‘নানারকম সংস্কারগুলোকে অ্যালিয়েনেট করে বাঁচতে গেলে জীবনের কোনও সৌন্দর্য থাকে না’ : প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার

সার্থক রায়চৌধুরী

 

সত্তরের বাংলা কবিতায় যে বহুল দেবতার বহুস্বর শোনা গিয়েছিল, তারা প্রত্যেকেই ছিল স্বতন্ত্র। আর এদের মধ্যেও স্বাতন্ত্র্য অথবা মুদ্রাদোষে যিনি ‘অন্য’ তিনি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (জন্ম : ১৯৫৬)। গ্রন্থাবলী : বালি ও তরমুজ (১৯৮৩), উন্মেষ গোধূলি (১৯৯৬), বঙ্গীয় চতুর্দশপদী (২০০২), উত্তর কোলকাতার কবিতা (২০০৫), গুপ্ত দাম্পত্য কথা (২০০৮), আনন্দ ভিখিরি (২০০৮), গুপ্ত দাম্পত্য কথা : পুং ও স্ত্রী পক্ষ (২০১৪), উপাদানকারণ (২০১৫), মধুরতুমুল (২০১৭)…

এই পরিচিতি নেওয়া হল প্রসূনবাবুর নামাঙ্কিত ফেসবুক পেজ থেকে। আমাদের তরফে যোগ বলতে শুধু শেষ বইয়ের নাম।

প্রসূনবাবুর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় মেতেছিলেন আরেক কবি সার্থক রায়চৌধুরী। সেই দীর্ঘ আলাপের একাংশ বাংলা কবিতার তন্নিষ্ঠ পাঠক ‘এই সময়’ পত্রিকায় পড়েছেন। আমাদের হাতে এসেছে সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি। এর জন্য ধন্যবাদ জানাই বিপ্লব চৌধুরী ও তাঁর ‘দূরত্ব’ পত্রিকাকে। ধন্যবাদ সার্থক রায়চৌধুরীকেও। তিনি না জানালে এই ঐশ্বর্য আমাদের গোচরে আসা কঠিন হত।

 

প্রসূনদা, প্রথম বই ১৯৮৩ সাল, তারপর ১৯৯৬। এই যে ১৩টা বছর… সাধারণত দেখা যায়, কবিদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, প্রথম বই এবং দ্বিতীয় বইয়ের মধ্যে এতখানি ব্যবধান হয় না। এটা কী কারণে ঘটেছিল সেই সময়?

এখানে অবশ্য মনে রাখতে হবে আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল ‘৭৪ সালে। তারপর প্রথম বই বেরোতে ‘৮২ সাল হয়। তুমি ‘৮৩ বলছ?

আমার মনে হচ্ছে, এখানে যেমন লেখা আছে ৮৩, ফেব্রুয়ারি ৮৩।

আসলে ওখানে ৮২ পর্যন্ত লেখারই স্ক্রিপ্ট করা হয়েছিল। সেই অর্থে বোধহয় ৮২ মনে হচ্ছে। যাই হোক, এর মধ্যে কিন্তু যাঁরা আমার সাথে লিখতে শুরু করেছিল তাঁদের অনেকেরই বই বেরিয়ে গেছে। আমি একটু অপেক্ষাপন্থী ছিলাম আর কি! পাণ্ডুলিপি করার সময় মনে হত — আজও মনে হয় — যথেষ্ট ভালো কবিতা সংগ্রহ হয়নি। এটা একটা দিক যেমন, আরেকটা হল যে, প্রথম বইটা থেকে দ্বিতীয় বইটার মাঝখানে আমি একটু বেশিই রাজনৈতিক জীবনের দিকে মন দিয়ে ফেলেছিলাম। তার মানে এই নয় যে তখন আমার কবিতা লেখা হয়নি, প্রচুর লিখেছি, তবে পরের বই করার প্রশ্নে সেগুলোর মধ্যে বেশিরভাগকে আমার আর সংগ্রহযোগ্য বলে মনে হয়নি। মনে হয়েছে এগুলোর বিশেষ স্থায়িত্ব ও সার্বিকতা নেই। যেন একটা ইস্যুভিত্তিক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। প্রচুর বাদ দিয়েছি। এগুলো নিয়ে বই করা যায় না। তারপরে ৯৪-৯৫-এ এসে মনে হল, না, এবারে অন্তত কিছু কবিতা লিখিত হয়েছে যেগুলো বই হিসেবে গ্রন্থনযোগ্য। সেটাই আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, ‘উন্মেষ গোধূলি’। ইস্যুভিত্তিক রাজনৈতিক কবিতাগুলোকে avoid করতে গিয়েই মাঝখানে আমার এতগুলি বছর লেগেছে।

কিন্তু, মানে আপনার প্রথম বই থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে ক’টি কাব্যগ্রন্থ আমরা হাতে পেয়েছি, তাতে গোড়ার দিকে যেমন একটা সরাসরি আপনি একদিকে ভীষণভাবে নাগরিক, আবার একইসঙ্গে সেই নাগরিক মনোভাব থেকে প্রকৃতিকে অযথা চটকানো আপনার সহ্য হয় না। যেমন ‘কালো ধোঁয়া’।

ঠিক।

বা ‘পাহাড়ে’। এখানে আপনি ভীষণভাবে একথা স্পষ্ট করে বলেছেন। এমনকি চৌকিদারের কাছে এসে ক্ষমাও চেয়েছেন। আবার একইসঙ্গে এই তৃতীয় বিশ্বের প্রতি প্রেম ও তার দুর্নীতিকেও আপনি কিন্তু অঙ্গুলিনির্দেশ করতে ছাড়ছেন না কোথাও এবং একটা অসম্ভব তীব্র যন্ত্রণা… এই জঙ্গল থেকে মানুষের মানে মানুষ যে জঙ্গলকে শেষ করছে, আস্তে আস্তে জঙ্গল দূরে সরে যাচ্ছে, প্রকৃতি দূরে সরে যাচ্ছে, এই একটা জিনিস ভীষণভাবে ছেয়ে আছে। সেই জিনিসগুলো কি আপনি মনে করেন ‘উন্মেষ গোধূলি’-তে অন্যভাবে tackle করেছেন পরে?

না।

সরে এসেছেন তার থেকে?

না তা নয়। দুটো বইতেই কমবেশি যে সমস্যাগুলো addressed হয়েছে, প্রায় একই। প্রথম বইয়ে একটু বেশি রোমান্টিক। ভেসে যাওয়া। দ্বিতীয়টাতে বিষয়ে একটু নানাত্ব আছে, বলায় বেশি ঘনত্ব আছে। আমার মনে হয় এই-ই যা তফাৎ! যন্ত্রণা একই। এর মধ্যে বিভিন্ন অবস্থান নেওয়া, বিভিন্ন কর্ম করা ‘আমি’-টির সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন একই। কিন্তু আমি সে সময়ে বহু কবিতা লিখেছি যেগুলো একেবারে খবরের কাগজের heading ধরা। আমি যেন just react করছি একটা রাজনৈতিক দৃষ্টিতে। সেগুলোকেই বাদ দিতে চেয়েছি।

কিন্তু প্রতিটি বইতেই মানে প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই আপনার একটা যাকে বলে political message বা political understanding আছে। সেটা খুব স্পষ্ট, যেন কোনও একটা ব্যর্থতা, বা কোনও একটা স্বপ্নের হঠাৎ corrupt হয়ে যাওয়া। এই একটা ব্যথা আপনার একাধারে রয়েছে, একইসঙ্গে আপনি কিন্তু সেটার তুমুলভাবে তীব্র প্রতিরোধ করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন, এবং লেগে থাকছেন, ছেড়ে যাচ্ছেন না।

