মদনমোহনের কীর্তিকলাপ

অতনু কুমার

 

বিষ্ণুপুর ঘুরতে গেছি দুদিনের জন্যে যেকোন ট্যুরিস্ট স্পটেই যা হয় মন্দিরগুলোর সামনে গাইডবুক, ছবির অ্যালবাম, আরও নানারকম চটি বই বিক্রি হচ্ছিল মদনমোহন মন্দিরের সামনে বয়সের ভারে ন্যুব্জ এক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালাকে দেখে শ্রীরূপা দয়াপরবশ হয়ে ১০ টাকা দিয়ে একটা হলুদ রঙের চটি বই কিনে ফেলল বৃদ্ধ ওকে বললেন, “মা, রোজ সকালে এই বইটা পাঠ করবে, মঙ্গল হবে” মঙ্গল কে না চায়! তাই ঘরে এসেই বইটা খুলে বসে গেলাম মলাটের ওপর লেখা, “বিষ্ণুপুরের মদনমোহনের আদি মাহাত্ম্য” পাঁচালির ঢঙে মদনমোহনের কেরামতির বিবরণ দেওয়া আছে পদকর্তার নাম, রচনাকাল কিছুই নেই যে মুদ্রকের নাম দেওয়া রয়েছে তাঁরাও কিছু বলতে পারলেন না পরে শুনলাম এধরণের অজস্র ছড়া গান বিষ্ণুপুরে প্রচলিত সেসব কথা পরে হবে, আগে গপ্পোটা বলা যাক

গল্প শুরু হচ্ছে বিষ্ণুপুর গ্রামের “দেবদ্বিজে ভক্তিমতী সতী শিরোমণি” এক ক্ষত্রিয়কন্যার কথা দিয়ে সে যখন দশমাসের গর্ভবতী তখন যুদ্ধে তার স্বামীর মৃত্যু হয় ঘরে আর ভালো লাগছিল না তাই পাশের বাড়ির এক মহিলা পুরীতে জগন্নাথ দর্শনে যাচ্ছে শুনে তার সঙ্গে ভিড়ে পড়ল পথে এক জঙ্গলের মধ্যে তার প্রসব বেদনা উপস্থিত হল এবং সেখানেই এক পুত্রসন্তানের জন্ম দিল সদ্যোজাত শিশুকে জঙ্গলে ফেলে রেখেই সেই ক্ষত্রিয় কন্যা চম্পট দিল অন্তর্যামী নারায়ণ সব দেখে “মদনমোহন” রূপে মর্ত্যে নেমে এসে মৌমাছি সেজে গাছের ডালে রাতারাতি মৌচাক বানিয়ে ফেললেন সেই মৌচাক থেকে ফোঁটা ফোঁটা মধু শিশুটির মুখে পড়ল পরদিন সকালে এক বাগদির মেয়ে কাঠ কুড়োতে এসে সেই শিশুকে দেখতে পেয়ে তাকে কোলে করে এক ব্রাহ্মণের বাড়ি নিয়ে গেল

ব্রাহ্মণের বাড়িতে সেই শিশু সযত্নে বড় হতে থাকে সাত মাস বয়সে মাঘী পূর্ণিমার দিনে তার অন্নপ্রাশন হয় গণকের পরামর্শে তার নাম রাখা হয় গোপাল সিংহ আরেকটু বড় হলে সে ব্রাহ্মণের গরুগুলোকে মাঠে চড়াতে নিয়ে যেতে শুরু করে এভাবে ভালোই চলছিল কিন্তু একদিন গরু চড়াতে গিয়ে আর ফেরে না তার বয়স তখন দশ বছর অরণ্যে হিংস্র জন্তু জানোয়ারের বাস উদ্বিগ্ন ব্রাহ্মণ খুঁজতে গিয়ে দেখলেন গাছের তলায় সেই বালক নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে তার মুখে সূর্যের আলো এসে পড়ছে আর তাকে ছায়া দিতে ছাতা হয়ে ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে দুটো সাপ

