উত্তম দত্ত

চারটি কবিতা

 

বৃক্ষপুরাণ

এতকাল এই বৃক্ষে কোনও সন্তান আসেনি।
কাল রাতে কোনও এক বন্ধ্যা রমণী 
জনান্তিকে ছুঁয়ে গেছে তাকে।
তারপর ভোরবেলা আদিবাসী পুরুষেরা এসে 
অযুত বিস্ময়ে ঘিরে রাখে গাছটিকে।

এত ফুল, এত রাশি রাশি ফলের উদ্ভাস
বাপের জন্মেও তারা দেখেনি কখনও।
গুণিনের পানপাত্রে জমে ওঠে আরও মদ, আরও ফেনা…
আধিভৌতিক মন্ত্রের ধোঁয়ায় ভরে ওঠে সমস্ত মহল্লা।

পুত্রবতীরা এসে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে গেল গাছের শিকড়ে।
গর্ভবতীরা আঁচলে প্রসাদ বেঁধে ফিরে গেল ঘরে।
গোখরোর গন্ধে ভরা গাছের কোটরে কারা যেন রেখে গেছে
দ্বাদশ অক্ষরে লেখা মন্ত্রপূত ঘট, 
সাদা হাঁসের রক্ত আর পোড়া মাটির লাল ঘোড়া।

ক্রমে রাত বাড়ে। 
চোরের মুখের মতো অন্ধকার ঘন হয়ে আসে গাছের মজ্জায়।
অলৌকিক ধোঁয়ার গন্ধে জেগে থাকে সদ্য পুত্রবতী গাছ।
শতকোটি নক্ষত্রের আকাঙ্ক্ষার আলো নিয়ে সেই মুখ, 
সেই পয়স্বিনী মরুজ্যোৎস্না আবার কখন এসে চুম্বন করে যাবে তাকে?

 

 

মন্দারের স্বপ্ন

স্বর্গের দিকে যেতে যেতে আমরা ক’জন 
নরকের দরজার কাছে থমকে গিয়েছিলাম 
নরকেরও নিজস্ব একটা সম্মোহন আছে।

আমাদের ভালোবেসে আরও কিছু বন্ধু ও স্বজন 
এখানেই বানিয়েছে ঘরবাড়ি রেখেছে প্রণাম 
আহ্লাদি শামিয়ানা টাঙিয়েছে বসন্তের গাছে।

স্বর্গের দিকে যেতে যেতে আমরা ক’জন 
তোমাকে প্রথম দেখি নরকের জাদুঘরে 
তোমার করতল ছুঁয়ে একদিন আমাদেরও 
স্বর্গকে অলীক বলে মনে হয়েছিল।

আমাদের পদরেখা চিনে আরও কিছু বন্ধু ও স্বজন 
ভিক্ষাপাত্র তুলে নিয়েছিল পাতার কুটিরে 
আগুন ও রক্তের ভিতরে মরে যেতে যেতে 
মৃতেরাও একদিন মন্দারের স্বপ্ন দেখেছিল।

 

 

সুধীবৃন্দ

নীরবতা বজায় রাখুন
সম্ভব হলে হাতের পাতায় ঢেকে রাখুন অবিশ্বাসী চোখ।
আমরা শান্তিপূর্ণ মৃত্যু ও প্রজনন-প্রক্রিয়াকে
একটা বিধি-সম্মত রূপ দিতে চাই।
ছিদ্রান্বেষীরা যে যাই বলুক, আমরা নরহত্যা কিংবা
ধর্ষণে বিশ্বাস করি না।
অমানুষদের কথা বলতে পারছি না
কিন্তু মানুষ আমাদের পাশেই আছেন।

কলম বন্ধ রাখুন
কলমের অনুশাসন এখন অচল
অহেতুক কালি ছিটিয়ে শব্দের অপচয় করবেন না।
সম্ভব হলে সারাদিন পূজা-পর্যায়ের গান শুনুন
অথবা মিষ্টি করে সৃষ্টি করুন ভালোবাসার শ্লোক।
কিংবা মানুষ ঘুমিয়ে পড়লে নীল-ছবিতে লাল-কমল হয়ে
ডুবে থাকুন সারারাত।

আমরা শিক্ষা-ব্যবস্থাটাকে ঢেলে সাজাতে চাই
দেবশিশুদের হাতে তুলে দিতে চাই অহিংস পিস্তল ও সানগ্লাস ।
আর শিক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়া দ্রোণাচার্যদের
একটু শান্তিপূর্ণ বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে চাই ।
ছিদ্রান্বেষীরা যে যাই বলুক, আমরা আচার্য-হত্যা কিংবা
ভালোবাসাহীন ক্ষমতা দখলে বিশ্বাস করি না।
আমরা চাই এই বিধিসম্মত শিলাবৃষ্টির দেশে
আইন আইনের পথে ঘুমিয়ে পড়ুক।

মিছিলে যাবেন না
মিছিল বড় সংক্রামক।
মানবাধিকার কমিশনেও যাবেন না
ওখানে কোনও মোহিনী যুবতী নেই।
বরং নিঃসঙ্গ লাগলে ফোন করুন এই নম্বরে : ৯৯৩৩৪৪১৬…….
কিংবা চলে আসুন আমাদের শীততাপ-নিয়ন্ত্রিত বসন্ত কেবিনে।

