সোভিয়েত সিনেমা ও রুশ বিপ্লবের শতবর্ষ

কণিষ্ক ভট্টাচার্য

 

এই সত্য-উত্তর যুগে বিপ্লব শব্দটি বহু ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে গেলেও, রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রুশ বিপ্লব রাষ্ট্র-সমাজ-ব্যক্তিমুক্তির ধারণায় যে বহুমাত্রিক অভিঘাত এনেছিল, মানব সভ্যতার ইতিহাসে এমন বিপুল আলোড়ন প্রতিতুলনাহীন। ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি ও অক্টোবরের (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের নভেম্বর) গণবিপ্লবে জারজমানার পতনের পরে লেনিনের নেতৃত্বে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। গৃহযুদ্ধের শেষে ১৯২২ সালে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র স্থাপনের আগেই ১৯১৯ সালের ২৭ অগাস্ট, ওডেসা ফিল্ম স্টুডিও ও ওডেসা ফিল্ম ল্যাবরেটরি জাতীয়করণের সময়, মহামতি লেনিন তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘সিনেমা আমাদের যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম। বাস্তবতা ও দূরদর্শিতার যে তুল্যমূল্য বোধে একজন মানুষ নেতা হয়ে ওঠেন তাঁর উদাহরণপ্রতিম এই উক্তি। মহামতি বিশেষণটির তাই প্রথার বাইরে সচেতন ব্যবহার এখানে। বিপ্লব-উত্তর রাষ্ট্রে বিকল্প দর্শনে রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধক ছিল বিপুল সংখ্যক নিরক্ষর মানুষ। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক দর্শনকে গণমানসে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের শিল্প সংস্কৃতিকে ব্যবহার করতে গেলে সাহিত্য সেই সংখ্যার বিরাট অংশের কাছে পৌঁছতে অক্ষম কারণ সর্বজনীন শিক্ষার কাজ তখনও অপেক্ষিত। এই সময়ে সিনেমার একই সঙ্গে দৃশ্য ও শ্রাব্য মাধ্যমগত সুবিধা (নির্বাক চলচিত্রের ক্ষেত্রে পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে ধারাবিবরণীর ব্যবস্থার কথা যথাস্থানে আলোচিত) যে সিনেমাকে প্রকৃত অর্থে গণমাধ্যম করে তুলতে পারে এবং প্রাক উদাহরণহীন নবীন দর্শনের রাষ্ট্রে তাঁর যে আশু প্রয়োজন সেটা রাষ্ট্রনায়ক বুঝেছিলেন। কেবল সমাজতান্ত্রিক চেতনা নয়, একই সঙ্গে কৃষি, শিল্প ও বিজ্ঞানের উন্নতিতে চলচিত্রের ব্যবহার অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে বলে চিঠিতে লিখেছিলেন লেনিন। প্রসঙ্গত সেই চিঠি লেখার সময়ে, ১৯২০ সালে তিনি গুলিবিদ্ধ, আহত এবং প্রায় মরণোন্মুখ। একই সঙ্গে স্মরণীয় জনমানসে সমাজতান্ত্রিক চেতনার মান উন্নয়নের জন্য সিনেমার ভূমিকাকে গুরুত্ব দিলেও রুশ বিপ্লবের পর প্রথম যে ছবি প্রদর্শিত হয়, সেটি ছিল রাশিয়ায় রুশ সাম্রাজ্যের সময়কালে নির্মিত একটি ধর্মীয় ছবি, নাম ফাদার সার্গিয়াস। সরকার কিন্তু সেই ছবির প্রদর্শনে কোনও বাধা সৃষ্টি করেনি।

