অভিনেতাশ্রেষ্ঠ – দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়

সংগ্রামজিৎ সেনগুপ্ত

 

সংগ্রামজিৎ সেনগুপ্ত বিশিষ্ট নাট্যকর্মী, নাট্যকার, নাট্য পরিচালক, আলোচক ও অভিনেতা সোনারপুর কৃষ্টি সংসদ দলের প্রাণপুরুষ দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়কে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, শিখেছেন আর একসঙ্গে কাজ করেছেন

 

 

শ্রেষ্ঠ অভিনয় কে না দেখতে চান! আচ্ছা, দর্শকেরা কীভাবে বোঝেন শ্রেষ্ঠ অভিনয়, ভালো অভিনয়, মন্দ অভিনয়, চলনসই অভিনয়? দর্শকেরা তো নাট্যতত্ত্ব পড়ে অভিনয় দেখতে আসেন না, আবার সমগ্র দর্শককুলও সমান শিক্ষা, সংস্কৃতিচেতনা, সামাজিক বোধ নিয়ে নাটক দেখতে বসেন না। কিন্তু অভিনয়ের ভালো বা মাঝারি বা মন্দ বুঝতে দর্শকেরা সবাই প্রায় এক পংক্তিতেই। নাটকের টেক্সট, ট্রিটমেন্ট ইত্যাদি বুঝতে হয়ত ফারাক থাকতে পারে কিন্তু অভিনয় বুঝতে পারেন সবাই। অভিনয়ের মান কেমন তা বুঝতে পণ্ডিত হতে হয় না। নিত্যকার জীবন অভিজ্ঞতা দিয়েই তা বোঝা সম্ভব। ‘মাঝারি’, ‘চলনসই’, ‘ওই একরকম’ অভিনয়ের সূক্ষ্ম বিচার সবাই করতে না পারলেও শ্রেষ্ঠ অভিনয় এবং অতি মন্দ অভিনয় যে কোনও দর্শক এক লহমায় বুঝে নিতে পারেন। মন্দ অভিনয় নিয়ে আলোচনার কোনও মানে হয় না (মন্দ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নিয়ে তবুও আলোচনা চলতে পারে, হয়ও), বরং শ্রেষ্ঠ অভিনয় নিয়ে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে দু-এক কথা বলতে চেষ্টা করি।

আসলে আলোচনাটা দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে। অনেকের মতো আমারও অভিমত– দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায় একজন শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। আমরা তাঁর অভিনয় দীর্ঘদিন ধরে দেখেছি, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। ব্যক্তিগতভাবে দু’টি পূর্ণাঙ্গ এবং তিনটি স্বল্পদৈর্ঘ্য নাটকে একসাথে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলাম এবং শেষ যে নাটক দ্বিজেনদা কৃষ্টি সংসদ-এর হয়ে অভিনয় করেছিলেন তা ঘটনাচক্রে আমার নির্দেশনায়, কৃষ্টি সংসদ-এর প্রতিষ্ঠাতার (ডাঃ সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত) জন্মশতবর্ষে, মাত্র এক বছর দশ মাস আগে; তারপরেই তিনি অসুস্থ হয়ে যান।

ছোট্টকাল থেকে যাঁদের অভিনয় দেখে আমাদের মতো নাট্যকর্মীদের চৈতন্যের বিকাশ ঘটে চলেছিল, উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়, তৃপ্তি মিত্র, কেয়া চক্রবর্তী, মমতা চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ, তাঁদের অভিনয়ের সঙ্গে সমান সারিতে দ্বিজেনদাকে বসাতে আমার দ্বিধা নেই। কেন নেই তা বলার প্রয়োজন।