বৃক্ষতলে শুয়ে শিশু নিদ্রা যায় সুখে,

সূর্যের কিরণ লাগে বালকের মুখে।।

নাগ ও নাগিনী দুটি সর্প তার কাছে

ছায়া হেতু ছত্রাকারে ফণা ধরি আছে।।

ব্রাহ্মণকে দেখে সাপদুটো পালাল বালককে কোলে নিয়ে বাড়ি ফিরে ব্রাহ্মণীকে বলল, “এ ছেলে যে সে নয় একে আর তুমি পাতের এঁটোকাঁটা খেতে দিওনা” পালিতপুত্রের মাহাত্ম্য সম্পর্কে ব্রাহ্মণ নিশ্চিত হলেন আরেকটা ঘটনায় ঝিলে মাছ ধরতে গিয়ে সেই বালকের জালে উঠল গোটাকয়েক আস্ত সোনার ইঁট মাছের আশায় সে আরেকবার জাল ফেলল এবারো মাছ নয়, উঠল তুলসী চন্দন তৃতীয়বার জাল জাল ফেলে পেল শঙ্খ, প্রদীপ, ঘন্টা ইত্যাদি পুজোর জিনিসপত্র আর চতুর্থবার জালে উঠল স্বয়ং মদনমোহনের বিগ্রহ মদনমোহনের আদেশে বালক তাঁকে ব্রাহ্মণের গৃহে স্থাপন করল ব্রাহ্মণ বালকের কপালে রাজলক্ষণ দেখতে পেলেন তাকে দিয়ে শপথ করিয়ে নিলেন সে যদি কোনদিন রাজা হয় তবে যেন তাঁকে পূজারি ব্রাহ্মণের পদে নিযুক্ত করে

ক্রমে মদনমোহনের আশীর্বাদে বিষ্ণুপুরের সিংহাসনে বসল গোপাল সিংহ সে আগের জন্মে ছিল মল্লবীর ভীম এইভাবে বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজবংশ স্থাপিত হল একদিন বিষ্ণুপুর রাজ্য আক্রমণ করল বাহান্ন হাজার বর্গীর দল রাজার করুণ অবস্থা দেখে মদনমোহন বুঝলেন তাঁকেই মাঠে নামতে হবে

একদা আসিল বর্গী বাহান্ন হাজার

লুটিতে রাজার গড় করি মার মার।।

নৃপ কহে গোলন্দাজ শুনহ বচন

সহায় আমার শুধু মদনমোহন।।

অন্তর্যামী নারায়ণ জানিয়া অন্তরে

তাড়াইতে বর্গী তিনি গেলেন সত্বরে

লালবাঁধে দল-মাদল দুটি কামান ছিল

তার মধ্যে আশী মণ বারুদ ভরিল।।

দুইটি কামান প্রভু লইল দুই বগলে

দুই হাতে দু কামানে দিল পলতে জ্বেলে।।

এক তোপে বহু বর্গী হইল নিধন

কামানের শব্দে মূর্ছা গেল বহুজন।।

মদনমোহন মন্দিরের দেওয়ালে চিত্রকলা। কামান দেগে বর্গী তাড়াচ্ছেন মদনমোহন

কামান দেগে বর্গী তাড়িয়ে রণক্লান্ত দেবতা ঘরে ফেরার পথে এক গোয়ালার কাছে দই চাইলেন মদনমোহনকে চিনতে না পেরে গোয়ালা বল, “ওহে সিপাই, দই যে খাবে, তার পয়সা আছে তো তোমার কাছে?” মদনমোহন বললেন, “দেখো ভায়া আমি রাজার ছেলে পয়সার জন্যে চিন্তা কোরো না” এই বলে সাড়ে ষোলমণ দই সাবাড় করে মদনমোহন উধাও হয়ে গেলেন এদিকে রাজা তখন রাস্তায় রাস্তায় মদনমোহনকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন গোয়ালা তাঁকে পেয়ে রাজপুত্রের দই খেয়ে যাওয়ার কথা নিবেদন করল “রাজা বলে গোয়ালা তোর সার্থক জীবন, ছেলে নয় বই খেয়েছেন মদনমোহন” গোয়ালা দেখল তার দইয়ের হাঁড়ি সোনা হয়ে গেছে