বিপ্লব উত্তর রাশিয়ায় সে দেশের বিভিন্ন মাধ্যমের শিল্পীরা নতুন যে শিল্পতত্ত্বের সন্ধান করছিলেন তা পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার রূপ নেয়। শিল্পে বাস্তবতার আন্দোলন তাঁর আগেই প্রতিষ্ঠিত। এবার শিল্পকে সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে কীভাবে মানব কল্যাণের আয়ুধ রূপে ব্যবহার করা যায় তাঁর নানারকম প্রকরণ ও তাত্ত্বিক ভাবনা চালিত করে সমকালীন রুশ শিল্পীদের। বস্তুত গত শতকের দুইয়ের দশকের শুরু থেকে তিনের দশকের শুরুই সোভিয়েত সিনেমার নিজস্ব বর্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সময়। এই সময়ে শিল্পীদের মধ্যে বিপ্লবের প্রত্যক্ষতা তখনও জায়মান। কেবল কাগুজে আদর্শের বুলি নয় বিপ্লবের অভিজ্ঞতায় তাঁরা সমৃদ্ধ ছিলেন। মনে রাখতে হবে সদ্য বিপ্লব-উত্তর সময়ে সিনেমার মতো শিল্পকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনা হলেও তখনও বিপ্লবের অভিঘাতে নতুন ভাবনার ক্ষেত্রে যে স্বাভাবিক স্বাধীনতা তা তখনও যান্ত্রিক আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সে আরও পরের ঘটনা এবং তখন লেনিন অনুপস্থিত। শিল্পের ক্ষেত্রে এই নতুন দিশা সন্ধানের পথে সাহিত্য ও অপরাপর শিল্প মাধ্যমের তুলনায় সোভিয়েত সিনেমা যে সবচেয়ে সফল ছিল তার আশু কার্যকারিতার দায় পালন করেও আবহমান শিল্পের ক্ষেত্রে, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। এই কাজে পুদোভকিন, দভজেংকো এবং আইজেনস্টাইন ছিলেন প্রধান চিন্তক। সিনেমা তখন শিল্পমাধ্যম হিসেবে নতুন, তাই পূর্ববর্তী সমস্ত শিল্পমাধ্যমের বৈশিষ্ট্য আত্তীকরণে অসুবিধা হয়নি সিনেমায় বরং তার সম্ভাবনার সীমানাকে দিগন্ত অতিক্রমী করে দিতে পেরেছিলেন তাঁরা। বিশ্ববিদ্যালয়, থিয়েটার বা ড্রয়িংরুমের শিল্পতাত্ত্বিক ভাবনার মধ্যে সাধারণ মানুষের মুখ আর জীবন সংগ্রামের স্থানাঙ্ক চিহ্নিত করে দিয়েছিলেন তাঁরা। অধ্যয়নের বিষয়ীভূত করে তুলেছিলেন তাকে।

গত শতকের তিনের দশক থেকে শিল্পে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার ছাপ পড়তে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও ভাষা ও মাধ্যমের ক্ষেত্রেও। প্রাথমিকভাবে বিপ্লব-উত্তর রাশিয়ায় ব্যক্তি চরিত্রের পরিবর্তে গোষ্ঠীবদ্ধ মানুষের যৌথসত্তার ওপর নায়কত্ব চাপানোর একটা দায় যেন ছিল স্পষ্টভাবেই। যেন ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে জনতার জীবন সংগ্রাম এবং মনন সংগ্রাম বিশ্লেষণই তার লক্ষ্য। যেন সর্বহারা ব্যক্তি নায়ক নয় সর্বহারা জনতাকেই নির্বিকল্পভাবে উঠে আসতে হবে নায়কোচিতভাবে। এই দায়ই পরবর্তীকালে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার অন্যতম চরিত্র লক্ষণ হয়ে ওঠে এবং অবশ্যই তা ভ্রান্তিমূলক। কিন্তু যখন রাশিয়ার বাইরে এই ভ্রান্তিমূলক ধারণা আসন করে নিচ্ছে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার চরিত্র লক্ষণ হিসেবে সেই সময়ে কিন্তু রাশিয়ার সিনেমার পরিচালকেরা ‘জনতার মুখরিত সখ্যে’র প্রতিনিধি রূপে ব্যক্তি নায়কের দুর্জয় প্রচেষ্টাকে তার প্রাপ্য সম্মানের আসন দিলেন সিনেমায়। কিন্তু বিশ্বে ততদিনে চরিত্র লক্ষণ স্থির হয়ে গেছে আর সেই ভ্রান্তির দায়ভার এই সেদিন পর্যন্তও (নাকি এখনও!) বহন করে চলেছিলেন বহু বামপন্থী শিল্পী।