ঠিক।

যেমন এক্ষেত্রে আমার ভীষণভাবে মনে পড়ে, মানে যেমন ধরুন অসংখ্য কবিতা এখানে বলা যায়, সেগুলো বলে আর ভারাক্রান্ত করে লাভ নেই জিনিসটাকে, মানে যেখানে আপনি বলছেন ‘সামান্য জোগাড়ে’ অথবা যেখানে আপনি বন্দুকের নলের দিকে তাকিয়ে নিজের এবং নিজের কাজকর্মের হিসেব দিচ্ছেন। এই যে আত্মসমালোচনা, একটা আদর্শচ‍্যুত হয়ে যাওয়া, ‘আমার সেজদি কি বিয়ে করতে পারত না খনি শ্রমিককে?’ আপনি বলে ফেলেছেন কোথাও। এটা কিন্তু শেষ বইটা আমি বলব না। শেষ বইটা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্য একটা আলোচনা আমাদের প্রয়োজন। তার আগে অব্দি কিন্তু ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’-র মধ্যেও সেটা রয়েছে। আপনি কিন্তু ছেড়ে বেরোতে পারেননি।

না না খুব ঠিক কথা। এ নিয়ে আমার কোনও দ্বিমত নেই। কিন্তু তুমি আরও একটা কথা বললে যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ তা হল স্বপ্নের corrupt হয়ে যাওয়া। খুব ভালো বলেছ। এটা আমার চলাটাকে বোঝার জন্য একটা প্রধান চাবিকাঠি। Corrupt হয়ে যাওয়াটা কেন হয় সেটা ভাবতে ভাবতে তার পথ ধরেই বোধহয় আমার শেষ দিকের বইগুলোর কথা তুমি আলাদা করে উল্লেখ করছ, আমি সেইখানে এসে পৌঁছেছি। ‘আনন্দ-ভিখিরি’-তে সেই স্বপ্নের ভেঙে যাওয়ার গল্পটা আমি বেশ বলতে পেরেছি বলে আমার মনে হয়। ‘আনন্দ-ভিখিরি’ তোমার সঙ্গে নেই বোধহয়। বইটা কি তোমাকে দেব? দিলে সুবিধা হয়?

খুব সুবিধা হয়।

এতে দ্যাখো প্রতিষ্ঠান নিয়ে একটা লেখা আছে। ‘ক্ষমতাকেন্দ্র’ নামে। তাতে আমি লিখেছিলাম, ‘একটার পর একটা ক্ষমতাকেন্দ্রের বিরোধিতা করতে করতে, আমি শেষ পর্যন্ত আমার অহং-এর সামনে এসে দাঁড়িয়েছি।’ এই যে কথাটা  আমি বলতে পেরেছি এটা আমার কাছে খুব বড় ব্যাপার। এটা আমার বলার ছিল বলেই বোধহয় এতসব কিছুর মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। প্রথম বইটা থেকেই সম্ভবত এর একটা আবছা অনুভব পাওয়া যাবে। যেমন ধরো ‘ক্রমপলায়ন চিহ্ন’। বা দ্বিতীয় বইটাতে ধরো নাম-কবিতাটা, ‘উন্মেষ গোধূলি’। ‘তোমাকেই শুধু বুঝতে চেষ্টা করি সারা দিনমান’। এতে প্রশ্ন করা হচ্ছে, ‘কিসের উন্মেষ চাও? উদঘাটন?’ শেষ হচ্ছে, ‘ঘোড়ার কেশর ধরে কেন কাঁদো গোধূলি আলোয়?’ তা, ঘোড়াটার পিঠে চড়ে exactly কোথায় সে যেতে চায়? এখন মনে হয় বুঝতে পারি যে, সে ওই ক্ষমতায়নের বাইরে চলে যেতে চায়। একই জায়গায় পড়ে থেকে প্রতি-ক্ষমতা তৈরি করতে চায় না। তাই ঘোড়ার কেশর ধরেই শেষ কান্নাটা আমায় কাঁদতে হল। ‘ঘোড়া’ হয়ত গতির প্রতীক। চরৈবেতির প্রতীক। পরে ‘বিবাহ নোটিশ’ কবিতাতেও প্রতীকটা এসেছে। ঘোড়াই যেন আমাদের প্রকৃত বিবাহের দিকে নিয়ে যেতে পারে। গাড়ি পারে না।

হর্স পাওয়ারটা কোথাও কাজ করছে।

যেটার জোরে সে মাধুর্যের দিকে, বা ক্ষমতায়নের বিপরীত দিকে, সবকিছুকে ভেদ করে তীব্রভাবে চলে যেতে পারে।

আপনার বেশ কিছু কবিতায় এটা লক্ষ করেছি যে প্রশ্ন করা, তীব্রভাবে সন্দেহ করা, অপমান করা এবং সরাসরি একেবারে যাকে বলা হয় যে এক ধরনের নোংরামোকে স্পষ্টত চিহ্নিত করে তার ব্যবচ্ছেদ করে দেওয়া আর কি, রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। এটা আপনার কবিতায় ভীষণভাবে পাওয়া যায়। যেমন আপনার প্রথম বইতে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ বলে একটি কবিতা আছে সেখানে আপনি স্পষ্ট বলেছেন:

‘মদ কম! আজও মদ কম! আজও অসন্তোষ দেখা দেয়
তোমাদের নিয়োজিত অধিকর্তা জানে
শ্রম দাবি মেটালেই প্রকৃত শাসক হওয়া ভার।

গির্জার সম্মুখে হিংসা অভ্যেস করা মানা।
ওরা তাই গির্জার পেছনে বর্শা বল্লম নিয়ে খেলে।’

তারপর আপনি ‘উন্মেষ গোধূলি’তে অদ্ভুতভাবে বলেছেন দেখুন:

‘যতটা পারছি সরল করে বলার চেষ্টা করে যাচ্ছি, খুব সহজ নয়,
এই কথা প্রযোজ্য মোহনপুর জুটমিল সম্পর্কেও,
যা একবার বন্ধ হচ্ছে, একবার খুলছে।’

তারপর তো বলার অপেক্ষাই রাখে না যে পুরুলিয়া কবি সম্মেলনে আপনি কী সাংঘাতিক আক্রমণ করেছেন। এই আক্রমণ বা এই ধরনের কবিতা একজন কবি হিসেবে আপনি লিখছেন, কখনও মনে হয় না যে এর থেকে অপ্রিয় হয়ে উঠতে পারি, আরও জনবিরল হয়ে উঠতে পারি, আরও একাকীত্ব জীবনে ছেয়ে আসতে পারে?