গোয়ালা বলে ভুলাও কি হে মদনমোহন

মরণকালে দিও প্রভু অভয়চরণ।।

মদনমোহন মন্দির

এই গোয়ালা পূর্বজন্মে ছিল কেশব ভারতী (শ্রীচৈতন্যের গুরু) বিষ্ণুপুরে তার নাম ছিল গোপাম মুরতি পরের জন্মে সে উদয় হল কলকাতার বাগবাজারে, গোকুল মিত্র নামে এক ব্যবসায়ীরূপে ওদিকে বিষ্ণুপুরে রাজবংশে প্রবল অর্থসংকট উপস্থিত হল

বিষ্ণুপুরের গ্রামখানি ছিল চাকুন্দার বন

সন্ধ্যা দিতে তৈল পুড়ত সাড়ে সাত মণ।।

মদনমোহনের আদেশে রাজা গোকুল মিত্রের থেকে তিন লক্ষ টাকা ধার করলেন বন্ধক রইল মদনমোহনের সেই বিগ্রহ বিষ্ণুপুরের বদলে এবার বাগবাজারে পূজিত হতে শুরু করলেন মদনমোহন গোকুল মিত্রর চাকরের নাম ছিল মদন একদিন ঘুম ভেঙে বাবু মদনকে ডাকছেন তার মনের কথা টের পেয়ে স্বয়ং মদনমোহন মদনের বেশে তামাক সেজে নিয়ে এল তামাকে টান দিয়ে তো বাবু অবাক!

তামাক খেয়ে গোকুল মিত্র চারিদিকে চায়

বিষ্ণুপুরের তামাক মদনা পেলি রে কোথায়।।

“মদন” ততক্ষণে মন্দিরে গা ঢাকা দিয়েছে পরের দিন পুজো করতে গিয়ে বামুন ঠাকুর দেখলেন বিগ্রহের হাতে তামাক আর টীকার দাগ, কাপড় দিয়ে মুছলেও উঠছে না ব্যাপার দেখে মিত্তিরমশাই কেসটা বুঝতে পারলেন এবং আদেশ জারি করলেন, তার বংশে যে তামাক সেবন করবে, সে স্ত্রীহত্যা ও ব্রহ্মহত্যার পাপে লিপ্ত হবে এদিকে মদনমোহন পড়েছেন লক্ষীপ্রিয়ার প্রেমে লক্ষীপ্রিয়া হল গোকুল মিত্রের কন্যা এক রাতে মদনমোহন হানা দিলেন লক্ষীপ্রিয়ার শয্যাকক্ষে তার অঙ্গ স্পর্শ করতেই পতিব্রতা কন্যা জেগে উঠে বলে, “কে হে তুমি আমার সতীত্ব নষ্ট করছ??” ঠাকুর বললেন, “আমি কে পরে জানবে, আপাতত আমার চূড়া বাঁশিটা রাখো” এই বলে নিজের চূড়া বাঁশি রেখে মদনমোহন নিজের ঘরে চলে এলেন পরদিন চূড়া বাঁশি চুরি গেছে দেখে গোকুল মিত্র পূজারি ব্রাহ্মণদের ওপর হম্বিতম্বি শুরু করল এমন সময় মদনমোহন দৈববাণী করে জানালেন, চূড়া বাঁশি তার কন্যার কাছেই আছে এই লক্ষীপ্রিয়া আসলে একজন শাপভ্রষ্ট অপ্সরা চূড়া বাঁশি ফেরৎ দিয়ে সে শাপমুক্ত হল এবং মদনমোহনের বাঁদিকে জায়গা পেল