যে রাজনৈতিক দর্শনে আস্থা রেখে সেই আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য সিনেমার বিষয় আঙ্গিক ও প্রকরণগত নতুন ভাবনা ভাবতে হয়েছিল সোভিয়েত সিনেমার চিন্তকদের তার আগে থেকেই সোভিয়েত সিনেমাকে দৈনন্দিনের ভাবনা ভাবতে হয়েছে। বিপ্লব পরবর্তীকালে সোভিয়েতের বার্তা গ্রামে মহল্লায় শহরে পৌঁছে দিয়েছিল এক রিলের কিছু ছোট ছবি। এই নির্বাক ছবির প্রদর্শনের সঙ্গে যে বক্তব্য ছিল দর্শকদের জন্য তা পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে পাঠ করা হত। বিশেষত গ্রামের যে অঞ্চলে তখনও সিনেমা নামক মাধ্যমটি পৌঁছয়নি সেখানেই এই ছবিগুলির প্রদর্শন হত বেশি। এগুলির বেশিরভাগই মূলত তথ্যচিত্র। সদ্য বিপ্লব উত্তর গোটা রাশিয়ার সাধারণ মানুষের সামাজিক বাস্তবতাকে ক্যামেরার বাস্তবতায় অনুবাদ করার মধ্য দিয়ে নতুন তত্ত্বায়ন হল, ‘কিনো-আই’। এই প্রামাণ্য দৃশ্যময়তাকে শিল্পতাত্ত্বিক নির্মাণ করলেন জিগা ভের্তোভ। জিগা ভের্তোভের নিউজরিল সিরিজ কিনো প্রাভদাছিল প্রথম দিকের সোভিয়েত সিনেমার এক বিশিষ্ট নিদর্শন। ১৯২২ থেকে ১৯২৫-এর মধ্যে এই কিনো প্রাভদার মধ্যে দিয়েই সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার চর্চা ও পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু হয় সিনেমা নামক মাধ্যমে।কিনো প্রাভদার পাশাপাশি ফরোয়ার্ড, সোভিয়েত!’ ছবির মাধ্যমে তথ্যচিত্রের বর্গে ভের্তোভের নিরীক্ষা ও অর্জন প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল রুশিয়ান তথা বিশ্ব সিনেমার সিনেম্যাটোগ্রাফির ক্ষেত্রে। জিগা ভের্তোভের শ্রেষ্ঠ কাজ ‘দ্য ম্যান উইথ দ্য মুভি ক্যামেরা’য় বাস্তবতা, প্রামাণ্যতা এবং তার দৃশ্যায়ন ক্যামেরার ক্ষমতার অজ্ঞাত সব সীমাকে অতিক্রম করল। এর সঙ্গে সম্পাদনা প্রকাশ করল ভের্তোভের সিনেমা ভাবনাকে যেখান থেকে তিনি পৌঁছলেন ‘সিনেমা ট্রুথ’-এ। এছাড়া তিনের দশকে ‘এন্থুসিয়াজম’ আর ‘থ্রি সংস অব লেনিন’ নামে দুটি ছবি তৈরি করেন। এই দশকের অপর গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলি হল শাবএর বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি দ্য ফল অব রোমানভ ডাইনেস্টি’, ইউ জেলিয়াবাজস্কির হাইড্রোপিটছিল জনপ্রিয় বিজ্ঞানের প্রথম ছবি।

এই সময়ে বহু নতুন প্রতিভা চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে যুক্ত হন সিনেমার নতুন মাধ্যমে। এঁদের মেধা ও প্রচেষ্টায় এবং সোভিয়েতের সহায়তায় ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের বিপরীতে সোভিয়েত ফিল্ম’-এর নতুন বর্গ গড়ে ওঠে। এই পথেই সের্গেই আইজেনস্টাইনের ট্রিলজি ‘স্ট্রাইক’ (১৯২৫), ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’ (১৯২৫) আর ‘অক্টোবর’ (১৯২৮) আসে। ‘স্ট্রাইক’ আইজেনস্টাইনের প্রথম ছবি আর এই ছবিতেই সম্পাদনার ক্ষেত্রে মন্তাজের দ্বান্দ্বিকতা লক্ষ করা যায় মজুর হত্যা আর পশু জবাইয়ের দৃশ্য পারম্পর্যে। ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন’-এ মন্তাজের ব্যবহার আর ছবির ব্যঞ্জনাধর্মিতা সামগ্রিকভাবে সিনেমা নামক মাধ্যমে নতুন ভাষা নিয়ে আসে এবং ছবিটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়। জন রিডের ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ উপন্যাস অবলম্বনে আইজেনস্টাইন বৈপ্লবিক মহাকাব্যের ধারণা তৈরি করেন তাঁর অক্টোবরছবির মাধ্যমে। এরই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পুদোভকিনের গোর্কির মাদার’-এর অবলম্বনে ১৯২৬-এ তৈরি ছবি। বৈপ্লবিক ইতিহাসের থিমের উন্নতি ঘটে পুদোভকিনের দ্য এন্ড অব সেন্ট পিটার্সবার্গ’ (১৯২৭) ছবির মাধ্যমে। সমকালীন জীবন নিয়ে অপর একটি উল্লেখযোগ্য ছবি হল বার্নেটের টার্বনায়া। প্রোটাজানভের ছবি ডন দিয়েগো অ্যান্ড পেলাজিয়া’ (১৯২৮) বৈপ্লবিক সংগ্রাম আর জীবনের নতুন ধারার প্রতি ছিল দায়বদ্ধ। ইউক্রেনের পরিচালক দভজেংকো উল্লেখযোগ্য তাঁর ঐতিহাসিক বৈপ্লবিক মহাকব্যিক ছবি জেভনিগোরা’, ‘আর্সেনালআর কাব্যিক ছবি আর্থ’-এর জন্য।

সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার চর্চার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি হল চাপায়েভ। ছবিতে গৃহযুদ্ধের সমকালীন রুশ বিপ্লবী এবং সমাজের বাস্তবতা তুলে আনা হয়েছে। বিপ্লবের ইতিহাস উঠে এসেছে সের্গেই উটকেভিচের গোল্ডেন মাউন্টেন’, বরিস বার্নেটের দ্য আউটস্কার্টস আর গ্রেগরি কোজিনসেভ ও লিওনিড ট্রাউবার্গের ম্যাক্সিম ট্রিলজির দ্য ইউথ অব ম্যাক্সিম’, ‘দ্য রিটার্ন অব ম্যাক্সিমআর দ্য ভাইবর্গ সাইডছবি তিনটিতে। মিখাইল রোমের ভ্লাদিমির লেনিনের জীবনীমূলক ছবি লেনিন ইন অক্টোবরআর লেনিন ইন নাইন্টিন এইটটিনউল্লেখযোগ্য। রুশিয়ার সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবন সের্গেই গেরাসিমভের ছবি কারেজিয়াস সেভেনএবং সিটি অব ইয়ুথছবিতে তুলে ধরা হয়েছে। গ্রিগোরি আলেকজাদ্রভ নির্মিত কমেডি ছবি হিসেবে যেমন সার্কাস’, ‘ভোল্গাভোল্গাতৈরি হয়েছে তেমনই সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব, কাজের উৎসাহ আর অতীত সময়ে অল্প সংখ্যক মানুষের ওপর অসহিষ্ণুতা নিয়ে ইভান পেইরেভের তানিয়া’, আর দ্য রিচ ব্রাইড’, এবং বরিস বার্নেটের বাই দ্য ব্লুয়েস্ট সিনির্মিত হয়েছে। জাতীয় নায়কদের নিয়ে তৈরি হয়েছে আইজেনস্টাইনের আলেকজান্ডার নভস্কি’, সেভোলোদ পুদোভকিনের মিনিন এন্ড পোজারস্কি’, ইগোর সেভচেংকোর বোগদান খমেলনিতস্কি। ক্লাসিক সাহিত্যকে গ্রহণ করা হয়েছে, বিশেষত মার্ক ডন্সকয়ের ম্যাক্সিম গোর্কির জীবনী নিয়ে ট্রিলজি, ‘দ্য চাইল্ডহুড অব ম্যাক্সিম গোর্কি’, ‘মাই অ্যাপ্রেনটিসশিপমাই ইউনিভার্সিটি

১৯৩০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সার্কাসছবিটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রঙিন ছবি দ্য স্টোন ফ্লাওয়ার১৯৪৬-এ, ‘ব্যালাড অব  সার্বিয়া১৯৪৭-এ, এবং ‘কুবান কসাক্স১৯৪৯ সালে মুক্তি পায়। গত শতকের চারের দশকে আলেকজান্ডার নেভস্কি’, ‘ইভান দ্য টেরিবলবিশ্ব ছবির ইতিহাসে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ছবি। পাঁচের দশকের শেষে ও ছয়ের দশকের শুরুতে সোভিয়েত প্রযোজনা করে ব্যালাড অব আ সোলজার। এই ছবিটি ১৯৬১ সালে BAFTA পুরস্কার পায় সেরা ছবির বিভাগে। পাঁচের দশকের অন্যতম সেরা ছবি হিসেবে আলোচিত হয় ‘দ্য ক্রেইন্স আর ফ্লাইং হাই’ ছবিটি।

