অতি অন্তহীন

রুমা মোদক

 

মিজান মিয়ার তিন কন্যা। বড়-ছোট যেমনই হোক, মাইজম কন্যার নাম খুশবু। অনেক দূর থেকে তার খুশবু পাওয়া যায়। পাড়াপড়শি বলে। নিজেরা খুব একটা পায় না, নিজের বলেই হয়তো। গরু যেমন নিজ বাড়ির ঘাটার ঘাস খায় না তেমন। কিন্তু এই মাইজমকে নিয়ে উৎকণ্ঠা তাঁর সেই শৈশব থেকে। আচ্ছা এখন সে প্রসঙ্গ থাক। ছোট কন্যার সম্বন্ধ আসছে। আপতত এটাই প্রথম প্রয়োজন। বড় কন্যা আর মাইজম কন্যার নানা কিছিমের কাণ্ডকারখানার পর এই ছোট কন্যার মুখ চেয়েই আছেন তারা। মিজান মিয়া আর তারা বিবি। তিন কন্যার জনক-জননী। একান্নবর্তী পাঁচ ভাইয়ের পরিবারের খোঁটা-খোঁচার এই তিন কন্যা কোথায় বড় হয়ে সমুচিত জবাব দেবে তা না বরং আরও উচকে দিয়েছে। বড় কন্যা বিধবা, মাইজম কন্যা তালাকপ্রাপ্ত আর ছোটজন এখনও আইবুড়ো।  চার ভাইয়ের নাকি ইজ্জত থাকে না মিজান মিয়ার কন্যাদের কুকর্মে।

বিপক্ষে দেখানোর কোনও যুক্তি হাতে না থাকায় মিজান মিয়া চুপচাপ মেনে নেয় ভাই সহ পাড়াপড়শির খোঁটা খোঁচা।

যাহোক, আজ এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর টাইম নাই। ছোট কন্যার বিয়ার সম্বন্ধের লোকজন এসে গেছে। জিলাপি আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে লক্ষ করে বউ আর বড় মেয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বসে আছে পিড়া পেতে। মিজান মিয়ারে দরজায় দেখে তারা একসাথে উচ্ছ্বসিত, তাড়াতাড়ি যান পাত্রপক্ষের সামনে, গিয়া কথা কন। না জানি মাইজলা ডায় কিতা মাতে আঙ্গে ডাঙ্গে!

বুঝা গেল মা-কন্যার দুজনের উৎকণ্ঠার কারণ। নিজে গিয়ে বসে পাত্রপক্ষের সামনে। চার ভাইয়ের দুজন আসে সময়মতো। খুব একটা মিল মহব্বত না থাকলেও বাকি দুই কন্যার বিয়েশাদির কথা-বার্তায় দায়িত্ব নিয়ে উপস্থিত ছিল তারা। তৃতীয় কন্যার বিয়ের আলাপেও তারা হাজির। কথাবার্তা আগায়। তৃতীয় কন্যা সামনে আসে। তারা হাঁটায় চলায়, এটা ওটা জিজ্ঞেস করে কথা বলায়। দম দেয়া পুতুলের মতো নির্ভুল জবাব দেয় তৃতীয় কন্যা। কন্যা পছন্দ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে পাত্রপক্ষ চলে যায়।

মিজান মিয়া আর তার স্ত্রী রাতে পান খেতে খেতে আন্দাজ করতে চায়, পাত্রপক্ষ কী কী যৌতুক চাইতে পারে আর তারা কতটা দিয়ে কন্যাদানের দায় থেকে মুক্তি পেতে পারে। কোনও আন্দাজই বরপক্ষের চাহিদা আর তাদের ক্ষমতার লক্ষণসীমা অতিক্রম করতে পারে না। পরদিন বিকালের আগেই পাত্রপক্ষ অবাক করে দিয়ে জানিয়ে যায় তারা যৌতুক ছাড়াই তারা মিজান মিয়ার তৃতীয় কন্যারে নিতে রাজি।