এটা ভালো প্রশ্ন করেছ। রিস্কি গেম ছিল ভেবে দেখিনি। তবে বাস্তবটা এই যে, অভিনন্দনই পেয়েছি। আসলে কী জানো, তৈরি হওয়া একটা ব্যবস্থার মধ্যে এমন অমোঘ অসঙ্গতি থাকে, চোখে পড়লে সেটাকে আক্রমণ করতেই হয়। নিজে তার শরিক হলে নিজেও আক্রান্ত হব, সেটা জেনেও আক্রমণ করতে হয়। এখানে ব্যক্তি বড় কথা নয়। পুরুলিয়ার মতো একটা প্রত্যন্ত জায়গায় মূলত কলকাতা থেকে যাওয়া কবিরা স্টারডম এনজয় করেছি, এটা হাস্যকর নয়? ওদের কষ্টে সংগৃহীত টাকায় মদ-মুরগি করছি, রাগ ধরবে না? এটা বোধহয় পঞ্চাশীদের মনোমতো একটা ব্যবস্থা। সত্তুরেরাও প্রথমদিকে প্রভাবিত হয়েছিল। অনৈতিকতাটা ক্রমশ বুঝেছে। ব্যক্তি বড় কথা নয়। যারা আয়োজক ছিল, সৎভাবে করেছে। যাঁরা অতিথি ছিলাম, বাংলা কবিতার প্রসারে সৎভাবে গিয়েছি। কিন্তু ব্যবস্থাটার মধ্যেই যেন একটা সৌন্দর্যের অভাব! পরে আমার ওই দলের বন্ধুরাও বলেছে, ‘ওটা আমাদের সকলের কথা। তুমি আমাদের হয়ে লিখেছ। তোমাকে ধন্যবাদ।’ লক্ষটা যদি নৈর্ব্যক্তিক হয়ে তবে আপাত নিশানা যারাই হোক তাদের কাছে আক্রমণকারী যে সবসময় অপ্রিয় হয়ে যায় তা নয়। সকলেই হয়ত নিজেকে আক্রমণ করার একটা ভাষা চাইছে।

মানে একটা খুব বড় রাজনীতির প্রেক্ষাপট রয়েছে, সেখানে যে একটা পুঁজির খেলা আছে, সেখানে যে একটা শ্রেণিকে আর একটা শ্রেণি অপমান করছে, নিষ্পেষণ করছে, সে তো আছেই; কিন্তু আপনার কবিতার মধ্যে প্রত্যেক মুহূর্তে যেটা দেখা যায় যে খুব ছোট ছোট মাপে মানুষ যখন তার পাশের মানুষকে অপমান করে ফেলে সেটা একটা ভয়ংকর, এবং সেই জায়গাটাকে আপনি খুব ভয়ংকরভাবে address করেন আর আপনার observation ভয়ংকর, সেই ব্যাপারে পরে আসছি আমরা। তো এই যে ছোট ছোট অপমানগুলো এটা কি সুবিধা হয়েছে যে উত্তর কলকাতার এরকম একটা পুরনো পাড়া, সেখানে এত বিচিত্র মানুষের বসবাস, এত কথাবার্তা, এর মধ্যে থাকার থেকে কি কোনও রসদ পেয়েছেন?

হ্যাঁ, সে তো নিশ্চয়ই! আমি জীবনকে দেখতেই শিখেছি ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’-র মধ্যে দিয়ে। ওই শিরোনামে সিরিজ লেখার অনেক আগে থেকেই। আমার দেখার বোধ শুরু হওয়ার কাল থেকেই। তো তুমি যেটা বললে, ছোট ছোট অপমান, তার তীব্রতা আমি এখান থেকেই দেখেছি। বড় বড় ব্যাপারগুলোর, যেমন শ্রেণি জাতি ধর্মটর্মের বৈষম্যজাত মনোব্যাথাগুলোর বড় বড় আলোচনাস্থল রয়েছে। কিন্তু অনেক ছোট বিষয় বড় ছকের মধ্যে আসে না। তাদের তীব্রতাও কিন্তু বিমূঢ় করে দেয়। শিক্ষিতা, সম্পন্না ভূগোল দিদিমণি আর একটা-ঘরে-ভাড়া-থাকা সদ্য বড় হওয়া ছাত্রী। দিদিমণির কোনও সচেতন দোষ নেই। তিনি প্রেগন্যান্ট। পড়া পারে না বলে ছাত্রীকে বকেন। এতে ছাত্রীটির নারীসত্তা যেন কাতরে উঠছে। ভাবা যায়! কোথা থেকে উৎসারিত হয় কিছু অপমানবোধ। আমি গভীর মরমে ভেবেছি আর সামান্য চেষ্টা করেছি ভাষায়।

আপনি কি কবির কোনও বিশেষ ভাষা, এতে বিশ্বাস করেন? একজন কবির একটি ভাষা হতে হবে? একটিই ভাষা?

আমার কবিতা পড়ে কী মনে হয়?

আমি তো আপনার কবিতায় দেখেছি যে এক একটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এক একটা ভাষা উঠে আসে।

শুনে ভালো লাগছে, কেননা এরকমটাই বোধহয় আমার মনোগত ইচ্ছে ছিল। ইউনিক কিছু নয় হয়ত, অনেকের লেখাতেই পাওয়া যেতে পারে। আমারও সেভাবেই লিখতে ভালো লাগে। ভীষণ বর্ষার সামনে দাঁড়িয়ে ব্রজবুলিতে বলে উঠতে : বাদারিয়া ঘেরি আয়ি চারহু ঔর কারি। এটা বলা ছাড়া বোধহয় কোনও উপায় ছিল না আমার। আবার তিরিক্ষে কোলকাত্তাই ভাষ্যে ‘কয়লাটা ভাঙ না বাঞ্চো’ পাশাপাশি বলতে ভালো লাগে। আসলে যে বিষয়কে আশ্রয় করে ভাবনাটা খেলা করে, ভাষাটা সেরকম না হলে মজা হয় না। তবে এসবের সম্পূর্ণ উল্টোদিকও আছে। ধরা যাক রামপ্রসাদ সেন কি চাররকম ভাষায় লিখেছেন? সেই তো শুরু থেকে শেষপর্যন্ত মা মা করে কেঁদে ভাসিয়েছেন। তবু তো সেই শুনেই আমরাও কেঁদে ভাসাচ্ছি আজও। সুতরাং একজন কবি যে কিভাবে operate করবেন এটা ঠিক determinable নয়। আমার কবিতায় অনেকবার বাঁকবদল হয়েছে। অনেকের কবিতার আদৌ হয়নি। তাঁদের লেখাও আমাদের সমান প্রিয়। কবিতায় কোনও must নেই।

মানে একজন গোয়েন্দার কাছে পরবর্তী কেসটা ঠিক কী; সেটা বুঝে সে তদন্তে নামবে, তারপর সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে। আরও একটা জিনিস, এটা বিভিন্ন জায়গায় তর্ক-বিতর্কের ক্ষেত্রে আসে; শাশ্বত, অনন্ত, সত্য। আপনার কোনও সত্যের সন্ধান আছে?

হ্যাঁ, আমার একটাই সন্ধান আছে, সেটা হল সেই reference frame, যার পরিপ্রেক্ষিতেই সব সত‍্যাসত‍্যের থাকা না-থাকা। আকাশে আনন্দ না-ই থাকলে মাটির জগতে কেই বা সুখী দুঃখী হত। আমি হয়ত তাকে ছুঁতে পারছি না! কিন্তু তা আমাকে ছুঁয়ে না থাকলে কোনও কবিতা লেখাই বোধহয় সম্ভব হত না। শাশ্বত, সত্য বা পরমার্থ যা-ই বলো না কেন, আমাদের সমস্ত কর্ম ও ভোগবাসনার ব্যাখ্যা ওইটি-ই।

এই সূত্রেই, এই যে একটা খোঁজ ক্রমাগত চলেছে যেটাকে ঠিক ধরা যাচ্ছে না; কিন্তু তার উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে, এবং সেখানে আমি যদি এভাবে দেখি; আপনি এখানে একটু আগে যেটা উল্লেখ করলেন ‘ক্রমপলায়নচিহ্ন’ কবিতায় বলেছেন:

‘আজও তো বুঝিনি বিপ্রদাস, কি যে তাড়া করেছিল!
আমি সৈকত কাঁকড়ার মতো আতঙ্কে উন্মাদ হয়ে,
এক গর্ত থেকে আরও অন্যতর গর্ত লক্ষ করে,
ক্রমাগত ছুটে গেছি,
আজ বল তবে নির্ভুল গর্ত কি তুমি পেয়ে গেছ?
পিছু তাড়া থেমে গেছে? প্রাণ!
এক ঢেউ সরে গেলে পরবর্তী তরঙ্গের আগে,
সৈকতে যে মুহূর্তের নিখিল স্তব্ধতা জেগে ওঠে।’

আবার ‘পাগল’ কবিতাটায় আপনি বলেছেন:

‘তুমি কি মেঘের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে জানতে চেয়েছ
লতা, গুল্ম, চিল, ঘুড়ি, জলছবি, ঘষা কাঁচ,
বাঁচার সীমানা ঘিরে যেসব সামগ্রী পড়ে আছে
তাদের কুড়িয়ে না নিয়ে বড় ভুল হয়ে গেছে!’