এই প্রেক্ষাপটের সামনে আমরা দেখতে চাইব তিনটি ছবিকে। ‘অক্টোবর’, ‘লেনিন ইন অক্টোবর’ এবং ‘দ্য এন্ড অব সেন্ট পিটার্সবার্গ’। ‘অক্টোবর’ ১৯২৭-এ আইজেনস্টাইনের নেতৃত্বে সোভিয়েত ফিল্ম মেকারের দ্বারা বিপ্লবের দশম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রযোজিত ছবি’। বলশেভিক সেনা, নাবিকেরা এতে যোগ দিয়েছিলেন। এই ছবি নির্মাণের সময়ে লেনিনগ্রাডের রাস্তা বাড়িঘর শীত প্রাসাদ সব যুদ্ধের সময়কার অবস্থাতেই ছিল। আইজেনস্টাইন পরিচালিত এই নির্বাক ছবিতে পরে শব্দ যোজনা করেন গ্রেগোরি আলেকজান্দ্রভ এবং দমিত্রি শসতোকভিচ। লেনিনের এক স্মরণীয় উক্তিকে উদ্ধৃত করে ছবির সূচনা হয়, ‘আমাদের গর্বিত হওয়ার অধিকার আছে যে আমাদের ওপর সোভিয়েত দেশ গড়ার সৌভাগ্য অর্পিত হয়েছে। আর তা গড়তে গিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছি আমরা।’

ফেব্রুয়ারির বিপ্লবে রাশিয়ার জার তৃতীয় আলেকজান্দারের মূর্তি ভাঙে জনসাধারণ। কৃষক ও সৈনিকেরা সহায়তা করে তাঁদের। কিন্তু যে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় তারা সবকিছুকেই ‘রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য’ বলে সামন্ততান্ত্রিক রাশিয়ার শাসকদের মতোই বিলাস বৈভবে জীবনযাপন করতে থাকে। ফলে সহজেই প্রশ্ন উঠে যায় এই সরকার সত্যিই ‘রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য’ কিনা। নতুন সরকারের সেনাদলের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা দেয়। যুদ্ধের সময়ে খাবারের আকালে মানুষ এক পাউন্ড রুটির বদলে তার আটভাগের একভাগ খুঁজতে বাধ্য হয়। কাজ নেই খাদ্য নেই এক চরম নৈরাজ্যের মধ্যে ফিনল্যান্ডের স্টেশনে এপ্রিলের ৩ তারিখ লেনিন ডাক দেন, এই সরকারকে আর সমর্থন করা হবে না। জুলাইতে এই পুঁজিবাদী মন্ত্রীসভার ওপরে বিক্ষোভ আছড়ে পড়ে। প্রতিক্রিয়াশীল পত্রিকা ‘ইভিনিং টাইমসের’ সামনে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চলে। এর বিরুদ্ধে শ্রমিকরা যাতে বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করতে না পারে তাই জোড়া ব্রিজগুলি খুলে দেওয়া হয়। সেই খোলা ব্রিজের ওপর থেকে ঝুলতে থাকে ঘোড়ায় টানা গাড়ির এক ঘোড়া। ঝুলন্ত ঘোড়াটি যেন এক চূড়ান্ত উত্তর খোঁজার প্রশ্নচিহ্ন হয়ে ওঠে। প্রাভদার কপি জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। ফার্স্ট মিশিগান রেজিমেন্ট শ্রমিকদের সমর্থন করে। বলশেভিকদের মিলিটারি হেডকোয়ার্টার তছনছ করা হয়। ঘোড়াটি ঝুলে থাকা থেকে মুক্তি পায়। প্রতিবিপ্লব জয়ী হয়। ৬ জুলাই সরকার লেনিনকে গ্রেফতার করার আদেশ দিল। লেনিন আত্মগোপন করলেন, কিন্তু ষষ্ঠ পার্টি কংগ্রেসকে নির্দেশ দিলেন সশস্ত্র সংগ্রামের। সরকারের প্রধান আলেকজান্ডার কারনেস্কি সম্রাজ্ঞী আলেকজান্দ্রার কেবিনে বসলেন যেন তিনি পরবর্তী জার। সরকারের সঙ্গে সেনাপ্রধানের মতান্তরে ক্ষমতা চলে গেল সেনাপ্রধানের হাতে। এখান থেকেই বলশেভিকদের শীত প্রাসাদ দখলকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তুলে আনা হয় ছবিতে।