মিজান মিয়া তো মনে মনে বেজায় অবাক! আর তার বউ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঘুরে ফিরে নিজেরে দেখে। বর্তমান যাই হোক, তাঁর নিজের গঠন মেয়েরা পেয়েছে বলেই, টপাটপ তিন তিনটার বিয়ে দিতে বেগ পেতে হয়নি।

যাহোক তৃতীয় কন্যার বিয়ের যোগাড়যন্ত্র চলতে থাকে। বিয়ের শাড়ি, হলুদের শাড়ি, দু-একপদ সোনারঙের গয়না। পান সুপারি, বাতাসা। শতেক বাজার। যৌতুক নাই বলে খরচ কিন্তু কম না।

আচ্ছা চলতে থাকুক ছোট মেয়ের বিয়ের আয়োজন। আমরা বাকি দুজনের কথা জেনে আসি। বড় কন্যা। তিন মেয়েরে বিয়ে দেয়ার চাপ মাথায় নিয়ে তখন ঘুরতে হয় মিজান মিয়ার। দায়দায়িত্ব ঝেড়ে হালকা হবার বাসনায় প্রথম প্রস্তাবটাকেই আকড়ে ধরেছিল সে বাগে পাওয়া মুরগির মতো। ছেলের বয়স একটু বেশি। হোক। তিন তিনটা কন্যা পার করতে হবে না? বয়স বিবেচনা করলে হবে? যৌতুক কম আর পাত্রের পরিবারে কোনও ঝামেলাও নেই। নিজেদের দিক দেখতে হবে না? জেলা জজ কোর্টের এক অনামা উকিলের মুহুরিগিরি করে বলতে গেলে দিন আনা, দিন খাওয়া মানুষ সে। তেমন পাত্র পেতে গেলে খরচও তেমন। চোখমুখ বন্ধ করে পার করে দিল মেয়েকে।

ভালোই কাটছিল মেয়ের সংসার। বছর না ঘুরতেই নাতির মুখও দেখল মিজান মিয়া। বাপের ঘর নাইওর আসতে বাপ মা বোনদের জন্য উড়না, মাফলার, চুরি আর নিমকি ভাজা জিলাপিও সাথে করে আনত। আসলে সতেরো বছরের মেয়ে, কাদামাটির পুতুল। যে ছাঁচে গড়া যায়, সে ছাঁচেই বসে। বড় মেয়েটার কোথাও কোনও অশান্তি অসুখের ছায়া দেখেনি সে। কিন্তু বিধি বাম। পাঁচ বছর যেতে না যেতেই জামাই তিনদিনের জ্বরে অক্কা পেল। গিয়েছিল কন্যা একা, ফিরে এল দুজন হয়ে। তবু একদিক থেকে শান্তি, বড় কন্যাটা বড় চুপচাপ, শান্ত। নিজের অসহায় অবস্থার জন্য নিজের ভাগ্যকেই দায়ি করে নির্বিবাদে বাপ মায়ের সব কথা মেনে নেয়। এদিক সেদিক উঁকি দেয়ার বয়সের স্বাভাবিক বাতিকও তার নেই বিধায় নিশ্চিন্তেই থাকতে পারে মিজান মিয়া। বলার মতো বিষয় একটাই, খরচ দুজনের বইতে হয়। তা হোক। অন্যদিকে মাইজম কন্যা পার হয়ে যাওয়াতে খরচ তো কমেও যায় কিছু।

আচ্ছা আমরা মাইজম কন্যার গল্প শুনব। তার আগে দেখি ছোট কন্যার বিয়ে নিয়ে বেশ ক্যাচাল লেগে গেছে।