মদনমোহন ও লক্ষীপ্রিয়ার মূর্তি

বাগবাজারে বসে ঠাকুর খাচ্ছ চিনির পানা

বিষ্ণুপুরে যেতে তোমায় কে করেছে মানা।।

ঠাকুর তো গোকুল মিত্তিরের ঘরে দিব্যি রয়েছেন, ওদিকে বিষ্ণুপুরে হাহাকার পড়ে গেছে মন্দিরের পাথর খসে যাচ্ছে রাজা থেকে প্রজা সবাই কাঁদছে এমনকি দোলযাত্রা, রাস উৎসবও বন্ধ হয়ে গেছে

হাতিশালে হাতি কাঁদে ঘোড়া না খায় পানি

বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদে গোপাল সিংহের রাণী।।

রাণী নিজের গলা থেকে গজমোতি হার খুলে দিয়ে বললেন, “হার বেচে শোধ রাজা গোকুলের ধার” কিন্তু রাজা টাকা নিয়ে গোকুল মিত্রের কাছে গেলে সে একটা জাল দলিল দেখিয়ে বলল, বিগ্রহ বিক্রি হয়ে গেছে রাজা আর কি করেন! কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন এমন সময় স্বয়ং মদনমোহন তাঁকে দেখা দিয়ে বললেন, “ওহে রাজা, ফিরে যাচ্ছ কেন? তুমি আলিপুরের কাছারিতে গিয়ে আপিল করো তোমার হয়ে আমি পাগড়ি পরে সওয়াল করব” শুনে রাজা চটপট আলিপুরে গিয়ে দরখাস্ত দিলেন

দলমাদল কামান

উকীলের বেশে প্রভু মদনমোহন

কাছারিতে গিয়ে তিনি দেন দরশন।।

দেখি জজ ম্যাজিস্ট্রেট মানিল বিস্ময়

কোথায় নিবাস তব কিবা নাম হয়।।

মদন উকীল নাম বাড়ী বিষ্ণুপুরে

বেতন দিয়া মহারাজ রেখেছেন পুরে।।

মদন উকিলের কেরামতিতে রাজা মামলা জিতে গেলেন কিন্তু গোকুল মিত্র অত সহজে হার মানার পাত্র নন তিনি কুমোরটুলি থেকে একটা নকল মূর্তি গড়িয়ে রাজার হাতে তুলে দিলেন রাজা মহা খুশি হয়ে যখন ফিরছেন তখন আবার দেখা দিলেন মদনমোহন তাঁর কাছে ব্যাপার শুনে তো রাজা হাঁ! কোন বিগ্রহ আসল আর কোনটা নকল তা চেনার উপায়ও বাতলে দিলেন সেই মদনমোহন

বামাঙ্গ যখন মোর ভিজিবে ঘামেতে

হেরিবে মক্ষিকা শ্বেত নাকেতে বসিতে।।

আসল ঠাকুর সেই লবে কোলে তুলে

রাখিও মনের কথা নাহি যেও ভুলে।।

রাজা মহাখাপ্পা হয়ে বাগবাজার ফিরে চললেন ডাকাডাকিতে গোকুল বাইরে বেরিয়ে এলেন রাজা বললেন, “তুমি তো মহা ছোটলোক হে! আমাকে একটা নকল ঠাকুর গছিয়ে দিলে?!!” গোকুল তখন আরেকটা ঠাকুর এনে বসিয়ে দেয় দুটো হুবহু একরকম কিন্তু দেখা গেল একটার বাম অঙ্গগুলো ঘামছে আর নাকে একটা সাদা মাছি এসে বসেছে ব্যাস রাজা ওমনি সেটাকে কোলে তুলে নিলেন এবার গোকুলের কাঁদার পালা ঠাকুর তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, বৎসরান্তে অন্নকূট উৎসবের সময় বারো দণ্ড সময় তিনি গোকুলের কাছে থাকবেন রাজা মদনমোহনকে সঙ্গে করে বিষ্ণুপুর নিয়ে গেলেন রাণী সোনার থালায় করে ঠাকুরকে ক্ষীর, সর, মাখন খাওয়ালেন রাস, দোল উৎসব আবার চালু হল “বিষ্ণুপুর পুনঃ হয় হর্ষে হর্ষময়”

