যই অভিনয়। মূল চরিত্রে শিশু অভিনেতাদের দিয়ে কাজ করানোর একটা সুবিধা হল গোটা ছবির মধ্যে একটা নিষ্পাপ innocence ছড়িয়ে পড়ে। দেশ-বিদেশের নানা সিনেমায় আমরা সেই উদাহরণ পেয়েছি। কিন্তু শিশু অভিনেতাদের দিয়ে স্বতস্ফূর্ত ও স্বাভাবিক অভিনয় করানোটাই অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। মানস মুকুল সেই কাজটিই করেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। যতটুকু জেনেছি, যে দেগঙ্গা ও বসিরহাট অঞ্চলের গ্রামের স্কুল থেকে মানস মুকুল আবিষ্কার করেন সামিউল আলম (গোপাল-এর চরিত্রে) ও নূর ইসলামকে (ছোটুর চরিত্রে)। প্রায় ৭-৮ মাস ধরে অভিনয়ের ঘষামাজা চলে। তারপর শ্যুটিং। এই অধ্যাবসায়টা কিন্তু ফুটে উঠেছে প্রায় প্রত্যেকটি দৃশ্যে।  মায়ের চরিত্রে নবাগতা স্নেহা বিশ্বাস যে অভিনয়টা করেছেন তা প্রায় আন্তর্জাতিক মানের। মানস মুকুল প্রমাণ করেছেন যে অভিনয়টা তিনি করিয়ে নিতে জানেন। এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের একটি আনকোরা ছেলের মধ্যে থেকেও সেরা অভিনয়টা বের হয়ে এসেছে। শ্রেষ্ঠ শিশু-অভিনেতার জাতীয় পুরষ্কার পেয়েছে সামিউল আর নূর যুগ্মভাবে।

বসিরহাট–দেগঙ্গা অঞ্চলের dialect কে রাখা হয়েছে সংলাপে। Dialect-এর এই প্রয়োগ এমন স্বাভাবিকভাবে সাম্প্রতিককালের কোনও বড় পর্দার বাংলা ছবিতে এসেছে মনে করতে পারলাম না। এই ছবি সেদিক থেকে অনন্য।

খুব minimal শিল্প-নির্দেশনা ছবির বিষয়কে ফুটিয়ে তোলে। দেখে বোঝাই যায় যে অন্তঃদৃশ্যগুলি ‘real location’–এ শ্যুট করা। কিন্তু তাও তো প্রচুর কাজ থেকে যায় তাকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এই ছবির বাস্তবসম্মত সিনেমাটোগ্রাফি। টালিগঞ্জের তথাকথিত ‘নিউ-এজ’ বাংলা ছবির অহেতুক আলোর ঝলকানি এই ছবিতে নেই। অত্যন্ত নিপুণভাবে, সামান্য কৃত্রিম আলোর ব্যবহারে বা অনেকক্ষেত্রে স্বাভাবিক আলোতেই দৃশ্যগুলি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবির প্রায় পুরোটা জুড়েই বর্ষাকাল। গ্রামাবাংলায় এই সময় যে স্যাঁতস্যাতে আলোটা থাকে সারাদিন ধরে, সেটাই এগিয়ে নিয়ে যায় গল্পকে। একটি স্বপ্নদৃশ্যে গোপাল ও তার মা’কে দেখা যায় ছুটতে। বাবার মৃত্যুদৃশ্য স্বপ্নে দেখে গোপাল। তার মা, পাগলের মতো ছুটছে রেললাইনের দিকে, গোপালও তার পিছনে। এই দৃশ্যে যে মুহূর্তগুলি তৈরি হয় তার অনেকটা কৃতিত্ব shot choreography-র।

নিমন্ত্রণবাড়ির স্বপ্নদৃশ্যে আবার আলোটা বদলে যায়। যেমন বদলে যায় শেষদৃশ্যের montage-এও। উল্লেখ করব grading বা colouring–এর কথাও। এখনকার digital cinematography-তে এই বিভাগের কাজ আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত এই ধরণের ধূসর বাস্তবকে ফুটিয়ে তোলার জন্য যে ধরণের মনন বা aesthetics-এর প্রয়োজন হয়, ছবিতে তার ছাপ রয়েছে।

ছবির সম্পাদনায় কোনও তাড়াহুড়ো নেই। ঝপাং ঝাপাং কাট নেই। বরং দর্শকের শান্ত থাকার ও ভাবনাচিন্তা করার ফুরসতটুকু আছে। শব্দনির্মাণ ও ধ্বনিপ্রয়োগ দৃশ্যগুলির সঙ্গে মানানসই ও আবহসঙ্গীত পরিমিত। বস্তুতঃ ছবির theme music-টির রেশ বহুক্ষণ মাথার মধ্যে থেকে যায়। এই music-টিও গঠনগতভাবে সহজ ও দুই ভাইয়ের জীবনযাপনের প্রতি সঙ্গতিপূর্ণ।

একটি সার্থক সিনেমা হয়ে ওঠার প্রতিটি লক্ষণ ‘সহজ পাঠের গপ্পো’-র মধ্যে রয়েছে। রয়েছে নিজের মতো করে তৈরি হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক ভাষ্য। কিন্তু কোথাও সেটা দাগিয়ে দেওয়া নেই। চাপিয়ে দেওয়া ভাষণ নেই। স্কুল-ড্রপআউট গোপাল আর ছোটু যখন একটু অবস্থাপন্ন বাড়ির কুয়োতলা পরিষ্কার করার জন্য পৌঁছোয় তখন সেই বাড়ির ছেলেকে নিয়ে তার বাবা স্কুলে যাচ্ছেন। বুট, টাই-পরা ছোট শিশুকে (যে একদম ছোটুর বয়সী) আদর করেন তার মা। দুই ভাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অপলক দেখতে থাকে। খাঁটি সিনেমাভাষায় রচনা হয় এই বৈষম্যের ছবি। বাড়তি কোনও ফুটনোট ছাড়াই। এইরকম উদাহরণ অজস্র।