‘লেনিন ইন অক্টোবর’ ছবিটি প্রধানত বলশেভিক বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কেবল অক্টোবরে লেনিনের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা তাঁর সংগঠনে সেটিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। সমকালীন মানুষের চোখে স্বয়ং লেনিন যে মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠেন তাকেই তুলে ধরা হয় ছবিতে। সমস্ত আন্দোলন সংগ্রামের ক্ষেত্রে যেমন বিশ্বাসঘাতক থাকে আর তাকেই ব্যবহার করে বিরুদ্ধ শক্তি তেমনই বলশেভিক বিপ্লবের ক্ষেত্রেও তাই ছিল। কিন্তু একজন সাধারণ শ্রমিক যখন জানতে পারে যে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে লেনিনকে খুন করার কাজে তখন সে খুনিদের গোটা দলটিকেই বিভ্রান্ত করে নিজের খুন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাকে উপেক্ষা করে। শেষ পর্যন্ত খুন হয়ে যায়ও সে কিন্তু ‘ভিভা লেনিন’ ডাক দিয়ে তাঁর মুক্তির প্রতীককে জাগ্রত রাখে।

এই ছবিতে বলশেভিক নেতৃত্ব লেনিনের পাশাপাশি উঠে আসেন কমরেড ভ্যাসিলির বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া এক সাধারণ মানুষ। ভ্যাসিলির স্ত্রী জানতেন না যে আশ্রয় নেওয়া মানুষটি লেনিন। তিনি আসন্ন শীতে তাঁদের সম্ভাবনার সন্তানটির জন্য পোশাক বানান। সেই ছোট ছোট জুতো জামা হাতে তুলে দেখে প্রবাদপ্রতিম নেতার যে স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস তা তাঁকে লেজেন্ডের খোলস ছাড়িয়ে সাধারণ সুখদুঃখমায়া জারিত একটি মানুষের ফ্রেমে বেধে দেয়। যিনি কিছুতেই রাজি হন না যে অতিথির জন্য ভ্যাসিলি দম্পতি তাঁদের একমাত্র বিছানাটি ছেড়ে দেবে, বরং তিনি একটি তোশক নিয়ে মেঝেতে পেতে তার তলায় ঠাণ্ডা আটকাতে খানিক বইপত্র দিয়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু দম্পতি কাঁধে মাথা রেখে হাত ধরে পাশাপাশি বসে মুগ্ধ হয়ে দেখে যায় তাঁদের অতিথিকে। প্রধান পরিচালক মিখাইল রম ও দমিত্রি ভ্যাসিলির পরিচালনায় এই ছবি বস্তুত ট্রিবিউট ফিল্ম, যা লেনিন জীবনীর একটি ক্ষুদ্র কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মিখাইল রম নিজেই সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, তিনি সাসপেন্সের মোড়কে আর সহানুভূতিশীল চরিত্রায়ন করতে চেয়েছিলেন। দুটি ক্ষেত্রেই তিনি সফল। সেই সাফল্যের ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব বরিস ভ্যাসিলিয়েভিচ শচুকিনের। তিনি এমন সময়ে ছবিতে লেনিন চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন যখন বলশেভিক বিপ্লবের পর মাত্র দশ বছর পার হয়েছে আর বহু মানুষ তখনও জীবিত যারা লেনিনের সহকর্মী বা ব্যক্তিগতভাবে লেনিনকে চিনতেন। রমের সহায়ক ছিলেন আলেক্সেই ক্যাপলার, যিনি ছবির চিত্রনাট্যকার।

‘দ্য এন্ড অব সেন্ট পিটার্সবার্গ’ শুরু হয় যুদ্ধের আগেই। উইন্ডমিলের চাকা ঘোরে, মেঘলা আকাশের নিচে চাষের ফাঁকে একটুকরো রুটি ভাগ করে খায় চাষি। চাষির বউ সন্তানের জন্ম দিয়েও আনন্দ পায় না, কারণ আরেকটা খাওয়ার মুখ বাড়ল। আরেকটা নতুন সর্বহারা। নদীর জলে শীতপ্রাসাদের প্রতিচ্ছবি কাঁপে।

