সহজ বিজ্ঞান জিজ্ঞাসাকে কুর্নিশ নোবেলের

অরণ্যজিৎ সামন্ত

 

জন্ম 1971. কলকাতায়। স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর। বর্তমানে বালিগঞ্জ গভঃ স্কুলের শিক্ষক। অবসর সময়ের কাজ বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি আর গান শোনা।

 

 

২০১৭ অর্থাৎ এই বছরে, ফিজিওলজি ও মেডিসিন বিভাগে নোবেল পুরস্কার পেলেন আমেরিকার তিনজন বিজ্ঞানী। জেফ্রি হল, মাইকেল ইয়াং আর মাইকেল রসব্যাস। ১.১ মিলিয়ন আমেরিকান ডলারের এই পুরস্কার তিনজনের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। ভারতীয় টাকায় সেই ভাগ প্রতিজনের দাঁড়ায় প্রায় দুই কোটি টাকা।

ভোরবেলায় সুইডেন থেকে পুরস্কারের খবর জানাতে রসব্যাসকে ফোন করা হলে তিনি শুরুতেই ফোনে বলেছিলেন “you have got to be kidding”। ঠাট্টা করছেন কেউ নাকি তাঁর সঙ্গে। কিন্তু সেটা যে মজা ছিল না এটা বিশ্বাস করতে তার সময় লেগেছিল। কিন্তু কেন। কারণ, তার মনে হয়েছিল নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো নজরকাড়া কাজ তো তারা করেননি। নতুন কোনও জিন এডিটিং টেকনিকের আবিষ্কার বা জটিল কোনও রোগের চিকিৎসা বিষয়ক গবেষণাই সাধারণত নোবেল কমিটির বিচারে প্রাধান্য পায়। সেই বিচারে জেফ্রিদের গবেষণা যে একেবারেই সহজ বিজ্ঞান জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজেছে। এ যেন ইস্কুলের ছাত্রের প্রশ্নের উত্তর দিতে বসে বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করে ফেললেন, এবারে নোবেল কমিটি তাকেই নোবেল পুরস্কার দিয়ে বসল।

নোবেল পুরস্কারের বিচারে যেসব বিজ্ঞানের গবেষণা এখন আলোচনায় উঠে আসে, সেসব বিজ্ঞান সাধারণ মানুষ অনেকদিনই বোঝেন না। বিজ্ঞানের ভাবনা ও কৃৎকৌশলের প্রয়োগ যে উচ্চতায় এখন পৌঁছেছে, সেটা বুঝতে স্কুল কলেজের বিজ্ঞানের চর্চা যথেষ্ট নয়, এটা সবাই জানেন। কিন্তু ২০১৬-তে ইওসিনোরি ওসুমিকে ফিজিওলজি ও মেডিসিন বিভাগে নোবেল দেওয়া হলে অনেকেই ভাবলেন বিজ্ঞানের গবেষণায় ‘বেসিক সায়েন্টিফিক ইনকুয়ারি’ বলতে আমরা যা বুঝি তার স্বীকৃতি মিলছে। সেই হিসেবে এবারের নোবেলও সেই টুপিতেই আর একটি পালক যোগ করল।

প্রশ্ন হল এবারের গবেষণা ঠিক কী নিয়ে।

এককথায় দিন ও রাত এই চব্বিশ ঘণ্টার সময়কাল ব্যাকটিরিয়া থেকে মানুষ, প্রাণ আছে এমন সবকিছুকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, কীভাষায় ‘সময়’ একটি জীবন্ত কোষকে বোঝাচ্ছে দিন হল রাত হল, সময় হল কাজের বা বিশ্রামের সেটাই এবারের গবেষণার মূল বিষয়। ভাবি, একটি কোষ। তার তো অনুভব করবার ক্ষমতা নেই। তার চোখ কান নাক কিছুই নেই। সে কিভাবে বোঝে ‘দিবারাত্রির কাব্য’। বা যদি ভাবি বোঝেও না, তাহলে কোন কৌশলে সে নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেয়, এটাই আমাদের ভাবাতে পারে। এই ছন্দোবদ্ধতাকে সারকাডিয়ান রিদম বলা হয়। এবারের নোবেল প্রাপ্তি এই সারকাডিয়ান রিদমের ওপর গবেষণার স্বীকৃতি। জিন স্তরে পৌঁছে এর রহস্য উদ্ঘাটন ছিল এবারের মূল বিষয়।