এই সন্ধানের সঙ্গে আপনি যখন বাস্তব সত্য যেটা লোক দেখছে অথচ অস্বীকার করছে, বারবার আপনার কবিতায় উঠে এসেছে, যে, তোমার চোখের সামনে মানুষ মানুষকে ফুটপাথে শুয়ে থাকতে দেখছে; তুমি পেরিয়ে যাচ্ছ কথা বলতে বলতে। তুমি একটা সত্য আছে জেনেও তাকে অগ্রাহ্য করছ। এই দুটোর মধ্যে রিলেট করা যায় কি? নাকি এটা একটা সম্পূর্ণ poetic search, আর ওটা একটা বাস্তব?

না, দুটো আলাদা, যদি এভাবে দেখা যায় যে একটা কাব্যিক একটা বাস্তব। কিন্তু কাব্যিক ও বাস্তবের মধ্যে এভাবে ভেদরেখা টানা খুব শক্ত। আমি টানি না। স্থায়ী ও তাৎক্ষণিকের মধ্যেও একই কথা। কিন্তু আমাদের আবহে সবসময়ই যেন বলে চলা হয় যে তাৎক্ষণিকই বাস্তব। বাস্তবই সত্য। এখন, এটা একটা ডাইকোটমিক চেতনায় পড়ে যাওয়া। আর এই চেতনায় পড়ে গেলেই তুমি reference frame মিস করবে। তখন কোনও কিছুই স্থায়ীও না তাৎক্ষণিকও না। কাব্যিকও না বাস্তবও না। শুরুতে এইটা, এই ডাইকোটমির মধ্যে পড়ে যাওয়াটা avoid করার কথাই আমি বলতে চাইছিলাম। স্থায়ীকে উপেক্ষা করে তাৎক্ষণিক লিখলে তা খবরের কাগুজে ব্যাপার হবে। সর্বব্যাখ্যাস্বরূপ Ref-frame নিয়ে যাদের কোনও মাথাব্যথা নেই। যেমন western বা আধুনিক concept। যা কিছু ইন্দ্রিয়ে পাওয়া যায় না বা বুদ্ধিতে কুলোয় না এরা বলে দেয় metaphysical বা  mystic বা কাব্যসত্য। এসব দিয়ে নাকি কোনও জ্ঞান সংক্রান্ত কারবার চলে না। এইটা আমি মানি না। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘অসীম কালের যে হিল্লোলে জোয়ার ভাঁটায় ভুবন দোলে, নাড়িতে মোর রক্তধারায় পেয়েছি তার টান’ সেটা রায়-ত্রিবেদীতে রক্তপরীক্ষা করে বোঝা যাবে না বলে তুমি যদি বলো যে এগুলো মেটাফিজিকাল, মিস্টিক, কাব্যসত্য, বাস্তব নয় এবং জগজ্জীবন সম্পর্কে সত্যজ্ঞান পাওয়ার প্রশ্নে এগুলোর কোনও দরকার নেই, দরকার আছে কেবল ইন্দ্রিয় ও বুদ্ধি দ্বারা পরীক্ষণীয় ‘বাস্তব’ প্রস্তাবনার, আমি সেটা একদম মানি না। কিছুদিন হল আমার একটা প্রবন্ধের বই বেরিয়েছে ‘ধ্যানবিন্দু’ থেকে, ‘ভাষাত্মদর্শন’ নামে। সেখানে আমি এই উপনিবেশি জ্ঞানতত্ত্বকে, এই জ্ঞানসংক্রান্ত মডার্নিস্ট প্রজেক্টটাকে, এই রাসেলীয় অবস্থানটাকে আগাগোড়া চ্যালেঞ্জ করে গেছি। আমি পো.ম. পো.ক. কিছু নই। ‘থিওরি অফ নলেজ’-এর প্রশ্নে স্বেচ্ছাচারী।

এই উচ্চারণের সাথে সাথেই তো পাঁজরের মধ্যে এক ধরনের শিরশিরানি অনুভূত হয়। আমরা কেঁপে উঠি।

ঠিকই তো! Physical ব্যতীত metaphysics-এর আলাদা কোনও স্টেটাস নেই। Meta-বাস্তবকে অবাস্তব বলার কোনও জায়গা নেই। বলতে যদি হয়, তবে অন্য জায়গা, অন্য পরিসর খুঁজতে হবে। শাস্ত্রবাক‍্যার্থবিচারের পরিসর, তার সম্ভাবনা এসব খুঁজতে হবে। সেসব খুব কঠিন ভাষাদার্শনিক ব্যাপার, আপাতত থাক। কিন্তু উপনিবেশি, মডার্নিস্ট প্রোজেক্ট বহুভাবে আক্রান্ত হলেও দুঃখের বিষয় যে, আমি কখনও দেখিনি ওই মূল জ্ঞানতাত্ত্বিক নির্মাণটাকে, রাসেলিয়ান পজিশনটাকে পোস্টমডার্ন পোস্টকলোনিয়ালদের দিক থেকে কেউ আক্রমণ করছে। কিন্তু ওই জায়গায় সমাধান না করলে আমাদের, সারা জগৎব্যাপী আমাদের, জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তি সম্ভব নয়। উপনিবেশ, আধুনিকতার বাইরে যারা তাকাতে চান তাঁদের এটা বোঝা দরকার। ওই একবগ্গা জ্ঞানতত্ত্বটাতে আমি ভীষণভাবে অত্যাচারিত বোধ করেছি। আমি একটা জগৎ জুড়ে জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তির স্বপ্ন দেখি। তো, তুমি যদি কাব্যিক আর বাস্তব দুটো খোঁজের কথা বলো, আমি বলব দুটোই একই জায়গায় ওতপ্রোত হয়ে আছে। দুটো দুই নয়।

আপনার কবিতায় তো রসিকতা ছত্রে ছত্রেই রয়েছে, এবং সেটা একেবারেই আপনার স্বভাবসিদ্ধ। মানে ‘ডাকবাংলোর প্রেম’-এ

‘হ্যাঁ হ্যাঁ সঙ্গে আছে চাল, ডাল, মুরগি পাইনি।
হাট উঠে গিয়েছিল। মদ আছে পর্যাপ্ত।’

বলার পরেই আপনি বলেছেন; ‘মোটামুটি হয়ে যাবে!’। এই যে humor বা কোথাও একটা আমরা যেভাবে কথা বলি সেই কথা বলার মানুষের দুঃখ, ঘৃণা, শ্লাঘা সব সব মিশে থাকে। এইটা কি আপনি খুব সচেতনভাবেই করেন? নাকি এটা আপনার সহজাত বলে মনে হয়?

