দশচক্রে ডাক্তার

কৌশিক লাহিড়ী

 

“একদিন আমাদের অঙ্কের মাস্টার আসেন নাই, হেডমাস্টার রামবাবু বলিয়া গেলেন — তোমরা ক্লাশে বসিয়া পুরাতন পড়া পড়িতে থাক। আমরা পড়িতে লাগিলাম, কিন্তু খানিক বাদেই পণ্ডিতমহাশয় পাশের ঘর হ‌‌ইতে “পড়ছ না কেন?” বলিয়া টেবিলে প্রকাণ্ড এক ঘুঁষি মারিলেন। আমরা বলিলাম, “আজ্ঞে হ্যাঁ, পড়ছি তো।” তিনি আবার বলিলেন, “তবে শুনতে পাচ্ছি না কেন, চেঁচিয়ে পড়।” যেই বলা অমনি বোকা ফকিরচাঁদ,

‘অন্ধকারে চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড

তাহাতে ডুবায়ে ধরে পাতকীর মুণ্ড—’

বলিয়া এমন চেঁচাইয়া উঠিল যে, পণ্ডিতমহাশয়ের চোখ হ‌‌ইতে চশমাটা পড়িয়া গেল। মাস্টার মহাশয় গম্ভীরভাবে ঘরের মধ্যে ঢুকিলেন, তারপর কেন জানি না হরিপ্রসন্নর কান ধরিয়া তাহাকে সমস্ত স্কুল ঘুরাইয়া আনিলেন, তাহাকে তিনদিন ক্লাশে দাঁড়াইয়া থাকিতে হুকুম দিলেন, একটাকা জরিমানা করিলেন, তাহার কালো কোটের পিঠে খড়ি দিয়া ‘বাঁদর’ লিখিয়া দিলেন, আর ইস্কুল হ‌‌ইতে তাড়াইয়া দিবেন বলিয়া শাসাইয়া রাখিলেন।

পরদিন রামবাবু হরিপ্রসন্নকে ডাকাইয়া পাঠাইলেন এবং তার কাছে সমস্ত কথা শুনিয়া আমাদের ক্লাশে খোঁজ করিতে আসিলেন। তখন ফকিরচাঁদ বলিল, ‘আজ্ঞে হরে চেঁচায়নি, আমি চেঁচিয়েছি।” রামবাবু বলিলেন, ‘পণ্ডিতমশাইকে পাতকী বলিয়া কি গালাগালি করিয়াছিলে?’ ফকির বলিল, ‘পণ্ডিতমশাইকে কিছুই বলিনি, আমি পড়ছিলাম —

‘অন্ধকারে চৌরাশিটা নরকের কুণ্ড

তাহাতে ডুবায়ে ধরে পাতকীর মুণ্ড–’”

কিঞ্চিদধিক ১০ মাস হল, অর্থাৎ চৌরাশি নয়, দিনের হিসেবে দুইশত চৌরাশি দিন অতিক্রান্ত। কারও জন্ম বা মৃত্যুর নয়। একটি সরকারি আইনের। মনে পড়ে না, সাম্প্রতিক অতীতে, এ রাজ্যে, আর কোন আইন নিয়ে চিকিৎসক সমাজ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর নাগরিক সমাজ ঠিক এতখানি উত্তেজিত,  আলোড়িত, আন্দোলিত, ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, বিভাজিত হয়েছেন।

তবে প্রশাসকের যতখানি, প্রদেশ বা দেশটা ঠিক ততখানিই আমার, আপনার, সকলের। দেশের নাগরিক হিসেবে কয়েকটা কথা বলাই যায়। তাতে কোনও আইনভঙ্গের অপরাধে আশা করি সাত দিনের ফাঁসি বা তিন দিনের জেল হবে না!

