মানুষে-মানুষে সংযুক্তির উৎসব

রুমা মোদক

পূজার আনুষ্ঠানিকতা আনন্দের উৎস। সাজ-সজ্জা, মন্ত্র-উপাচার, বিলাস-ব্যসন সেই আনন্দের উৎস নয়। আনন্দের উৎস নয় বাহুল্য খরচের, প্রতিমার চাকচিক্য। পূজার আনন্দ মূলত সম্মিলনের আনন্দ। মানুষে মানুষে উৎসব উপলক্ষ্য করে সংযুক্ত হওয়ার আনন্দ। এই আনন্দে কোনও অলৌকিক লাভের হাতছানি নেই। নেই পুণ্যলাভের লোভ।

মানুষে মানুষে সংযুক্ত হবার আনন্দ যুক্ত না হলে পূজা কেবলই পর্যবসিত হয় কিছু আনুষ্ঠানিক আচারে। সংযুক্ততাহীন আচরণসর্বস্ব আনুষ্ঠানিকতা সার্বিক অর্থে সভ্য মানুষের ইতিহাসে ইতিবাচক কোনও ভূমিকা রাখে না।

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা অর্জন আর ভারত বিভাগ পরস্পর বিপরীতমুখী দুই ঘটনা এই এলাকাবাসীর। অর্জনের আনন্দ যেখানে বিলীন হয়েছে বিসর্জনে। পরাধীনতার শৃঙখল ছেঁড়ার মাহেন্দ্রক্ষণ যেখানে সিক্ত হয়ে উঠেছে ইতিহাসের করুণতম অশ্রুবিসর্জনে। মুক্ত আকাশে মুক্ত পতাকা বোধ করি লজ্জা লুকিয়েছে উর্দ্ধপাণে তাকিয়ে, দেশান্তরিদের দীর্ঘ কাফেলা দেখার লজ্জা। বাংলা কাশ্মীর পাঞ্জাব ভাগের দগদগে ঘা নিয়ে এই উপমহাদেশ খণ্ড খণ্ড হয়ে টিকে আছে বিশ্বের মানচিত্রে। বড় লজ্জার কথা এ বিভেদ হয়েছে ধর্মের নামে। নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ধর্ম হয়েছে জাতিসত্তার পরিচয়।

মানবজাতির ইতিহাস যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস। এককে পরাজিত করে অপরের জয়ের ইতিহাস। এক ধ্বংসযজ্ঞ ছাপিয়ে অন্যটি। জনপদে জনপদে গণহত্যা, সভ্যতার পতন পর্যন্ত। তবু সব ছাপিয়ে অনিবার্য দেশান্তর এক জীবনে মৃত্যুর যন্ত্রণা। এই বাংলায় বিষাদময় মৃত্যুযন্ত্রণা ছাপিয়ে তবু আত্মশক্তির জোর আর প্রত্যয়ে কিংবা কিংকর্তব্য কিছু সংখ্যালঘু হিন্দু রয়ে গেছে সাতপুরুষের ভিটা আঁকড়ে। আঁকড়ে তাঁর স্মৃতি শিকড় আর প্রকৃতি মিলিয়ে এক পূর্ণ জীবন পরিক্রমা। র্যাডক্লিফের ছুরি আর নেহেরু-জিন্নাহর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা তবু টিকে রয়েছে স্ব-অস্তিত্বে।

বাংলাদেশ, এও তো এক অনিবার্য ইতিহাস।ধর্মভিত্তিক দেশভাগের ক্ষতের উপর রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে ছিনিয়ে এনেছে অসাম্প্রদায়িক দেশ- বাংলাদেশ। চারটি রাষ্ট্রীয় স্তম্ভের একটি ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতিতে দেশটি যাত্রার শুরুতেই ঘোষণা করেছে ভবিষ্যৎ গতিপথ। কিন্তু ৫ টি বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এই আদর্শের চাকা ঘুরেছে উল্টোদিকে। একটি বিশেষ ধর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিনে দিনে ধর্মান্ধতাকে পরিপুষ্ট করেছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিপতিত করেছে সঙ্কটের অনিশ্চিত গভীরে। প্রতিবছর বেড়েছে দেশত্যাগের হার। ৭১-এ ৩০% হিন্দু নেমে এসেছে ৮%-এ। নিজের শিকড় বিচ্ছিন্ন হয়ে উদ্বাস্তু হবার মতো অনিরাপত্তা এদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের প্রতিরোধে একাত্ম হওয়ার বদলে দেশান্তরি করেছে। এ বড়ই করুণ ইতিহাস বাংলাদেশের হিন্দুদের।
এতো গেলো একদিকের সামান্য কথা। অন্যদিকে বৈশ্বিক ও এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা বিশ্বজুড়ে, যার উত্তপ্ত লু হাওয়া পুড়িয়ে যায় এই জনপদকেও। আইসিস, বোকো হারাম নানা বিচিত্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর উন্মত্ত নৃত্য এই জনপদেও। কখনও এদের দেশীয় নাম ‘হরকাতুল জিহাদ’, কখনও ‘ জে এম বি’। নানা ছোটখাটো হানা হামলায় নিজেদের অস্তিত্ব ঘোষণা করলেও, গত ২০১৬ সনে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে নারকীয় হামলার পর পুরো পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জুজুর ভয় সত্যি হয়ে আঘাত করে পুরো জাতির বিশ্বাসে। ঈদের দিন নস্যাৎ করা হয়েছে ঈদ জামাতে হামলার প্রস্তুতি। তারপর একের পর এক পরিচালিত হচ্ছে জঙ্গি দমন অভিযান।