না এটা স্বতঃস্ফূর্তই। যখন আসলে যে বিষয়টা মনে পাক খেয়ে খেয়ে ভাষা পায় ওর মধ্যে দিয়েই চলে আসে। পরিকল্পিতভাবে তৈরি নয়। ওই কবিতাটা যখন মাথায় আসছিল তখন নিশ্চয় তাতে ‘মোটামুটি হয়ে যাবে’ কথাটা ছিল না। কিন্তু end product হিসেবে যখন আসছে তখন মনে হচ্ছে ওগুলো অনিবার্য ছিল। আর রসিকতা মর্মে বেঁধার কাজটাও ভালো করে।

আরেকটা জিনিস যে; বাংলা ভাষার প্রতি আপনার একটা জাত্যাভিমান তো আছেই এবং বাংলা ভাষাকে নিয়ে আপনি গর্বিত। সেটা ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’-তে খুব স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

‘তাদের সন্তানরা দুরান্তের সন্ত বিদ্যালয়ে বা পয়েটে শিক্ষা নেয়,
কেউ এদিকে আসে না,
মা তোমার ভয়ে তারা কোথায় পালিয়ে যায় ভাবো।’

আমার একটা প্রশ্ন; এই ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ এটাকে আপনি কেন প্রবন্ধ আকৃতিতে লিখলেন না? এটা তো প্রবন্ধ হতে পারত?

এটা এতটা প্রবন্ধধর্মী ছিল বলেই পরে যখন আমার কবিতা সংগ্রহ হয়েছে আমি বইটা থেকে কিছু নমুনা মাত্র পেশ করেছি। সবকটা লেখাকে দেওয়ার মতো মনে হয়নি। এর অনেক কিছুই পরে আমি প্রবন্ধে লিখেছি। ছোটখাটো কাগজে ছাপাও হয়েছে। তবে বাংলাভাষার প্রতি যে ভালোবাসার কথাটা বললে তার মধ্যে ঠিক chauvinism ছিল না। ‘জাত্যাভিমান’ কথাটাকে যদি chauvinism-এর সমান্তরাল ধরি। ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’-তেই আছে কিন্তু এই লেখাটা:

‘পৃথিবীর সব ভাষা সুমহান, শুধু মাতৃভাষা
              ওরকম কিছু নয়…
পৃথিবীর সব ভাষা সুমহান কিন্তু মাতৃভাষা
মহত্বের কারণে নয়, দুঃখিনী মায়ের মতো হৃদে
বিঁধে থাকে সন্তানের, গোপন ব্যথার মতো বাজে।’

আপনার বেশ কিছু লেখা পড়লে পাঠক হিসেবে মনে হয় যে এগুলো আপনি অচেতনে লিখেছেন। পেনটা চলে গেছে। আমি খুব স্পষ্টত কিছু কবিতার কথা বলি; ‘স্বীকারোক্তি বন্দুকের নলকে’ আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বালি ও তরমুজ’ থেকে, ‘মফস্বলের বাস’। ‘উন্মেষ গোধূলি’-তে ‘পলাতক’। ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’-তে তো প্রচুর; যেমন ধরুন; ‘পাথরের গলি দিয়ে টানা রিকশা’, ‘শালা অকৃতজ্ঞ বল তোর মাকে’, ‘শিককাবাব খুশবুখাস দিল চুরাইস হ্যারিসন রোড’, ‘উড়েদের ছেলেটা সিংহ সেজেছে’, ‘আমাকে যে কী বলতে চায়’, ‘ভজনবাবু বই লেখেন’ এগুলো একজন কবিই জানেন যে তিনি কখন ডুবে গেছেন তিনি জানেন না। একসময় মুখ তুলে দেখলেন একটা কবিতা লেখা হয়ে গেছে। আবার কিছু কবিতা আছে আপনি concious। আপনি জানেন যে এর পরের স্তবকটার আগে হয়ত গালে হাত দিয়ে দু-মিনিট ভাবতে হবে। এটা কী ঘটে?

ঠিকই বলেছ। ‘পলাতক’ বা উত্তর কলকাতার ‘আঁখি আধেক খোলার পর’ এগুলো লেখার পর যেন বুঝেছি যে, লেখা হল। ফেলে রেখেছি বহুদিন। তারপর যখন সমালোচক দৃষ্টিতে passable মনে হয়েছে, ছেপেছি। তুমি যেটা বললে, অবচেতনে লেখা হয়ে যায়। এটা ঘটনা, অতিরঞ্জন নয়। অনেক লেখা আছে, যেমন ‘উন্মেষ গোধূলি’-তে ‘বলো কার্য কিভাবে সাধিত হতে চাও?’ খুব সচেতন নির্মাণে এগুলো লেখা কঠিন। পরে আমি আমার সচেতন নির্মাণধারার সঙ্গে এদের সঙ্গতি পেয়েছি তাই লেখাগুলো আছে। ধরো ‘ভজনবাবু বই লেখেন’ বা ‘হ্যারিসন রোড’-এও একটা দেখা, একটা প্রত্যক্ষ কোথাও কাজ করে। কিন্তু ‘বলো কার্য’ বা ‘আঁখি আধেক খোলার পর’ এগুলোর মধ্যে তেমন কিছুর অভাব। ফলে এ লেখাগুলো তোমার প্রশ্নটাকে justify করে।

কিন্তু দুটোই কবিতা। কোনও দল যদি মনে করে কেবল অবচেতনেই কবিতা হয়, তা বোধহয় সত্যি না?

না মনে হয়।

আরেকটা কথা প্রসুনদা। যেমন ধরুন একটা কবিতা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল ‘প্রস্তুতি’ আপনার ‘উন্মেষ গোধূলি’-র লেখা। সেখানে প্রথমে একটা বর্ণনা চলেছে তারপর আপাতভাবে আলাদা মনে হবে শেষ স্তবকে; আবার দেখা যায়, আসলে এটা একই গল্প। আপনি বর্ণনা করেন, সমালোচনা করেন, নির্দেশ করেন কিন্তু আপনি ক্রমমুক্তি যে কীসে হবে সেটা নির্দেশ করেন না। কারণ কী? এটা কি আপনার বিনয় নাকি আপনিও সেটারই সন্ধানে?

আসলে যে যন্ত্রণাটা, অজ্ঞানই তো তার কারণ। মুক্তি আমি নির্দেশ করব কী করে, আমার জন্য তো সন্ধান! সন্ধানের মধ্যেই মুক্তির একটা ভাব থাকে। মুক্তি কীসে হবে তা আমি নির্দেশ করলে সন্ধানী কাব্যের হানি হয়। মানুষের সারাদিনের এত কাজ যেন রাত্রে শুতে যাওয়ার আয়োজন। আবার, মানুষের গোটা জীবনটাই একটা অন্তিম শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি মাত্র যার থেকে আমরা কেউ বিচ্যুত নই। একই যাত্রা। কত বিভিন্নতা! কিন্তু একটা একাত্মতা বোধ হয়। অন্তিম শয়নের প্রস্তুতির মধ্যে। একাত্মতাতেই মুক্তির ভাব। উদ্ভাস।

আপনার একটা কবিতা খুব ব্যতিক্রমী মনে হয়। আপনার কবিতা পড়লে বোঝা যায় আপনি কোনও না কোনও সময় এটা লিখেই ফেলতেন, সোজাসুজি বলেই দিতেন কথাটা; ‘আমার মেয়ের বিয়ের ঝলমলে’। এখানে আপনি এত স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করলেন, সাম্প্রদায়িক ধান্দাবাজি ও ধর্ম বিষয়ে আপনার যে ব্যঙ্গাত্মক ও রগুড়ে মনোভাব। এটা কী কোনও বিশেষ কারণে লিখেছিলেন নাকি এসে গিয়েছিল?