ঘটনা কী? পাত্রের মামা এসে বলছে, বিয়ের তারিখ পিছাতে হবে। কারণ পাত্রের চাচা মারা গেছে। এই মারা যাবার খবর কী আসল না নকল, এটা কী বিয়ে ফিরিয়ে দেবার কৌশল নাকি আসলেই পিছাতে চায় ইত্যাদি নানাবিধ ধন্ধে মিজান মিয়া হাবুডুবু খায়। হাজার দশেক টাকা বিয়ের নামে হাত গলে বেরিয়ে গেছে। লোক জানাজানি হয়ে গেছে এই বিয়ের খবর, এখন যদি তারা বিয়ে না করায় উপায় আছে? কিন্তু না করালে তো আর জোর জবরদস্তি করে, কিংবা হাতে পায়ে ধরে করানোর জামানা নয়। অগত্যা সময় পিছানোর বার্তা নিশ্চুপ মেনেই নিতে হয়।

রাত গভীর হলে, মানুষের আওয়াজ শব্দ বন্ধ হয়ে শিয়ালের হুক্কাহুয়া উচ্চকিত হলে মিজান মিয়া বউয়ের সাথে মিটিঙে বসে, আইচ্ছা গিন্নি কও তো তিনটা মাইয়াই এমন অলক্ষী কপাল নিয়া ক্যান জন্মাইছে? বউ শুনে শেষ করে না, শুরু করে নাকি সুরে কান্না। বউয়ের এই এক দোষ। পারে খালি কানতে। দিশাবিশা না পেলেই কান্না। থাকুক ছোট কন্যার বিয়ের অমীমাংসিত প্রসঙ্গ। সময় হলে মীমাংসা হবে।

আমরা মাইজম কন্যার ঘটনা শুনি। তিন কন্যার মধ্যে সে সবচেয়ে শিক্ষিত। সদরের কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ। এই পাশ আর আকর্ষণীয় গঠনে সে যতটা না নিজেকে তার চেয়ে অধিকতর যোগ্য ভেবে দেমাকে মাটিতে পা ফেলে না। পাত্র তারে পছন্দ করবে কী, তারই পাত্র পছন্দ হয় না। সারাদিন সেজেগুজে ঘুরে বেড়ায় আর পাড়া ছাড়িয়ে গ্রামের পোলাপান সব বেড়ার ফাঁকে উঁকি দেয়। কোনও না কোনও পোলাপানের বাপ মা অভিভাবক নিত্য বিচার নিয়ে আসে — মেয়েরে সামলাইয়া রাখতে ফার না? কন্যাও সমান তেজে উত্তর দেয়, ক্যান নিজের পুলারে সামলায়া রাখতে কেউ নিষেধ দিছে? এহেন কন্যারও পাত্র পছন্দ হয়। ছেলে দুবাই থাকে। মিজান মিয়া রাতে ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে কন্যারে জিগায়, পাত্র পছন্দ হইল না দুবাই পছন্দ হইল? কন্যা লাজে অর্ধেক ভাত খেয়ে উঠে গেলে বউ ফিসফিস করে, পাত্র পছন্দ হইলে হইছে, দুবাই পছন্দ হইলে হইছে, আফনের কী! নফল নামাজ পড়ুম এই তেজ ঘর থিক্যা বিদায় নিলে। মিজান মিয়া অকাট্য যুক্তি মেনে নীরবে খেয়ে উঠে।

আর পরের শুক্রবার জুম্মা নামাজের পর মাইজম কন্যার কাবিন হয়ে যায়। পাত্রকে হাজার বিশেক টাকা দিতে হয় ফার্নিচার বাবদ। গায়ে লাগে না। কিনতে গেলে আরও বেশি লাগত। আচ্ছা থাক, এদিকে আবার ছোটকন্যার বিয়ের বার্তা নিয়ে পাত্রপক্ষ পুনরায় এসে হাজির। আগে শুনি তারা কী বলে।