বাংলা ছবির দর্শক প্রায় ভুলতে বসেছিল গ্রামবাংলার পথঘাট। শেষ ১০-১৫ বছরে পশ্চিমবঙ্গে নির্মিত ও বড় পর্দায় মুক্তি পাওয়া এমন কোনও বাংলা ছবি প্রায় মনে করতে পারলাম না (একটি দু’টি ব্যতিক্রম বাদে) যাতে এত বাস্তবানুগভাবে গ্রামবাংলার কোনও রাস্তা, মাঠ, বাগান বা সব্জিবাজার দেখেছি। অনেকে আবার কিছু দৃশ্যের সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’-র কিছু দৃশ্যের তুলনা করছেন। হ্যাঁ, ছবির শেষের দিকের montage-এর কিছু shot-এর সঙ্গে ‘পথের পাঁচালী’-র শাপলা ফুল আর ফড়িং ইত্যাদির close-up-এর মিল টানা যায়। সেটা তাঁরা আরও টানছেন বিভূতিভূষণের গল্প অবলম্বনে বানানো ছবি বলেই হয়তো। শেষের দৃশ্যে কিন্তু ছবির রং উজ্জ্বল। হয়তো বর্ষাশেষের ইঙ্গিত। ধনীগৃহে নিমন্ত্রণ পাওয়ার আকাঙ্খা ইত্যাদি ছাড়িয়ে জীবন তখন যেন নিজের ছন্দে ফেরার ইঙ্গিত দেয়। খুব ধীরে, নরম রোদের মধ্যে, অনুচ্চকিতভাবে ফিরে আসে এই ছন্দ, ছোট ছোট দৃশ্যের মধ্য দিয়ে। অসুস্থ ভ্যান-চালক বাবা হয়তো আবার কাজে যোগ দেন। মা হয়তো কাজ পান নতুন ধান তোলার। ঘরে দু’টো পয়সা আসে। নিয়মিত ভাত রান্না হয়।

ছবির শ্যুটিং হয়েছিল ২০১৫-তে। এর মধ্যে দেশবিদেশের বেশ কিছু film festival-এ ঘোরাঘুরি, জাতীয় পুরস্কার ইত্যাদির সময় বাদ দিলেও ধরে নেওয়া যেতে পারে প্রায় এক-দেড় বছর লেগেছে ছবির নির্মাণে। ছোট বাজেটের ছবিকে অনেকরকম ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াই, অনিশ্চয়তা, পরিমার্জন ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সেসবের কিছু এলোমেলো ছাপ পড়ে যায় ছবির মধ্যে। আবার অনেকসময় সিনেমা নির্মাণে কোনও অনির্দিষ্ট বাঁক এসে পড়ে অজান্তেই। প্রতিবন্ধকতাগুলোর মধ্য দিয়েই হঠাৎই পৌঁছে যাওয়া যায় নতুন কোনও আকারে। আশ্চর্যজনকভাবে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ ছবিটির প্রতিটি ফ্রেমে যেটা ফুটে উঠেছে সেটা হল অনেকগুলো গুণী মানুষের নিষ্ঠা ও সংযোজন। ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ প্রমাণ করল যে ভালো সিনেমা বানাতে বড় হাউস, অভিজ্ঞ স্টার অভিনেতা, বিশাল বাজেট কিম্বা প্রচুর প্রচার-– এসবের কোনওটাই তেমন লাগে না। সিনেমার প্রতি সততা ও একাগ্রতাই হয়তো প্রধান মূলধন।

দেখতে, শুনতে কিম্বা অনুভূতিতে প্রায় একইরকম হয়ে যাওয়া বাংলা সিনেমার ভিড়ে ‘সহজ পাঠের গপ্পো’ একটি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে থাকল সময়ের নিরিখে।

প্রযোজককে ধন্যবাদ এই ছবিটিকে বড় পর্দা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

[ছবি রিলিজ করার পর ৩য় দিনে (১০ই সেপ্টেম্বর) বেহালার ‘অশোকা’ হলে দুপুর ১টার শোয়ে পৌঁছে যাই। ট্রেলার দেখার পর একটা আগ্রহ তো ছিলই। কিছু বন্ধু ছবিটি দেখে উচ্চকিত প্রশংসা করেন। ভেবেছিলাম এক সপ্তাহের বেশি থাকবে না সিনেমাহলে। কিন্তু এই লেখা যখন লিখছি, তখন জানা গেল আগামী সপ্তাহেও বড় পর্দায় ছবিটা দেখা যাবে এবং সন্ধেবেলা, ভালো সময়ে। অর্থাৎ উৎসাহ বাড়ছে। আপনি যদি ভাল বাংলা সিনেমার আগমার্কা দর্শক হন তাহলে বড় পর্দায় ছবিটা দেখে আসুন। দেখার পর অন্তত তিন-চার দিন এবং রাত ছবিটা আপনার সঙ্গে থাকবে-– গ্যারান্টী।  না, বাংলা ছবির পীঠস্থান ‘নন্দন’-এ ছবিটা দেখার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষ এই ছবিকে ঐ প্রেক্ষাগৃহে দেখানোর উপযুক্ত মনে করেননি! ]

 

About Char Number Platform 844 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*