আসলে রগড়টা কবিতায় নিহিত আছে ধর্মকে আমাদের সাদামাটা দৃষ্টিতে দেখার মধ্যে। খুব কথ্য প্রাত্যহিক ভাষার মধ্যে এনে ফেলে দেখার মধ্যে। যে আবহে আমরা বেড়ে উঠি তাতেই অনুষঙ্গগুলো থাকে। এরকম, আমার বাড়িতেই কিছু একটা অনুষ্ঠান ছিল। একটা বিড়ি খেতে বেরিয়ে আমি দেখলাম গায়ে একটা চাদর, ধুতি পরা, সবই খুব ময়লা; শীর্ণকায়, পেটটা ভেতরে ঢুকে গেছে, নিকষ কালো এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ জুলুজুলু করে তাকিয়ে আছে দুটো খাওয়ার আশায়। পৈতেটা কোমরের ওপর সামান্য দেখা যাচ্ছে। তা ভেপার ল্যাম্পের আলোয় আমার হঠাৎ মনে হল, সোনার পৈতে! আর এর সঙ্গে একটাই অনুষঙ্গ আসে, নারায়ণ শিলার। আমার পরিবারে শালগ্রাম শিলা বহু পুরুষ ধরে নিত্য দুবেলা পূজিত হন তো। মনে হল, নারায়ণ! নারায়ণ! তাঁকে আমি ভোজবাড়ি থেকে এনে বিবিবাজারের আসগর চাচার বানানো বিরিয়ানি ভোগ নিবেদন করলাম। তিনি খেলেন। মনে হচ্ছিল তাঁর কৃপাতেই আস্তিকতা নাস্তিকতা সব। নারায়ণকে বিরিয়ানি খাওয়ালাম তো! মনে মনে আমি আশীর্বাদ চেয়েছিলাম, এই নাস্তিকতা যেন বেঁচেবর্তে থাকে। আসলে ধর্মকে দূর থেকে দেখলেই খুব বদমায়েশ, সাম্প্রদায়িক এসব মনে হয়। কিন্তু নানারকম সংস্কারগুলোকে আ্যলিয়েনেট করে বাঁচতে গেলে জীবনের কোনও সৌন্দর্য থাকে না।

না একটা জিনিস জিজ্ঞেস করি; আপনি আপাদমস্তক একটা নাস্তিক লোক। আমি জানি না। আপনার কবিতা তাই বলে, হয়তো তাও বলে না স্পষ্টত। আপনি নাস্তিক না আস্তিক কেউ জানে না, কিন্তু এই যে এই গরিব ‘দরিদ্র নারায়ণ’-কে দেখা; এর মধ্যে কি কোথাও আপনার ব্রাহ্মণ‍্যবাদ কাজ করে গেছে?

এটা খুব সরলীকরণ হয়ে যাবে। আবার ওই দূর থেকে দেখার ফাঁপরে পড়ে যাবে। যখন কিছু ডিভিসিভ হয়, ব্রাহ্মণ‍্যবাদ-টাদের প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-ও তো ব্রাহ্মণকথাই। ‘মা হিংসাত সর্বভুতানি’ কাদের বার্তা? আমিও ওই সমন্বয়ের ভাষাতেই কথা বলার চেষ্টা করেছি। পলিটিক্যাল সেকুলারিটি থেকে তাই তার মোড, অপারেশন সবই আলাদা। কিন্তু ধর্মকে প্রাণের কাছে এনেই বিভেদের সমাধান করতে হবে। বিভেদবাদের বিরুদ্ধে আমি তীব্রভাবে কথা বলেছি ‘উন্মেষ গোধূলি’-তেই। ‘পূর্বপুরুষদের অভিশাপ’ লেখাটা পড়ো। ‘তোমার ছায়া ধরে কে টানছে’। তবে পরে এই একান্তিক ঘোরটা আমার কেটে গেছে। আসলে, পূর্বপুরুষদের কথাকে একটা অন্ত থেকে পাঠ করে, মনগড়া পাঠ করে আমি মনে করেছি যে তাঁরা বোধহয় আমার আধুনিক সেকুলার পলিটিক্যাল আইডিয়ালসকে অনুমোদন করবেন না। কিন্তু সত্যিই এরকম কোনও ডায়লগ তো হয়নি। তাহলে বলতে হয়, আমারই বিভেদচিন্তা থেকে ডায়লগটা তৈরি হয়েছে! ভুয়ো! পূর্বপুরুষদের কথাকে নিশ্চিতভাবে ‘ব্রাহ্মণ‍্য’ ইত্যাদি একটা ‘বাদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আমিই ছায়ার সঙ্গে লড়ে মরেছি। এবং তাঁদের কথার সমন্বয়ী সারাংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এতে কারওই কোনও উপকার নেই। ক্রমশ আমার বিভেদ দৃষ্টিভঙ্গিটা নানান ভাবনার মধ্যে দিয়ে স্বতই পাল্টে গেছে।

কলকাতার থেকেই আবার শুরু করব আর কি। প্রসূনদা আপনার বহু কবিতায় ও ‘উত্তর কলকাতার কবিতা’ তার নামকরণ থেকেই, প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকেই এই যে পুরনো কলকাতা, কলকাতার পাড়া, সমাজ ভীষণভাবে আপনাকে আক্রান্ত করেছে এবং আপনার মধ্যে দিয়ে সে যেন প্রস্ফুটিত হতে চায়। এখানে যেমন ধরুন ‘উত্তর কলকাতার কবিতার’ সেই আঁকশিওয়ালা একজন মানুষ গলির ভিতর আসত এবং উঁচু উঁচু সুইচ অন করে সন্ধের মুখে চলে যেত তার সম্বন্ধে আপনার লেখা। বা ধাঙড় বস্তিতে গিয়ে হোলির বাঁদুড়ে রং। এখানে লিখতে লিখতে হঠাৎ বলেছেন, ‘দেখছি চায়না পাল মাথাঘষা সেরে বারান্দায় মেলে দিচ্ছে বেগুনি ছোপ লাগা ব্রা।’ বা ধরুন ‘আমার মেয়ের বিয়ের ঝলমল’-এ তো আছেই; ‘কাকে শুইয়ে দিয়েছে গো নাকে তুলো চোখে তুলসীপাতা?’ এই অদ্ভুত বাচন, সত্যি কথা এগুলো। ‘পাথরের গলি দিয়ে টানা রিকশা’ থেকে শুরু করে ধরুন শিককাবাব, ‘উড়েদের ছেলেটা সিংহ সেজেছে’ ‘ভজনবাবু বই লেখেন’ অবশ্যই এবং যদি শেষ বলি ‘সবুজ দরজা’। এই কবিতাগুলো, মাত্র কয়েকটা বললাম। আপনি জানেন যে আরও ছড়িয়ে আছে সর্বত্র; আপনার এই কলকাতা, তার পাড়া, তার সমাজ এগুলো সত্যি না হলে তো এভাবে উঠে আসতে পারে বলে মনে হয় না।

তা তো অবশ্যই। আর আমি লিখন ভঙ্গিমাটাও ধারাভাষ্যের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করেছি বেশিরভাগ জায়গায়। কাব্যিকতা এর সংস্থাপনের মধ্যে আছে। পরে জেনেছি বেদবাক্যের ধরনবিচারের শাস্ত্রে এই স্টাইলকে বলে ‘অনুবাদ’। যথা ‘অগ্নির্হিমস‍্য ভেষজম’। আগুন শীতের ওষুধ। কিছুই না হুবহু ফ্যাক্টই বলা হচ্ছে। কিন্তু দারুণ কাব্যিক, শুধুমাত্র সংস্থাপনের জোরে। এই স্টাইলটা আমার দারুণ লাগে। ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’-তে আমি যা আ্যচিভ করতে চেয়েছিলাম তা এই কমেন্টারি স্টাইলটার জোর ছাড়া সম্ভব ছিল না। আসলে বিচ্ছিন্নতা আমার চক্ষুশূল। সরাসরি সম্পর্ক ছাড়া আমি পারি না। যে অঞ্চলে আমার থাকা, তার আনাচ-কানাচ অলি-গলির সঙ্গে যদি একটা স্পষ্ট একাত্মতা লেখালেখিতেও কিছুটা অনুভব করতে না পারি আমার মনে হয় আমার সামগ্রিক কবিত্বই ব্যর্থ। এই প্রত্যক্ষ স্থানিক মাখামাখিটা অনেক কবিরই ‘উপাস্য’ বলে না-ও মনে হতে পারে নিজ নিজ কবিকৃতিতে। কিন্তু আমার ধাঁচের পক্ষে এই ধারাভাষ্যের স্টাইলটা ছাড়া… তুমি একটু আগে বলছিলে ‘শোন ভাইপো’ কবিতার কথা।