১৯৮৪-তে হল ও রসব্যাস একসঙ্গে এবং ইয়ং আলাদাভাবে ফলমাছি ড্রসোফিলার কোষে একটি জিনকে খুঁজে পেলেন। তার নাম দেওয়া হল পিরিয়ড জিন। এর থেকে তৈরি হয় যে প্রোটিন তার নাম হল পার (PER)। মাছির কোষে এই পার-এর মাত্রা রাতেরবেলায় বাড়তে থাকে আর দিনে কমে যায়। রাতে সে ঝিমিয়ে পড়ে আর দিনে চনমনে হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানী ইয়ং এখানে এর সঙ্গে আর একটি প্রোটিনকেও চিনে বের করলেন যার নাম হল টাইমলেস। এই টাইমলেস প্রোটিন কোষের ভেতরে পার প্রোটিনের মাত্রাকে বাড়তে বাধা দেয়। রাত থেকে সময় যত দিনের দিকে যায়, টাইমলেস পার প্রোটিনের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে তার মাত্রা কমাতে থাকে। যাকে ইনহিবিট করা বলে। শুধু দিন রাত নয়, পৃথিবীর আহ্নিক-বার্ষিক গতি, ঋতু পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলিও জুড়ে যায় এই ভাবনায়। এর বাইরে জীবের গ্লোবাল মাইগ্রেশন আছে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া আছে, খিদে আছে, খিদের সময় খাবারের অভাব আছে। ঘুম যেমন আছে, তেমনই আছে ঘুমের সময়ের অভাব। গোলার্ধের একদিক থেকে অন্যদিকে গেলেই উলটে যেতে পারে চব্বিশ ঘণ্টার হিসেব। এই প্রতিটি জায়গায় কোষ কীভাবে নিজেকে গুছিয়ে নেয়, সেটাও বিজ্ঞানীদের মতো সাধারণ মানুষেরও প্রশ্ন।

সারা বিশ্বজুড়েই বিজ্ঞানের গবেষণা এখন পরিচালিত হচ্ছে মানুষের কাজে লাগবে এমন চটজলদি আবিষ্কারের দিকে। ক্যানসারের ওষুধ, এইচ আই ভির টীকা বা অ্যালঝাইমারের ওষুধ নিয়ে গবেষণা বললে টাকা মিলবে। এতে ভুল নেই। কিন্তু বাণিজ্য সংস্থাগুলি এখানে টাকা ঢালতে চায় মুনাফার লোভে। ওসুমির অটোফাজি নিয়ে বা সারকাডিয়ান রিদম নিয়ে গবেষণায় তারা উদাসীন। কোষের নিজের কাজের কারণে তার পেটে যেসব বর্জ্য জমে ওঠে তাদের ফেলে দিতে ওসুমির গবেষণা চটজলদি সমাধানের কোনও রাস্তা খুলে দেয় না। বরং বিজ্ঞানের সামনে তাত্ত্বিক গবেষণার বিরাট ক্ষেত্র উন্মোচিত করে। সারকাডিয়ান রিদমের গবেষণাও সেখানেই সফল। যেমন অনেকেই বলেছেন, এই গবেষণা থেকে ড্রাগ-অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ওষুধ খাওয়ার সময়ের ধারণায় বড় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। কোষের রসায়ন আরও খুঁটিয়ে জানা গেলে ওষুধের কাজের ঠিক সময় ও তার অন্য দিকগুলি নিয়ে আমরা সচেতন হতে পারব। এড়ানো যাবে সাইডএফেক্ট। ব্লাডসুগার, হার্টের অসুখের মতো রোগের মোকাবিলাতেও মিলতে পারে আলোর দিশা। তবে এহ বাহ্য।

প্রাণের অধরা মাধুরীকে ধরতে এই ছন্দোবন্ধনই হাতে থাকে বিজ্ঞানের।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*