বিগত শারদোৎসবের সময় ডক্টর্স ফোরামের পক্ষ থেকে একটি লিফলেট বিলি করা হয়েছিল, তার থেকে কয়েকটা লাইন পড়া যাক —

সংবাদপত্রের খবর, বিগত সাত-আট মাসে পশ্চিমবঙ্গে চিকিৎসকের ওপর শারীরিক আক্রমণের সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। অবশ্য অধিকাংশ নিগ্রহ খবরের কাগজ-টিভিতে আসে না, তাদের ধরলে অবস্থা আরও অনেক খারাপ, এক বছর আগের তুলনায় তিনগুণ তো বটেই।

কারা মারছেন ডাক্তারদের? ক্ষুব্ধ রোগী নেই যে তা নয়, কিন্তু প্রায় প্রতিটি ঘটনার পরে দেখা যাচ্ছে, তাঁদের ন্যায্য বা অন্যায্য বিক্ষোভের পর যখন ভাঙ্গচুর মারধোর শুরু হচ্ছে তখন রাশ চলে যাচ্ছে অন্য লোকেদের হাতে। আর আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না রোগীরাও — সেদিন জোকা-র সরকারি হাসপাতালে রোগীমৃত্যুর পরে একদল আক্রমণকারী আইসিইউ-তে চড়াও হয়ে এক বয়স্কা রোগিণীর অক্সিজেন-স্যালাইন খুলে তাঁকে মেরে ফেললেন।

বেসরকারি হাসপাতাল হোক আর সরকারি, অপরাধীরা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, পুলিশ তাদের নামে কেস নিচ্ছে না, নিলেও ধরছে না। সন্দেহ হয়, প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে কী নির্দেশ আছে?

‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস’ ফোরাম’ মনে করে ডাক্তার  রোগীর স্বার্থ এক  অভিন্ন — রোগকে প্রতিরোধ করা, রোগ হলে তাকে সারানো, সারাতে না পারলে যতটা সম্ভব আরাম দেওয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনও সবকিছু নিশ্চিত করে বলে দিতে পারে না। তাই ডাক্তারকে বিশ্বাস না করে রোগীর উপায় নেই। অপরপক্ষে, ডাক্তারেরও রোগীকে সারানোর সাধ্যমতো চেষ্টা না করে উপায় নেই, নইলে সে নিজের কাছেই প্রত্যহ মরে যাবে, প্রত্যহ অর্থহীন এক জীবন টেনে নেবার গ্লানিতে তার দমবন্ধ হয়ে আসবে।”

কিন্তু সমস্যাটা হল, বন্ধু আর্যতীর্থ যেমন লিখেছেন, ইদানিং

“মৃত্যু মানেই গোলমেলে ডাক্তারি

মৃত্যু মানেই প্রমাণ গাফিলতি

অমর ছিলো মানুষ নাকি আগে

চিকিৎসকই মেরেছে সম্প্রতি”

শুশ্রূষায় সংকট : পটভূমি

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখে কলকাতা শহরের একটি নামী বেসরকারি হাসপাতালে রোগীমৃত্যু ঘিরে ঘটে যায় ভয়ংকর হামলা, আক্রমণ, ভাঙচুর। আহত হন বেশ কিছু চিকিৎসাকর্মী। শুরু হয় বিপুল বিতর্ক। রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসক ২২শে ফেব্রুয়ারি সব বেসরকারি হাসপাতালের কর্তাদের সঙ্গে এক অভূতপূর্ব মিটিং করেন, যা সরাসরি সম্প্রচারিত হয় প্রতিটি স্থানীয় দৃশ্য-শ্রাব্য সংবাদমাধ্যমে। তাৎক্ষণিকভাবেই প্রস্তাবিত হয় রাজ্যের চিকিৎসা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রকএকটি নয়া কমিশন। 

এর ঠিক আটচল্লিশ ঘণ্টার মাথায় আর একটি বেসরকারি হাসপাতাল জড়িয়ে পড়ে আর একটি রোগীমৃত্যু পরবর্তী দুর্ভাগ্যজনক বিতর্কে যার ফলে পদত্যাগ করেন হাসপাতালের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্ত্রী। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে,​এর মাত্র সাতদিন পরে, ৩রা মার্চ রাজ্য বিধানসভায় প্রস্তাবিত এবং গৃহীত হয় চিকিৎসা সংক্রান্ত এক নতুন প্রাদেশিক আইন (অথবা, পুরনো আইনের এই নব সংস্করণ) যার পুরো নাম West Bengal Clinical Establishments (Registration, Regulation and Transparency) Bill, 2017।