আমি শোন ভাইপোর প্রসঙ্গটায় একটু পরে আসছি। এই কলকাতা বিষয়ক অন্য কোনও কবি বা তার কবিতাতে কলকাতা এইভাবে তার গলির ভাষা, গলির মানুষের কথা, তার দৈনন্দিন জীবনযাপনের ওঠা পড়া ছোটখাটো খিস্তি-খেউর অদ্ভুতভাবে মিশে রয়েছে।

হ্যাঁ, ওই যে রাস্তার আলো জ্বালানো মানুষটি…

আপনি বলেছিলেন একদিন খেলা শেষে ফিরে এসে তাঁকে ভগবান মনে হয়েছিল।

একদম, একদম ঠিক। কবিতাটির বীজ ছিল আমার ৮-১০ বছর বয়সের অনুভবে। তখন আমার কোনও সংশয় ছিল না যে ভগবান আছেন। এবং নিশ্চয়ই কোনওদিন কোনও-না-কোনও রূপে দেখতেও পেয়ে যাব তাঁকে। এবং সেই আমার প্রথম ভগবান দর্শন। এখন, বলো এটা কাব্যিক না বাস্তব। একদিন খেলা শেষে বাড়ি ফিরছি, ফাঁকা গলি, দেখি একটা লম্বা লগি দিয়ে বাড়ির সামনের আলোটা জ্বেলে দিলেন টুক করে। রোজই দেখি। সেদিন মনে না হয়ে পারল না, এরকমই হবেন, সন্ধেবেলা আলো জ্বেলে দিচ্ছেন, আপাতত এটুকুই তাঁর কাজ বোধহয়। কিন্তু এভাবে তো লেখাটা লেখা হয়নি, তাই আলোর জায়গায় কবিতায় ‘তারা’ শব্দটা এসেছে ভাবনাটাকে ধরে রাখতে। বা ‘লিখে’ দেওয়ার কথাটা।

বা ধরুন এই যে ‘চায়না পাল’। এরকম নাম যদি সত্যিই না থাকত তবে কি কেউ কল্পনা করে এরকম লিখতে পারত?

শুধু কল্পনায় লেখা মুশকিল। নামগুলো সত্য। একটু এদিক-ওদিক করা। এরা সব আমার বন্ধু-বান্ধবী। এদের সঙ্গে ছোটখাটো প্রেম, খুনসুটি, অল্পবয়সী যৌনতা সব মাখামাখি হয়ে আছে। ওইভাবেই হোলি খেলা।

তারপর ওই চায়ের দোকান। ভজনবাবু। সে-ও তার মানে বাস্তব।

নিশ্চয়। ওই হোলির বাদুড়ে রং, ধাঙড় বস্তিতে তাসা, মদ, শুয়োরের মাংস, তুলকালাম। ওখান থেকেই, আগের রাত থেকেই হোলিটা শুরু হয়ে যেত। বসন্তের মর্মবেদনাটা টের পাওয়া যেত।

একই সঙ্গে ‘উড়েদের ছেলেটা সিংহ সেজেছে’ কবিতায় এই ভাষাটাও তো সরাসরি আপনি বসিয়ে দিচ্ছেন।

যতটা সম্ভব। এমনকি তথাকথিত দু-একটি আপত্তিকর শব্দ বসাতেও আমার হাত কাঁপেনি। কারণ নইলে বোধহয় ঠিক প্রতিধ্বনিটা হত না।

এই করতে করতে যখন ‘সবুজ দরজা’ দেখছি, একটা পুরনো একান্নবর্তী কলতলা বাড়ির বিবরণ দিচ্ছেন। পাখিটাকে তুলে আনছেন ছাদের ঘরে। এখানে আমার একটা প্রশ্ন আসে একদম শেষে আপনি বললেন দুটি শব্দ — ‘তোর কবি’। এর আগে প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কণ্ঠ দিয়ে তিনি যে কবি বা তিনি যে কখনও কবি বলে উচ্চারণ করবেন নিজেকে, আমরা পাইনি। আমার মনে হয়েছে আপনি ঘেন্না করেন এভাবে বলা; আমি কবিতা লিখি; আমি কবি; আমি ভিন্ন মানুষ। আপনার কি মনে হয় সত্যিই একজন কবি ভিন্ন মানুষ? নাকি কয়েকজন লেখে না আর কয়েকজন লিখে ফেলে?

না, ভিন্ন নয়। এখানে ‘তোর কবি’ বলার মধ্যে দিয়ে সেটারই উদযাপন হয়েছে। প্রায় ভেঙে পড়া পুরনো বনেদ, বেশ করুণ অবস্থা ওই তরুণ ছেলেটার, যে কবিতা লেখে। কিন্তু সে ‘রিয়া নামের মেয়েটার কাছে কবি’। এটাই তাঁর আনন্দ।

অদ্ভুত এই কবিতাটা। ‘শালা অকৃতজ্ঞ বল তোর মাকে’। একটা পুরনো কলকাতার পুরনো একটা মানুষ, সে বিরাট দাপুটে হয়ত ছিল। তারপরে তাঁর সঙ্গে এক মহিলার প্রেম ছিল বা কোনও একটা সম্পর্ক ছিল। তারপরে সেই মহিলার ছেলে আজ বড় হয়ে পাড়ার মস্তান হয়েছে। এই যে একটা delivery-এও কি আপনার শোনা?

হ্যাঁ শোনা। ওই বয়স্ক লোকটিই বলেছিলেন। ওনার আতঙ্কটা হয়ত ওনার অপরাধী বিবেকের সৃষ্টি। আবার একটা আত্মপক্ষ সমর্থনও আছে। বিচিত্র দ্বন্দ্ব! এটাকে নিজে না দেখলে বানিয়ে লেখা যায়?

এই একইভাবে পড়তে পড়তে, এই কলকাতার কথা, ভয়ংকরভাবে উঠে আসছে এবং penetrate করছে। হঠাৎ দেখলাম ‘আমাকে যে কি বলতে চায়’ এই কবিতাটায় এসে মনে হল যে, আমরা তো জানি এখন gender studies-ই ধরা যাক, এখানে যেমন স্ত্রীর কাজ, পুরুষের কাজ বা কোথাও একটা global capital হোক, বা পুরুষতন্ত্রই হোক বহুদিন ধরে মহিলাকে একভাবে ব্যবহার করছে, পুরুষের চোখ দিয়ে দেখছে, এই সমস্ত আমরা জানি। কিন্তু এই যে এই কবিতাটাতে আপনি সরাসরি কি সেই gender studies বা gender-এর যে সমস্যা, যেটাকে problemetise করা হচ্ছে, সেটাকে আক্রমণ করছেন না?