পাঁচালি শেষ হল সকলকে মদনমোহনের আদি কথা পাঠ করার পরামর্শ দিয়ে

ভক্তিতে ডাকিলে নর মদনমোহনে

অন্তকালে পায় স্থান প্রভুর চরণে।।

যে গৃহেতে হইবে এ আদি কথা

রোগ শোক দুঃখ দৈন্য নাহি যায় তথা।।

বড় পাথর দরজা। দলমাদল কামান আগে এখানেই থাকত এবং মিথ অনুযায়ী এখানেই মদনমোহন বর্গীদের ওপর কামান দেগেছিলেন

বইয়ের কোথাও পদকর্তার নাম, রচনাকাল কিচ্ছু দেওয়া নেই প্রকাশকও কিছু বলতে পারলেন না সুকুমার সেন “বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস” গ্রন্থে লিখেছেন, “অষ্টাদশ-উনবিংশ শতাব্দীতে স্থানীয় দেবদেবী, ব্যক্তি বা ঘটনা বিশেষ ও দৈবদুর্বিপাক লইয়া বিস্তর ছড়া গান রচিত হইয়াছিল পূর্বেও এইরূপ ছড়া রচিত হইত, কিন্তু সেগুলি আমাদের হস্তগত হইবার পূর্বেই লুপ্ত হইয়া গিয়াছে … একাধিক কবি রচিত মদনমোহন বন্দনা পাওয়া গিয়াছে ইহার বর্ণনীয় বিষয় হইতেছে মদনমোহন কর্তৃক দলমাদল কামান দাগিয়া বিষ্ণুপুর হইতে বর্গী বিতাড়ন এবং চৈতন্য সিংহ কর্তৃক কলিকাতায় গোকুল মিত্রের নিকট মদনমোহন বিগ্রহ বন্ধক রাখা।”

ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে এই ধরণের আরেকটা ছড়া গান পেলামঃ “সাধু গোকুল মিত্রের জীবনী” গল্প প্রায় এক, কোথাও কোথাও বিবরণ বিস্তৃততর, কোথাও সংক্ষিপ্ত, কোথাও আবার হুবহু এক পদ রয়েছে যেমন “মদনমোহন মাহাত্ম্য”-এ গোকুল মিত্রের কন্যা লক্ষীপ্রিয়ার শাপমুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু “গোকুল মিত্রের জীবনী”তে শাপের ব্যাপারটা বিশদে বলা হয়েছে লক্ষীপ্রিয়া আসলে স্বর্গের অপ্সরা চন্দ্রাবলী বৃন্দাবনের রাস উৎসব দেখে রাধার নামে কটুক্তি করেছিল বলে তাকে নীচঘরে জন্ম নিতে হয়েছিল  আবার কোনও কোনও ঘটনা একেবারে অন্যরকম যেমন মদনমোহন বিগ্রহ নিয়ে মামলার কথা দুই পাঁচালিতেই আছে মদনমোহনের রাজার পক্ষে ওকালতির কথাও আছে কিন্তু মামলার ফল দুই জায়গায় দুরকম “মদনমোহন মাহাত্ম্য”-এ বলা হচ্ছে, “রাজার ঠাকুর বলি ডিগ্রি হয়ে গেল/ গোকুল আকুল হয়ে কাঁদিতে লাগিল” আর “গোকুল মিত্রের জীবনী” বলছে “বিচার মতে রাজার ঠাকুর গোকুল ডঙ্কা মেরে নিল” এখানে নকল ঠাকুর গড়ার ব্যাপারটাও নেই স্বাভাবিকভাবেই কোথাও আবার একই পদ সামান্য অদলবদল করে ভিন্ন জায়গায় বসানো হয়েছে, যার ফলে অর্থ গেছে এক্কেবারে উলটে “গোকুল মিত্রের জীবনী”তে বাগবাজারে মদনমোহনকে বন্ধক রেখে বিষ্ণুপুরে ফিরে যাওয়ার আগে রাজা বলছেন,

