ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — দ্বিতীয় পর্ব

চার্লস বুকাওস্কি

বাংলায়ন : শুভঙ্কর দাশ

(প্রথম পর্বের পর)

 

৮/২৯/৯১

রাত ১০-৫৫

আজ রেসের মাঠে সবকিছু বড় ধীরে চলছে, আমার হতভাগ্য জীবন ঝুলছে একটা হুকে। আমি তো রোজই ওখানে যাই। কখনও কাউকে দেখিনি প্রতিদিন একমাত্র কর্মচারীদের ছাড়া। আমার হয়ত কোনও ব্যাধি আছে। সারোয়ান এই রেসের মাঠেই পোঁদ মারিয়েছে, ফান্টে পোকারে, দস্তয়েভস্কি গাড়ি চালানোর পেছনে। আর এটা টাকা পয়সার ব্যাপার না যতক্ষণ না আপনি সব শেষ করে ফেলছেন। একসময়ে আমার এক জুয়াড়ি বন্ধু বলেছিল, ‘আমি কেয়ার করি না আমি হারছি না জিতছি, আমি শুধু জুয়া খেলতে চাই।’ টাকা পয়সার উপর আমার অনেক বেশি শ্রদ্ধা আছে। আমার জীবনের বেশিটাই কেটেছে সামান্য টাকায়। আমি জানি পার্কের বেঞ্চ কাকে বলে, আর বাড়িওয়ালার কড়া নাড়া। টাকা পয়সার খারাপ দিক মাত্র দুটো-– খুব বেশি আর খুব কম।

আমার মনে হয় সবসময়ই কিছু না কিছু থাকে নিজেদের যন্ত্রণা দেওয়ার জন্য। রেসের মাঠে আপনি টের পাবেন অন্যদের অনুভূতি, সেই মরিয়া অন্ধকার, কি সহজেই তারা তা ছুঁড়ে দেয় ওখানে আর হাল ছেড়ে দেয় তারপর। রেসের মাঠের জনতা পৃথিবীর মহত্বের বেলুনটাকে ফাঁসিয়ে দেয়, ওখানে জীবন ঘষটাচ্ছে মৃত্যুর সাথে আর হেরে যাচ্ছে ক্রমাগত। শেষ অবধি জেতে না কেউই, আমরা শুধু খুঁজে চলেছি একটা সাময়িক রেহাই, চোখ-ধাঁধানো ঝলমলে আলোর বাইরের একটা মুহূর্ত। (ধুর বাল, সিগারেটের জ্বলা দিকটা গিয়ে লাগল একটা আঙুলে যখন আমি এই উদ্দেশ্যহীনতার কথা ভাবছি। ওটা জাগিয়ে দিল আমায়, ফিরিয়ে আনল ওই সার্ত্রে অবস্থা থেকে।) নিকুচি করেছে, আমাদের চাই কৌতুকরসবোধ, হাসতে পারাটা দরকার আমাদের। আমি আরও বেশি হাসতে পারতাম, আমি আরও অনেক কিছু করতে পারতাম অনেক বেশি, শুধু লেখালিখি ছাড়া। আর এখন, আমি শুধু লিখছি আর লিখছি আর লিখছি, যত বয়স বাড়ছে তত বেশি লিখছি আমি, মৃত্যুর সাথে নেচে চলেছি। দারুণ ব্যাপার। আর আমার মনে হয় এইসব লেখা ঠিকঠাকই আছে। একদিন ওরা বলবে ‘বুকাওস্কি মারা গেছে’, আর তখন আমাকে ঠিকঠাক খুঁজে নেওয়া হবে আর ঝুলিয়ে দেওয়া হবে নোংরা উজ্জ্বল কোনও আলোকস্তম্ভ থেকে। তাতে কী এসে যায়? অমরত্ব জীবিতের একটা বোকা বোকা আবিষ্কার। জানেন রেসের মাঠ কী করে? সার দিয়ে দাঁড়ানো ঘোড়াদের দৌড় শুরু করায়। বিদ্যুতের চমক আর ভাগ্য। শেষ নীল পাখিটা গান গাইছে। আমি যা কিছুই বলি না কেন তা শুনতে ভালো লাগে কারণ যখন আমি লিখি তখন তো আমি জুয়া খেলছি। অনেকেই বড় সাবধানী। তারা পড়ে, তারা পড়ায় আর তারা ব্যর্থ হয়। চালু রীতিগত প্রয়োগ তাদের আগুন টেনে ছিঁড়ে উলঙ্গ করে দেয়।