একটা কথা খোলা গলায়, এবং নির্দ্বিধায় বলে রাখা ভালো যে, চিকিৎসা সংক্রান্ত এই নতুন প্রাদেশিক আইন (অথবা, পুরনো আইনের এই নব সংস্করণ) অনিবার্য ছিল।

একটা কোথাও রাশ টানা দরকার ছিল এবং সেটা প্রশাসকের অধিকারের মধ্যেই পড়ে।

​কিন্তু এর পর থেকেই রাজ্য জুড়ে সৃষ্টি হয় এক অস্বস্তিকর, অনাকাঙ্খিত এবং ভয়ংকর পরিস্থিতি। একের পর এক চিকিৎসা সংস্থা, চিকিৎসক এবং চিকিৎসাকর্মীদের ওপর নেমে আসতে থাকে আক্রমণ। তার কিছু স্বতঃস্ফূর্ত হলেও, বেশিরভাগটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নতুন আইন করা হয়েছিল, শুধুমাত্র বেসরকারি হাসপাতালের কথা ভেবে, কিন্তু আইন বলবৎ হবার পাঁচ মাস পর দেখা যাচ্ছে, সিংহভাগ আক্রমণের অভিমুখ হচ্ছেন সরকারি ডাক্তাররাই।

সম্প্রতি ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরামের পক্ষ থেকে পুলিশ প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রের তথ্যে মেলে তারই সমর্থন।

​ডাক্তারদের ফোরাম, কী? এবং কেন?

এই যুগ তথ্যপ্রযুক্তির, আরও নির্দিষ্ট করে বললে, সোশ্যাল মিডিয়ার। এই অভূতপূর্ব মন্থনকালের প্রভাব আছড়ে পড়ল সেই ভার্চুয়াল দুনিয়াতেও।

ফেসবুকের প্ল্যাটফর্মে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জন্ম নিল চিকিৎসকদের সম্পূর্ণ রাজনীতি-নিরপেক্ষ নতুন সংগঠন ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টরস ফোরাম (ডব্লুবিডিএফ)। জন্মলগ্ন থেকে আজ অব্ধি মাত্র কয়েক মাসে যার ভার্চুয়াল সদস্য সংখ্যা পৌঁছে গেছে প্রায় আঠেরো হাজারের অভাবনীয় মাইলফলকে।

এল আরও কিছু ভ্রাতৃপ্রতিম চিকিৎসক সংগঠন।

জোট বাঁধলেন চিকিৎসক সমাজ।

রাজ্যবাসী সাক্ষী থাকলেন, এক ঐতিহাসিক মিছিলের, ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগত রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ‘ভরসা থাকুক’ ব্যানারে হাঁটলেন কয়েক হাজার চিকিৎসক। দাবি সামান্যই, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার, রোগী-চিকিৎসকের সুসম্পর্কের আর সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার। তাতে পরিস্থিতি বদল হল না এতটুকু। নেমে আসতে থাকল একের পর এক আক্রমণ।

আদালতের দ্বারস্থ হলেন চিকিৎসকরা, সুবিচারের আশায়।

সংগঠিত হতে থাকল মিটিং, কনভেনশন।

এল চিকিৎসক নিরাপত্তার জন্য এস ও এস app, কোথাও বা চিকিৎসক সমাজ আত্মরক্ষার জন্য নিজেদের প্রশিক্ষিত করে তুলতে চাইলেন মার্শাল আর্টে।