বাগবাজারে বসে ঠাকুর খাও চিনির পানা

আজ অবধি বিষ্ণুপুরে যেতে তোমায় করে গেলাম মানা

“মদনমোহন মাহাত্ম্য”তে প্রায় একই ধরণের পদ রয়েছে খানিকটা পরে, যখন বিষ্ণুপুরবাসী মদনমোহনের শোকে বিলাপ করছেনঃ

বাগবাজারে বসে ঠাকুর খাচ্ছ চিনির পানা

বিষ্ণুপুরে যেতে তোমায় কে করেছে মানা।।

বুঝতে অসুবিধে হয় না “মদনমোহন মাহাত্ম্য” লিখেছেন হয়ত রাজার সভাকবি বা রাজভক্ত পদকর্তা আর “গোকুল মিত্রের জীবনী”র রচয়িতা মিত্র পরিবারের বেতনভুক গীতিকার তাই একই ঘটনা উভয়ে ব্যাখ্যা করেছেন ভিন্নভাবে, কখনও আবার ঘটনাটাকেই বদলে দিয়েছেন আজকের সংবাদমাধ্যমের যে বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার তাগিদে “খবর তৈরী” করে, গোকুল মিত্র ও রাজার অন্নভুক পদকর্তারা কি তাদেরই পূর্বসূরি? মনে পড়ছে নন্দীগ্রাম নিয়ে রাজ্য রাজনীতি যখন উত্তাল, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক মহল আড়াআড়িভাবে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল তদনীন্তন রাজ্যপাল বলেছিলেন, “ট্রুথ ইজ ডিভাইডেড ইন নন্দীগ্রাম