আমার এখন ভালো লাগছে বেশ, এই দোতলায় বসে ম্যাকিন্টসের সঙ্গে, আমার প্রিয় বন্ধু।

আর মাহলের বাজাচ্ছে রেডিওতে, ও এত অবলীলায় ভেসে চলে, বড় বড় ঝুঁকি নিতে নিতে, ওটা নেওয়া দরকার মাঝে মধ্যে। তারপর আসে ওর লম্বা লম্বা শক্তিশালী সুরের চড়াই। ধন্যবাদ হে মাহলের। আমি তোমার থেকে ধার নিই যা আমি কখনওই শোধ দিতে পারব না তোমায়।

আমি বড় বেশি ধূমপান করি, আমি বড় বেশি মদ খাই কিন্তু আমি বড় বেশি লিখতে পারি না, ওটা জাস্ট আসে আর আমি ডাকি ওদের আবারও আসতে বলি আর ওরা এসে মিশে যায় মাহলেরের সাথে। মাঝে মাঝে নিজেকে থামতে বাধ্য করি। বলি আমি, দাঁড়াও একটু, এখন ঘুমোতে যাও অথবা তোমার ৯টা বেড়ালের দিকে দেখো অথবা বউয়ের সাথে বসো গিয়ে কোচে। হয় তুমি রেসের মাঠে নয়তো রয়েছ ম্যাকিন্টসের সাথে। আর তারপর আমি থামি, ব্রেক কসি, মালটাকে দাঁড় করাই। কেউ কেউ লিখেছেন আমার লেখালিখি তাঁদের বাঁচতে সাহায্য করেছে। ওগুলো আমাকেও সাহায্য করেছে। এই লেখালিখি, ওই ঘোড়াগুলো, আর ৯টা বেড়াল।

এখানে একটা ছোট বারান্দা আছে, দরজাটা খোলা আর আমি দেখতে পাচ্ছি হার্বার ফ্রিওয়ে সাউথের গাড়ির আলোগুলো, ওরা কখনও থামে না, ওই আলোদের ক্রমাগত চলে যাওয়া, সমানে। ওইসব লোকেরা কী করছে? কী ভাবছে? আমরা সবাই তো মারা যাব, সব্বাই, কী সার্কাস। এটা ভাবলেই তো একে অপরকে ভালোবাসা যায় কিন্তু তবু তা ঘটে না। নিতান্ত তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আমরা আতঙ্কিত বিষণ্ণ, আমদের গিলে খাচ্ছে সব অকিঞ্চিৎকর বিষয় সমূহ।

চালিয়ে যাও মাহলের। তুমি এই রাতটাকে অলৌকিক করেছ। থেমো না মাদের চোদ, থেমো না।

৯-১১-৯১

রাত ১-২০

পায়ের নোখগুলো কেটে ফেলা উচিৎ। কয়েক সপ্তাহ ধরে পায়ে লাগছে। আমি জানি ওটা পায়ের নোখগুলোর জন্য কিন্তু কাটবার সময় পাচ্ছিলাম না। প্রতিটা মিনিটের জন্য লড়ে যাচ্ছি, কোনও কিছুর জন্যই আর সময় নেই আমার। অবশ্য যদি রেসের মাঠ থেকে দূরে থাকতে পারতাম অনেকটা সময় হাতে পেতাম। কিন্তু আমার জীবনটাই তো সামান্য একটা ঘণ্টা হাতে পাওয়ার জন্য যুদ্ধ যখন আমি যা চাই তা করতে পারি। ঠিক কিছু না কিছু একটা চলে আসবেই, আমার কাছে আমি যে গিয়ে দাঁড়া্‌ব, তার মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়াতে।

