২০১৭ : হিংস্রতাই নিয়তি তবে?

অমিতাভ গুপ্ত

 

হিংস্রতা কি আর শুধু খুনোখুনি রক্তপাতে হয়? এ বছরের ভারতে অবশ্য সে তালিকাও দীর্ঘ। তার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে গৈরিক ছাপ। গোরক্ষকদের হিংস্রতার হিসেব রাখা ইদানীং বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। দেশের প্রাত্যহিকতায় ঢুকে পড়েছে সেই আখ্যান। তবু, একটা পনেরো বছর বয়সী ছেলেকে শুধু মুসলমান হওয়ার অপরাধে চলন্ত ট্রেনে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলে থমকে দাঁড়াতে হয়। অথবা, গরু পাচার করা হচ্ছে, এই অভিযোগে একটা জ্বলজ্যান্ত মানুষকে পিটিয়ে মারল যারা, তাদের শাস্তি চেয়ে এ দরজা থেকে ও দরজায় মাথা কুটে মরা নিহতের সন্তানের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যেতে হয়। এই দেশের নামই তবে ভারত! অবশ্য, ঠিক রঙের হিংস্রতার পুরস্কার অনেক। দাদরিতে যারা মহম্মদ আখলাককে পিটিয়ে মেরেছিল, তাদের সরকারি চাকরি হয়েছে। এই মৃত্যু উপত্যকাই আমাদের দেশ। অস্বীকার করার জায়গা কোথায়?

গৌরী লঙ্কেশের কথাও ভুলবেন কী ভাবে? পানেসর, দাভোলকর, কালবুর্গিদের তালিকায় এ বছর যোগ হলেন গৌরী। কর্নাটকের সাংবাদিক। তাঁর অপরাধ, নিজের কলামে তুলোধোনা করতেন উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের। আশ্রয় দিতেন উমর খালিদ, কানহাইয়া কুমারদের। শিক্ষিত, সমাজের উচ্চকোটিতে বিচরণকারী গৌরীর বুকে বুলেট দেগে দিয়ে গেল যে আততায়ীরা, নরেন্দ্র মোদীর সরকার অবশ্য এখনও তাদের পুরস্কার দেয়নি। কারণ, বেশ কয়েক মাস কেটে যাওয়ার পরও তারা অজ্ঞাতপরিচয়। যে পুলিশ বিনা প্রশ্নে তুলে নিয়ে যেতে পারে সোনি সোরিদের, যে পুলিশ নন্দিতা সুন্দর, বেলা ভাটিয়াদের নাজেহাল করতে পারে দিনের পর দিন, সেই পুলিশই সন্ধান পায় না গৌরীর হত্যাকারীদের।

একেবারে অন্য দুনিয়ার বাসিন্দা ছিলেন আফরাজুল খান। পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিনমজুর খাটতে গিয়েছিলেন রাজস্থানে। হিন্দুত্ববাদের এক ধ্বজাধারী তাঁকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিল। তার পর, সেই দৃশ্যের ভিডিয়ো রেকর্ডিং করে ছড়িয়ে দিল ইন্টারনেটে। ঠিক যে ভঙ্গিতে কোতল করে আইসিস-এর জঙ্গিরা। নতুন মাত্রায় পৌঁছল হিন্দুত্ববাদের হিংস্রতা। এ অবশ্য হওয়ারই ছিল। মৌলবাদ, তা সে দুনিয়ার যে প্রান্তেরই হোক, যে ধর্মের আর যে বর্ণের হোক, একটা নির্দিষ্ট পথ বেয়েই চলে। আফরাজুলের হত্যাকারীকে রাজস্থান পুলিশ গ্রেফতার করেছে বটে, কিন্তু দিনকয়েক বাদেই শুনিয়ে দিয়েছে, লাভ জিহাদের ‘প্রতিবাদ’ করতে সে লোকটি অন্য কাউকে মারতে চেয়েছিল, আফরাজুলকে নয়। যেন, এই ‘ভুল’ স্বীকার করে নিলেই স্খালন হয়ে যায় এই বিকট হিংস্রতার যাবতীয় দোষ।