বিষ্ণুপুরের মদনমোহনের আদি মাহাত্ম্য

এই ধরণের পদ ও পাঁচালিতে রাজভক্তি ও অলৌকিকতা প্রকট হলেও এসবের মধ্যে যে ইতিহাসের অনেক কিছুই লুকিয়ে থাকে তা বলাই বাহুল্য বিষ্ণুপুরে আমাদের গাইড বলছিলেন বিষ্ণুপুরের রাজারা ক্ষত্রিয় ছিলেন, রাজস্থান থেকে এসেছিলেন বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারে বিষ্ণুপুরের রাজপরিবারের সংরক্ষিত নথি অবলম্বনে যে “ইতিহাস” লেখা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে ৬৯৫ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ভারতের এক রাজপুত্র সস্ত্রীক পুরীতে তীর্থ করতে যাওয়ার সময় বিষ্ণুপুরের কাছাকাছি লাউগ্রামে তাঁর স্ত্রী পুত্রসন্তান প্রসব করেন এবং সেই রাজপুত্র মা ও ছেলেকে স্থানীয় এক ব্রাহ্মণ ও এক কায়স্থর তত্ত্বাবধানে রেখে যান এই পুত্রই কালক্রমে আদিমল্ল নাম নিয়ে মল্লরাজবংশের প্রতিষ্ঠা করেন উইলিয়াম হান্টারের “অ্যানালস অফ রুরাল বেঙ্গল” বইয়ে আবার বৃন্দাবনের কাছের জয়নগর রাজ্যের রাজার দেশভ্রমণে বেরিয়ে বিষ্ণুপুরের নিকটস্থ অরণ্যে রাণীর পুত্রসন্তান প্রসব, সদ্যোজাতকে জঙ্গলে ফেলে রেখে প্রস্থান, স্থানীয় এক কাঠকুড়ুনি বাগদির শিশুকে আবিষ্কার এবং কালক্রমে নানা অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে তার রাজপদে অভিষেকের কাহিনী আছে আদিমল্লের জন্মকাহিনীর এই দুই বৃত্তান্তের সঙ্গে আলোচ্য “মদনমোহন মাহাত্ম্য” বা “গোকুল মিত্রের জীবনী”তে গোপাল সিংহের বাল্যলীলার বেশ কিছু মিল ও অমিল আছে সবকটা আখ্যানের একটা কমন বক্তব্য হল বিষ্ণুপুরের রাজারা স্থানীয় বা উত্তর ভারতীয় কোনও ক্ষত্রিয় বংশজাত বিনয় ঘোষ তাঁর “পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি” গ্রন্থে লিখেছেন, “মল্লরাজারা যখন সভাপণ্ডিতকে দিয়ে বংশবৃত্তান্ত রচনা করিয়েছেন তখন ভিতর থেকে জেলে আদিবাসীদের সঙ্গে আদিমল্লের সম্পর্কের সমস্ত কাহিনী ছেঁটে ফেলে ব্রাহ্মণ-কায়স্থদের কথা যোগ করেছেন এবং তাঁরা যে উত্তর ভারতের রাজপুত বংশজাত তাও ভালোভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন বাংলার এইসমস্ত ‘রাজবংশচরিত’ ও ‘কুলপঞ্জিকা’র একটা উপসর্গ মনোবিজ্ঞানীদের সহজেই নজরে পড়বে– সেটার নামকরণ করা যায় ‘ক্ষত্রিয় কমপ্লেক্স’ এবং ‘রাজপুত কমপ্লেক্স’ হিন্দুসমাজের বর্ণবৈষম্যের এটা একটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া” বাঁকুড়া ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ারেও বলা হয়েছে, “The fact that the Rajas of Bishnupur called themselves Mallas (an aboriginal title) for many centuries before they assumed the Kshattriya title of Singh, the fact that down to the present day they are known as Bagdi Rajas all over the Bengal, as well as numerous local facts and circumstances – all go to prove that the Rajas of Bishnupur are Khatriyas, because of their long independence and their past histories, but not by decent.”

মল্লরাজারা ক্ষত্রিয় না বাগদি সে তর্ক মুলতুবি রেখেও একটা ব্যাপার বলা যায় যে বিষ্ণুপুরের রাজারা অন্তত সপ্তদশ শতকের আগে পর্যন্ত যথেষ্ট বীরত্বের পরিচয় দিয়ে নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রেখেছিলেন “মদনমোহন মাহাত্ম্য”-এর রচয়িতা গোপাল সিংহের ভক্ত তাই সপ্তম শতকে মল্লরাজ বংশের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতকে বর্গী আক্রমণ ও গোকুল মিত্রের কাছে বিগ্রহ বন্ধক রাখা এই পুরো কীর্তিটাই তিনি চাপিয়ে দিয়েছেন গোপাল সিংহের ওপর বাস্তবে গোপাল সিংহের রাজত্বকাল ছিল ১৭৩০ থেকে ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দ এবং তাঁর সময়েই বিষ্ণুপুর রাজবংশের পতনের সূচনা মল্লরাজারা আগে শাক্ত ছিলেন, সপ্তদশ শতকে রাজা বীরহাম্বিরকে বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত করেন শ্রীনিবাস আচার্য তারপরই বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত টেরাকোটার মন্দিরগুলো নির্মাণের কাজ শুরু হয় কিন্তু গোপাল সিংহের সময় বৈষ্ণব আচার উৎকট আকার নিয়েছিল রাজার আদেশে বাধ্যতামূলক হয় মালা জপ করা ও সূর্যাস্তের আগে হরিনাম ভজন করা অন্যদিকে বর্ধমানের রাজা একের পর এক এলাকা ছিনিয়ে নিতে থাকে ভাস্কর রাওয়ের বর্গীবাহিনী দুর্গের প্রতিরোধ ভেদ করতে না পারলেও ফসল ধবংস করে অর্থনীতিকে তছনছ করে দিয়ে যায়