পুলিতভ, অবখব, লেবেদেভের কারখানার শ্রমিকরা মালিকপক্ষের অত্যাচার আর নিতে পারছিল না, এদিকে স্টক মার্কেটে লেবেদেভের শেয়ারের দর বাড়ে। মালিকের কাছে খবর হয়ে যায় যুদ্ধ লাগলে দর আকাশ ছোঁবে। মালিক বিপুল সরকারি কনট্র্যাক্ট পায়। সেই কাজ তুলতে কারখানার সময় বাড়িয়ে দেয় মালিক। গ্রামে খাবার নেই, কাজ নেই। সেই চাষির ছেলে পেট চালাতে না পেরে শহরে আসে কাজের খোঁজে, কিন্তু শহরে যে চেনা মানুষের কাছে আসে সে শ্রমিক নেতা, মালিকের যতই লাভ বাড়ুক পেট ভরানোর মতো খাবার তাঁর ঘরেও নেই। মিথ্যে দেশপ্রেমের বুলি আউড়ে মালিক বলে জাতির স্বার্থে কাজের সময় বাড়াতে হবে। শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে স্ট্রাইকের ডাক দেয়, ভাবে এক সপ্তাহেই মালিকপক্ষ ভেঙে পড়বে, কিন্তু সেই এক সপ্তাহ শ্রমিকের সন্তানের পেট চলবে কী করে শ্রমিকের বউয়ের সেই প্রশ্নের উত্তর তখনও কারও কাছে নেই। শ্রমিক নেতার বউ গ্রাম থেকে আসা ছেলেটিকে কাজ দেখতে বলে কারণ এখানে কেউ খাবার জোগাড় করে দেওয়ার অবস্থায় নেই।

মালিক ধর্মঘটী শ্রমিকদের সরিয়ে নতুন শ্রমিক নিয়োগ করে, গ্রাম থেকে আসা ভূমিহীন চাষি শহরের শ্রমিক হয়। কিন্তু ধর্মঘটী শ্রমিকরা কারখানার গেট আটকায়, নতুনদের কাছে আবেদন করে যে তোমরা নিজেদের লোকের বিরুদ্ধেই যাচ্ছ। দুইদল অভুক্তের মধ্যে লড়াই লাগিয়ে দেয় পুঁজি। গ্রামের ছেলেটি জমায়েত হওয়া শ্রমিকদের বলে যে এদের কে উসকেছে তা সে জানে। এ কথা শুনে পুলিশের লোক তাকে নিয়ে যায় মালিকের প্রতিনিধির কাছে। তাকে নিয়ে ওরা যায় নেতার বাড়ি চিনে তাকে ধরতে। এই ধরিয়ে দেওয়ার বদলে তাকে কাজের প্রতিশ্রুতি আর একটা কয়েন দেয় মালিকের লোক। শ্রমিক মহল্লায় সকলের চোখে ধিক্কার দেখে ও বোঝে যে সকলের চোখে ও বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠেছে। মালিকের কাছে গিয়ে বলে শ্রমিক নেতাটি ওর গ্রামের লোক তাকে যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। ওর ঘরে বাচ্চা আছে অথচ ওর ঘরে খাবার কিছু নেই। সেখানে ওকে খেদিয়ে দিতে গেলে ও পাল্টা মার দেয়। মালিককে মারধোরের অপরাধে ওকে থানায় তুলে নিয়ে গিয়ে প্রচণ্ড মারধোর করে আধমরা অবস্থায় গারদে রাখে। সে রাতেই যুদ্ধ ঘোষণা হয়। তাই সব বন্দীদের ছেড়ে সেনাদলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অভুক্ত চাষি মজুর হতে এসে হয়ে যায় অভুক্ত সৈন্য। লেনিনের সেই উক্তি স্মরণে আসে ‘সৈন্য হল উর্দি পরা চাষি’। দুই দেশের দুই দল অভুক্ত মানুষের পরস্পরকে খতম করার মধ্যে দিয়ে শেয়ারের দর বাড়ে লেবেদেভের।

তিন বছর যুদ্ধ চলে কিন্তু কীসের জন্য মানুষ জানে না, জানে না সেনাদল। এর মধ্যেই ১৯১৭ আসে। দেশে কামানের গোলা আছে কিন্তু রুটি নেই। জারকে সরিয়ে নতুন সরকার আসে কিন্তু তারা জারের মতোই বিলাসব্যসনে ডুবে থাকে। মানুষ কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় এই পুঁজিবাদী মন্ত্রীদের সরাতে হবে। যুদ্ধের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। সেনাবাহিনীকে ফিরিয়ে আনা হয় কমিউনিস্টদের রোখবার জন্য, কিন্তু শত্রু চিনতে তাঁদের ভুল হয় না।