ঘনীভূত হল অন্ধকার।

চিকিৎসক সমাজের কাছে এ এক ভয়ঙ্কর সময়। দুঃসহ, নিরাশ্রয়, বিপন্ন, অসহায়।

বিশদে যাবার আগেই কয়েকটা কথা জেনে রাখা ভালো — 

ডাঃ শ্রীনাথ রেড্ডি কমিশন

এদেশে চিকিৎসা খাতে ব্যয় অপ্রতুল (মাথাপিছু ৩৯ ডলার) যা এমনকি অনেক অনুন্নত দেশের থেকেও কম। প্রতি হাজারে শয্যা সংখ্যা ০.৮ যা প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কার (৩/১০০০) থেকে কম। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ১.২ শতাংশ। জনস্বাস্থ্যে খরচের হার মাত্র ৩৩ শতাংশ (প্রয়োজন ৭০%), স্বাস্থ্যে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ শতকরা ৮০ শতাংশ যার ৭৪% ব্যয় হয় ওষুধ ও সরঞ্জামের জন্য। সরকারি পরিকাঠামোর রোগী-চিকিৎসক সাক্ষাতের গড় সময় ১ মিনিট মাত্র।

স্বাস্থ্যের মানোন্নয়নের জন্য যে উপযুক্ত পরিকাঠামো প্রয়োজন তার অভাবের কথা চিন্তা করে সরকার ডাঃ শ্রীনাথ রেড্ডি কমিশন গঠন করেন, যা সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা বলে বিবেচিত হয়।

সে রিপোর্টে বলা হয়েছিল ২০২২ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ৩ শতাংশ করতে হবে, ব্যক্তিগত খরচ কমিয়ে ৩৫% করতে হবে ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

ডাঃ শ্রীনাথ রেড্ডি কমিশনের সুপারিশ সরকার গ্রহণ করেননি। সে রিপোর্ট এখন ঠাণ্ডা ঘরে!

কা কস্য পরিবেদনা!

ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট? কিন্তু যেখানে কোনও এস্টাব্লিশমেন্ট নেই? নেই প্রথাগত ‘ক্লিনিক্যাল’ তকমাধারী কোনও কিছুর অস্তিত্ব?

আজও আমাদের দেশের (এবং প্রদেশের) প্রতিটি প্রান্তে প্রাথমিক এবং আপৎকালীন স্বাস্থ্য পরিষেবা দিয়ে থাকেন প্রথাগত শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণবিহীন কিছু মানুষ, যাঁদের আমরা ‘হাতুড়ে’ বলে থাকি।

এঁদের মধ্যে কিছু প্রশিক্ষণবিহীন স্বশিক্ষিত মানুষ আছেন, যাঁরা সত্যি মানুষের উপকার করেন, বা অন্তত করতে চান, নিজেদের সীমিত বিচারবুদ্ধি, অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

আর আছেন প্রচুর ভণ্ড, ঠগ, শঠ, ভেকধারী নকল চিকিৎসক, যাঁরা প্রতিনিয়ত মানুষকে ঠকিয়ে চলেছেন। আছেন হোমিও, আয়ুর্বেদ, ইউনানী, ম্যাগনেটোথেরাপি বা আয়ুষ চিকিৎসকেরা।

তাঁদের সিংহভাগই কিন্তু বেসরকারি।

থাকবেন তো তাঁরা এই আইনের আওতায়?

কোথাও কিন্তু এই ব্যাপারটার উল্লেখ নেই!

এই একশো তিরিশ কোটির দেশে প্রতি দেড় হাজার মানুষ পিছু মাত্র একজন চিকিৎসক!

তার জন্য কি একজন চিকিৎসক দায়ী?

সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা মেলায় সরকারি হাসপাতালে রোগী সংখ্যা বেড়ে গেছে চতুর্গুণ।

ফলে শিকাগোর সেই আট ঘণ্টা শ্রমের আইন ভুলে গিয়ে একজন চিকিৎসককে অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়, প্রায়শই ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা। কোথাও বা আরও বেশি।

এই করতে গিয়ে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার গাফিলতির দায়ভার প্রায়শই এসে পড়ে পরিষেবার মুখ সেই চিকিৎসকের ঘাড়েই। অপমানিত, নিগৃহীত হন সেই মানুষটিই।

সেই মানুষটিই, যিনি অন্য গ্রহের প্রাণী নন, যিনি আর পাঁচজন পেশাদারের মতো এই সমাজ থেকেই উঠে আসেন। আসেন, আমার আপনার বাড়ি থেকেই।

সেই একজন যিনি তাহলে ছোটবেলা থেকে মনোযোগী ছাত্র বা ছাত্রী ছিলেন, মেধাবীও।

পাড়ায়, ইস্কুলে কলেজে যাঁকে ভালো ছেলে বা মেয়ে বলা হত, কৈশোর আর যৌবনের প্রায় পুরোটাই যিনি মনোনিবেশ করেছেন বইয়ের পাতায়, জয়েন্ট এন্ট্রান্সের দুর্লঙ্ঘ্য পর্বতারোহন করে ফের পাড়ি দিয়েছেন অজস্র পার্ট, সেমেস্টারের ঢেউ পেরিয়ে MBBS-এর অকূল পাথার, তারপর আবার পোস্ট গ্রাজুয়েশনের যুদ্ধে জয়ী কিংবা পরাজিত হয়ে নেমেছেন জীবনযুদ্ধে!

কেউ কেউ আবার মধ্যবিত্ত পরিবারের নানা রকম পিছুটান পেরিয়ে শুধুমাত্র মেধার ওপর ভিত্তি করে পাড়ি দিয়েছেন বিলেতে, উচ্চশিক্ষিত হয়েছেন, নিয়েছেন সর্বোচ্চ মানের প্রশিক্ষণ এবং তারপর ফিরে এসেছেন নিজের দেশে, হয় বাধ্য হয়ে, অথবা, আদর্শের টানে।

ফিরে এসেছেন, সেই দেশে, যেখানে ‘ব্রেন ড্রেন’কে জঘন্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়, কিন্তু পঞ্চায়েত প্রধান, কাউন্সিলর, এমএল এ, এম পি, প্রাক্তন মন্ত্রী এমনকি প্রাক্তন কয়েদি পর্যন্ত চিকিৎসকদের বা সংস্থাকে হুমকি দিয়ে থাকেন প্রায় জন্মগত অধিকার বশত!

তবে কি যত দোষের ভাগী শুধুমাত্র চিকিৎসকরাই? আরও নির্দিষ্ট করে বললে বেসরকারি চিকিৎসকরা?

দরকার ছিল এরকম একটি আইনের, অন্তত আইনের ভয়ের, অনেক কুলাঙ্গার অসৎ চিকিৎসা ব্যবসায়ী আছেন তাঁদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য।

এই আইনে সঠিকভাবেই সাধারণ মানুষের রক্ষাকবচের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, চিকিৎসক সুরক্ষিত থাকবেন কোন কবচের ভরসায়?

রাত 3টে 45-এ একশো কিমির বেশি গতিতে সিট বেল্ট না পরা অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে চালক আহত হওয়া আর সহযাত্রীর মৃত্যু ঘটার পর Safe drive, save life বাণী-উদগাতা সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, অথচ, প্রত্যন্ত কোনও গ্রামাঞ্চলে, ঢাল তরোয়ালহীন অবস্থায় চিকিৎসা করতে গিয়ে কোনও সরকারি চিকিৎসক যখন নিগৃহীত হন, সেই উদ্বেগের ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না।

আর, শুধু বেসরকারি চিকিৎসা পরিষেবা কেন, দেখতে হবে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থাতেও আর কেউ যেন ভুক্তভোগী না হন! কারণ, কেবলমাত্র বেসরকারি হাসপাতাল তো নয়, সাধারণ মানুষ তো সরকারি হাসপাতালেও যেতে পারেন, যানও।

তো, সরকারি হাসপাতাল কেন এই আইনের বাইরে থাকবে? গত কয়েক মাসে আক্রান্ত চিকিৎসকদের দুই-তৃতীয়াংশ তো সরকারি হাসপাতালেই কাজ করেন!