আজ রাতে পায়ের নোখগুলো কেটে ফেলার একটা প্রচণ্ড চেষ্টা করতে হবে। হ্যাঁ আমি জানি কেউ কেউ মারা যাচ্ছেন ক্যান্সারে, কেউ কেউ রাস্তায় শুয়ে আছেন পিচবোর্ড বাক্সের উপর আর আমি বড়বড়াচ্ছি আমার পায়ের নোখ কাটার ব্যাপারে। তবুও আমি বাস্তবতার অনেক বেশি কাছে ওইসব কুঁড়ে শামুকগুলোর থেকে যারা বছরে ১৬২টা বেসবল খেলা দেখে। আমি আমার নরকে ছিলাম, আমি এখনও আমার নরকেই আছি, নিজেকে উৎকর্ষের পরাকাষ্ঠা ভাবি না আমি। এই যে বেঁচে আছি আর আমার বয়স ৭১ বছর আর বড়বড়াচ্ছি আমার পায়ের নোখ নিয়ে এটাই আমার কাছে মিরাকেল হিশেবে যথেষ্ট।

আমি পড়ছিলাম দার্শনিকদের কাজ। ওরা সত্যিই অদ্ভুত, মজারু খেপা লোকজন সব, জুয়াড়ি এক একটা। দেকার্তে এসে বলল এরা সবাই বাজে বকছে। সে বলল অঙ্কই হচ্ছে চরম স্বতঃসিদ্ধ সত্যির মডেল। সৃষ্টি ও জীবন যন্ত্রবৎ। তারপর এল হিউম। বৈজ্ঞানিক আকস্মিক জ্ঞানের বৈধতা নিয়ে আক্রমণ শানাল। আর তারপর কিয়ের্কেগার্ড ‘আমি অস্তিত্বে আংলি করি ওর গন্ধটা কিছুনার মতো। আমি কোথায়?’ তারপর সার্ত্রে দাবী করল অস্তিত্বটাই অযৌক্তিক। আমার এদের বেশ ভালো লাগে। ওরা দুনিয়াটা কাঁপায়। ওভাবে ভাবতে ওদের কী মাথা ধরত না? দাঁতের ফাঁকে একগাদা কালো অন্ধকার ভিড় করে গর্জন করত না? যখন আপনি এ ধরনের লোক দেখেন আর তাদের জড়ো করেন ওইসব মানুষদের বিরুদ্ধে যাদের আমি রাস্তায় হাঁটতে দেখি অথবা খেতে দেখি কোনও ক্যাফেতে অথবা দেখি টিভির স্ক্রিনে মুখ দেখাতে, সেই তফাৎটা এতটাই বেশি যে আমার ভেতর কিছু একটা মোচড় দিয়ে ওঠে, লাথ মারে আমার নাড়িভুঁড়িতে।

মনে হয় আজ রাতে আর পায়ের নোখ কাটা হবে না। আমি পাগলে যাইনি কিন্তু মাথাটাও ঠিক নেই আমার। না, হয়ত আমি পাগল। যাইহোক, আজ যখন দিনের আলো আসবে আর দুপুর ২টো বাজবে ডেল মারের শেষ দিনের রেসের প্রথম রেসটা শুরু হবে। আমি তো রোজই খেলতাম, প্রতিটা রেস। আমার মনে হয় আমার এবার ঘুমনো উচিৎ, আমার ব্লেডের মতো ধারাল নখগুলো ফালা করে দিচ্ছে ভালো বিছানার চাদরগুলো। শুভ রাত্রি।

(তৃতীয় পর্ব আগামী সংখ্যায়)

1 Trackback / Pingback

  1. ক্যাপ্টেন দুপুরে ভাত খেতে গেছে আর নাবিকেরা দখল নিয়েছে জাহাজের — তৃতীয় পর্ব – ৪ নম্বর প্ল্যাটফ

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*