আমরা এই স্বপ্নভূমিকে মুক্তাঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে চাই
যেখানে বাঘ থাকবে বাঘের মতো
আর ইঁদুর ইঁদুরের মতো।
ছিদ্রান্বেষীরা যে যাই বলুক, আমাদের কোনও পোষা হায়না নেই।
আমাদের পরিকল্পনা আছে: আগামী বছর
মাইলের পর মাইল রোপণ করা হবে ২০১৮টি সাদা গোলাপের চারা।
আর প্রত্যেকটি অশান্ত ইঁদুরের রহস্যময় মৃত্যুর পর 
আকাশে ওড়ানো হবে একশ আটটি সাদা পায়রা।

মনে রাখবেন: এই নশ্বর বঙ্গদেশে আমিই অবিনশ্বর
সমস্ত বেদের মধ্যে আমিই সামবেদ
এই পশুখামারের দেশে আমিই চেতনা
বালখিল্য পুরোহিতদের দেশে আমিই বৃহস্পতি
সমস্ত শব্দের মধ্যে আমিই ওংকার
এই টিলা-পাহাড়ের দেশে আমিই একমাত্র হিমাদ্রি-শিখর
তৃণভোজী জরাজীর্ণ গাভীদের গ্রামে আমিই রূপসী কামধেনু
এই নির্বিষ নাগিনীকন্যার পাতালপুরীতে আমিই উলূপী।

অতএব সুধীবৃন্দ
এই গাঙ্গেয় আকাশে আর কোনও গাংচিল নেই
এ অরণ্যে নেই অন্য কোনও ধর্মের বিড়াল
আমিই গাংচিল, মার্জারও আমি, আমাকেই খুঁজে দ্যাখো, খোঁজো
সর্ব্বধর্ম্মান্ পরিত্যাজ্য মামেকং শরণঙ্ ব্রজ।

 

 

মরিয়ম

ভোরবেলা মানুষের কপালের ভাঁজ দেখলেই বোঝা যায় কে প্রেমিক কে অনুপ্রবেশকারী। ছেঁড়া শার্ট, ধূসর চামড়ার জুতো আর মরা সাহেবের টুপি দেখলেই বোঝা যায় কার কাছে পাসপোর্ট আছে, আর কে দাঁত দিয়ে সীমান্তের তার কেটে ঢুকে পড়েছে তোমার প্রাসাদে।

বিছানার নীচে এত দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বেঁচে আছো কী করে মরিয়ম? শুধু এক মৃত মানুষের পদশব্দ শোনার জন্য, সমস্ত রাত জনহীন প্রাসাদের নীল আলোর মধ্যে হেঁটে বেড়াচ্ছ তুমি। যেন পুরনো পাজামার গন্ধে জেগে আছে ফাল্গুনের চিতল হরিণ। করিডোরে, দেয়ালের বুকে, শুনশান মেঝের উপরে, খাটের পাশিতে, সমস্ত সিলিং জুড়ে লিখে রেখেছ কার নাম? হাবশি খোজার কাছে গোপন করেছ কাকে?

এ জন্মে তোমার আর পরিত্রাণ নেই। মাঝরাতে অন্ধকার-ডানা মেলে দৃষ্টিহীন পরি নেমে আসে তোমাদের চিলেকোঠার ঘরে। সন্দিগ্ধ ধোঁয়ার মধ্যে ভর-ওঠা ডাকিনীর মতো কাঁদে। বাতাসে উড়তে থাকে রাশি রাশি শ্লোক। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের মধ্যে সারারাত খেয়া বায় নীল-বর্ণ মাছি। মানুষকে ভালোবাসার সমস্ত প্রতিভাই তুমি হারিয়ে ফেলেছ বহুদিন, একটা ভুল স্টেশনে পা রেখে। তোমাকে বসিয়ে রেখে এক কৃষ্ণবর্ণ ট্রেন সেই কবে চলে গেছে দিকশূন্যপুরে।

আমার পাসপোর্ট নেই। ছেঁড়া শার্ট, বাঘের চামড়ার জুতো আর মরা-সাহেবের টুপির মধ্যে আমি লুকিয়ে রেখেছি এক অলৌকিক সাপের মাথার মণি। ভাঙা দাঁতের কোটরে বহন করছি কাঁটাতারের দুঃস্বপ্ন। হাবশি খোজাকে জানিয়ে রেখো মরিয়ম, তোমাদের লোহার দরজায় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তালা ঝুলিয়ে রেখেও আমাকে ফেরানো যাবে না।

আমার এক হাতে ভয়াবহ বিস্ফোরক অন্য হাতে নীল শতদল। পুরোনো পাজামার নেশা ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আমি উপড়ে ফেলব পৃথিবীর সমস্ত রেললাইন, যাতে কৃষ্ণবর্ণ কোনও আধিভৌতিক ট্রেন অতর্কিতে ফিরে এসে তোমাকে মিথ্যে স্বপ্ন দেখাতে না পারে। খাপ-পঞ্চায়েত ও সীমান্ত-রক্ষীরা জানে, প্রেমিক মাত্রেই অনুপ্রবেশকারী। প্রস্তুত থেকো মরিয়ম, আমি আসছি।

 

 

1 Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*