সরকারি চিকিৎসক আক্রান্ত হলে বা সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ভাঙচুর হলে কেন প্রয়োগ করা হয় না West Bengal Medicare Service Persons & Medicare Service Institutions (Prevention of Violence & Damage to Property) Act, 2009?

আইনসভা ছাড়াও দেশের সংবিধান স্বীকৃত আর একটি স্তম্ভ হল বিচারসভা।

এই আইনে অভিযুক্ত চিকিৎসক বা চিকিৎসা সংস্থা আবেদন করতে পারবেন না কোনও দেওয়ানি আদালতে, চাইতে পারবেন না বিচার, কিন্তু কেন?

একজনও সৎ, পরিশ্রমী, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক যেন অসম্মানিত না হন, না হন হেনস্থার শিকার সেটা দেখার দায়িত্ব কার?

একটি অপরাধ এমনকি খুনের মামলায় অভিযুক্ত আসামীর বিরুদ্ধেও তদন্ত এবং বিচার করা হয় একটি জায়গায়।

কিন্তু চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে অভিযুক্ত একজন চিকিৎসককে শাস্তি দেবার জন্য আছে সমাজের সাত সাতটি যুপকাষ্ঠ!

১. পুলিশ,

২. সিএমওএইচ,

৩. কমিশন,

৪. উপভোক্তা ফোরাম,

৫. রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিল,

৬. স্বাস্থ্য ভবন,

৭. সংবাদমাধ্যম।

ন্যাচারাল জাস্টিসের সূত্র মেনে একজন ফাঁসির আসামীও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পায়, একজন অভিযুক্ত চিকিৎসক পাবেন না কেন?

সাঁইতিরিশ বা সাতান্ন বা সাতাত্তর নেহাত সংখ্যা হতে পারে, কিন্তু মনে পড়ে মঁসিয়ে ভেরদু ছবিতে চ্যাপলিনের সেই অমোঘ উচ্চারণ “One murder makes a villain. Millions a hero.”

এ কোন সমাজে আমরা এসে পৌঁছালাম যেখানে সদ্য চিকিৎসক হওয়া এক মেধাবী তরুণীর অবমাননা, বয়োবৃদ্ধ চিকিৎসকের শারীরিক নিগ্রহ এমনকি সরকারি আধিকারিক চিকিৎসকের বিষ্ঠাস্নান আমাদের নিদ্রাহীনতার কারণ ঘটায় না!

মিছিল দূরস্থান, সুশীল সমাজের একজন প্রতিনিধিও মোমবাতি হাতে বলেন না, Not in my name!

ন্যাশনাল মেডিক্যাল কমিশন বিল : সিঁদুরে মেঘ

নতুন একটি অগণতান্ত্রিক, অবৈজ্ঞানিক, দমনমূলক, জনবিরোধী বিল আনতে চলেছেন দেশের সরকার বাহাদুর। অনেক দোষ-ত্রুটি সত্ত্বেও মেডিক্যাল কাউন্সিল কিন্তু একটি নির্বাচিত স্বশাসিত সংস্থা। নতুন ব্যবস্থায় নির্বাচিত কাউন্সিলের বদলে আসবেন সরকার মনোনীত আমলারা। দেশের স্বাস্থ্যনীতির নির্ধারক হবেন প্রধানত সরকারি আমলারা। এমনকি এই কমিশনের সর্বোচ্চ পদেও থাকবেন একজন অচিকিৎসক। মডার্ন মেডিসিনের চিকিৎসাপদ্ধতির সঙ্গে হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ, ইউনানী, ম্যাগনেটোথেরাপি মিশিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে এক হাঁসজারু ভয়ংকর চিকিৎসাব্যবস্থা। তিনসপ্তাহের ব্রিজ কোর্সের মাধ্যমে একজন আয়ুষ চিকিৎসক পেয়ে যাবেন মডার্ন মেডিসিনের ওষুধের প্রয়োগাধিকার!