তারা পুনরায় তারিখ করতে চায়, তবে সামান্য দাবি আছে তাদের। পঞ্চাশ হাজার টাকা। পাত্রের হাত এই মুহূর্তে খালি। বিয়ের খরচ কুলাইতে এর নীচে হবে না। মিজান মিয়ার তব্দা খাওয়া অবস্থা দেখে পাত্রের মামা মুখ খুলে জানায় কন্যার বড় দু বোনের কিসসা কাহিনী শুনে পাত্রের মা বেঁকে বসছিলেন। এসব মৃত্যুর খবরাখবর বাহানা মাত্র। অনেক কষ্টে এই পঞ্চাশ হাজার টাকার বিনিময়ে পাত্রের মাকে রাজি করানো গেছে। এখন যা ভালো মনে হয় করুক মিজান মিয়া।

অন্দর থেকে ইশারা দেয় মিজান মিয়ার বউ। ইশারা পেয়ে আর অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে রাজি হয়ে যায় মিজান মিয়া। ছোট মেয়ের বিয়ে পুনরায় স্থির হয়। পাত্রের মামা যাবার আগে মিজান মিয়ার কানে কানে বলে, আফনের মাইজম কইন্যার বদনামে তো পাঁচ গাঁয়ে কান রাখা যায় না।

মিজান মিয়ার কী হয় কে জানে, পঞ্চাশ হাজার টাকা যোগাড়ের দুশ্চিন্তা হোক কিংবা ক্রমাগত মাইজম কন্যার বদনাম শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হওয়ার কারণেই হোক পাত্রপক্ষ বিদায় নেয়া মাত্র জলন্ত চুলার আগুনের কাঠ তুলে মাইজম কন্যারে মারতে যায়। মা আর বাকি কন্যারা তারে থামাতে পারে না।

সে রাত সারারাত মাইজম কন্যা ঘুমায় না, কান্দে। মিজান মিয়া আর বউ সারারাত ঘুমায় না, হিসাব করে হাজার পঞ্চাশ টাকার যোগান হবে কীভাবে! রাত ফুরিয়ে দিন হলে মাইজম কন্যা মিজান মিয়ার সামনে দাঁড়ায়। পঞ্চাশ হাজার টাকার চেকটা বাড়িয়ে দিলে মিজান মিয়ার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। মাইজম কন্যা জানায় একজন দুবাই থেকে পাঠিয়েছিল তার খরচ। এইটা সে বোনের বিয়েতে দিতে চায়।

মিজান মিয়া তার বউ বড় কন্যা ছোট কন্যা সব একসাথে টাস্কি খেয়ে যায়। কে দিল? জামাইরে তালাক দিয়া তো দেশে আসছে বছর ঘুরতেছে, টাকা দিল কে? খুশবু তেজে উত্তর দেয়, যার জন্যে জামাইরে তালাক দিছি, সে পাঠাইছে।

মিজান মিয়া আর বউ তাকায় বিস্ময়ে বিমূঢ় পরস্পরের দিকে। একী কথা শুনে তারা খুশবুর মুখে। দায়মুক্তির  স্বস্তির নিশ্বাস অজান্তে বেরিয়ে আসে নাক-মুখ দিয়ে একসাথে।

বড় বোন আর ছোট বোন তাকায় পরস্পরের দিকে, এক বিছানায় ঘুমিয়ে তারা টেরই পেল না খুশবুর খুশবু?

যাহোক চলতে থাকে ছোট কইন্যার বিয়ের আয়োজন নিশ্চিন্তে, আনন্দে। পাড়াপড়শি আসে, পান-সুপারি খেতে খেতে গল্প-গুজব হয়। বেশ একটা বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি হৈ চৈ-এ চারদিক মৌ মৌ করে। এরই এক ফাঁকে বড় কন্যা মাইজম কন্যারে ঘরে ঢুকিয়ে খিল আটকায়, হোক ছোটর বিয়ে, তারপর আগে আমার। আমিও জামাই পছন্দ কইরা রাখছি। তুই যারে দুবাই ছাইড়া আইছস হে। তারপর তুই যা খুশি কর।

About Char Number Platform 339 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*