অন্যদিকে ভারতবর্ষের ভাগ্যাকাশে ততদিনে উদিত হয়েছে নানাবিধ ঔপনিবেশিক শক্তি বৃটিশদের বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ডে রূপান্তরিত হওয়ার প্রক্রিয়া চলছে যে মুর্শিদাবাদের নবাবদের থেকে “সিংহ” উপাধি পেয়েছিলেন বীরহাম্বিরের পৌত্র রঘুনাথ সিংহ, সেই নবাবরা কয়েকবছর পরেই পলাশীর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বৃটিশের বেতনভুকে পরিণত হবেন দেশীয় সামন্তশ্রেণী বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে সঙ্গে এঁটে উঠতে না পেরে ক্রমে তাদের অধীনস্থ জমিদারে পরিণত হল আর অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদের ছত্রছায়ায় উত্থান ঘটল এক শ্রেণীর নব্য জমিদার ও ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর বিষ্ণুপুরের পরাক্রমশালী রাজা অর্থের প্রয়োজনে কুলদেবতাকে বন্ধক রাখতে যাচ্ছেন কলকাতার ব্যবসায়ীর কাছে– এ হয়ত সামন্ততন্ত্রের হাত থেকে বণিকতন্ত্রের হাতে ক্ষমতার হাতবদলেরই এক উদাহরণ তবে মনে রাখতে হবে এই দুই শ্রেণীরই টিকি তখন বাঁধা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের কাছে তাই কুলদেবতার অধিকার নিয়ে লড়াইয়ের নিস্পত্তি হয় ব্রিটিশ আদালতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল স্বয়ং মদনমোহনের উকিল রূপে আদালতে সওয়াল ভাগ্যের কী পরিহাস! যে ভগবান বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নিয়ন্তা, মানুষের জাগতিক পাপ-পুণ্যের বিচারক, সেই ভগবান কে কি না পাগড়ি পরে দাঁড়াতে হল ম্লেচ্ছ জজ ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে!

এতে ভগবানের মহিমা কতটা ক্ষুণ্ণ হল জানি না তবে বাঙালির কাছে ভগবান এই রূপেই ধরা দিয়েছে বার বার অন্তর্যামী নারায়ণ তাই কামান দেগে বর্গী তাড়ান, গোয়ালার থেকে দই হাতিয়ে ক্ষুধা মেটান, কামতাড়নায় বণিক কন্যার শয্যায় হানা দেন, কাছারি আদালতে ওকালতিই বা করবেন না কেন? বিষ্ণুপুরে যাঁরা ঘুরতে যাবেন তাঁরা একটা করে “মদনমোহন মাহাত্ম্য” না নিয়ে ফিরবেন না মন দিয়ে মদন মোহনের মাহাত্ম্য পড়লে আধুনিক বর্গীদের হামলা ঠেকাতে সুবিধে হবে

 

তথ্যসূত্রঃ

(১) বিষ্ণুপুরের মদনমোহনের আদি মাহাত্ম্য, প্রকাশকঃ বীণাপাণি পুস্তক মন্দির

(২) সাধু গোকুল মিত্রের জীবনী, প্রকাশকঃ অজানা

(৩) মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর A Guide Book, প্রকাশকঃ বিশ্বজিৎ ব্যানার্জি

(৪) পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি (প্রথম খণ্ড), বিনয় ঘোষ, প্রকাশকঃ প্রকাশ ভবন

(৫) Bankura District Gezetier, Chapter II

(৬) বিষ্ণুপুর ট্যুরিষ্ট গাইড শ্রী মিঠু ভুঁই-এর সঙ্গে কথপোকথন

 

ছবি: অতনু কুমার ও শ্রীরূপা ঘোষ কুমার

 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*