মৃত্যুমিছিলের কথা থাক। এ বছরই উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশের মতো বেশ কয়েকটি বিজেপিশাসিত রাজ্য ফরমান জারি করেছিল, মাদ্রাসায় স্বাধীনতা দিবসের যে অনুষ্ঠান হবে, তার ভিডিও রেকর্ডিং যেন জমা করা হয় রাজ্যের শিক্ষা দফতরে। মুসলমানরাও যে ১৫ অগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপন করতে পারেন, ‘ভারতমাতা’-র নামে জয়ধ্বনি দিতে পারেন, রাষ্ট্র সেই কথাটি বিশ্বাস করে না — হাতেগরম বুঝিয়ে দেওয়া গেল। এক বিপুল জনগোষ্ঠীকে নিজভূমে পরবাসী হয়ে থাকতে বাধ্য করার মধ্যে যে হিংস্রতা আছে, তার অভিঘাত কি গৌরী লঙ্কেশদের বুক ফুঁড়ে যাওয়া বুলেটগুলোর চেয়ে কিছু কম? আরও মারাত্মক, এই হিংস্রতা কোনও ব্যক্তিবিশেষের নয়, কোনও ‘বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠী’-র নয়, এই হিংস্রতা রাষ্ট্রের। যে রাষ্ট্র এখনও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান মেনে চলে। গোট বছর জুড়েই চলল জাতীয়তাবাদের নামে সংখ্যাগরিষ্ঠের আস্ফালন। কোথাও সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত চলাকালীন উঠে না দাঁড়ানোর ‘অপরাধে’ লাঞ্ছিত হতে হল কোনও শারীরিক প্রতিবন্ধী নাগরিককে, কোথাও ‘বন্দে মাতরম্‌’ বলে হাঁক পাড়ার ফরমান জারি হল। দেশটা যে হিন্দুত্ববাদীদের পিতার সম্পত্তি নয়, ২০১৭ সালে এই কথাটা মনে রাখাই বেশ কঠিন হল।

রাষ্ট্রের হিংস্রতা অবশ্য সীমাবদ্ধ নয়। ঝাড়খণ্ডের এগারো বছরের সন্তোষী কুমারী তার সাক্ষ্য দিতে পারত, যদি নেহাত অনাহারে মরে না যেতে হত তাকে। রাষ্ট্র ঘোষণা করে দিয়েছিল, রেশন কার্ডকে আধার-এর সঙ্গে না জুড়লে রেশন দেওয়া বন্ধ। আইন করে যে খাদ্যের অধিকারকে মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছিল রাষ্ট্র, আধার-কে সর্বজনীন করার তাড়নায় সেই অধিকার লঙ্ঘন করতে বাধেনি সরকারের। সন্তোষীদের পরিবারের রেশন কার্ডের সঙ্গে আধার নম্বর জুড়ে ওঠা হয়নি। পুজোর ছুটি পড়ার আগে অবধি মিড ডে মিলের খুঁদকুড়োয় খানিক হলেও পেট ভরত তার। স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই একমুঠোরও আর সংস্থান রইল না। মেয়েটা মরে যাওয়ার পর তার হতদরিদ্র মা বিলাপ করে বলছিলেন, শেষ অবধি শুধু একটু ভাত খেতে চেয়েছিল সন্তোষী। রাষ্ট্র মুখ থেকে সেই গ্রাসটুকু কেড়ে নিতেও দ্বিধা করেনি। সরকারি কর্তাদের কি ভাতের পাতে একবারও থমকে গিয়েছিল হাত? মনে হয় না। রাষ্ট্রযন্ত্রের মন নাই। তাঁরা সময় সুযোগ মতো আধার তালিকা থেকে একটা নম্বর কেটে দিয়েছিলেন, এই মাত্র।