এটা তাঁর নিজের অধীত শাস্ত্রের প্রতি চরম অনাস্থা ও অপমান তো বটেই, মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার দ্বার প্রশস্ত করা।

মেধাভিত্তিক ভর্তির প্রথাকে পেছনে ঠেলে খুলে দেওয়া হবে বেসরকারি, ক্যাপিটেশন ফি-ভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজের দরজা। এতে শুধু যে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্য-শিক্ষার সর্বনাশ হবে তাই নয়, সমস্যা-জর্জর স্বাস্থ্য পরিষেবা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে।

সংকটকাল পেরিয়ে এক মহাশূন্যতার দিকে এগিয়ে চলেছে সমাজ। সে সমাজের যে চিকিৎসক প্রয়োজন নেই, তা তো নয়!

এই দমবন্ধকারী পরিবেশ থেকে মুক্তি কী উপায়ে বা কোন পথে?

জেনেভা ঘোষণাপত্র

১৯৪৮ সালে জেনেভায় বিশ্ব মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএমএ)-এর দ্বিতীয় সাধারণ পরিষদ সভায় গৃহীত হয় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো হিপোক্রাটিক শপথবাক্যগুলির একটি আধুনিক এবং সংহত রূপ। সারা পৃথিবী জুড়ে চিকিৎসকরা তেরোটি শপথে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন।

খুব আশার কথা যে সম্প্রতি শিকাগোতে 14ই অক্টোবর 2017 তারিখে বিশ্ব মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (ডব্লিউএমএ) সাধারণ পরিষদ সভায় জেনেভা ঘোষণার নতুন সংশোধিত সংস্করণটি গৃহীত হয়েছে।

এবং সত্তর বছর পর এই প্রথম তাতে সংযোজিত হয়েছে একটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ শপথ বাক্য —

  • I WILL SHARE my medical knowledge for the benefit of the patient and the advancement of healthcare;
  • I WILL NOT USE my medical knowledge to violate human rights and civil liberties, even under threat;

এই দুটির মাঝখানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এই কথা গুলি —

  • I WILL ATTEND TO my own health, well-being, and abilities in order to provide care of the highest standard;

নতুন কথা তো নয়, সেই চেনা কথা “Physician, heal thyself…”

নিজের যত্ন নাও, ডাক্তার, নিজে সুস্থ থাকো, নিরাপদ থাকো, সুরক্ষিত থাকো।

তা এই যদি বিশ্ব-সংস্থার শপথবাক্য হয়, তবে তো সমাজের দায়িত্ব আমাকে, আমাদের সুরক্ষা দেওয়া, সুস্থ কাজের পরিবেশ দেওয়া, যাতে একজন চিকিৎসক অন্ততঃ নিরাপদে মানুষের চিকিৎসা করতে পারেন!

Supreme court verdict

এই দেশের সর্বোচ্চ আদালত কিন্তু বলেছিলেন এ কথা, একবার নয়, বারবার!

২০০৯ সালে মাননীয় বিচারপতি মার্কণ্ডেয় কাটজু এবং বিচারপতি আর এম লোধার বেঞ্চ তো পরিষ্কার জানিয়ে দেন —

“This is necessary to avoid harassment to doctors who may not be ultimately found to be negligent. We further warn the police officials not to arrest or harass doctors unless the facts clearly come within the parameter laid down in Jacob Mathew’s case, otherwise the policemen will themselves have to face legal action,”

দেখা যাক জ্যাকব ম্যাথিউর সেই কেসে মাননীয় বিচারক রায়ের সেই ঐতিহাসিক কথাগুলি — 

“A medical practitioner faced with an emergency ordinarily tries his best to redeem the patient out of his suffering. He does not gain anything by acting with negligence or by omitting to do an act. Obviously, therefore, it will be for the complainant to clearly make out a case of negligence before a medical practitioner is charged with or proceeded against criminally. A surgeon with shaky hands under fear of legal action cannot perform a successful operation and a quivering physician cannot administer the end-dose of medicine to his patient.