না এটা আমার আক্রমণ নয়। এটাও সমাজের নীচুস্তর থেকে উঠে আসা একটা প্রশ্ন ফেমিনিজম সম্পর্কে। এক সম্পন্ন পরিবারের সাজগোজ করা ফেমিনিস্ট মহিলা এক বেশ গরিব ঘরোয়া বউকে বোঝানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এখানে লিঙ্গঘটিত ঐক্যবোধ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। ওই গরিব বউটির প্রশ্ন: নিজের ঘর-সংসারের কাজের জন্য আবার টাকাপয়সা কী? তার দার্শনিক জিজ্ঞাসা: ঘরের পুরুষটার জন্য ভাত রেঁধে না রাখলে সে লোকটা ঘরে ফিরবে কেন? এই যে আকুতিটা, মনে হয়েছিল, কোথাও একটা বাস্তবতা আছে। ধরা দরকার।

কোনও কিছুকে ন্যায়বিচার দেওয়া তো কবির কাজ না! সত্যটাকে তুলে ধরা কবির কাজ। সেটা ভুল কি ঠিক সেটা তো সমাজ বিচার করবে। এই একইভাবে আর একটা কবিতা খুব অদ্ভুতভাবে নাড়া দেয়; এই যে ‘শোন ভাইপো’। এটাও কি আপনি বলবেন যে আপনি কোথাও থেকে শুনেছেন বা এটা আক্রমণ নয়?

এটাও স্বকর্ণে শোনা। অনেক পাড়াতেই এরকম মহিলা থাকেন, প্রায় কেউ নেই, কোনও রকমে চলে, হয়ত একসময় পয়সাওয়ালা ঘরের মেয়ে-বউ ছিলেন, যাঁকে অল্পতেই রাগানো যায়, চিৎকার চেঁচামেচি গালাগালি করেন। তিনি এক কাপ চা খাওয়ার আশায় তাঁর জীবনদর্শন বলেছিলেন এই কবিতার লেখককে। যে, মনটা হল পুরুষ আর শরীরটা হল মাগী। প্রত্যেকটা মানুষ এই দুটো বিলক্ষণ বস্তুতে গড়া। আমার মনে হয়েছিল, দার্শনিকতা তাহলে কারও বাবার সম্পত্তি নয়। সকলেরই একটা দার্শনিক জীবন রয়েছে। সেটুকুর সন্ধান করাই আমাদের যথেষ্ট। কোনও নন্দন স্মাগল করে ঢোকানোর দরকার নেই। এ হুবহু লিখতে পারলে মারাত্মক ব্যাপার।

আচ্ছা প্রসূনদা ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’ তো বটেই, সমস্ত লেখালেখি জুড়েই আপনার বাংলা ভাষাকে নিয়ে একটা আবেগ আছে। কিন্তু ধরুন এই যে কবিতাটা; ‘নথিভুক্ত অপরাধ রুদ্রমণি কাঞ্চন শলাকা’। এখানে অবলীলাক্রমে আপনি পরপর বিদেশী শব্দ ব্যবহার করেছেন। আমার শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে this is another commentary।

হ্যাঁ এটাও commentary। যে ছেলেটির চোখ দিয়ে এটা দেখা, সে একটি সদ্য যুবক। বাড়িতে শুতে পায় না স্থানের অভাবে, ক্লাব ঘরে এসে থাকে। ক্লাব ঘরে থাকার সূত্রে ক্লাবের টিভিতে ব্লু ফিল্ম দেখছে এবং এই যে সামগ্রিকভাবে তাঁর ভাষাটা, ওই ভাঙা ইংরাজি মেশানো বাংলা একটা…

আপনি সচেতনভাবে ওই শব্দগুলোকে ওইভাবে রেখেও দিয়েছেন?

হ্যাঁ, ওই শব্দগুলোই documentation-এর স্ট্যাম্পটুকু বহন করছে। তাই লিঙ্গারি হয়ে আছে, লঞ্জারি করা হয়নি, ফরাসি করার কোনও দরকার নেই। এই শব্দগুলো যেভাবে ঢুকে পড়ছে…

কারণ ওর মুখ দিয়ে বলা লিঙ্গারি আর লঞ্জারির মধ্যে তো পার্থক্য আছে!

বিরাট পার্থক্য আছে। এই যে শব্দটা সে শুনে ফেলেছে কোথায় রাখবে জানে না কিন্তু শিখে গেছে ওটাকে ওই বলতে। এটা কোথাও নথিভুক্ত হওয়া দরকার তো!

তার মানে বাস্তবতায় মূল এবং কল্পনা তার একটা প্রসারণ?

হ্যাঁ, তা তো নিশ্চয়ই, তবে সবসময় যা দেখি তাই বাস্তব এরকমও আবার নয়।

না, তা নয়। যেখানে আপনি একেবারেই নিমগ্ন, আপনিও জানেন না আপনি লিখছেন, সেখানে বাস্তবতা থেকে আপনি শুরু করে দিচ্ছেন আর কি! সেটা থেকে আপনি কখনও বেরিয়ে যাচ্ছেন না।

যাচ্ছি তখনই, যখন মনে হচ্ছে বাস্তবতাটা আরও আরও আরও গভীরে, appearanceটুকু দেখা যাচ্ছে। কবি ওইটা ছুঁতে চাইছেন তাঁর ভাষার জোরে, ওই ভেতরের বাস্তবতা, যা নিশ্চয়ই ঐন্দ্রিয়-বৌদ্ধিক নয়, ভাষাগত সত্তা।

একটা সিরিজ আপনি লিখেছিলেন… অতিপ্রাকৃত ফল মানে Hyper Real-কে আপনি ভীষণভাবে আক্রমণ করেছিলেন একটা সিরিজে। আপনার মন পড়ছে?

হ্যাঁ, সেটা এখনও গ্রন্থবদ্ধ হয়নি। ওটা বেরিয়েছিল সুকল্প চট্টোপাধ্যায়ের পত্রিকাটাতে।

ওখানে কি আপনি hyper real-কে বোঝার চেষ্টা করেছেন, নাকি hyper real হয় না, যেটা আপনি একটু আগে বলছিলেন?

Hyper Real হয় না, ও বোঝার চেষ্টা দুটোই। ওই যে বললাম প্রথমেই, যদি একটা reference frame না হয় তাহলে আমরা hyper real বলতে পারি না।

আজকাল বাচ্চারা যে video games খেলে বা ইন্টারনেটে কথাবার্তা হয়, এটা তো একটা virtual world। কিন্তু সেটা তো রিয়্যালিটির অঙ্গ, অথচ সে নেই।

আমরা কিন্তু reality-কে একটা reference frame হিসেবে ধরে নিয়েই এ কথাটা বলছি যে, বাস্তব খেলাধুলা হয়, মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল খেলা হয়।

আপনাকে যদি সমস্ত ক’টা বই এনে দেওয়া হয় তাহলে আপনি কি আবার কোনও কবিতার পরিমার্জনা করবেন? যেমন আমি উদাহরণস্বরূপ আপনাকে একটা কবিতার কথা বলছিলাম একটু আগে।

ওই কুকুরদের কবিতাটা?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। তো এটা কি আপনি করবেন?

হ্যাঁ, তুমি যে নির্দিষ্ট কবিতাটার কথা বলছ, সেটা আমি সম্প্রতি পড়ে দেখিনি, কিন্তু এইটা ঘটনা যে আমার প্রত্যেকটি কবিতার ক্ষেত্রে কপি করার সময় এমনকি যে কবিতা ছাপাও হয়ে গেছে কোনও না কোনও পত্রিকায়, আমি বইয়ের জন্য যখন সেটা কপি করেছি দেখেছি পাল্টে পাল্টেই যাচ্ছে। আমাকে যদি দেওয়া হয় আমার বই, তাহলে বহু editing হবে। এ ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

মানে বই হয়ে গেল মানেই যে কবিতাটা শেষ হয়ে গেল এরকম নয়। আবার পড়তে গিয়ে মনে হল এই জায়গাটা এরকম হলে ভালো হত তো!

যেখানে পাঠকের scope।

(শেষাংশ আগামী সংখ্যায়)

About Char Number Platform 46 Articles

ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*