আমাদের শৈশব কৈশোর যে স্বাধীন দেশের আলো হাওয়ায় আমাদের চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে এই দেশের দৃশ্যপট। এক আকাশ পার্থক্য রচিত হয়েছে আমাদের বর্ধিত হবার কালে আর একালে। মূলত সামাজিক ভাবে, শিক্ষা- সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কখনওই নিজেকে এতোটা একা বিচ্ছিন্ন বোধ হয়নি, যা এখন হয়। আমাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে যে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই প্রতিদিন, আমাদের বেড়ে উঠার কালে তা হইনি।

প্রতিদিন প্রতি মূহূর্তে আমরা একা হয়ে যাই জন্মগত হিন্দু পরিচয়ের কারণে। পোশাকে এখন ধর্মীয় পরিচয় সুষ্পষ্ট। ফেসবুকে যখন কোনও বন্ধু আপনি হিন্দু বলে আনফ্রেন্ড করে দেয়, তখন টের পাই কত গভীরে ক্ষত সৃষ্টি করেছে এই সাম্প্রদায়িকতা। টের পাই কী দুরারোগ্য রোগ গ্রাস করেছে সাধারণের জীবন, যখন হাসপাতালের রোগিনী, হিন্দুর রক্ত জেনে টান মেরে খুলে ফেলে রক্তের সিরিঞ্জ। যখন সমাজে পারিবারিকভাবে এই সাম্প্রদায়িকতা পৃষ্ঠপোষকতা পায়, সেই সমাজে জঙ্গি উৎপাদন খুবই সহজ সমীকরণ।

সাম্প্রদায়িক এই অচেনা স্বদেশ আমি বিশ্বাস করি আন্তর্জাতিক ভয়াবহ উদ্বিগ্নতার অংশ বই নয়। বিশ্বাস করি আমার এই প্রিয় স্বদেশ এতোটা অচেনা হতে পারে না যেখানে নিজেকে সংখ্যালঘু হিন্দু ভাবাই চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়াতে পারে!

সারা বিশ্বের মতো এই বাংলাদেশেও মহাধুমধামে শুরু হয়েছে বাঙালির প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা। আয়োজন আড়ম্বরে কোনও ত্রুটি নেই। আলোকসজ্জা মণ্ডপসজ্জা সবকিছুতেই চাকচিক্যময় বর্ণাঢ্যতা। পূজা ঘিরে নেয়া হয়েছে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কাল মহাসপ্তমীতে নামবে মানুষের ঢ্ল। স্থানীয় রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠিত হবে কুমারীপূজা। বন্যা, রোহিঙ্গা সমস্যা সব ছাপিয়ে সপ্তাহ জুড়ে মধ্যরাত অবধি জমজমাট ছিল পুজোর বাজার। দশমীতে রাজপথ জুড়ে বিশাল শোভাযাত্রার বহরে বন্ধ হয়ে যাবে শহরে মানুষের স্বাভাবিক চলাচল। শোভাযাত্রায় হাজার হাজার মানুষের ঢল- কেবল হিন্দু নয়, মিশে থাকবে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও।

যদিও পূজা সামনে রেখে কয়েক জায়গায় নিয়মমতোই ঘটেছে মূর্তিভাঙ্গার ঘটনা,তবে এই বিচ্ছিন্ন ঘটনা প্রভাব ফেলেনি সারা দেশের পূজার আয়োজনে।

গতবছরও মোটামুটি নিরাপদ পরিবেশে পূজারিদের ভিড় ছিলো মণ্ডপে মণ্ডপে সকল ভয় ভীতি জঙ্গি হামলার ভয় উপেক্ষা করে। আশা করা যাচ্ছে এবছরেও তার অন্যথা হবে না।

অতর্কিত আতঙ্কের ভয়ে ভারাক্রান্ত না হোক আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য। ঈদে বন্ধুর বাড়িতে যেমন আমার সেমাই-এর ভাগ থাকে অমলিন, ঠিক তেমনি অমলিন থাকুক তার নাড়ুর ভাগখানিও। পুজো ঘিরে জয় হোক মানবিকতার। নতুন করে উদ্বোধন ঘটুক আসাম্প্রদায়িক চেতনার। একান্ত নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় নিজের কাছে রেখে মানুষ মিলুক মানুষের সাথে উৎসবের আনন্দ আয়োজনে।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*