এরপর কীভাবে, কোন দেশে, কবে (বা আদৌ) বিপ্লব হবে সেটা তো সেই সেই দেশের পরিস্থিতি অনুসারে নির্ধারিত হবে, কিন্তু সোভিয়েতের বিপ্লব সারা পৃথিবীকে সিনেমার ক্ষেত্রে প্রধানত যে ধারণাগুলি দিয়ে গেছে তার প্রধানতম হল সিনেমার ভাষা। এক্ষেত্রে লেভ কুলেশভের কথা উল্লেখযোগ্য। ফিল্ম তাত্ত্বিক কুলেশভ সোভিয়েত মন্তাজের পিতৃপ্রতিম স্রষ্টা। তাঁর মতে, সিনেমার নাটকীয়তা তার শটের বিষয়বস্তুতে নয়, বরং তা আছে সেই শটকে এডিট করে জোড়ার মধ্যে। এর পরীক্ষা তিনি করেন ১৯২৪-এ তাঁর অনবদ্য ছবি ‘মিস্টার ওয়েস্ট ইন দ্য ল্যান্ড অব বলশেভিক’-এ। কুলেশভ একটি অভিব্যক্তিহীন লং শট নেন তাঁর অভিনেতা ইভান মজুখিনের। এই শটটাকে তিনি তিনটে ভাগ করেন। এবার সেগুলিকে তিনটে আলাদা শটের সঙ্গে জোড়েন। তিনটি শট হল, একটা ধোঁয়া ওঠা সুপের বাটি, এক সুন্দরী যুবতী, কফিনে শোয়ানো একটি শিশুর শব। তারপর যখন সেগুলি দর্শককে দেখানো হল তারা জানালেন, মজুখিনের অভিব্যক্তি সুপের বাটির ক্ষেত্রে ছিল ক্ষুধার্ত, যুবতীর ক্ষেত্রে ছিল কামনায় ভরা আর মৃত শিশুর ক্ষেত্রে শোকাবহ। এই হল মন্তাজের শক্তি। যা সোভিয়েত বিশ্ব সিনেমাকে দিয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ফিল্মস্কুলের ধারণা বিশ্বকে উপহার দেয় সোভিয়েত। ১৯১৯ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক ভ্লাদিমির গার্ডিন স্থাপন করেন ‘গেরাসিমভ ইন্সটিটিউট অফ সিনেম্যাটোগ্রাফি’। ১৯৩৪ সালে এই ফিল্ম স্কুলের নাম হয় ‘অল ইউনিয়ন স্টেট ইন্সটিটিউট অব সিনেম্যাটোগ্রাফি’। এখানে পড়িয়েছেন লেভ কুলেশভ, মার্লেন খুতসিয়েভ, আলেক্সেই বাটালভ, সের্গেই আইজেনস্টাইন, মিখাইল রম, সেভলোদ পুদোভকিন, সের্গেই বন্ডারচুখ, এলেম ক্লিমভ, সের্গেই পারজানভ, আলেকজান্ডার শুকোরভ এবং আন্দ্রেই তারকোভস্কি। এর পরেই সারা পৃথিবীতে ‘ফিল্ম স্কুল’-এর ধারণা আসে।

এরই সঙ্গে সাধারণ খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষ যে সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে উঠতে পেরেছে সেই ক্ষেত্রেও সোভিয়েতের ভুমিকা অপরিসীম। নন্দনতত্ত্বের দিক থেকে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার আদর্শ এক দীর্ঘ সময় আবিশ্ব শিল্পীদের প্রভাবিত করেছে। রাষ্ট্র প্রগতিশীল শিল্পকে সহায়তা করবে এই ধারণা সোভিয়েত দিয়েছিল বিশ্বকে। তারই প্রভাবে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে প্রগতিশীল শিল্পকে সহায়তার ধারণা আসে। আমাদের দেশেও আটের দশক পর্যন্ত এই ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বাজার অর্থনীতি আসার সঙ্গে সঙ্গে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণাই যেভাবে আক্রান্ত, সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সমস্ত ক্ষেত্রকেই যেভাবে বাজারের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, যেখানে ভর্তুকিকে একটি ঘৃণ্য শব্দ হিসেবে দেখাতে চাইছে বাজার, যেখানে প্রগতিশীলতার ধারণাই আক্রান্ত সেখানে প্রগতিশীল শিল্পের পাশে রাষ্ট্র থাকবে এ ভাবনা হয়ত আমাদের মধুরতম কল্পনারও সীমার বাইরে চলে যাবে।

এপ্রিল, ২০১৭।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*