নির্ভয়ার ধর্ষণের পাঁচ বছর পেরোল। কার্যত সেই দিনটাকে ‘উদ্‌যাপন’ করার জন্যই যেন একটা পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণ করে তার গোপনাঙ্গে বোতল পুরে দিয়ে গেল কিছু পুরুষ। এই শিশুটিই একমাত্র নয়। বছরের শুরু থেকে শেষ, খবরের কাগজের পাতা ভরে থাকল শিশুদের ওপর যৌন অত্যাচারের, ধর্ষণের খবরে। দিল্লির দামি স্কুল রায়ান ইন্টারন্যাশনালে এক দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র একটি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রকে গলা কেটে খুন করল — সে জানত, এমন ঘটনা ঘটলে স্কুলে পরীক্ষা পিছিয়ে যাবে কয়েক দিন। পুলিশ গোড়ায় গ্রেফতার করল অশোক কুমার নামক এক বাস ড্রাইভারকে। গরিব মানুষ, ফলে সমাজও বেমালুম মেনে নিল যে অশোকই খুনি। পুলিশ অকথ্য অত্যাচার করে আদায় করে ফেলল অশোক কুমারের ‘স্বীকারোক্তি’। তার মাস দুয়েক পর দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রটি ধরা প়ড়ায় ছেড়ে দেওয়া হল অশোককে। কিন্তু, তত দিনে শারীরিক, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তিনি। আমাদের নাগরিক সমাজ অবশ্য এই হিংস্রতার প্রতিবাদ করে উঠতে পারেনি। আইএএস অফিসারের মেয়েকে বিজেপি নেতার ছেলে হেনস্থা করলে সমাজ যেভাবে রুখে দাঁড়ায়, ফেসবুক-টুইটারে উপচে প়ড়ে প্রতিবাদ, অশোক কুমার তার ছিটেফোঁটাও পাননি। প্রতিবাদও যে শ্রেণিনিরপেক্ষ নয়, ২০১৭ সাল আমাদের বুঝিয়ে দিয়ে গেল।

খুচরো হিংস্রতা? তার হিসেব কষতে বসলে ইন্টারনেটের পাতাতেও বুঝি জায়গা কম পড়বে। অ্যাসিড আক্রমণ থেকে বধূহত্যা, বৃদ্ধ মা-বাবাকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া, হাসপাতালে ডাক্তারের ওপর চড়াও হওয়া, স্কুলশিক্ষককে সমঝে দেওয়া — ভারতের সমাজ, পশ্চিমবঙ্গের সমাজ, প্রতি বছর যেমন চলে, এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আশঙ্কা হয়, ৩৬৫ দিন পরে ফের এই সালতামামি লিখতে বসলেও বুঝি অন্য কথা লেখার কোনও উপায় থাকবে না। হিংস্রতাই এখন এই সমাজের অভিজ্ঞান। এই সমাজে প্রকাশ্য রাস্তায় এক দুষ্কৃতী এক অসহায় তরুণীকে ধর্ষণ করতে পারে। পথচলতি মানুষ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখতে পারেন, কেউ বিতৃষ্ণায় মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে পারেন, কেউ হয়তো উপভোগও করতে পারেন সেই ধর্ষকাম। ভিডিও রেকর্ডিং করতে পারেন একাধিক মানুষ, ফেসবুকে আপলোড করে দিতে পারেন। কিন্তু, একজনও এগিয়ে গিয়ে প্রতিবাদ করতে পারেন না। একজনও থামাতে পারেন না সেই প্রকাশ্য নৃশংসতা। হিংস্রতায় এখন এমনই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে ভারত যে এ সব দৃশ্য আলাদা করে আর কোনও অভিঘাত তৈরি করে না।

হিংস্রতাকে ক্রমে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়াই এই বছরের সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা। গোটা বছরের প্রতিটি দিন, দেশের প্রতি প্রান্তে যে ঘটনা ঘটেই চলল।

About Char Number Platform 339 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*