শ্রেষ্ঠ অভিনয় বিদ্যুৎশক্তির মতো। একশো ওয়াটের আলো জ্বালাতে ওয়ারিং, প্লাগ, সুইচ, ফিউজ, ল্যাম্প ইত্যাদি সবই চোখে দেখা যায়। দেখা যায় না শুধু বিদ্যুৎপ্রবাহকে। ‘বিদ্যুৎশক্তি’ অনুভব করি তড়িদাঘাত পেলে। শ্রেষ্ঠ অভিনয়ও একটি ‘শক্’ খাওয়ার মতো। শরীরের ঝাঁকুনি থেকে মন ও মননে এমন ঝাঁকুনি লাগে যে তার অনুরণন থেকে যায় দীর্ঘকাল। দ্বিজেনদার অভিনয় প্রায় ‘শক্’ খাওয়ার মতো এক দুর্লভ অভিজ্ঞতা। শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের কণ্ঠ, শরীর, মস্তিষ্ক নিয়ে যে চরিত্র নির্মাণশৈলী তার তল পাওয়া যায় না। ‘চরিত্র’ অনায়াসে ধারণ করে নিয়ে, অভ্যন্তরে রেখে, আবার ভিতরের মানুষটিকে দর্শকের কাছে হাজির করা এ বড় সহজ কাজ নয়। অভিনয়ের থেকেও চরিত্রকে প্রকাশ করা, জীবন্ত করে উপস্থিত করার মধ্যে এক ‘প্রতিভা’ লাগেই, কিন্তু প্রতিভা দিয়ে সবটা হয় না। কঠোর অনুশীলন, প্রাণান্ত প্যাশন, প্রাণপাত করা দায়বদ্ধতা ছাড়া তাই ‘ম্যাজিক’ অভিনয় অসম্ভব। মোহিত চট্টোপাধ্যায় আমাদের বলতেন নাট্য কেন, সব শিল্পেই একটা ‘ওয়ান্ডার এলিমেন্ট’ প্রয়োজন। শ্রেষ্ঠ অভিনয়, শ্রেষ্ঠ পরিচালনায় ‘ওয়ান্ডার এলিমেন্ট’ ছাড়া শ্রেষ্ঠ হওয়া যায় না। দ্বিজেনদার অভিনয়ে এই ‘ওয়ান্ডার এলিমেন্ট’ পূর্ণমাত্রায় ছিল। চলনে, বলনে, নয়নে তা তীব্রভাবে প্রকাশ হত, আমরা শুধু মুগ্ধ হতাম তা নয়, ‘শক’ খেতাম। বারবার যেমন উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখদের অভিনয় দেখতাম তেমন দ্বিজেনদার অভিনয় দেখতে ব্যাকুল হতাম। বিভাস চক্রবর্তী দ্বিজেনদাকে ‘অভিনেতা-অদ্বিতীয়’ বলেছেন– তার কারণ বোধহয় তাই।

আধুনিক কালে গত বেশ কয়েক বছর ধরে অনেক ভাল ভাল অভিনেতাদের অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছি, মনে হয়েছে অভিনয়টা অনেকাংশে টেকনিকালি দক্ষ, কিন্তু অন্তর বা হৃদয়ের উত্তাপ আমাকে ছুঁয়ে দিয়ে শক দিতে পারছে না। দক্ষ অভিনয়ও সহজ নয়; বহু পরিশ্রমে, ক্ষমতায় এ দক্ষতা অর্জন করা যায়। নিখুঁত অভিনয়ে যে দক্ষতা লাগে, তাও সারা জীবনের সাধনা। দক্ষ অভিনেতাদের কুর্নিশ জানাতেই হয়। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা ঝাঁকে ঝাঁকে আসেন না। অনেকগুলি বিষয় তার সঙ্গে থাকেই। দ্বিজেনদার শ্রেষ্ঠত্বও বোধ করি তাই। দক্ষ অভিনেতা যেন সবসময় বলতে চায়, “আমার অভিনয় দেখো। কেমন লাগছে– আমার দক্ষতাকে বুঝতে পারছ তো?” শ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের জাত পৃথক– তাঁরা কিছুই বলেন না– শুধুই চরিত্রকে প্রকাশ করেন, চরিত্রের আত্মাকে প্রতিষ্ঠিত করেন, তার মধ্যে দক্ষতা তো থাকতে হবেই– দক্ষতা ছাপিয়ে চরিত্র প্রকাশের অসামান্য শেমুষী তাঁকে শ্রেষ্ঠ বানিয়ে দেয় এবং এটাই হল শিল্পের ‘ওয়ান্ডার এলিমেন্ট’, যা দ্বিজেনদার সহজাত।

আর দ্বিজেনদার দায়বদ্ধতা– শুধু নাট্যক্ষেত্রে নয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পথে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। মতাদর্শে অবিচল, নির্লোভ এক প্রকৃতি তাঁকে চরিত্র তৈরিতে দ্বন্দ্বতত্ত্বের হদিশ দিয়ে দেয়, তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পথে সকল বাধা দূর করে দেয়।

আমার প্রণাম। আমার লাল সেলাম।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*