If the hands be trembling with the dangling fear of facing a criminal prosecution in the event of failure for whatever reason — whether attributable to himself or not, neither can a surgeon successfully wield his life-saving scalpel to perform an essential surgery, nor can a physician successfully administer the life-saving dose of medicine. “

MEDICARE 2009

উপায় কিন্তু আছে, ছিলই, ২০০৯ সালে এই রাজ্যেই আনা একটি আইন ছিল, আজ পর্যন্ত প্রয়োগ হয়নি।  ​

West Bengal Medicare Service Persons & Medicare Service Institutions (Prevention of Violence & Damage to Property) Act, বা চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী এবং চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ প্রতিরোধ এবং সম্পত্তির ক্ষতি নিবারক আইন।

একটা জোরালো দাবি উঠতে পারে কি, এই ভুলে যাওয়া যাওয়া আইনটি অক্ষরে অক্ষরে বলবৎ করার?​

প্রবাসী চিকিৎসক ​বন্ধুর সঙ্গে কথায় কথায় এই চিন্তাগুলো দানা বাঁধল।

কোনও সহজ পন্থা নেই।

বিতর্ক-বিবাদ-যুক্তি-তক্কো-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-কনক্লেভ-মিছিল-আদালত সব চলতে থাকুক, তার সঙ্গে যোগ হোক আর একটি মাত্রা, যা অপেক্ষাকৃত সরলতর কিন্তু প্রলম্বিত।

বস্তুবাদী, কিন্তু ততটা দ্বন্দ্বমূলক নয়।

সংঘাতের বিপরীতে আলোচনায়। সমাধান সম্ভব ধৈর্যশীলতায়।

কোনও আইন একজন চিকিৎসকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন সমাজবদলের। নিদেনপক্ষে সমাজের মানসিকতা বদলের। দূরবীন লাগিয়েও এহেন নিখাদ গ্রীষ্মযামিনী-স্বপ্নসম ইউটোপিয়ান সমাজবিপ্লবের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে কি?

নাহ!

কিন্তু, দার্জিলিং-এর হিমালয়সম সংকটমোচনের পথ যদি আলোচনার টেবিলে বসে খোঁজা যেতে পারে, এক্ষেত্রে নয় কেন?

শুরু হোক প্রক্রিয়াটা। প্রতিটি শহরে, গঞ্জে, গ্রামে, পঞ্চায়েতে বসুক নিয়মিত আলোচনা সভা। থাকুন চিকিৎসক, রোগী, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, সরকারি এবং বিরোধী রাজনীতির প্রতিনিধি, শিক্ষক, আইনজীবি সবাই। পারস্পরিক দোষারোপ নয়, আসুন সবাই মিলে খোঁজা হোক সমাধান সূত্র।

এর জন্য চাই সমাধানের সদিচ্ছা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

সমাজের কলঙ্কমোচনের জন্য এই উদ্যোগ কিন্তু নিতে হবে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকেই।

কিন্তু সংশয়ী মন একটা নিষ্ঠুর হিসেবের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

এই একশো তিরিশ কোটির দেশে প্রতি দেড় হাজার মানুষপিছু মাত্র একজন চিকিৎসক!

আর সেই জন্যই ভোটবাদী এই রাষ্ট্রব্যবস্থায় প্রশাসক যে অঙ্কের (তথা ভোটের) হিসেবে করুণভাবে সংখ্যালঘু!

চিকিৎসক সমাজের কথা আদৌ ভাববেন, সেটাও কষ্টকল্পনা!

এটাই সত্যিকারের সংকট।

এক ভয়ংকর সামাজিক অচিকিৎস্য মহামারী আসন্ন হবে। আর তার দায়ভাগী হতে হবে প্রশাসনকেই।

কে না জানে, অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না, নগরে আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা পায় না।

​সাউথ ব্লক বা নবান্ন ও না !

About Char Number Platform 179 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*